দেড়দিন ধরে অনেক ঈদের বেড়ানো বেরালাম। কিন্তু অনেক অনেক দিনের জমানো অতৃপ্তি আবারো আমাকে গ্রাস করলো।
আমার কখনোই গ্রামে ঈদ করা হয়নি।
দাদা মারা যান বাবা যখন ক্লাস সেভেনে। আমার জন্মেরও আগে আমার বড় চাচা গ্রামের ভিটা থেকে ঘরদোর উপড়ে মফস্বল শহরে তার নিজের নতুন কেনা জমিতে স্থাপন করেন। তখন থেকে আমাদের ভিটায় সত্যি সত্যি ঘুঘু চড়ে(আমি নিজের চোখে ঘুঘু হেঁটে বেড়াতে দেখেছি)।
নানার পৈত্রিক ভিটা ছিল তারাকান্দি নামে যমুনার পাড়ের এক গ্রামে। সেটাও নদী গর্ভে বিলীন হয় '৬০দশকের প্রথম দিকে।
ছেলেবেলায় দেশে ঈদ করা মানে ছিল হয় পূর্ববংগের এক মফস্বলে না হয় উত্তর বংগের পাটের বানিজ্যে কোলাহল মুখর ছোট্ট একটা শহরে।
ঈদের ছুটি শেষে স্কুলে গেলে আমার গল্প করার তেমন কিছু থাকতো না।
সতীর্থেরা যখন ধান সেদ্ধর সাথে পাখীর চুরি করে আনা ডিম সেদ্ধ করার, খড়ের আগুন জ্বালিয়ে মটরশুঁটি খাওয়ার আর নদীর কিনারে পানির মধ্যে সরু জংলী আখ তুলে চোষার গল্প করতো আমি তখন সেসব গোগ্রাসে গিলতাম আর ভাবতাম 'ইস্ আমার যদি গ্রামের বাড়ি থাকতো!'
৮০ সালে আমি আমার সম্প্রসারিত পরিবারের (আমার প্রজন্মের) সবার কাছ থেকে চাঁদা তুলে আমাদের গ্রামে গেলাম। ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, মেম্বার, গ্রামের গন্যমান্য ব্যাক্তি সবাইকে নিয়ে মিটিং করে আমাদের ভিটার ওপর থেকে "অবৈধ অনুপ্রবেশকারী"দের উচ্ছেদ করলাম। তাদের মধ্যে যারা যারা ছিল আথির্কভাবে অসমর্থ তাদের তোলা চাঁদা থেকে আর্থিক সাহায়্য দিলাম অন্য জায়গায় বাড়ি তুলতে। তার পর ৩৬৫টি (মনে রাখার সুবিধার্থে) মেহেগনি চারা লাগালাম। চিন্তা ছিল যদি ৩০ বছর বেঁচে থাকি তাহ'লে একটা জায়গার মেহেগনি কেটে সেগুলো বিক্রি করে সেই টাকা দিয়ে একটা বাড়ি তোলা যাবে।
গাছগুলো বাড়তে থাকে। এক সময় আমাদের ভিটাটা আশেপাশের দশ গ্রামে "বাগান বাড়ি" নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে।
একবার আমার বন্ধু ও বিবাহ সম্বন্ধীয় আত্মীয়দের নিয়ে বেড়াতে গিয়েছিলাম ওখানে। বিশাল এলাকা জুড়ে জমিতে দেড় মানুষ উঁচু গাছ আর গাছ, বিরাট টলটলে পানির এক পুকুর ( দু'পুরুষের আগের বিশালত্ব, ভাগ করলে আমার পরের পুরুষে তা ১০ ফুট বাই দশ ফুটে পরিনত হবে)। পুকুরে চার পাড়ে সারি, সারি গাছ। এ যেন অন্য ভুবন। সবাই অভিভুত। আসার সময় সবারই এক কথা, এমন একটা স্পট থাকতে কেন আমরা অন্য জায়গায় ছুটি কাটাতে যাব?
২০০১এ আমার এক পরমাত্মীয় সে গাছগুলো কেটে লাকড়ি হিসেবে পানির দামে বিক্রি করে দেয়।
আমার গ্রামের বাড়িতে ঈদ করার সাধও ঘুচে যায়।
ইস্ যদি আমার একটা গ্রামের বাড়ি থাকতো।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ রাত ১:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



