somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ঘুরে এলাম সীমানত

২১ শে মে, ২০১০ সন্ধ্যা ৬:১১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ভোর ছয়টা বেজে ৩০ মিনিট । ঠান্ডা ঠান্ডা হাওয়া । তখনো সূর্যের আলো ভালভাবে ফুটেনি । দিনটা ছিল দু'হাজার দশের জানুয়ারীর শেষ দিন মানে ৩১ তারিখ ।
আমি বরাবরই ভ্রমণপ্রিয় একজন মানুষ । ঘুরতে বেশ ভালবাসি । আর যাতে বেশি বেশি ঘুরতে পারি তাই সদস্য হয়েছি DUTSএর ।
তো সেখান থেকে এবারের ট্যুর সেন্ট মার্টিন-এ । ৩য় সেমিষ্টার পরীক্ষাও শেষ । তাই যাওয়ার জন্য ব্যাপক পরিকল্পনা করেছি । শুধু টাকা জমা দেওয়াটা বাকী আছে ।
এদিকে আবার ডিপার্টমেন্ট থেকে এবারের বনভোজন হচ্ছে শেরপুরের গজনীতে । বনভোজনের তারিখটা আমার ট্যুরের তারিখের মধ্যেই পড়েছে । তো ভাবছি, কি করা যায় ? সমুদ্র ভ্রমণেই যাব নাকি জঙ্গল ভ্রমণেই যাব ! হঠাৎ ডিপার্টমেন্ট থেকে ফখরুদ্দীন স্যারের ফোন এল । স্যার বললেন , আমি নাকি যতদিন আরবী ডিপার্টমেন্টের (কু নাকি সু) খ্যাত ছাত্রী হিসেবে আছি ততদিন নাকি আমাকে ডিপার্টমেন্ট থেকে বনে-বাদাড়ে ভ্রমণ করতে হবে । তাই রাজী হয়ে গেলাম ।
তো প্রথম মাসের শেষ দিবসের ভোরে আমার বর্তমান আবাস হল থেকে বের হয়ে রওনা দিলাম মল চত্বরের উদ্দেশ্যে । গুনে গুনে পাঁচ মিনিট পর পৌঁছলাম । গিয়ে দেখি , আমার চারপাশে চারটা বাস । সবাই বাসে উঠছে । আমাদের ব্যাচের জন্য চার নাম্বার বাস । উঠলাম গিয়ে চার নাম্বারে । উঠে দেখি, এখানেও ডাবলিং । মানে- প্রতি ব্যাচের জন্যে ১ টা করে বাস, অথচ আমাদের বাসে আমাদের ব্যাচের সাথে ডাবলিং করছে মাস্টার্সের ভাইয়ারা ... নাকি মাস্টার্সের সাথে ডাবলিং করছি আমরা ! আমাদের গাড়িতে ছিল আমাদের বড় ভাই জননন্দিত শিল্পী ফয়সাল আমীন কাযী । তো ভেবেছিলাম, সে যখন আছে তো গাড়িতে নিশ্চয় অনেক মজা হবে । কিন্তু ঘটল উল্টা । তারা তো কোন মজা করলই না, বরং গাড়িওয়ালাদের ভং-চং মার্কা গান শুনতে শুনতে যেতে হল ।
তো আমাদের গাড়ি চলছে তো চলছেই গাজীপুর- ময়মনসিংহের শাল- গজারের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে । ভাগ্যের নির্মম পরিহাস আর কাকে বলে ! হঠাৎ আমাদের গাড়ির একটা চাকা গেল পাংচার হয়ে । চাকা ঠিক করতে করতে পার হয়ে গেল আধা ঘন্টার বেশি সময় । এই ফাঁকে আমাদের বানর গ্র“পের বিশিষ্ট সদস্যরা পাশে একটা নার্সারী দেখতে পেয়ে সেখানে ঢুকে লাফালাফি শুরু করে দিল । চাকাকে সুস্থ করে আবার যাত্রা শুরু হল । কিছুদূর যাওয়ার পরে আবার তেল শেষ হয়ে গেল । হায়রে কপাল ! তাও আবার ভাঙ্গা-চোড়া এক তেল-পাম্পের সামনে ! তেল নিতে আবার সেই আধা ঘন্টা । এবার শুরু হল আমাদের একটানা অনির্দিষ্ট কালীন যাত্রা । যাইতে যাইতে আমরা শেষকালে শেরপুরে ঢুকেই গেলাম । এরপর... গজনীর রাস্তা । মধ্যে দিয়ে চিকন আঁকা- বাঁকা , উঁচু- নিচু রাস্তা । দু’পাশ দিয়ে উঁচু- উঁচু পাহাড়ী বন । মনে হচ্ছিল পাহাড় কেটে রাস্তা করা হয়েছে, আর আমরা গহীন বনের মধ্যে দিয়ে গাড়ি নিয়ে পাহাড়ে উঠছি । অসম্ভব এক ভাল লাগা আমাকে নাড়া দিয়ে যাচ্ছিল । মনে হচ্ছিল , অ্যাডভেঞ্চারে যাচ্ছি ।
ভাল লাগার এই আবেশের মধ্যে দিয়ে এক পর্যায়ে পৌঁছলাম চির কাক্সিক্ষত সেই গজনী অবকাশ কেন্দ্রে । গাড়ি থেকে নামতেই স্যারের আদেশ এল রেষ্ট-রুমে গিয়ে রেষ্ট নেবার । এমনিতেই তখন ঘড়িতে বাজে ২.০০ টা । অথচ শিডিউলে ছিল আমরা পৌঁছব ১২.০০ টায় । আবার রেষ্ট নিতে নিতে বাজল ২.৩০ টা । স্যার ডেকে পাঠালে নিচে গেলাম । তাঁরা আমাদের নিয়ে ঘুরতে বের হলেন । প্রথমেই গেলাম সাইট ভিউ টাওয়ারে । টাওয়ারের শীর্ষে উঠে চারদিকে চোখ বুলিয়ে যা দেখতে পেলাম !! ওয়াওওওওও !!! বলে শেষ করা যাবে না । কি সুন্দর সবুজ পাহাড়ে ঘেরা চারদিকে !এত্ত সুন্দর জায়গা আর এত্ত সুন্দর দৃশ্য আমাদের দেশেও আছে । মনে হচ্ছিল, যেন এক স্বপ্নের জগতে চলে এসেছি । পরে শুনি, এটা আমাদের না । এটা ভারতের সীমান্ত । কেটে-ছেঁটে ভাল জায়গা গুলো রেখে দিয়েছে !
কিছুক্ষণ টাওয়ারে কাটালাম । এরপর নিচে নেমে এলাম । ছেলেরা ততক্ষণে ভারত সীমান্তে চলে গেছে । ফখরুদ্দীন স্যার আমাদেরকে নিয়ে ভারত সীমান্ত জয়ে রওনা হলেন । কিন্তু, চেয়ারম্যান স্যারের আদেশে তিন-চার কদম এগিয়েই ফিরে এলেন । অদম্য ইচ্ছাকে দমাতে না পেরে স্যারের নির্দেশ অমান্য করে আমরা নিজেরাই রওনা দিলাম । রাস্তার মাঝে দেখা পেলাম কয়েকটা বড় ভাইয়ার । কিছুদূর হাঁটার পর পেয়ে গেলাম ঘোড়ার গাড়ি । গাড়ি কিছুদূর যাওয়ার পর আমাদের নামিয়ে দিল । কারণ, সামনে বিপজ্জনক এলাকা । গাড়ি নিয়ে আর ঢোকা যাবে না । আমরা হেঁটেই বিপজ্জনক এলাকার ভেতরে ঢুকে গেলাম । হাঁটতে বেশ মজাই লাগছিল । কারণ, জায়গাটা অ্যাডভেঞ্চারের জন্য দারুণ । একেতো পাহাড়, বন-জঙ্গল । তার উপর আবার বিএসএফ-এর গুলি খাওয়ার ভয় ! এমন হলেই তো মজা!
সীমান্ত জয় শেষে ফিরে এলাম । এসে দেখি, সবাই খেতে বসেছে । কিন্তু বনভোজনে তো বনের মধ্যে খাওয়ার কথা ! অথচ খাচ্ছে খোলা মাঠে ! তাহলে তো এটা হয়ে গেল মাঠ ভোজন !
আমি খাবার নিয়ে মাঠে না বসে চলে গেলাম গাড়িতে । আমার দলের সদস্য হিসেবে যোগ দিল ইভা, সুখী আর আরমান । খাবার ছিল: পোলাও , মুরগীর রোষ্ট , গরুর গোশত, ডিম, সালাদ আর কোল্ড ড্রিংকস । (খাবারের নাম লিখেও তো ভুল করলাম । কারণ, আমার এখন নাম দেখে আবার খাইতে ইচ্ছে করছে )
ভোজন-পর্ব শেষে গাড়ি থেকে নামলাম । এবার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পালা । আমরা বসে পড়লাম । আমরা যখন গাড়িতে ছিলাম তখন ফয়সাল ভাইয়া বলে দিয়েছিল , আমার গাড়িতে দুইটা মেয়ে আছে । এরা যদি হাঁড়ি ভাঙতে না পারে তবে এদের গজনীতে রেখে আসব ।
অনুষ্ঠানের শুরুতে আবার সেই কথা স্মরণ করিয়ে দিল । তো আমি আর ইভা ঠিক করেই রেখেছি যে , হাড়ি ভাঙ্গা তো দূরে থাক হাড়ির ধারে কাছেও যাব না । প্রথম পর্ব ছিল ডিপার্টমেন্টের পিচ্চি-পাচ্চা মানে ১ম বর্ষের পোলা-পানদের জন্যে । এরপরেই এল সেই কাক্সিক্ষত হাড়ি ভাঙ্গা । কেউ তো ঠিক মত যেতে পারে না । হাড়ি ভাঙ্গার গতি দেখে তো হাসতে হাসতে মরে যাওয়ার অবস্থা ! পরে হাড়ি ভাঙ্গল স্যারের মেয়ে । এরপর ছিল র‌্যাফেল ড্র । দেখি , স্যারেরা একেকজন দশটা-বারোটা করে টিকেট কিনে নিয়ে রেখেছে । তো ফল স্বরূপ যা হওয়ার কথা তাই হল । এরপর এল স্যারদের বালিশ খেলা । মানে বালিশ ঢিলা-ঢিলি আরকি! সবাইকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হল আমাদের প্রিয় মুখ ফখরুদ্দীন স্যার । খুশির ঠেলায় সবাই স্যারকে মাথায় নিয়ে নাচানাচি শুরু করল ।
সব পর্ব শেষ হয়ে বাকী থাকল এক পর্ব । সেটা হল আমাদের ফিরে আসা । সবাই ফ্রেশ হয়ে গাড়িতে উঠলাম । রওনা দিলাম পুরাতন আবাসের দিকে । রাতের নিঝুম নিরবতা ভেঙ্গে চলে এলাম ঢাকায় ঠিক রাত ১২.০০ টায় । শুরু হল আমার হলে ঢোকার সংগ্রাম । অবশেষে আমার হাউজ- টিউটর ম্যাডামের ঘুম ভেঙ্গে দিয়ে গভীর রাতে হলে ঢোকার সুযোগ পেলাম । এভাবেই শেষ হল আমার ২০১০এর বনের মধ্যে ভোজন ।




সর্বশেষ এডিট : ২১ শে মে, ২০১০ সন্ধ্যা ৬:৫২
৬টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×