somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

যুদ্ধাপরাধ ও ট্রাইব্যুনাল : নানকিং মাসাকার ও টোকিও ট্রায়াল

১৭ ই ডিসেম্বর, ২০০৯ বিকাল ৩:৪৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
যুদ্ধাপরাধ ও ট্রাইব্যুনাল - ২য় পর্ব

জাপানী সেনাবাহিনী চীন আগ্রাসনের প্রাক্কালে ১৯৩৭ সালের ডিসেম্বর মাসে চীনের তৎকালীন রাজধানী নানকিং শহর দখলের পর ২ থেকে ৩ লক্ষ লোককে হত্যা, ২০ থেকে ৩০ হাজার মেয়েলোককে ধর্ষণ এবং সারা শহরে লুটতরাজ ও ধ্বংসের এক তান্ডবলীলা চালিয়েছিল। এই কুখ্যাত গণহত্যা, ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ ও অমানবিক নির্যাতন ইতিহাসে Nanking Massacre বা Nanjing Massacre বা Rape of Nanking এবং এই যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য পরবর্তীতে যে ট্রাইব্যুনাল হয়েছিল তা International Military Tribunal for the Far East বা Tokyo Trials বা Tokyo War Crimes Tribunal নামে পরিচিত।

১৯২৮ সালে চীনের জাতীয়তাবাদী সরকার রাজধানী পিকিং থেকে নানকিং-এ স্থানান্তরিত করে। চীনে কিউমিনটাং ও কম্যুনিষ্টদের (Nationalist-Communist Civil War) মধ্যে শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ১৯৩১ সালে মঞ্চুরিয়া দখলের মধ্য দিয়ে জাপান চীন আগ্রাসন শুরু করে। পরপর আরো কয়েকটি শহর দখল করার পর চীনের টনক নড়ে। ১৯৩৭ সালে চীনের কম্যুনিষ্ট ও জাতীয়তাবাদীরা একত্রিত হয়ে জাপানের আগ্রাসন ঠেকানোর জন্য একটি যুক্ত বাহিনী গঠন করে। এই বাহিনী ছিল খুবই দুর্বল। তাদের ছিল না উপযুক্ত কোন ট্রেনিং বা আধুনিক কোন অস্ত্র। জেনারেল টাং শেনজির নেতৃত্বে সামরিক-আধাসামরিক মিলে ১ লক্ষ সৈন্য নানকিং রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত হল।
১৯৩৭ সালের ডিসেম্বর মাসে দীর্ঘ যুদ্ধ ও ব্যাপক হতাহতের মধ্য দিয়ে জপান সাংহাই দখল করে। জাপানের দখলকৃত শহরগুলো থেকে দলে দলে উদ্বাস্তু এসে আশ্রয় নিল নানকিং শহরে। নানকিং শহরের লোকসংখ্যা ২৫০০০০ থেকে বেড়ে হয়ে গেল প্রায় ১০ লক্ষ। এসময় জাপানের সম্রাট হিরোহিতুর পুত্র প্রিন্স অশোকা ছিলেন জাপানের রাজকীয় বাহিনীর কমান্ডার। সাংহাই দখলের পর জাপানীরা নতুনভাবে সংগঠিত হয়ে নানকিং দখলের অভিপ্রায়ে জেনারেল মাটসুইয়ের নেতৃত্বে বিভিন্ন দিক থেকে এগিয়ে আসতে লাগল। জেনারেল টাং শেনজির আদেশে শহরের চারপাশের রাস্তাঘাট সব বন্ধ করে দেওয়া হল যাতে লোকজন পালাতে না পারে ও জাপানীরা সহজে শহরে ঢুকতে না পারে।

সব বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে ৯ ডিসেম্বর জাপানীরা নানকিং-এর দ্বার প্রান্তে চলে আসল। নানকিং-এর পতন তখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। জাপানী জেনারেল মাটসুই চীনের সেনাবাহিনীর কাছে হুকুম পাঠাল, ২৪ ঘন্টার মধ্যে আত্মসমর্পণের জন্য, অন্যথায় তাদেরকে সম্পুর্ণভাবে ধ্বংস করা হবে। চীনা জেনারেল টাং International Comittee for the Nanking Safety Zone -এর সদস্যদের মাধ্যমে Hankow শহরে অবস্থানরত চিয়াং কাইশেকের সাথে যোগাযোগ করলেন। তিনি শেষ সৈন্যের জীবন থাকা পর্যন্ত নানকিং রক্ষার জন্য যুদ্ধ চালিয়ে যেতে নির্দেশ দিলেন। কয়েকদিন ব্যাপক যুদ্ধের পর ১৩ ডিসেম্বর জাপানীরা নানকিং দখল করে নিল। এ যুদ্ধে চীনের অনেক সৈন্য প্রাণ হারাল। আর যারা বেঁচে ছিল তারা বিভিন্ন দিকে পালিয়ে গেল, অনেকেই পোশাক পরিবর্তন করে সাধারণ জনতার ভীড়ে মিশে গেল। জাপানী সৈন্যরা শহরে ঢুকে যাকে যেখানে পেল হত্যা করতে লাগল। নিরপরাধ জনসাধারণ থেকে শুরু করে আহত সৈনিক পর্যন্ত কেউ রক্ষা পেল না।

জাপানীরা এখানে মানুষ হত্যার জন্য বর্বরতা ও নৃশংসতার সব পদ্ধতি ব্যবহার করেছিল। এদের বিভৎস যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিল নানকিং-এর ২০ থেকে ৩০ হাজার নারী। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গণধর্ষণের পর এদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ক্ষত-বিক্ষত করে হত্যা করা হত। জাপানী সৈন্যরা নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা দিয়েছিল কে কার থেকে বেশি মানুষ হত্যা করতে পারবে। নিচের ছবিটি তৎকালীন জাপানী পত্রিকায় প্রকাশিত নানকিং যুদ্ধের একটি খবর।

এ থেকেই অনুমান করা যায় উগ্র জাতীয়তাবাদী জাপানীদের আগ্রাসনের নিষ্ঠুর কার্যকলাপের বিভৎসতা। সেই বিভৎসতার বর্ণনা দিয়ে লেখা দীর্ঘায়িত করলাম না। যাই হোক তখনকার দিনে মিডিয়া ও তথ্যপ্রযুক্তি আজকের মত এত শক্তিশালী ছিল না। এছাড়া জাপানীদের নিষ্ঠুরতার ভয়ে কোন সাংবাদিক প্রকাশ্যে ছবি তুলতে পারে নি। শুধুমাত্র প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষী, স্থানীয় হাসপাতালের ডাক্তার-নার্চ ও উপসনালয়ের পাদ্রি-সন্ন্যাসিনীদের বর্ণনা এবং জাপানী কিছু সৈনিকের ডায়েরী থেকে প্রাপ্ত তথ্য থেকে অনুমান করা হয় যে ১৩ ডিসেম্বর ১৯৩৭ সালে নানকিং দখলের পর প্রথম ছয় সপ্তাহে জাপানীদের হাতে নিহত হয়েছিল কমপক্ষে দুই লক্ষ লোক ও ধর্ষিত হয়েছিল বিশ হাজার নারী। পরবর্তীতে জেনারেল মাটসুই তাঁর সৈন্যদের উল্লেখিত নিষ্ঠুর কার্যকলাপের কথা স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। ১৯৩৮ সালে জাপান ও চীনের collaborating government প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ও জাপান ২য় বিশ্ব্ব যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে নানকিং-এর অবস্থা ধাপে ধাপে উন্নীত হতে থাকে। এসময় জেনারেল মাটসুই সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করলেও প্রিন্স অশোকা ২য় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যন্ত কমান্ডার ছিলেন। এরমধ্যে ২য় বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপে নাৎসী জার্মানীদের হত্যা ও ধ্বংসের তান্ডবলীলার কারণে নানকিং মাসাকার সাময়িকভাবে চাপা পড়ে। জাপানের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বিশ্বযুদ্ধের পরিসমাপ্তির পর তা আবার যুদ্ধাপরাধের তালিকায় চলে আসে।

২য় বিশ্বযুদ্ধে যুদ্ধবন্দীদের শারীরিক নির্যাতন, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও বার্মায় নিরপরাধ মানুষ হত্যা এবং নানকিং মাসাকারের যুদ্ধাপরাধে জাপানের সামরিক অফিসার এবং বেসামরিক কর্মকর্তাদের বিচারের উদ্দ্যেশ্যে বিভিন্ন দেশের ১১ জন বিচারকের সমন্বয়ে ১৯৪৬ সালের ৩ মে Tokyo War Crimes Tribunal গঠন করা হয়। উল্লেখ্য, জাপানের সম্রাট পরিবারের কাউকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত করা হয়নি- যা ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছিল।

এই ট্রাইব্যুনাল জাপানের ২৮ জনের বিরুদ্ধে তিন ধরনের অপরাধের অভিযোগ আনে: "Class A" (crimes against peace), "Class B" (war crimes), and "Class C" (crimes against humanity)। বিচার সম্পন্ন হতে মোট সময় লাগে আড়াই বছর। বিচারের রায়ে জেনারেল মাটসুইসহ ৭ জনের মৃত্যুদন্ড, ১৬ জনের যাবৎজীবন এবং ২ জনের স্বল্প মেয়াদী কারাদন্ড হয়। বাকী ৩ জনের বিচারকালীন সময়ে স্বাভাবিক মৃত্যু হয়। উল্লেখ্য, কারাদন্ডে দন্ডিত সবাই মাত্র ৮ বছর পর প্যারলে মুক্তি লাভ করে।

নানকিং মাসাকারের ভিডিও ক্লিপ:


- চলবে -
যুদ্ধাপরাধ ও ট্রাইব্যুনাল - ১ম পর্ব (ভূমিকা ও ইতিহাস)
---------------------------------------------------------------
ছবি ও তথ্যসূত্র:
উইকিপিডিয়া
Online Documentary
ইন্টারনেট
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই ডিসেম্বর, ২০০৯ বিকাল ৪:৩৫
৭টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×