মিথ্যাচারের আলোচনা ও প্রশ্ন পর্ব
**প্রথম আলো যা যা এড়িয়ে গেছে/মিথ্যা বলেছে:
ক. পার্বত্য উপজাতিদের (Tribal) আদিবাসি (Aborigine) বলে উল্লেখ করেছে (অথচ, বৃটিশ সনদ ও পার্বত্য শান্তিচুক্তিতে তাদের উপজাতি হিসাবেই উল্লেখ আছে). এর কারণ, আদিবাসি শব্দটা উপজাতির চেয়ে অধিক সহানুভূতি-আকর্ষক.
খ. নির্দিষ্ট করে বাঘাইহাটের কথা বললে আদি-বাঙ্গালিরাই ওখানের আদিবাসি, তারা ১৯৪৭ সালের পূর্ব থেকেই ছিল যখন সেখানে কোন উপজাতি ছিল না. অধিকাংশ বাঙ্গালি, যারা সেটলার বাংগালি হিসাবে পরিচিত তারা ২০০৬ সালে এসে পূণ:সেটেল করেছে. উপজাতিরাও সেটেলার এখানে, তফাত্ শুধু, তারা বিভিন্ন সময়ে এসে সেটেল করেছে. প্রথম আলো এটা এড়িয়ে গিয়েছে বাঘাইহাটের উপর উপজাতিদের অধিকারের অগ্রগণ্যতা প্রতিষ্ঠার অপকৌশল হিসাবে.
গ. রিজার্ভ ফরেস্ট হওয়ায় পার্বত্য অন্যান্য এলাকার মত এখানে আইনত কোন ব্যক্তিগত জমি ছিল না, বাঙ্গালিও না উপজাতিদেরও না. এটা এড়িয়ে গিয়েছে উপজাতিদের জমি বাঙ্গালিরা দখল করে নিচ্ছে – এমন ধারণা প্রতিষ্ঠার অপকৌশল হিসাবে.
ঘ. ইউপিডিএফ যে একটি সন্ত্রাসি, কাঠ-পাচারকারি ও চাঁদাবাজ সংগঠন – এর উল্লেখ কোথাও করেনি পাছে উপজাতিদের প্রতি ‘সেন্টিমেন্ট টানা’য় ক্ষতি হয়. এর আরেকটা অর্থ হতে পারে, প্রথম আলো বা তার রিপোর্টাররা ইউপিডিএফ-এর কাছ থেকে মোটা ‘সন্মানি’ পেয়েছে.
ঙ. ঘরবাড়ি পোড়ানোর ঘটনার আগে যে বাঙ্গালিদের বিরুদ্ধে উপজাতিরা বিক্ষোভ করেছে, বাঘাইহাট বাজার বয়কট শুরু করেছে ও লিফলেট ছেড়েছে তার কোন উল্লেখ করেনি. এ সময় বাঙ্গালি কর্তৃক চান্দের-গাড়ি পরিবহণ সার্ভিস বন্ধ করে দেয়া এবং উপজাতি মহিলা কর্তৃক দা-লাঠি নিয়ে আর্মির গাড়ি চলা বন্ধ করার অপচেষ্টার কথাও উল্লেখ করেনি. পাশাপাশি, সশস্ত্র ইউপিডিএফ কর্তৃক বাঙ্গালিদের উপর নির্যাতন চালানোর কথা ভুলেও বলেনি. উদ্দেশ্য একটাই – উপজাতি বা ইউপিডিএফ-এর ভাবমূর্তির কোন ক্ষতি না হয়ে যায়.
চ. বাঘাইহাটের ঘটনায় বাঙ্গালিরাও যে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে – এমন তথ্য ও ছবি ছাপানো থেকে সসতর্ক বিরত থেকেছে (এ কাজটা ব্লগার ‘প্রিন্সেস ঢাকা’ও যথেচ্ছ করেছেন). পাছে, সহানুভূতির ব্যলান্সটা বাঙ্গালিদের দিকে কিছু সরে না যায়. [পাঠকবৃন্দ এমন কোন ছবি দেখেছেন বলে কি মনে পড়ে?]
ছ. বাঘাইহাটের ঘটনায় উপজাতি, বাঙ্গালি, আর্মি, সরকার সবাই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, লাভবান হয়েছে শুধু ইউপিডিএফ (এবং তাদের পশ্চিমা/জাপানি ডোনাররা) – কোন প্রতিবেদন বা সম্পাদকীয়তে এমন তথ্য/মতামত আসেনি. কারণ, সত্যিটা ফাস হয়ে গেলে আর্মিরও গুষ্ঠি উদ্ধার করা হবে না, ইউপিডিএফ-এর কাছ থেকে মোটা ‘সন্মানি’টাও পাওয়া যাবে না! গ্রেট মিস!!
জ. ঘটনার শুরু অর্থাত্, জনৈক শাহআলম কর্তৃক পাথরমনি চাকমার থেকে বিরোধপূর্ণ জমি ক্রয়, ইউপিডিএফ কর্তৃক ফেরতের জন্য চাপ/হুমকি দেয়া, হঠাত্ করেই একদিন ইউপিডিএফ-এর টাকায় (৫-লাখ) ‘সাজেক নারী সমাজ’ হলুদ চাষ প্রকল্পের উদ্দেশ্যে সেই সামান্য জমিতে কুড়েঁঘর তোলার চেষ্টা, বনবিভাগের লোকেরা ঘর তোলায় বাধা দেয়া, ইউপিডিএফ-কে বিরোধপূর্ণ জমিতে কোন প্রকল্পের টাকা না দেয়ার জন্য চিঠি দেয়া – এসব কিছু কখনও উল্লেখ করেনি. উদ্দেশ্য – উপজাতি বা ইউপিডিএফ-এর ভাবমূর্তির কোন ক্ষতি না হয়ে যায়.
ঝ. ইউপিডিএফ কর্তৃক বাঙ্গালিদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের জন্য ‘সাজেক নারী সমাজকে ২-লাখ টাকা দেয়া হয় – অকুস্থলে এটা অতি চাউর একটা অভিযোগ. এই অভিযোগের কোন সুনির্দিষ্ট প্রমাণ কারও কাছে নাই বটে, কিন্তু একটি কথিত অভিযোগ হিসাবে উল্লেখ থেকেও সচেতনভাবে এড়িয়ে গেছে. উদ্দেশ্য – ইউপিডিএফ-এর ভাবমূর্তির কোন ক্ষতি না হয়ে যায়, মোটা ‘সন্মানি’টা না মিস হয়ে যায়.
ঞ. উপজাতিরা কোন বাস্তব কারণ ছাড়াই বাঘাইহাট বাজার বয়কটের ডাক দিয়ে লিফলেট ছাড়ে ও বয়কট শুরু করে – এসব তথ্য গায়েব. উদ্দেশ্য – উপজাতি বা ইউপিডিএফ-এর ভাবমূর্তির কোন ক্ষতি না হয়ে যায়.
ট. ‘আদিবাসীরাও জোট বেঁধে...’ অর্থাদ্ প্রকান্তরে লেখা ফসকে বেড়িয়ে গেছে যে, উপজাতিরা ধোয়া তুলসিপাতা না!
ঠ. ‘সকাল ১০টার দিকে আদিবাসীরা সেখানে জড়ো...’ প্রথম আলো পরের দিন বর্ণনা শুরুই করেছ সকাল ১০টা থেকে. তারা ঐ দিন সকালে ০৮০০ ঘটিকার দিকে ৪-৫ শত উপজাতি ইউপিডিএফ-এর সশস্ত্র কাভারে পরিকল্পিতভাবে বাঙ্গালি পাড়ায় সকল বাড়িতে একযোগে আগুন লাগানোর ঘটনা বেমালুম চেপে গেছে.
ঠ. ‘সাদা পোশাক পরা সেনা সার্জেন্ট রেজাউলকে আঘাত করে।...’
প্রথমত, সেনা ডিউটিপোস্টে (ক্যাম্প নয়!) সবাই ডিউটিতে থাকে, সাদা পোশাকের কোন সুযোগ সেখানে নাই.
দ্বিতীয়ত, একটা বিরূপ পরিস্থিতিতে সবাই এলার্ট, স্ট্যান্ড-টু অবস্থায় থাকে. এমতাবস্থায় সাদা পোশাকে থাকা কল্পনারও অতীত, অসম্ভব.
তৃতীয়ত, সাদা পোশাকের কী অপরাধ ? এ জন্য তাকে কোপানো হয়েছে – তাহলেত ইউনিফরম খুললেই কোপ খেতে হবে!
চতুর্থত, ধরা হল, সাদা পোশাকে সার্জেন্ট রেজাউল গোয়েন্দাগিরি করতে গিয়েছিল - এমনটা বিশ্বাস করা কতটা যৌক্তিক? অযৌক্তিকতার কারণগুলো:
১ম. পাহাড়িরা বাঙ্গালিদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিচ্ছে – এমতাবস্থায় একজন সাধারণ বাঙ্গালির ছদ্মবেশে গোয়েন্দাগিরিতে কেউ যাবে না.
২য়. একজন সার্জেন্ট একটি ক্যাম্পে নেতৃস্থানীয় পদে থাকে, তাকে ক্যাম্পের আশেপাশে সবাই চেনে, তার পক্ষে ছদ্মবেশ নিয়ে গোয়েন্দাগিরি করা অসম্ভব.
৩য়. সার্জেন্ট রেজাউল আহত হয়েছে পোস্টের পাশেই, পোস্ট থেকেই যেখানে সব দেখা যাচ্ছে সেখানে সাদা পোশাকে গোয়েন্দাগিরির অভিযোগ কতটা ধোপে টেকে?
৪র্থ. পোস্টের পাশেই আহত না হলে তাকে ইভাকুয়েট করার জন্য পোস্টে এম্বুলেন্স যেত না এবং গুলি খেয়ে উইন্ডশিল্ডও ভাঙ্গত না যায়.
পঞ্চমত, একজন সেনাসদস্যকে কোপানোর সাহস যাদের, নিরস্ত্র বাঙ্গালিদের উপর তাদের নির্যাতন কতটুকু হতে পারে, অনুমেয়.
উদ্দেশ্য – উপজাতি কর্তৃক সেনাসদস্য কোপানোর ঘটনাকে হালকা করা, বরং আর্মিরই দোষ বলে ধারণা দেয়া.
ড. পুলিশ সুপারের বরাতে ‘ভূমি নিয়ে বিরোধের জের ধরে সেনাবাহিনী ও আদিবাসীদের মধ্যে গুলিবিনিময়ের ঘটনা ঘটেছে’ বলে উল্লেখ করেছে। ইউপিডিএফ-এর একটি দল সেনাবাহিনীর জোন সদরের উপর গুলি বর্ষন করেছে – এ তথ্যও হাওয়া!
প্রথম আলোর রিপোর্টাররা এত কিছু জেনে ফেলল, গুলিবিনিময়ের ঘটনা বলতে হল পুলিশ সুপারের বরাতে! প্রকৃতপক্ষে, আদিবাসী নয়, গুলিবিনিময় হয়েছে আর্মি ও ইউপিডিএফ-এর মধ্যে. ইউপিডিএফ-এর নাম নেয়া প্রথম আলোর কাছে ভাসুরের নাম নেয়ার সামিল! তারা অসত্ উদ্দেশ্যে মিথ্যাচার করেছে. কারণটা – ইউপিডিএফ-এর ভাবমূর্তির কোন ক্ষতি না হয়ে যায়, মোটা ‘সন্মানি’টা না মিস হয়ে যায়.
ঢ. প্রথম আলো সর্বাত্মক চেষ্টা করেছে, উপজাতিদের ঘরবাড়ি পোড়ানোর ঘটনাকে সেনাবাহিনী কর্তৃক অথবা সেনাবাহিনীর ছত্রছায়ায় বাঙ্গালি কর্তৃক ঘটানো হয়েছে – এমন ধরণাকে প্রতিষ্ঠিত করতে.
প্রথমত, পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর ৪০-বত্সরকাল সময়ে এটা কখনও করেনি. সেনাশৃঙ্খলার ব্যাপারে যাদের ন্যূনতম ধারণা আছে তারা এটা বিশ্বাস করবে না.
দ্বিতীয়ত, সেনাবাহিনীর ছত্রচ্ছায়ায় ঘটানোর ব্যাপারটি তদন্ত সাপেক্ষ. কিন্তু, উপজাতিরা যদি সেনাবাহিনীর ছত্রচ্ছায়া ছাড়াই বাঙ্গালিদের ঘরবাড়ি পোড়ানোর সামর্থ রাখে, তবে উপজাতিদেরটা পোড়ানোর জন্য বাঙ্গালিদের সেনাবাহিনীর ছত্রচ্ছায়া নিতে হবে কেন? তারাতো নিজেরাই এমন সামর্থ রাখে! কারণ, ৪০-বত্সর ধরে তারা শান্তিবাহিনী ও ইউপিডিএফ-এর হাত থেকে বাঁচার জন্য শারিরীক ও মানসিকভাবে নিজেদের তৈরি রেখেছে!!
তৃতীয়ত, ১৯৯৪ সালে রাঙ্গামাটির নানিয়ারচরে এমন বাঙ্গালি-উপজাতি দাঙ্গা হয়েছিল. তখনও সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠেছিল. তখন এক সদস্যের বিচার বিভাগীয় তদন্ত হয়েছিল. বিচারপতি দীর্ঘদিন নানিয়ারচরে থেকে তদন্ত শেষে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগের কোন ভিত্তি পাওয়া যায়নি বলে মত দিয়েছিল. বিচারপতিটা কে? মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান – সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান ও একজন বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবি.
সুতরাং, উপজাতিরা অভিযোগ এনেছে বলেই সেনাবাহিনী দোষ হয়ে যায় না এবং প্রথম আলোকেও সে অভিযোগ সত্যি প্রমাণের জন্য একচোখা কলমদৈত্য হওয়াটা মানায় না. দেশের সবচে চালু পত্রিকার দম্ভ নিয়ে কলমদৈত্যামি করে কতদিন আকাম করে যাবে, যেতে পারবে – বুদ্ধিমানের মত এটা একবার ভাবা উচিত. কারণ, সময় গেলে সাধন হবে না!
প্রথম আলোর এমন আচরণের কারণটা আমরা জানি, গভীরে প্রোথিত সেনাবিদ্বেষ এবং ইউপিডিএফ তথা তাদের ডোনার এনজিওদের মোটা ‘সন্মানি’র মোহনীয় মিথস্ক্রিয়ার এক অমিয় ফলাফল!
পরিশেষে, বাঘাইহাটে প্রতিটা বাঙ্গালি ও প্রতিটা উপজাতিরই ঘরবাড়ি পুড়েছে. চাকমা ও বাঙ্গালি উভয়েই এ দেশের নাগরিক – যে কারও বিরুদ্ধে সহিংসতাই আপরাধ. আর একচক্ষু দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে গণ-সচেতনতা নয় বা ভাতৃত্ব নয়, গণ জিঘাংসাই বাড়বে. কেউ কাউকে ল্যাঙ্গ মেরে নিজের সুখ-শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারবে, প্রতিপক্ষ যত ক্ষুদ্রই হোক – এমন চিন্তা বাতুলতা. শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামে নয়, বাংলাদেশের সবখানেই এটা প্রযোজ্য. যত তাড়াতাড়ি আমরা এটা বুঝব, জাতি হিসাবে তত তাড়াতাড়ি আমরা সুপ্রতিষ্ঠিত হতে পারব.
প্রথম আলো-এর বাঘাইছড়ির নিয়ে কলমদৈত্যামি, ঘটনার অন্যপিঠ ও কিছু প্রশ্ন – ১ম পর্ব
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



