somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বৃষ্টিহণ্টন

০৯ ই অক্টোবর, ২০০৭ বিকাল ৩:৩৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপের জন্য গতকাল সারাদিন খুব বৃষ্টি হয়েছে। কখনো ঝিরঝির আবার কখনো মুষলধারে। টানা বৃষ্টিতে যা উপকার হয়েছে তা হল সন্ধ্যার পরে এলাকায় আর বিদ্যুত যায় নি, অসুবিধাও কম নয়- রাতে ইণ্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। আর ছিল, বৃষ্টিতে ভেজার সুযোগ বা বিড়ম্বনা। আমি অবশ্য সুযোগের দিকটাই দেখেছি।

গুলশান গিয়েছিলাম ব্যক্তিগত কাজে। ফেরার পথে কামাল আতাতুর্ক ধরে হেঁটে ফিরছিলাম। ওভারব্রিজের নিচে এসে বাসের দেখা পেলেও চড়ে বসার সুযোগ হয় নি। অগত্যা হাঁটতে হাঁটতে রেলক্রসিংয়ের মুখে আসা, আমাকে দেখেই বরাবরের মত ব্যারিকেড পড়ল, অনেকেই পড়ি-কি-মরি করে রেললাইন অতিক্রম করলেও আমার তাড়া ছিল না, আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রেলগাড়ির অপেক্ষায় রইলাম। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ট্রেনের দিকে তাকিয়ে ছোটবেলায় ট্রেনে চড়ার স্মৃতি মনে আসছিল। ট্রেনের যাত্রীদের দেখে মনে কেমন ঈর্ষাও হচ্ছিল, যেন সকল আনন্দ বয়ে নিয়ে যাত্রীরা আমাদের দিকে তাচ্ছিল্য করছে। আর, এদিকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে তাদের দিকে ড্যাব ড্যাব করে চেয়ে থাকা ছাড়া আমাদের কিছু করার নেই।

আরো এগিয়ে গিয়ে রাস্তার পাড় থেকে দু’টো কদবেল কিনলাম। দোকানি আমাকে একটি কাঁচা কদবেল ধরিয়ে দিতে চাইছিল, কিন্তু বহৃদিনের অভিগ্ঞতার সাহায্যে আমার সাথে বিশেষ সুবিধা করতে পারল না। ব্যাগে কদবেল পুরে আমি হেঁটে চললাম। মনে এক অদ্ভুত আনন্দ। যারা ঢাকার বাইরে থেকে আসেন, তারা ঢাকাকে প্রায়ই নিরানন্দ শহর বলে গালিগালাজ করেন। অন্তত তখন আমার তা মনে হচ্ছিল না। হাঁটতে হাঁটতেই কখন Rangs ভবনের সামনে এসে গেছি কে জানে। দেখলাম ভবনের সব কাঁচই ছুটিয়ে নেয়া হয়েছে। ভবনটি এখনো জীর্ণ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কোনমতে। হঠাত করে দৌড়োতে ইচ্ছে হল, নভোথিয়েটারকে বামে রেখে এক দৌড়ে চলে গেলাম এমপি হোস্টেলের কাছে। আমার অনুভূতি তখন পথের রাজা বলতে যা বোঝায় আর কি।

এমপি হোস্টেল ছাড়িয়ে সংসদের অপরূপ রূপে আরেকবার চোখ বুলিয়ে নিয় সোজা মিরপুর রোডের পানে এগুলাম। মাঝে হাতের বামে সংসদের বিশাল মাঠটি চোখে পড়ল। সংসদ এলাকায় থাকার সময় এখানে কত খেলেছি, যাদের সাথে খেলেছি তাদের সবাই বয়সে আমার বড় ছিল, তবে সেই দিনগুলোকে তারাও শ্রেষ্ঠ মনে করে। এখন এই মাঠে আর খেলাধুলা হয় না, বিকেলে বলে ঢুকতেই দেয়া হয় না। আর ঐতো, এই দিক দিয়ে সংসদ এলাকায় ঢোকার রাস্তায় দু-প্রস্থ ব্যারিকেড দেয়া, আমাদের দুই নেত্রীর ব্যাপক নিরাপত্তার জন্য। অবশ্য তাদের আতিথেয়তা দানের আগে থেকেই মাঠে ঢোকা নিষিদ্ধ ছিল। ক্লাস সেভেন পর্যন্ত এখানে আমার কোন খেলার সাথী না থাকলেও পরের কয়েক বছরে বড় ভাইয়ার বন্ধুরা তার দুঃখ কাঁটিয়ে দিয়েছিল, জীবনে এক অদ্ভুত আনন্দ আর ভালোবাসা যোগ হয়েছিল। সেখানে নিশ্চয়ই প্রতিভা বিকাশের কোন অনন্য টোটকাও ছিল, কিন্তু এ মাঠে এখন আর আমার মতদের ঢোকার অধিকার নেই।

মিরপুর রোডে উঠে এক মজার চিন্তা মাথায় এল। ঢাকায় আমার প্রথম স্কুলটায় ঢুঁ মেরে গেলে কেমন হয়। বলাই বাহুল্য, আমার যাত্রাপথের পুরো সময় ধরেই বৃষ্টি ঝরছে, এ বুদ্ধিটি নিশ্চয়ই স্বাভাবিক নয়, তবে তখন কিন্তু একে খুবই উপযুক্ত মনে হল। গণভবনের নাম এখন প্রধানমন্ত্রী ভবন থেকে প্রধান উপদেষ্টা ভবনে রূপ নিয়েছে, তবে আমার স্কুলটির নাম গণভবনই রয়ে গেছে, গণভবন সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়। ঢুকে পড়লাম স্কুলের রাস্তায়, মনে পড়ল যখন থ্রিতে থাকতে এ স্কুলে ভর্তি হই, তখন এ রাস্তায় ঢুকলেই রীতিমত আমার হাত-পা গুলিয়ে উঠত। না, শিক্ষকরা খুব অত্যাচারী ছিলেন না, তবে প্রথম প্রথম সহপাঠীরা আমাকে যে উষ্ণ অভ্যর্থনা দিতেন, তা তখনো সহজ-সরল আমার জন্য মাত্রাতিরিক্ত ছিল। একটা উদাহরণ দিই, বাথরুমে গেলে দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে দেবার ভয়ে আমি বাথরুমে পর্যন্ত যেতাম না। অবশ্য এসবই বন্ধ হয়ে যায় আমি ফোরে উঠে প্রথম হবার পর থেকেই। তখন তো সবাই আমার ভক্ত।

এসব ভাবতে ভাবতেই স্কুলের গেটে পৌছে গেলাম, ভাল লাগল। গেটের বাইরে বড় বড় করে লেখা “গণভবন সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়”, স্থাপিত-১৯৮০, প্রভাতী শাখা-ছাত্রী; দিবা শাখা-ছাত্র। ছোট গেটটা দিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। সেই আগের স্কুল, আমার সামনে ঠায় দাঁড়িয়ে, পুরনো প্রেমিকের মত আমার অপেক্ষায়, দেরি হয়েছে বলে কোন অভিমান নেই। স্কুলের গেটে এক দারোয়ানের সাথে দেখা। তাদের সাথে কথা বলে জানলাম সেলিনা আপা এখনো আছে, ছোটবেলায় আমাদের সবার প্রিয় শিক্ষক। স্কুল বন্ধ, তাই বরং উপরে চলে যেতে সুবিধা হল, স্কুলের রুমগুলো তালাবন্ধ, কিন্তু তাতে কি, খোলা জানালা দিয়ে ভিতরের পুরোটাই দেখা যায়। আমরা যে ক্লাসগুলোতে ছিলাম, সেগুলো ঘুরে ঘুরে দেখলাম। এক বিশাল গুপ্ত প্রাসাদে যেন ঘটনার যোগসূত্র খুঁজে চলেছি, খুঁজছি নিজের শৈশবকেই। হঠাত মনে হল, দারোয়ান ভাই বলেছিলেন এখন কোচিং হচ্ছে। তাই উপরে কোচিং রুমে গেলাম। হ্যা, এখনো ঠিক সেখানেই পঞ্চম শ্রেণীর কোচিং হয় যেখানে আমরা করতাম। ঐতো, গোটা গোটা অক্ষরে বোর্ডে লেখা, “সম্ভ্রমার্থক ও তুচ্ছার্থক ক্ষেত্রে উত্তম পুরুষ ও নাম পুরুষ...” হয়ত সমর্পিতা আপারই লেখা। মনে পড়ল, সামান্য সম্মানীর বিনিময়ে তারা আমাদের জন্য কত অক্লান্ত শ্রমই না দিতেন। প্রথম হওয়ার জন্য আমার দিকে বিশেষ নজর ছিল সবার, আমাকে বৃত্তি পেতে সাহায্য করতে যেন সবাই আত্মোতসর্গ করেছেন। পরবর্তী সময়ে নামকরা স্কুল-কলেজে পড়ে বুঝেছি, তাদের অনেক শিক্ষকেরই এমন কর্মস্পৃহার বিন্দুমাত্র নেই।

স্কুলটিকে আগের মত রেখে, বৃষ্টিকে সাথে এগিয়ে চললাম আমি, সাথে এক অদ্ভুত ভালোলাগা। মনের কোথাও দুঃখের লেশমাত্র নেই। স্কুলটা ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে গেল, ঝাপসা হয়ে গেল সামনের পথটুকুও।
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই অক্টোবর, ২০০৭ সন্ধ্যা ৭:২৪
১১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকাল

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৭ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:৫১



আজকাল আমার মনে হয় -
আমাকে কেউ পছন্দ করে না,
কারো কাছে গেলে, সে বিরক্ত হয়।
পোশাক অগোছালো, এলোমেলো চুল,
চোখের দৃষ্টি কেমন ঘোলাটে!
বীরত্ব দেখানোর কিছু নেই।
চতুর পুরুষ স্ত্রীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে ৯টি বছরঃ একজন লিলিপুটিয়ান থেকে সত্যিকার ব্লগার হয়ে উঠার গল্প

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২৮

আজ আমার ৩য় বইয়ের জন্য চুক্তি করতে প্রকাশক আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। প্রকাশনা সংস্থা 'উত্তরণ'-এর মাসুদ ভাইয়ের বাংলাবাজারের অফিসে ঘণ্টাখানেক ছিলাম। তাঁর সাথে কথা বলতে বলতেই আমার মনে একটি বোধোদয় আসে! আমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×