বন্ধু প্রতীম দেশ হল সোনার পাথর বাটি। দুটি দেশ পরষ্পরের কাছাকাছি আসে যখন তাদের স্বার্থ থাকে অভিন্ন। ১৯৭১ এর ২৫ শে মার্চের পর পাকিস্তানের নাগপাশ থেকে রক্ষা পেতে বাংলাদেশ ভারতের স্মরনাপন্ন হয় আর চির শত্রু পাকিস্তানকে সামরিক ভাবে দূর্বল করতে, ভেংগে দু’টুকরো করতে এবং একটা বিশাল বাজার পেতে ভারত বাংলাদেশকে সাহায্য করে। ফলাফল বাংলাদেশ এবং ভারতের পক্ষে এবং পাকিস্তানের বিপক্ষে গেছে।
গত রাতে এ টি এন নিউজে গোলাম আজমের সাক্ষতকার দেখে বার বার একাত্তুরকে ফিরে ফিরে দেখছিলাম।
তার সাক্ষাতকার শুনে মনে হচ্ছিল যে বাংগালীরা ভালবেসে এবং বিশ্বাসভরে আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছিল। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা বাংগালীদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে পাকিস্তানের চির শত্রু ইন্ডিয়ার সাথে হাত মিলিয়ে পাকিস্তানকে দ্বিখন্ডিত করার ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে। পাকিস্তান সরকার এতে ক্ষুব্ধ হয় এবং কিছু সংখ্যক সেনা মোতায়েন করে রায়ের বাজার এবং আরো কিছু স্থানে । সেনা বাহিনী সব সময় সব দেশেই একটু বাড়াবাড়ি করে থাকে। ঢাকাতেও করেছিল এবং রায়ের বাজার জ্বালিয়ে দিয়েছিল। যেহেতু তখন নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সব ইন্ডিয়াতে গিয়েছিল সে সময় পাকিস্তানকে দু’টুকরো করতে সেহেতু পাকিস্তান সরকারের মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার রাও ফরমান আলী গোলাম আজম ও অন্যান্য আরো কিছু সমমনাদলের প্রধানদের ডেকে নিয়ে সেনা বাহিনী উদ্ভুত পরিস্থিতি সামাল দিতে কাজে লাগান।
বাংলাদেশের ১৪ কোটি লোকের ভেতর স্বাধীনতার পর জন্ম নিয়েছে ৯ কোটি ৮০ লক্ষ লোকেরও বেশী ( সুত্রঃ UNFPA)। এই ৯.৮ কোটি লোক মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি। আবার একাত্তরে যাদের বয়স তিনের কম ছিল সাধারনভাবে তাদের কারুরই স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি থাকার কথা নয়। লোক মুখে শুনে এবং বিকৃত ইতিহাস থেকে জেনেই তাদের জ্ঞান মুক্তিযুদ্ধের ওপর। স্বাধীনতা পরবর্তী প্রজন্মের বিশাল একটি অংশ একাত্তরে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলীর কিছুই জানে না বা জানার প্রয়োজন বা আগ্রহ বোধ করেনা। এর সাথে আছে স্বাধীনতা বিরোধী ও তাদের দোসরদের প্রপাগান্ডা।
দেশের সর্ব বৃহৎ দুটি রাজনৈতিক দলের একটি সরাসরি এবং সর্বজন সমক্ষে এই যুদ্ধাপরাধীদের সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। সনদ পত্র প্রদান করছে তাদের নিষ্পাপ চরিত্রের । সেই দলটিতে মুক্তি যুদ্ধে অংশ গ্রহণকারী সদস্য সংখ্যাও কম নয়। ঢাকার সাবেক মেয়র খোকা নিজেই একজন অকুতভয় মুক্তিযোদ্ধা যিনি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ঢাকা নগরীর গেরিলা যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন।
অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বলে পরিচয়দানকারী আওয়ামী লীগ সংবিধানে প্রচুর কাটাছেঁড়া করলো। ধর্মকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করলো। কিন্তু ধর্ম ভিত্তিক রাজানীতি বহাল রাখলো।
তারা যুদ্ধাপরাধী বিচার শুরু করলো। কিন্তু সে বিচারও তারা প্রশ্নবিদ্ধ রাখলো। বিচারের আওতায় অনেক চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী নেই।
চিটাগাংএর কসাই, তৎকালীন চিটাগাংএর আল বদর প্রধান, দিগন্ত টিভির মালিক মীর কাশেম তার গায়ে সৈদি আতর মেখে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। চিটাগাং এ একাধিক গণহত্যায় তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ আছে। অভিযোগ আছে চিটাগাং এর বুদ্ধিজীবী হত্যার তালিকা প্রনয়ণের।
এ টি এন হুজুর, মেহেদী রংগা আবুল কালাম আযাদের বিরুদ্ধে গ্রাম ঘেড়াও করে নিয়মিতভাবে সেখান থেকে মেয়েদের ধরে পাকি ক্যাম্পে সরবরাহ করার গুরুতর অভিযোগ আছে। তাকে দেখা গেছে তার কমলা রং এর মুখ নিয়ে বই মেলা’১১তে ঘুরে বেড়াতে। তিনি তার মসজিদ কাউন্সিল নিয়ে সুখেই আছেন। যে মসজিদ কাউন্সিলের বিজ্ঞাপন রোজই দেখা যায় আমার দেশ পত্রিকার অন লাইন সংখ্যায়।
এটি এন এ বার বার দেখানো ময়ময়নসিং এর মুসলিম লীগ নেতা যে তার বৈঠখানায় মুক্তি যোদ্ধাদের জবেহ করতো বলে অভিযোগ আছে তাকে বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায় ঢাকার অতি অভিজাত এলাকায়। গুলশান কেন্দ্রীয় মসজিদ কমিটির তিনি কর্ণধার।
ভুঁড়ি ভুঁড়ি উদাহরণ আছে এমন। এই উদাহরণে উদ্ভুদ্ধ হয়ে গ্রেফতারকৃত যুদ্ধাপরাধীদের সাংগপাংগরা যদি বলে শুধুমাত্র রাজনৈতিক উদ্দ্যেশ্য হাসিল করতে এই বিচারের ব্যাবস্থা করা হয়েছে তাহলে তাদের খুব একটা দোষ দেয়া যায় না। সেই সুত্র ধরে গোলাম আযম যখন বলে বি এন পি যাতে ক্ষমতায় যেতে না পারে শুধু সে জন্যেই তার মত ঈমানদার, শুধুমাত্র আল্লাহ ছাড়া যে কাঊকে ভয় করেনা, একাত্তরে যে কোন অন্যায়ই করেনি, তাকে ধরা হচ্ছে তখন কিছু মানুষের মনে তার এই বক্তব্য বিশ্বাস যোগ্যতা অর্জন করতেই পারে।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রক্রিয়ায় সেদিন অভিযুক্তির জন্যে যে সাক্ষীকে জেরা করা হয় তার বিবরন এই ব্লগেই দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর পক্ষের অনেকেই পোষ্ট করেছে এবং করেছে বোধগম্য কারনেই। কিন্তু এমন তো হবার কথা ছিল না। যে অর্থ বল, লোক বল, সাংগাঠনিক বলের প্রয়োজন ছিল এ বিচার কাজ চালাতে সেটা কি সরকার এই বিচারে নিশ্চিত করেছে? আসামী পক্ষের উকিল আর সরকারী পক্ষের উকিলের মান তুলনা করলেই সেটা দিবালোকের মত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ও জে সিম্পসনের মামলা যে তার পক্ষে গিয়েছিল তার পেছনে উকিলের জন্যে জলের মত অর্থ ঢালার ব্যাপারটা নিজামী গং ঠিকই বোঝে, সরকার বোঝে না। বিমান বন্দরের নাম বদলাতে সরকার যে টাকা খরচ করেছে তার সাথে এই যুদ্ধবন্দী বিচারে খরচের একটি তুলনা দাঁড় করাতে পারলেই স্পষ্ট বোঝা যাবে যে আসলেই যুদ্ধাপরাধী বিচার এ সরকারের কাছে কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ।
দু’বছর পর আরেকটি নির্বাচন হবে। এই সব যুদ্ধাপরাধীদেরকে নিষ্পাপ ঘোষনা দেয়া খালেদা জিয়া সরকার প্রধাণ হবে বা হওয়ার সম্ভাবনা খুবই বেশি যদি আমরা অতীত থেকে উদাহরণ টানি।। দেলোয়ার-নিজামী-সাকা গংদের বাড়িতে এবং গাড়ীতে আমাদের জাতীয় পতাকার অবমাননা শুরু হবে এবং হতেই থাকবে।
আর বিচারের বাণী নিরবে নিভৃতে কাঁদতে থাকবে।
একাত্তুরে যাদের হত্যা করা হয়েছিল, যারা নির্যাতিত হয়েছিল, নির্যাতিত যে মায়েরা ষাট হাজার যুদ্ধ শিশু জন্ম দিয়েছিল, যাদের বাড়ি ঘর লুন্ঠিত হয়ে ছিল এবং আগুণে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল তারা ছিল আম জনতা। আর আম জনতার বিচারের জন্যে যে পরকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় সেটা তো সবারই জানা।
আজ থেকে ঠিক চল্লিশ বছর আগে এই দিনে এই সময়ে চাপা উল্লাস নিয়ে আমি যখন চিটাগাং ইস্টার্ণ রিফাইনারির তেলের ট্যাংকে আগুন দেখতে দেখতে হরষে লাফালাফি করছিলাম তখন কি ভেবেছিলাম এই আমিই চল্লিশ বছর পরে এ কথাটি বলতে যে উন্নিশ শো একাত্তুরে ইন্ডিয়া পাকিস্তানকে দুর্বল অকরতে আমাদেরকে জন্ম দেয় নি, গৌরবময় একটি মুক্তি যুদ্ধের মাধ্যমে আমাদের দেশ আমরা স্বাধীন করেছি। উন্নিশ শো একাত্তুরে আসলেই বাংগালী জাতির এক হাজার বছরের লিপিবদ্ধ ইতিহাসের সবচে’ গৌরবময় অধ্যায় রচিত হয়েছিল।
আজ থেকে চল্লিশ বছর পর কেউ কি মনে করবে যে সীমাহীন আত্মত্যাগ, কল্পনাতীত দেশপ্রেম এবং উদাহরনের অতীত বীরত্বের বিনিময়ে আমাদের দেশ স্বাধীনতা লাভ করেছিল?
আমার সন্দেহ আছে। সম্ভবতঃ তখনকার মানুষেরা গোলাম আজমের মতই বলবে এবং বিশ্বাস করবে (যে বিশ্বাস গোলাম আযমও করেনা) যে জন্ম শত্রু পাকিস্তানকে ভাংগতে বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছিল ভারত।
কোন এক অলৌকিক উপায়ে আমি যদি তখনো বেঁচে থাকি তাহলে আমিও নিশ্চয়ই ততদিনে গোলাম আজমের দেয়া তত্ত্বটাকেই বিশ্বাস করা শুরু করবো ।
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই ডিসেম্বর, ২০১১ সন্ধ্যা ৭:১২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


