আমার সাংবাদিকতা জীবনের একটি অবিশ্বাস্য স্মরণীয় দিন হলো ১৬ জুলাই ২০০৭। দিনটি অনেকের কাছেও স্মরণীয়। আওয়ামী লীগের কাছে স্মরণীয় এই জন্য তাদের নেত্রী শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করা হয়েছিলো। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে স্মরণীয়,তারা চাঁদাবাজীর মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে গ্রেফতার করতে পেরেছেন। গ্রেফতার অভিযানে যারা অংশ নিয়েছেন তাদের কাছেও তেমনি দাগকাটার মতো একটি দিন।
আমার কাছে পেশাগত কারণে দিনটি স্মরনীয়। রাত বারোটায় আমি, আমার চেয়ারম্যান মাহী জলিল, সিইও তাজ চৌধুরী এবং মিডিয়া এন্ড কমিউনিকেশন ডিরেক্টর শোয়েব চৌধুরী মিটিং শেষ করে হাসতে হাসতে অফিস থেকে বের হচ্ছিলাম। শোয়েব ভাই বললেন তানভীর তোমাকে আমি বাসায় লিফট দেবো। তখনই আমার মোবাইলে প্রথম ফোনটি আসলো। যুবলীগ সভাপতি জাহাঙ্গীর কবির নানকের মেয়ে রাখি বললো, তানভীর ভাই অবস্থা খারাপ,নেত্রীর বাসায় পুলিশ!! মনে হয় এরেস্ট করে ফেলবে।
চমকে উঠে বললাম, তুমি ফোন রাখো আমি দেখি ঘটনা সত্যি কিনা। কয়েক জায়গায় ফোন করলাম। তার পর যুক্তরাজ্য যুবলীগ সভাপতি আনোয়ার ভাইয়ের ফোন।
-আনোয়ার ভাই ব্যপারকি?
আনোয়ার ভাই বললেন, তানভীর আর ফোন করে লাভ নাই, ঘটনা ফাইনাল .. এরেষ্ট করে ফেলবে।
ফোন টা রেখে নিউজ রুমে ছুটে গেলাম, নিউজ রুমে কম্পিউটারটা অন করে লিখে ফেললাম , ”শেখ হাসিনা অবরুদ্ধ , যে কোন সময় গ্রেফতার হতে পারেন”। চ্যানেল এস টেলিভিশনে টেলিস্ক্রল চালিয়ে দিলাম।
তখন্ও পুলিশ শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করেনি। রাত তখন ১২:৩০ । চেয়ারম্যান জলিল ভাইকে বললাম, জলিল ভাই তাৎক্ষনিক লাইভ প্রোগ্রাম করতে হবে। এক বাক্যে চেয়ারম্যান রাজী। ’অভিমত’ আমাদের একটি নিয়মিত টকশো। আমি বললাম আমি প্রেজেন্টিং করবো কিন্তু গেষ্ট পাবো কোথায় এতো রাতে!!
ফোন করলাম আনোয়ার ভাইকে তখন রাত ১টা । বললাম ,আনোয়ার ভাই অফিসে আসতে পারবেন ? আমরা লাইভ টক শো আয়োজন করছি। আনোয়ার ভাই বললেন আমি ১০ মিনিটের মধ্যে আসছি। শোয়েব ভাই তখনও আমার এই পাগলামী দেখছেন, বললাম শোয়েব ভাই আপনি আমার গেষ্ট হয়ে যান, আমি দুইজন নিয়ে প্রোগাম শুরু করে দিই। শোয়েব ভাই রাজী হয়ে গেলেন।
রাত ১:৩০ মি আমাদের মধ্য রাতের সংবাদ রিপিট হয়। সেখানে কোন আপডেট নিউজ দেয়ার সুযোগ নাই। তাই সংবাদের ঠিক আগে আমরা অনুষ্ঠান শুরু করে দর্শকদের একটি ঘোষনা দিলাম , শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করা হচ্ছে। আমরা সংবাদের পর পরই টক শোর আয়োজন করবো। দর্শকদের অপেক্ষায় রেখে সংবাদ বিরতিতে চলে গেলাম।
রাত ২টায় আবার শুরু হলো টক শো। অবিরাম গতিতে চলতে থাকলো টক শো। আমাদের অনুষ্ঠানের মূল সহযোগিতা করেছেন বাংলাদেশের এটিএন বাংলার সিনিয়র রিপোটার জি,এম তাসলিম। ঢাকা থেকে তাসলিম ভাই আমাদের লন্ডন ষ্টুডিওতে টেলিফোনে শেখ হাসিনার গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়ার পুরো ধারা বিবরণী দিয়েছেন।
স্টুডিও থেকে প্রিন্স ভাই, রাসুল ভাই, আহাদ ভাই সকলেই অসম্ভব পরিশ্রম করে অনুষ্ঠানটিকে করে তুলেছিলেন প্রাণবন্ত। শত শত দর্শক টেলিফোনে সর্বশেষ সংবাদ জানার জন্য লাইভ অনুষ্ঠানে ফোন করেছে। আমার দুই বছর ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকতা জীবনে এবং ইতিপূর্বে যত টক শো আমি করেছি তার কোনটিতে এতো টেলিফোন কল আমি রিসিভ করিনি। গতকালের শোতে যত ফোন কল পেয়েছি যে প্রিমিয়াম নম্বরে জ্যাম লেগে গিয়েছিলো। পরে কন্ট্রোল রুম থেকে বলা হয়েছিলো প্রায় হাজার খানেক ফোন কল এসেছিলো।
অনুষ্ঠানের সবচেয়ে বড় চমক ছিলো শেখ হাসিনার ছেলে সজিব ওয়াজেদ জয়ের টেলিফোন সংলাপ। ব্লগার আরাফাতুল ইসলামের মন্তব্য অনুযায়ী সিএসবি নিউজ জয়ের স্বাক্ষাতকার প্রচার করেছিলো সর্ব প্রথম । সেটি ৬:৩০ মি হতে সকাল ১০ টার মধ্যে।
বাংলাদেশ সময় সকাল ৯টা। আমরা স্টুডিও থেকে সরাসরি জয়ের সাথে যুক্তরাষ্ট্রে টেলিফোন সংযোগ স্থাপন করেছিলাম। জয় প্রায় ৬ মিনিট ধরে অভিমত অনুষ্ঠানে লাইভ স্বাক্ষাতকার দেন।
পরদিন সকাল হতে আমি যে পরিমাণ টেলিফোন কল পেয়েছি আর মানুষের সাধুবাদ পেয়েছি আমার এই ক্ষুদ্র সাংবাদিকতা জীবনে এই মুহুর্ত দ্বিতীয়বার আসবে কিনা জানিনা। একটি সংবাদের গুরুত্ব আর দর্শক চাহিদা পুরন করতে পেরে আমার মনে হয়েছে আমি আমার পেশার যোগ্য মূল্য দিতে পেরেছি।
আত্মতৃপ্তিতে ভরে উঠেছিলো আমার মনটা। দর্শক এতোটাই উদগ্রীব হয়েছিলো যে লন্ডন সময় ভোর ৫:৩০ মিনিট পর্যন্ত বিরামহীন ভাবে টক শো চালিয়ে যেতে হয়েছে

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

