এক পাকি ঠগের পাল্লায় পড়েছিলুম-১ম ভাগ
আমার ঘরের মানচিত্র ছন্নছাড়ার পেন্সিলের ঘরের মানচিত্র-এর মতোই এলোমেলো; সুবিধার না।রুমজুড়ে চারিদিকে ছড়ানো-ছিটানো বই-খাতা টি-শার্ট, প্যান্ট, লুংগি, মোজা, এমনকি আন্ডারওয়্যারও।ইন্দোনেশিয়ান কলিগের ভাষায় "স্টোররুম"।হ্ল জীবনের অভ্যাস এখনো ছাড়িতে পারি নাই; ভবিষ্যতে ছাড়িতে পারিবো সেই আশাও নাই।
আমার সদ্যবন্ধু সেই পাকি রুমের ভিতরে অনেকটা সাঁতারকাটার ভংগীতে হাঁটিয়া চেয়ারে আসন পেতে বসিলো।সে বেশ সিরিয়াসভংগীতে শুধাইলো " তাকে চিনতে পারছি কিনা?
কেমতে কি!এই মাল জীবনে দেখিয়াছি বলে মনে পড়ে না। বলিলাম "স্যারি,চিনতে পারছিনা"।
"আরে ইয়ার,আমার বন্ধু তো তোমার সাথে কাজ করে,উই মেট বিফোর"
"অফিসে কোন পাকি(পাকিস্তানি বলেছিলাম আসলে) নাই "।
"লুক ইয়ার, আমি এইখানে এসে একটু ডার্ক হয়ে গেছি,চুল কেটে ফেলছি,তাই তুমি চিনতে পারছো না।
কি মুশকিল! বললাম "দেখো খুব বেশী পাকিস্তানির সাথে আমার পরিচয় নাই।ঢাকায় জনাচারেক পাকিস্তানি ছেলে আমার কলিগ ছিলো,তারা এখনো ঢাকায়।আর কুয়ালামামপুরে ট্রেইনিং-এ গিয়ে দুইজনের সাথে পরিচয় হয়েছিলো; একজন ছিলো ইসলামাবাদের, আরেকজন লাহোরের।তুমি কি ইসলামাবাদ থেকে আসছো "? সেই দুইজনের মধ্যে যে এই চান্দু ছিলোনা,সেটা আমি নিশ্চিত জেনেও জিগাইলাম।
হালায় সংগে সংগে কয়, "ইয়েস,আই অ্যাম ফ্রম ইসলামাবাদ,।সিউরলি,উই মেট বিফোর,ইয়ার"?
একটা লোক যখন এতো করে পীড়াপীড়ি করিতেছে,তাও আবার মেহমান।পাকি হলেও এই রকম "নো","নো" করাটা ঠিক শোভন দেখায় না।
"ওকে,আমার স্মৃতিশক্তি খারাপ।হয়তোবা ভুলে গেছি;পরে মনে পড়বে।বাদ দাও,তুমি তোমার বৃন্তান্ত বলো; এখানে কি কাজে আসছো,কতদিন ধরে আছো"?
তার বর্ণনামতে সে এইখানে এসেছে দু'মাস হতে চল্লো।মাইনিং কোম্পাণী'তে কাজ করে, গত সপ্তাহে সে হান্টিংয়ে গিয়েছিলো।আজকেই হান্টিং থেকে ফিরেছে। আমাকে আগেই দেখেছে, দেখেই চিনিছে কিন্তু খুব ব্যাস্ত থাকায় প্রবল ইচ্ছা থাকা সত্বেও আসতে পারেনাই ইত্যাদি ইত্যাদি।
ঝাড়া আধাঘন্টা ধরে সে ইলেকশনে দাঁড়ানো প্রার্থীর ন্যায়,বারাক ওবামার মত করে, নিজের সম্বন্ধে, পাকিস্তানের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক সম্পর্কে নিজস্ব মতামত বয়ান করে গেলো।আর আমি ইন্টারকেটিভ শ্রোতার মত মাঝে মাঝে এই গুরত্বপূর্ণ আলোচনায় অংশ নিলাম।তার ইংরেজি উচ্চারণ ও ফ্লুয়েন্সিতে আমি ততক্ষনে ইম্প্রেসড্।আলোচনায় একটু খামতি দিয়ে সে তার পুরানবন্ধুর দিকে মনোযোগ ফেরায়।চোখে মুখে কৌতুহল নিয়ে এমনভাবে জানতে চাই আমি বিয়ে করেছি কিনা যেন পূর্ববর্তি সাক্ষাতে সে আমার বিয়ের কার্ড পাইছিলো!
‘ফরচুনেটলি অর আনফরচুনেটলি নট ইয়েট”
"তোমার বান্ধবি আছে না"?
“না”,মনোকষ্ট নিয়ে এবারো তাকে হতাশ করি।
“আসলে আমার কাছে খনি থেকে পাওয়া অনেক মূল্যবান স্টোন আছে;তাদের দিতে চেয়েছিলাম;যাইহোক তুমি চাইলে ভবিষ্যতের জন্য রেখে দিতে পারো"।
এরপর জিজ্ঞেস করে তুমি কি হরিনের মাংস পছন্দ কর?
হরিনের মাংস আইলো কই থেকে !আমি কিছু না বুঝে তার দিকে তাকিয়ে থাকি।
“তোমাকে বললাম না, আমি হান্টিং থেকে ফিরছি।বাফেলো, হরিন প্রভৃতি শিকার করে নিয়ে এসেছি।গাড়িতেই সব আছে।চাও তো এখনি নিয়ে আসি” তবে ছোট্ট একটা প্রোব্লেম; আমরা ৯টা রাইফেল নিয়ে শিকারে গিয়েছিলাম, তার মধ্যে একটার লাইসেন্স ছিলোনা।আসার পথে পুলিশ গাড়িসহ সবকিছু আটক করেছে; ওদেরকে কিছু টাকা পয়সা খাওয়াতে হবে।এদিকে আমি আমার কার্ড, টাকা পয়সা "হোয়াইট ওসিন" হোটেলে রেখে এসেছি।শহরের বেশ বাইরে, যাওয়া-আসা ঘন্টাদুয়েকের মামলা।
একটু থেমে ইতস্তত করে বলে ক্যান ইউ হেল্প মি,আই এম অশ্যামড টু আস্ক ইউ।
“টাকা তুি যাচ্ছো কোথায় পিরীত যেখানে আসবে কবে বিচ্ছেদ হলে”।
টাকাপয়সা ধার-দেনা নিয়ে এত তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে যে কেই টাকার কথা তুললেই আমি এখন পিছটান দেয়।তবু তার স্মার্ট চলন-বলন,দুর্দান্ত ইংরেজি কথন দেখে একটু প্রভাবিত হলাম।
বললাম,”আমাদের তিন এম্পলয়ির জন্য অফিসের গাড়ি আছে একটা কিন্তু আমি ড্রাইভিং জানিনা;আমার কলিগ যে ড্রাইভিং জানে তাকে বলে দেখতে পারি?সে রাজি হলে তোমাকে ওই হোটেল ড্রপ করে আসতে পারি?
“এতো রাতে কাউকে বিরক্ত করার দরকার নাই তারচেয়ে আমি বরং ট্যাক্সি করে যাবো।তুমি আমাকে ৪৬০০০শিলিং ধার দাও,আই প্রমিজ আমি ওখান থেকে ফিরিয়ে শোধ দিয়ে দিবো।“
৪৬০০০ শিলিং মানে প্রায় ৪০ ডলার মানে ৪০X৭০=২৮০০ টাকা,নেহায়েত কম না(তারচেয়ে বড় কথা আমাকে মদন বানায় যদি!);তাছাড়া আমার কাছে সর্বসাকুল্যে আছে ৩০০০০ শিলিংয়ের মতো।পরদিন ভারত মহাসাগরে একটা বোট ট্রিপের মতো আছে;অফিসের ফরেইনিয়ার সবাই যাবে,হিজ হিজ হুজ হুজ।আমি আকালে আছি; যাইতাম না কিন্তু ফিলিপিনোদের সাথে সম্পর্ক ঠিক ভাল যাইতেছে না।না গেলে আরো খারাপ হবে, গেলে বরং কিছু মেরামত হওয়ার চান্স আছে।
“আমার কাছে তো এত টাকা নাই”
“কতো আছে”?
“২০০০০”,একটু মিছা কথা কইলাম।“তারচেয়ে বরং চলো কলিগের রুমে যাই,তাকে রেকুয়েস্ট করি গাড়ি বের করার জন্য”।
সে অনিচ্ছাসত্তেও আমার সাথে হাটা ধরলো কলিগের রুমের উদ্দেশ্যে।
হাঁটতে হাঁটতে একটা পঞ্চ মিনিটের পরিকল্পনা দাড় করালাম।সে যদি সত্যই বিপদে পড়ে থাকে,তাইলে হোটেল পর্যন্ত যে কোন উপায়ে পৌছে দিতে পারলেই হলো আর সে যদি টাকার জন্য মুলোমুলি করতে থাকে তাইলে বুঝতে হবে ডাল মে কুচ কালা হ্যায়।কলিগ কাম ড্রাইভারকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে গাড়িটা রাস্তায় নামাতে পারলেই ল্যাঠা চুকে যায়।
কিন্তু বিধিবাম আমার কলিগ এতরাইতে রাস্তায় নামতে রাজি নয়;তার কাছে ড্রাইভিং লাইসেন্স নাই।আমার পঞ্চমিনিট পরিকল্পনা শুরুতেই মাঠে মারা গেলো।শেষচেষ্টা হিসেবে পাকিটাকে বললাম, চলো আমরা দুজনে রওনা দেই।
তখন সে বলে তার কাছেও নাকি ড্রাইভিং লাইসেন্স নাই।
ইতমধ্যে সে তার স্বভাব সুলভ দক্ষতায় ইন্দোনেশিয়ান কলিগকে ম্যানেজ করে ফেলছে।কলিগ বেটা আমাকে বলে, হাবিব, আমি সর্বোচ্চ ৩০ হাজার দিতে পারবো, বাকিটুকু তুমি কি দিতে পারবে?তোমার ফ্রেন্ড যখন বিপদে পড়েছে, তখন কি আর করা, আমার কাছে এরচেয়ে বেশি নাই।
হ পাকিটা আমার জানি দোস্ত,টাকাটা খোয়া গেলে তো ঠিকই আমারে ধরবা।মরিয়া হয়ে বললাম কালসকালে যে সমুদ্রদর্শন তার কি হবে?
“ডোন্ট ওরি ওখান থেকে ফিরেই টাকাটা এনভেলাপে করে তোমাদের দরজার নীচে রেখে আসবো”।পারলে তখনি সে পকেট থেকে এনভেলপ বের করে।
এদিকে আমি তখনও আমতা আমতা করছি।পাকিটার কাছে মনেহয় ধরাখেয়েই গেলাম।
“আরে ইয়ার তুমি শুধু শুধু ব্যাপারটা কমপ্লিকেইকেটেড করছো,হোয়াট ডু ইউ থিংক আই অ্যাম এ বেগার,আই অ্যাম এ ফ্রড জাস্ট ফর অনলি ৪৬ থাউজেন্ড শিলিংস।
আমি মনে মনে কয় তুমি পাকি না, তোমারে ঠিকই দুই নম্বর ভাবছি খালি মুখ ফুটে কইতে পারতেছি না।
কলিগের কাছ থেকে টাকাটা নিজের হাতে নিয়ে পাকিটাকে বললাম তোমাকে ধার দিবো,ঠিক আছে কিন্তু একটু হোটেল রিসেপশানে যাবো;তোমার সম্পর্কে একটু ডিটেইলস্ কালেক্ট করতে হবে।বলেই রিসেপশানের দিকে হাঁটা দিলাম। সে(পাকিটা) আমার পিছে পিছে।
হোটেলটা সরকারি জিলাস্কুলে মতো।চারিদিকে ক্লাসরুমের মতো এপার্টমেন্ট;মাঝখানে বেশ বড় কম্পাউন্ড।তখন রাত ১১:৩০ মতো। অন্ধকার মতো একটা জায়গা সে আমাকে দাঁড় করাইলো।
“তুমি রিসেপশানে যেতে চাচ্ছো কেন,তুমি কি আমাকে ট্রাস্ট করোনা”?
“দেখো ব্যাপারটা ঠিক ওরকম না;ফ্রাংকলি স্পিকিং আমি এখনো তোমাকে আগে কোথায় দেখেছি,মনে করতে পারছি না”।
“রিসেপশানে গিয়ে কি হবে শুনি”
“ওকে রিসেপশানে যাবোনা ঠিক আছে,আচ্ছা তুমি আমার প্রতিবেশি,তুমি এইদিকে কোন রুমে থাকো" ? আমার এপার্টমেন্টের দিকে আংগুল তুলে বললাম।
সে তখন হোটেল অন্যদিক দেখাইয়া বলে “আমি ওদিকে থাকি”।
“রুম নং প্লিজ”
“আরে আমি তো এই হোটেলে থাকিনা, মেইন রাস্তার ওপারে থাকি তবে হোটেল ম্যানেজিং ডিরেক্টর আমার পরিচিত”।
তোর ম্যানেজিং ডিরেক্টরের গুল্লি মারি।আমি তখন শতভাগ নিশ্চিত এই বেটা ঠগ।সাহস করে বললাম” আই এম কনফিউস্ড নাউ; স্যারি টু সে আই ট্রাস্ট ইউ নো মোর”।সাথে এড্ করলাম “এমন কাউকে যদি নিয়ে আসতে পারো যাকে আমি চিনি তুমিও চিনো তাইলেও টাকাটা দিবো আদার ওয়াইজ নো"।
বলেই তারদিকে,চারদিকে একটু চোখ বুলিয়ে নিলাম। সে আমার চেয়ে একটু লম্বা,
স্বাস্থ্যের দিক থেকে আমার মতোই।অন্ধকার জায়গা,আশেপাশে কাউকে দেখা যাচ্ছে না।হালায় চাকু-টাকু বের কিনা? একটু বা ভয়ই পেলাম।
আমার এই অ্যাডামেন্ট ভাব দেখে তার সুর একটু নরম হয়ে গেল।সে বলে ”তুমি এমন করেতেছে কেন,তুমি কি শাকিলের ভাই না,শাকিলের বোনের সাথে তো আমার ভাইয়ের বিয়ে হইছে,তোমাকে শুরুতেই বলছিলাম না আমি তোমার পরিচিত”?
আবার এই শাকিল(আমার ভাই,আমি জানিনা!) কে।“না,শাকিল নামে কাউকে চিনি না”।
“বাট ইউ লুক লাইক শাকিল”।
"অনেকেই আমার মতো দেখতে,আমার চেহারা খুব কমন"
"দেন, ইউ আর নট শাকিল'স ব্রাদার। ওহ ইয়ার,তাইলে আমার মনে ভুল হয়ে গেছে।আই এপোলোজাইস টু ইউ।ছিঃছিঃ তুমি এখন আমাকে কি ভাববে,আমাকে তো ফ্রড মনে করবে"।
“নো প্রোব্লেম,আমি পাকিস্তানিদের সম্পর্কে ভালো মনোভাব পোষন(!) করি,ভুল তো হতেই পারে”।কথা বাড়ায় লাভ নাই;আপদটা বিদায় হলেই বাঁচি।
“তাইলে তুমি প্রমিজ করো,কালকে বিকালে ফ্রি থাকবে।আমি তোমাকে ক্লাবরুমে ড্রিংক করাবো,তুমি যদি ড্রিংক নাও করো,এটলিস্ট ইউ টেইক অ্যা সোডা,যদি না আসো,তাইলে ভাব্বো আমাকে ফ্রড ভাবছো”।
আমার নিকট হইতে সম্মতি আদায় করিয়া উনি প্রস্থান করিলেন।আর আমি এক পাকি এবং ঠগকে পরাজিত করার আনন্দে লাফাইয়া লাফাইয়া কলিগের আবাস অভিমুখে চলিলাম তার দেয় অর্থটা ফিরিয়ে দিতে।
ও, হ্যাঁ আমি কিন্তু তার সোডার জন্য বিকালগুলোতে এখনো অপেক্ষায় রহিয়াছি।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা সেপ্টেম্বর, ২০০৮ রাত ১২:৫২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



