বাংলা ব্লগিং-এর অগ্রদূত সামহোয়ার ইন-এর উদ্যোগে ১৯-শে ডিসেম্বরকে বাংলা ব্লগ দিবস ঘোষণা এবং ব্লগারদের স্বত:স্ফূর্ত অংশগ্রহণে দিবসটি উদযাপন নি:সন্দেহে বাংলা ব্লগিং-এর ইতিহাসে নতুন এক মাত্রা সংযোজিত হল। সমকালের বাংলা ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির সমুজ্জ্বল দিশারী, বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবি অধ্যাপক আনিসুজ্জামান কতৃক বাংলা ব্লগ দিবসের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা প্রদান দিবসটিকে মহিমান্বিত করেছে। আশা করা যায় দিবসটির গুরুত্ব অনুভব করে অপরাপর বাংলা ব্লগগুলোও, যারা বিশ্বময় বাংলাভাষীদের জন্য মাতৃভাষায় ব্লগিং-এর সুযোগ এনে দিয়েছে তারাও দিনটির সাথে সংহতি প্রকাশ করে জাতীয়ভাবে দিনটি পালন করবে।
অধ্যাপক আনিসুজ্জামান কতৃক বাংলা ব্লগ দিবস ঘোষণা
উত্তর আধুনিক যুগের বর্তমান এ আবহে নয়া উপনিবেশিক শক্তি বিশ্বময় ভাষা ও সংস্কৃতির উপর তাদের আগ্রাসন অব্যাহত রেখেছে। এক গবেষণায় জানা যায় ইংরেজি ভাষার দাপটে বিগত দশকে বিভিন্ন ছোট ছোট জনগোষ্ঠির প্রায় ২০০-টি ভাষা বিলুপ্তি পেয়েছে। ভাষার উপর আগ্রাসনে বিশ্বায়নের এ যুগে উপনিবেশিক শক্তি তথ্য প্রযুক্তি, বিশেষত: অর্ন্তজাল বা ইন্টারনেটকে বড় এক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। এ কারণেই ইন্টারনেটে প্রধানতম ভাষা (lingual-franc)হিসেবে ইরেজি ইতোমধ্যেই পরিচিতি লাভ করেছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলা ব্লগের উন্মেষ এবং বাংলাভাষী ব্লগারদের মাঝে এর জনপ্রিয়তা লাভ নি:সন্দেহে আগ্রাসী শক্তির বিপক্ষে দৃশ্যমান একটা প্রতিবাদ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার দাবি রাখে। শুধু বাংলা ব্লগ নয়, বিশ্বের সব স্থানিক ভাষা-সংস্কৃতি সুরক্ষার জন্য প্রয়োজন স্ব স্ব ভাষায় ওয়েবসাইট তৈরী করা সহ ব্লগিং-এর সুযোগ সৃষ্টি করা।
বাংলা ব্লগগুলো ইতোমধ্যেই সমাজে গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে। এ প্রসঙ্গে নিম্নোক্ত বিষয়াবলীতে আলোকপাত করা যেতে পারে।
ক. মূল ধারার পত্র-পত্রিকায় নানা রূপ সেন্সরশীপের কারণে লেখক-লেখিকারা প্রায়শ:ই তাদের যৌক্তিক মনের ভাব প্রকাশ করতে পারেন না। কিন্তু ব্লগসমুহে মুক্তভাবনার চিন্তা চেতনা প্রকাশে বাধা নেই। এ কারণেও অনেকের কাছেই বাংলা ব্লগ হয়ে ওঠছে তাদের লেখালেখির একটি প্রিয় মাধ্যম হিসেবে।
খ. বাংলাভাষায় প্রচারে এবং প্রসারে বাংলা ব্লগ বিশেষ ভূমিকা পালন করছে। প্রতিষ্ঠিত লেখকদের বাইরেও ব্লগে অংশগ্রহণ করছে নব প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা। এতে করে তৈরী হচ্ছে নতুন নতুন লেখক-লেখিকা, যা বাংলাভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতিকে আরো সমৃদ্ধ করবে।
গ. দেশ-কালের সীমানা পেড়িয়ে বাংলা ব্লগগুলো সার্থকভাবে পেরেছে একটি বৈশ্বিক বাংলাভাষী কমিউনিটি সৃষ্টি করতে। ব্লগিং-এর কারণে বাংলাভাষী ব্লগারদের মাঝে সৃষ্টি হয়েছে মেল বন্ধন। উল্লেখ্য, এ মেল বন্ধন শুধুমাত্র ভার্চুয়াল জগতেই সীমাবদ্ধ নয় বরং আমাদের বাস্তব জীবনেও এ বন্ধন প্রতিফলিত হচ্ছে নানাভাবে।ব্লগারদের আয়োজিত ব্লগারদের আড্ডা, পিকনিক এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায়।
ঘ. জনমত তৈরীতেও ব্লগ বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখছে। সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে এবং আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আজ নব প্রজন্ম উজ্জীবিত। এর অনেক কার্যকারণের মধ্যে বাংলা ব্লগগুলোর ভূমিকাও উল্লেখযোগ্য।
বাংলা ব্লগ দিবস ঘোষণার মাহেন্দ্রক্ষণে উপস্থিত থাকতে পেরে এবং সেই সাথে কিছু কথা বলার সুযোগ পেয়ে নিজেকে গর্বিত মনে হয়েছে। তবে অনুষ্ঠানটি থেকে ফিরে এসে ভাবনায় এল অকথিত কিছু কথা। বাংলা ব্লগিং-এর ইতিহাসে জানা-আরিল দম্পতির কথা বিশেষভাবে না এলে আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
বিজয় দিবসের ঝান্ডা উড়িয়ে রাজপথে জানা-আরিল দম্পতি
ভালবাসার এক অপ্রতিরোধ্য শক্তি রয়েছে, যা ভাষা সংস্কৃতি কিংবা ভৌগলিক সীমানার বেড়া ডিঙ্গিয়ে দুজন মানুষকে কাছাকাছি আনতে পারে। এ প্রস্তাবনার জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ জানা-আরিল দম্পতি। বাঙ্গালী সংস্কৃতির আবহে বাংলা ভূ-খন্ডেই লালিত পালিত বাংলাদেশী মেয়ে জানা। আর সেই সুদূরের স্ক্যান্ডেনেভিয়ান দেশের নরওয়েজিয়ান বংশোদ্ভূত আরিল। কোন শুভক্ষণে কিংবা কিভাবে তারা গড়ে তুলেছে ভালবাসার তাজমহল তা তারাই ভাল বলতে পারবে।
'সামহোয়ার ইন বাংলা ব্লগ যে মূলত: জানা-আরিল দম্পতির মানস সন্তান একথা আজ সবারই জানা। উল্লেখ্য ব্লগটি সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাসেবী একটি মঞ্চ। এটি প্রতিষ্ঠাকরণ এবং চালু রাখতে এ দম্পতি যেভাবে তাদের অর্থ, মেধা ও সময় বিনিয়োগ করে যাচ্ছেন তাতে অবাক হতে হয় বৈকি। তবে এক্ষেত্রেও যে ভালবাসা বড় নিয়ামক তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বাংলা ভাষা-সংস্কৃতির প্রতি গভীর ভালবাসা প্রসূত দায়বদ্ধতা থেকেই যে এই সৃজনশীল, উদ্যোমী দম্পতি সামু প্রতিষ্ঠাকরণ সহ এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়ভার গ্রহণ করেছেন তা দ্বিপ্রহরের সূর্য্যের মতোনই সুস্পষ্ট। তবুও এখানে কথা থেকে যায়। জানা একজন বাঙ্গালী মেয়ে, সে বিবেচনায় বাংলাভাষা-সংস্কৃতির প্রতি তার গভীর মমত্ববোধ থাকাটা অভিনব কিছু নয়। কিন্তু আরিল? সেই সুদূর নরওয়ে যার দেশ, ইউরোপের আবহে লালিত-পালিত নরওয়েজিয়ান আরিলের মনে বাংলাভাষা-সংস্কৃতির প্রতি যে দরদ তা সত্যিই আমাদেরকে চমৎকৃত করে।
আমাদের মেয়ে জানা
আরিলের সাথে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় বুঝতে পেরেছি বাংলাভাষা-সংস্কৃতির প্রতি তার রয়েছে অকৃত্রিম টান। আমাদের সাথে কথাবার্তায় ইংরেজি নয় বরং বাংলায় বলতেই তিনি স্বাচ্ছ্যন্দ বোধ করেন। লক্ষ্য করেছি, আমাদের সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক আত্মিকরণে তার অক্লান্ত প্রচেষ্টা। ওর সাথে কথা বলে বুঝতে পারি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাতেও তিনি উজ্জ্বীবিত। এমন একজন মানুষকে কি করে বিদেশী ভাববো?
আমি তোমাদেরই লোক
আমার দৃঢ় বিশ্বাস বাঙ্গালী সংস্কৃতি ধারণ করে আরিল এখন আর নিজেকে বিদেশী ভাবে না। বরং রবীন্দ্রনাথের মত তার হৃদয়ও গেয়ে ওঠে-
মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক
আমি তোমাদেরই লোক।
জয় হোক জানা-আরিল দম্পতির।জয় হোক সামহোয়ার ইনের। জয় হোক বিশ্বের সকল বাংলাভাষী ব্লগারদের।
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে ডিসেম্বর, ২০০৯ বিকাল ৫:২৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


