somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দরগার ওরশ কিংবা আমার বালক বেলা (আমার শততম পোস্ট)

২০ শে নভেম্বর, ২০০৮ রাত ১২:০০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

খুব ছোটবেলা যখন আব্বার হাত ধরে দরগার ওরশ দেখতে যেতাম তখন পৃথিবীর তাবৎ বিস্ময় এসে ভিড় জমাতো আমার মনের জানালায়। কাস থ্রী-কিংবা ফার পড়ুয়া বালকের কাছে তখন দরগা ওরশের বসা দু’পাশের বাহারী খেলনার দোকানগুলো রীতিমতো লন্ডন-আমেরিকা দেখার মতো বিস্ময়ের। আর সেই বিস্ময় দেখার জন্যই সারা বছর ওরশের অপো থাকতাম। যখন শুরু হতো তিনদিনের ওরশ। তখন প্রথম দিন থেকেই সেখানে নিয়ে যাওয়ার জন্য আব্বার কানের কাছে ঘ্যান ঘ্যান শুরু করে দিতাম। তারপর আব্বা তার ব্যস্ততায় ফাঁক পেলে আমাদের নিয়ে যেতেন দরগার ওরসে বসা মেলায়। সেটা বেশি ক্ষেত্রেই বিকেল বেলা হতো।
ওরশ শুরু হলেই আমরা অধির অপোয় থাকতাম কখন আব্বা বলবেন চলো। বলতেই যা সময় ভালো জামা পড়ে তৈরি হতে আমাদের ভাই-বোনের দেরি হতো না। তারপর দু’জনে আব্বার দুই আঙ্গুল আকঁড়ে ধরে রাস্তায় বেরিয়ে পড়তাম।
শাহ্জালালের দরগাহ্ শহরের প্রায় কেন্দ্র স্থলে। ওরশের সময় তাই শহরে হাঁটা-চলা কষ্টকর হয়ে যায়। রিক্সা-গাড়ি আর জনজট (মানুষের জটলা) ঠেলে আমদের এগুতে হতো বিস্ময় জাগানো খেলনার দোকানের দিকে। চোখ রাস্তার দু’পাশ জোড়া খেলনার দোকানের স্তরে স্তরে সাজানো বাহারী সংগ্রহের দিকে থাকলেও হাতটা চেপে থাকতো আব্বার আঙ্গুল। কারণ এই জনঅরণ্যে দুই বালক-বালিকার ভরসার তরী তো বাবার আঙ্গুল দুটিই। নিজের অবস্থান নিশ্চিত করার পাশাপাশি আমরা একে অন্যকে দেখে নিতাম। পছন্দের খেলনাগুলো দেখিয়ে ভয়ে ভয়ে আব্বার কাছে কিনে দেয়ার আবদার করতাম। আব্বার মেজাজ ভালো থাকলে যেটা বলতাম সেটাই কিনে দিতেন আর যেদিন মেজাজ উল্টো থাকতো সেদিন ঝাড়ি খাওয়াও বিচিত্র ছিল না। সেই থেকে কখন জানি ভয়ের একটা বিষয় মনের মাঝে জায়গা করে নিয়েছিল।
বছর ঘুরে আবারও ওরস এসেছে। মেলা বসেছে দরগার দু’ধারের রাস্তা জুড়ে। কিন্তু ছোট্ট বেলার সেই আকর্ষণ জাগানো ওরসের এখন আর আমাকে টানে না। আমার পৃথিবীতে তো এরই মাঝে অনেক উলট পালট হয়ে গেছে। সেই ছোট্ট বালক আমি এখন অনেকখানি বড় হয়ে গেছি। এখন আর আব্বার আঙ্গুলে ধরে হাটতে হয় না। দিন কিবা রাত আমাকে একলাই হাঁটতে হয়। আমি হাঁটি...।
গতকাল অফিস থেকে যখন বেরুলাম ততণে ঘড়ির কাঁটায় রাত দুটো। বাসায় ফিরতে হলে আমাকে শাহ্জালালের দরগার পাশ দিয়ে যেতে হয়। গতকাল যখন বাড়ি ফিরছি তখন দরগা এলাকা জুড়ে অন্যরকম একটা রাত নেমেছে। ওরশে অংশ নিতে আসা দেশের বিভিন্ন এলাকার লোকজনের পদভারে রাত তার বিশেষত্ব হারিয়েছে। যেন সবে সন্ধ্যা নেমেছে এখানে। আমি দেখি। এই দৃশ্য দেখে যে কারই মন ভাল হওয়ার কথা। কিন্তু আমার হয় না। বরং কোথা থেকে মনখারাপের বিষয়টা এসে আমার সঙ্গি হয়। আমি নিজের অজান্তেই কখন জানি ফিরে যাই আমার বালক বেলায়। যখন বাবা ছিলেন, একটা আঙ্গুল ছিল আকড়ে ধরার কিংবা চেনা জানা ঘরদোর, আঙ্গিনা আর স্কুলের রাস্তা আর স্কুল ঘর কেন্দ্রিক ছোট্ট পৃথিবীর বাইরে হঠাৎ আসা দরগার বৈচিত্রের আকর্ষণ। তখন তো চিন্তা বলতে ছিল পড়া আর পরিক্ষায় ভালো রেজাল্ট করা। কিন্তু এখন আর এসবের কিছুই নেই। তার বদলে আছে রাজ্যের চিন্তা, বাস্তবতার কঠিন চেহারা, আর জীবন মন্ত্রের কুটিলতার প্রতি নিয়ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া।
ইস্! আবার যদি সেই ছোট বালক হতে পারতাম। আবার যদি আব্বার হাতের আঙ্গুল চেপে পরম স্বস্তি নিয়ে রাস্তায় নামতে পারতাম। কিন্তু চাইলেই তো আর অতীতে ফিরে যাওয়া যায় না।
বাবাও নেই। সেই বালক বেলাও নেই। তাই ওরশে যাওয়ার আকর্ষণও নেই। কত দূর থেকেই না লোকজন আসে ওরশে অংশ নিতে। আর আমি পাশে থেকেও বোবা অভিমান নিয়ে ওরশের পাশ কাটিয়ে বাড়ির পথ ধরি।
৭টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিলিয়নিয়ার রবিন খুদা ও আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকার

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ০৯ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:৩০

বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় কী?

কর্মসংস্থান? না।

বিনিয়োগ? না।

ডলার সংকট? না।

গার্মেন্টস খাতে ছাঁটাই? না।

ব্যাংকিং খাতের আস্থা সংকট? না।

সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো— কোনো অনুষ্ঠানে জুলাই চেতনা কত মিলিলিটার ঢুকেছে, কে কতবার উচ্চারণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×