দৈনিক আমাদের সময় চলার পথের চলতি পত্রিকা
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
শ্রেণীকক্ষে প্রবেশ করেছিলাম কয়েকটি পত্রিকা হাতে। উদ্দেশ্য, শিক্ষার্থীদের ‘নিউজ ট্রিটমেন্ট’ সম্পর্কে সম্যক ধারণা দেওয়া। দু-একটি পত্রিকা নিয়ে কথা সেরে, দৈনিক আমাদের সময় হাতে নিয়েই তো আক্কেল গুড়ুম! একি, শিক্ষার্থীদের ‘নিউজ ট্রিটমেন্ট’ নিয়ে ধারণা দিতে এসেছি কিন্তু দৈনিক আমাদের সময়-এর ‘নিউজ ট্রিটমেন্ট’ নিয়ে আমাকে ধারণা দেবে কে? কোনটি দিনের প্রধান সংবাদ, কোনটি দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয়, কিছুই তো ঠাওর করতে পারছি না। একটি শিরোনাম পেয়েছে লাল রংয়ের মর্যাদা, অন্যটি পেয়েছে হলুদ, ছাই কিংবা বেগুনি রংয়ের গুরুত্ব। তা ছাড়া তাৎপর্যবাহী ফন্ট কিংবা ৪-৫ কলামের দৃষ্টিকটু সমঝদারির
বাড়াবাড়ি তো রয়েছেই। তাই দিবসের সেরা সংবাদ খুঁজতে গিয়ে আর পাঁচ পাঠকের মতো নাজেহাল হতে হয়েছে আমাকেও। সংবাদের এ ‘সাম্যবাদী ট্রিটমেন্ট’ দিয়ে পাঠককে বেকায়দায় ফেলে যে দৈনিক তা হচ্ছে এ সময়ের পত্রিকা দৈনিক আমাদের সময়।
একটি পত্রিকার হরেক রকম ব্যবহারের সর্বোতকৃষ্ট উদাহরণ সম্ভবত দৈনিক আমাদের সময়। ঢাকা শহরের প্রচণ্ড জ্যাম, যাত্রীদের নাভিশ্বাস কিন্তু দৈনিক আমাদের সময়-এর পোয়া বারো। ভ্যাপসা গরম ও প্রচণ্ড রোদে অন্তহীন জনর্দুভোগ কিন্তু পথচারীর হাত, বগল কিংবা মাথায় ঠাঁই করে নেয় দৈনিক আমাদের সময়। তথ্যদানের পাশাপাশি ইত্যাদি হাজারটা রোজকার প্রয়োজন মেটাতে সর্বদা পাশে থাকছে দৈনিক আমাদের সময়। কিন্তু পাঠকের সহস্র চাহিদায় সাড়া দিয়েও পত্রিকাটি এখন পর্যন্ত ‘সুশীল পাঠকের’ তথ্যক্ষুধায় ‘ভর্তা-ভাজি’র ট্রিটমেন্টই পাচ্ছে; ‘মেইন ডিশ’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না। কেবল একঝলক দেখা কিংবা এক চিমটি তথ্যক্ষুধা মেটাতেই যেন আমাদের সময়। তাই পত্রিকাটির সর্বাধিক বিক্রি-বাট্টা দেখা যায় কর্মক্ষেত্র কিংবা যানবাহনে; তা-ও অন্য কোনো জাতীয় দৈনিকের সঙ্গে সস বা সালাদ হিসেবে একটু বাড়তি রসদের জোগান দেবে বলে। আর হাতেগোনা যে দু-চারটি বাসাবাড়িতে পত্রিকাটি রাখা হয়, তা হয়তো সহায়ক পত্রিকা হিসেবে কিংবা পরিবারের অর্থ সাশ্রয় প্রকল্পের অংশ হিসেবে; নয়তো পরিবারের কোনো নাছোড়বান্দা সদস্যের আবদার মেটাতে। কিন্তু মজা হচ্ছে, কথিত সুশীল পাঠক যেমন একদিকে পত্রিকাটিকে পূর্ণাঙ্গ জাতীয় দৈনিকের মর্যাদা দিতে নারাজ, অন্যদিকে এটি না পড়লে অভ্যস্ত পাঠক হজমি সমস্যায় ভুগতে থাকেন। সত্যিই উভয় সংকট! তাই তো কর্মক্ষেত্র থেকে যানবাহন সর্বত্রই চলে একঝলক আমাদের সময় দেখার চটজলদি আয়োজন। প্রশ্ন জাগে, ভদ্র সমাজে দৈনিক আমাদের সময় অচ্ছুত অথচ অনিবার্য কেন? সম্ভবত পত্রিকাটির ‘চটকদারি’ই তার অন্যতম কারণ। অনুমান করি, অস্থিচর্মসার পত্রিকাটি বাজারমাত কৌশল হিসেবে বেছে নিয়েছে ‘গুজব সাংবাদিকতা কিংবা অনুমাননির্ভর সাংবাদিকতা। পত্রিকা থেকে প্রতিদিন বিচিত্র ধরনের গুজবের সন্ধান পায় পাঠক, যা প্রায়শই ওই দিনের ‘টক অব দ্য টাউন/কান্ট্রি’র মর্যাদা পায়। ফলে এটি পাঠকের মধ্যে ‘কথোপকথন মুদ্রা’ হিসেবে কাজ করে। মূলত গুজব ও গাল-গল্পের রসদ খুঁজতে খুঁজতেই অধিকাংশ পাঠক জ্ঞাত কিংবা অজ্ঞাতসারে এ পত্রিকায় অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। আর একবার অভ্যস্ত হয়ে উঠলে পাঠককে তা বয়ে বেড়াতে হয় বহুদিন। যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ ধরনের গুজবভিত্তিক সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতা থাকে না। কিন্তু শহুরে ব্যস্ত পাঠক তার একঘেয়ে ও নিরানন্দময় জীবনে এক ছটাক বৈচিত্র্যের ছটা তালাশ করে ওই তিন টাকার গুজবের মধ্যেই। ফলে চরিত্রের দিক থেকে পত্রিকাটি খানিক ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’, ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ ইমেজ নিয়ে হাজির হয় হররোজ।
বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জগতে দৈনিক আমাদের সময় একটি ‘এক্সপেরিমেন্টাল’ পত্রিকা। সাংবাদিকতার প্রাতিষ্ঠানিক/তত্ত্বীয় অজস্র ধারণাকে দুমড়ে-মুচড়ে নিয়ত বাতিল করে চলছে পত্রিকাটি। তাতে একদিকে যেমন সাংবাদিকতার প্রচল রীতিনীতি লঙ্ঘিত হচ্ছে, অন্যদিকে সাংবাদিকতার বিদ্যায়তনিক জগতে যুক্ত হচ্ছে নিত্যনতুন মাত্রা/অভিজ্ঞতা। একদিকে সাংবাদিকতার তত্ত্বীয় ধারণা তার কৌলীন্য হারাচ্ছে, অন্যদিকে নিত্যনতুন অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এ যেন ভাঙার মধ্যেই সৃষ্টির বারতা। অবশ্য সব ভাঙাভাঙি যে কেবল নতুনতর সৃষ্টির প্রেরণা থেকে তা কিন্তু নয়, বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চলছে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে সাময়িক স্বার্থসিদ্ধির আয়োজন। তার পরও প্রতিটি কাজেরই তো থাকে সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া। নিউটনের এই সূত্র ধরেই আমরা পেয়ে যাই কিছু অপরিকল্পিত অথচ গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেড়্গণ। সাংবাদিকতার জ্ঞানতাত্ত্বিক জগতে যে সহ-সম্পাদক (ঝঁন-বফরঃড়ত) একদা ছিলেন ‘অনুচ্চারিত কুশীলব’, দৈনিক আমাদের সময় তাদের রূপান্তর করেছে ‘উচ্চারিত কুশীলব’-এ। এটি নিঃসন্দেহে সাংবাদিকতার চলমান ধারণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। পত্রিকাটি প্রকাশের গোড়ার দিকে প্রকাশিত প্রতিটি সংবাদের তালু ও তলাতে প্রতিবেদক ও সহ-সম্পাদকের নামাঙ্কিত থাকত মোটা হরফে। ক্রমশ এই খোদাই রীতির ক্রমসংকোচন ঘটতে থাকে এবং বর্তমানে কেবল আন্তর্জাতিক সংবাদের বেলায়ই সহ-সম্পাদকের নাম উল্লেখ করা হয়। সংবাদের গায়ে প্রতিবেদক ও সহ-সম্পাদকের নাম উল্লেখ থাকায় একদিকে যেমন তাদের কাজের নিত্য-স্বীকৃতি মেলে, অন্যদিকে এ ধরনের চর্চা তাদের মধ্যে একটি প্রচারবাদী মনস্তত্ত্বের প্রবণতাও প্রগাঢ় করে তুলতে পারে। একটা সময় ছিল যখন কেবল ‘এক্সক্লুসিভ স্টোরি’গুলোকেই ‘বাই নেমে’ ছাপা হতো; ফলে ওই ধরনের ‘ইনডেপথ স্টোরি’ তৈরির জন্য নিজ নিজ সাংবাদিকদের থাকত প্রাণান্তকর চেষ্টা। কিন্তু আজ দৈনিক আমাদের সময় পত্রিকা বিষয়টিকে উদাম করে দিয়ে ‘গণ’ চরিত্র দিয়েছে। তাতে সাংবাদিকতার লাভ কি ক্ষতি হলো, সে বিচারে না গিয়ে বলা যায়, আখেরে লাভ হলো আমাদের সময় কতৃপক্ষেরই। সাংবাদিকদের কম টাকায় খাটিয়ে অনায়াসে ঢের বোঝানো সম্ভব, এ পত্রিকায় কাজ করলে কয়েক দিনে নাম কামানোর সুযোগ রয়েছে। তা ছাড়া স্থানস্বল্পতার অজুহাতে পত্রিকাটিতে ‘ইনডেপথ রিপোর্টিংয়ের তো দেখা মেলাই ভার। সুতরাং কেবল ‘ইনডেপথ রিপোর্টিং’ রচনা করলেই তা স্বনামে ছাপা হবে, এ আশ্বাস দেওয়ার ফুসরত কই দৈনিক আমাদের সময় কর্তৃপক্ক্ষের? আর গভীরতর প্রতিবেদনের কথা বাদই দিলাম, আমাদের সময় পত্রিকায় প্রকাশিত অধিকাংশ সংবাদই তো অসম্পূর্ণ; সূচনার পর দু-একটি প্যারার বেশি তথ্য পরিবেশিত হতে দেখা যায় না। অথচ এই সীমিত কলেবরের মধ্যেই অত্যন্ত দড়্গতার সঙ্গে ৩-৪ কলামব্যাপী সংবাদরূপী বিজ্ঞাপন ছাপানোর কোশেশ চলে হরহামেশাই। ফলে আমাদের সময়-এর পাঠকগোষ্ঠী প্রায়শই তথ্যতৃষ্ণার একটি মৃদু সুড়সুড়ি নিয়ে অন্য পত্রিকায় গিয়ে তা মোচনের চেষ্টা চালায়। পাঠকের মধ্যে ‘তথ্যের তৃষ্ণা জাগিয়ে তা জাঁকিয়ে রাখার’ বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে পত্রিকাটির শ্লোগান হওয়া প্রয়োজন ছিল ‘দৈনিক আমাদের সময় একটি সংবাদ সূচনাসর্বস্ব দৈনিক’।
সংবাদ শিরোনাম লেখার ক্ষেত্রে দৈনিক আমাদের সময় মাঝেমধ্যে মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়ে থাকে; যা প্রশংসার্য। কিন্তু সংবাদ শিরোনাম ও সংবাদ সূচনার মধ্যকার বৈপরীত্য প্রায়শই পত্রিকাটিকে নন্দিত না করে নিন্দিত করে তোলে। একটি দৃষ্টিনন্দন সংবাদ শিরোনামের মোড়ক উন্মোচন করে পাঠক প্রায়শই তার কাংখিত রসদ খুঁজে পায় না এবং চটকদারি সংবাদ শিরোনাম দেখে অধিকাংশ সময় বিভ্রান্ত হয়, যা দৈনিক আমাদের সময় সম্পর্কিত একটি নিয়মিত অভিযোগ। অবশ্য হাতেখড়ির অব্যবহিত পর পরই পাঠক সম্প্রদায় বুঝে ফেলে, এটি এ পত্রিকার একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য। মাত্রাতিরিক্ত সংবাদের ঠাসা বুনন পত্রিকাটির আরেকটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। পত্রিকার দৃষ্টিনন্দন ও পাঠকের দৃষ্টিসুখের জন্য প্রধান প্রধান দৈনিক যেখানে প্রথম পৃষ্ঠায় এক ডজন প্রতিবেদন প্রকাশে ভরসা পায় না, সেখানে দৈনিক আমাদের সময়-এ তা প্রায়শই তিন ডজন ছাপানোর দুঃসাহস দেখায়। ফলে ভ্যাপসা গরমে দ্রুত টাইয়ের নট খুলতে গিয়ে ‘ভদ্রলোক’ যেমন হাঁসফাঁস করতে থাকেন তেমনি আমাদের সময়-এর পাঠককেও কোনটা-রেখে-কোনটা-পড়ি এমন করতে গিয়ে একটা ভ্যাবাচেকা পরিস্থিতি সামলাতে হয়। ফলে একটি সংবাদের শিরোনাম, আরেকটির বডি অব দ্য স্টোরি, অন্যটির আলোকচিত্র ইত্যাদি করতে গিয়ে পাঠককে গোটা পত্রিকা পরিভ্রমণ করতে হয় এবং অবশেষে সবটা মিলিয়ে একটি আস্ত সংবাদের নাগাল পান। প্রথম ও শেষ পৃষ্ঠায় ‘কাঁঠাল জাগ’ দেওয়ার মতো করে মাত্রাতিরিক্ত সংবাদকে ঠেলে-ঠুলে জায়গা দেওয়ার ফলে আস্ত পত্রিকাই রূপ নেয় একটি মূর্তিমান আস্তাবলে। নানান কিসিমের/জাতের সংবাদকে এক হাঁড়িতে রাখতে গিয়ে পত্রিকাটি আধুনিক বাংলা সাংবাদিকতার প্রথম পত্রিকা সমাচার দর্পণ (১৮১৮৪ৈ০) এর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। যখন শিরোনামহীন সংবাদের পরিকল্পনাহীন উপস্থাপনই ছিল পত্রিকার মৌল বৈশিষ্ট্য। দৈনিক আমাদের সময় পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে শিরোনাম থাকে বটে, তবে তা একটি আরেকটির বগলে কিংবা পেটে এমনভাবে সহাবস্থান করে, ফলে অতিমাত্রায় সতর্ক পাঠক না হলে এর পাঠোদ্ধার অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রায় দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। তাই ভাংতি পয়সা গোনার মতো করে পত্রিকাটির সংবাদ শিরোনামকে গুনে গুনে পৃথক করতে হয় এবং পৃথক করে করে পড়া চালিয়ে যেতে হয়।
মাত্র দুই টাকা দাম (যদিও বর্তমানে তিন) ধার্য করে পত্রিকাটি নিঃসন্দেহে সংবাদপত্র জগতে কলির যুগের সূচনা করেছে। যদিও পত্রিকাটির পাঠক সম্প্রদায়, বিক্রয়মূল্য ও বিক্রি-বাট্টার স্থানএই ত্রয়ীর মধ্যে একটি রয়েছে যৌক্তিক সম্পর্ক। কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনার ছাপ এখানে সুস্পষ্ট এবং একটি সফল নিরীর জন্য সম্পাদক নাঈমুল ইসলাম খানকে কৃতিত্ব দেওয়া যায়। পত্রিকাটির কাঙ্খিত পাঠক সম্প্রদায়ের নিরিখে এর দামকরণকে সার্থক বলা যায়। কারণ যে যে পরিস্থিতিতে এবং যে যে কারণে পাঠক আমাদের সময় পত্রিকা কেনে, তাই এর দাম দু-তিন টাকাই জুতসই। কিংবা উল্টো করে বলা যায়, দাম দুই টাকা বলেই এ পত্রিকার কাটতি ভালো। কারণ চরিত্র অক্ষুন্ন রেখে আমাদের সময় পত্রিকাকে তথাকথিত মর্যাদাশীল জাতীয় দৈনিকের মূল্যে (৮-১০ টাকা) বিক্রি করা সম্ভব হতো না। পত্রিকাটির দাম বাড়াতে হলে তার চারিত্রিক জৌলুশ বাড়ানোও জরুরি হয়ে পড়বে। তা ছাড়া আমাদের পার্শ্ববর্তী অঞ্চল পশ্চিম বঙ্গে যদি একটি পত্রিকা ২-৩ রুপি রাখা সম্ভব হয়, তবে এখানে তা কেন নয়? ব্যাপকসংখ্যক পাঠকের ক্রয়সীমার মধ্যে পত্রিকার দাম রাখতে পেরে একদিকে দৈনিক আমাদের সময় যেমন বাংলাদেশের পত্রিকার পাঠক সম্প্রদায় বৃদ্ধি করেছে, অন্যদিকে বাণিজ্য করার একটি ফাঁকা মাঠের বন্দোবস্ত করতে পেরেছে। যদিও আমাদের সময় পত্রিকার দেখাদেখি তার ব্যবসায় ভাগ বসাতে ইতোমধ্যেই একই মূল্যের আরেকটি পত্রিকা (বাংলাদেশ প্রতিদিন) বাজারে চলে এসেছে। সংবাদপত্রের নতুন পাঠক তৈরি না হওয়া বাংলাদেশের পত্রিকা জগতের একটি আদি সংকট। ফলে বাজারে নতুন পত্রিকা আসার সম্ভাবনা তৈরি হলে পুরোনো পত্রিকাগুলো তার পাঠক হারানোর বেদনা-যাপন-প্রস্তুতি নিতে থাকে। অর্থাত নতুন পত্রিকা মানে নতুন পাঠক নয়। পুরোনো ক্ষয়িষ্ণু পত্রিকাগুলোর পাঠক ভাগিয়ে এনে ব্যবসা পত্তন করাই হয়ে উঠেছে হালের নতুন পত্রিকার ধর্ম। ফলে নবাগত পত্রিকাগুলো নতুন পাঠকগোষ্ঠী তৈরির বিন্দুমাত্র দায়-দায়িত্ব না নিয়ে বিকাশমান বেসরকারি খাতের বিজ্ঞাপন থেকেই মুনাফা উশুল করার ধান্দা নিয়েই আত্মপ্রকাশ করে। কিন্তু আমাদের সময় সে ক্ষেত্রে অনেকটা ব্যতিক্রমী ভূমিকায়। পত্রিকাটি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভাসমান পাঠককে কিংবা পাঠকের ভাসমান সময়কে সংবাদপত্র বাণিজ্যের আওতায় আনতে পেরেছে।
যেমন বাঘা ওল, তেমন বুনো তেঁতুল এটি একটি অতি পরিচিত বাগবিধি। আমাদের সময় পত্রিকার ক্ষেত্রেও তা ষোলোআনাই সত্যি। যেমন তার দাম, তেমনই তার কাম। বিক্রয়মূল্য তিন টাকা বলে তৃতীয় শ্রেণীর কাগজ, যাচ্ছেতাই ছাপা, ছিরি-ছাদহীন ছবি, নিয়ে হাজির হচ্ছে দৈনিক আমাদের সময়। যদিও বাংলাদেশে মিডিয়া-ব্যবসা অদ্যাবধি একটি লাভজনক খাত এবং এ খাতে বিনিয়োগ বাড়ছে নিরন্তর। ডজনখানেক চ্যানেলের সদ্য লাইসেন্সপ্রাপ্তি এবং আরও এক ডজন অপেড়্গমাণ চ্যানেল অন্তত তা-ই ইঙ্গিত করে। আর বিনিয়োগ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মিডিয়া জগতে অনিবার্য অনুপ্রবেশ ঘটছে নয়া প্রযুক্তির, কিন্তু আমাদের সময় পত্রিকা যেন এই স্রোতের প্রতিকূলে ভাসমান এক তৃণ; যার মধ্যে একুশ শতকীয় প্রযুক্তির কোনো ছাপ-ছায়া-গন্ধ নেই। আমাদের সময় পত্রিকার এই প্রযুক্তিবিমুখতার যুক্তি একটাই; স্বল্পমূল্য। দাম তিন টাকা বলেই পাঠককে ম্লেচ্ছ জ্ঞান করা! কম দামি পাঠক হিসেবে না-হয় পত্রিকার চাকচিক্যের বিষয়টি আমলে না নিলাম, কিন্তু বানান ভুলের বিষয়টি ভোলা যায় কী করে? দৃষ্টিগ্রাহ্য বানান ভুল অতিমাত্রায় দৃষ্টিকটু, যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া অসম্ভব।
সম্পাদকীয়হীনতা দৈনিক আমাদের সময় পত্রিকার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। সাংবাদিকতার পাঠ্যবই মারফত আমরা জানি, সম্পাদকীয় একটি পত্রিকার নীতিকে তুলে ধরে। কিন্তু সাংবাদিকতার এই শরিয়তি জ্ঞানকে আমলে না নিয়ে আমাদের সময় পত্রিকা সম্পাদকীয়হীন একটি মারেফতি অবস্থান নিয়েছে। ফলে সমাজে চলমান সহস্র বিষয় নিয়ে পত্রিকাটির আর আনুষ্ঠানিক মতামত প্রকাশের দায়দায়িত্ব রইল না। দিকনির্দেশনা প্রদানের এই দায়দায়িত্বহীন অবস্থান পত্রিকাটিকে পিছু টান মুক্ত করলেও তার বাউণ্ডুলে চরিত্রকেও আড়াল করতে পারেনি। ফলে জাতির সংকটকালে দৈনিক আমাদের সময় পত্রিকাটির সুর ও স্বর বোঝা রীতিমতো অসম্ভব হয়ে পড়ে। পত্রিকাটিও সে সুযোগের ষোলোআনা ব্যবহার করে ‘ঝোপ বুঝে কোপ মারা’র কাজে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে। দৈনিক আমাদের সময় পত্রিকার এই সুযোগসন্ধানী সাংবাদিকতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। পত্রিকার পাঠকগোষ্ঠীর কাছে বিষয়টি রীতিমতো বিব্রতকর ঠেকেছে, যেখানে পত্রিকার সংবাদে প্রতিফলিত হয়েছে এক ধরনের মতামত কিন্তু বিভিন্ন চ্যানেলের প্রচারিত টক শোতে পত্রিকার সম্পাদকের মুখে শোনা গেছে ভিন্ন মতামত। নীতিহীনতার চর্চাই যদি সম্পাদকীয় প্রকাশ না করার মর্মকথা হয়, তবে তা উচিত কি অনুচিত, সে বিচারের ভার সম্মানিত পাঠককুলের।
একটা সময় ছিল যখন বইয়ের ফ্লাপে লেখকের দেশ ভ্রমণের একটি বিস্তারিত বর্ণনা মিলত। সেটি অবশ্যই উড়োজাহাজ নয়, জলজাহাজ যুগের ঘটনা যখন বৈদেশ-ভ্রমণ ছিল একটি উল্লেখযোগ্য বিষয়। কিন্তু দৈনিক আমাদের সময়-এর পাঠকের জন্য সম্পাদকের বৈদেশ-ভ্রমণবিষয়ক গল্প অবশ্যপাঠ্য একটি বিষয়; যা পয়সা দিয়ে কিনে পড়তে হয়। কারণ তিনি ব্যক্তিগত প্রয়োজনে দেশের বাইরে যাওয়া মানে আমাদের সময়-এর অন্তত এক কলাম সংবাদের জন্ম দেওয়া। যদিও ‘সংবাদমূল্য হিসেবে এটি একটি মূল্যহীন সংবাদ কিন্তু পত্রিকার সম্পাদক বলে কথা! শুধু তা-ই নয়, আমাদের সময় পত্রিকার বিজ্ঞাপন ভাটা যাচ্ছে, সরকারি বিজ্ঞাপনের জন্য মাননীয় তথ্যমন্ত্রী/প্রধানমন্ত্রী বরাবর আকুল আবেদনসম্পর্কিত ৩-৪ কলামের সংবাদ, কর্মরত সাংবাদিকদের দু-মাস বেতন দিতে পারছে না কর্তৃপক্ষ দুঃখ প্রকাশসূচক ৩-৪ কলামের একটি সংবাদ ইত্যাদি তো হরহামেশাই দেখা যায়। পাঠক হিসেবে আমাদের জিজ্ঞাসা, যখন পত্রিকাটির রুজি-রোজগার ভালো থাকে তখন কি সেটি সংবাদ হিসেবে ঠাঁই পেতে পারে না? আর যদি পেয়েও যায় তবে পাঠকের কী-ই বা যায়-আসে তাতে?
লেখক: খ. আলম
৫টি মন্তব্য ০টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে
আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন
নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন
শৃঙ্খল মুক্তি আমার
শৃঙ্খল মুক্তি আমার

ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন
=একান্ত নিজস্ব জিনিসগুলো পর হয়ে যাচ্ছে=

যে চোখ দিয়ে দেখেছি ধরার আলো, সে চোখও দিচ্ছে ফাঁকি,
যে চোখের আলোয় দেখেছি পুকুর নদী, শুকনো উঠোন;
বৃষ্টি ভেজা দিন, দেখেছি ময়না শালিক, ঘুঘু ডাকা দুপুর
সে চোখ পর হয়ে যাচ্ছে অল্প... ...বাকিটুকু পড়ুন
রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।