somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হারানো বিশেষণ (পরিমার্জিত)

১৪ ই মে, ২০০৯ রাত ৯:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

[মোটামুটি আনকোরা। জেলারেল থাকতে দিয়েছিলাম। কারও চোখে বোধহয় পড়েনি। তাই আবার দিলাম।]

সব কাহিনীর একটা নাটকীয় শুরু থাকা উচিত। কিন্তু আমার কাহিনীর তেমন কিছু নেই। বিশাল ভারি দুটো ব্যাগ নিয়ে হাঁটছি।পেছন থেকে আম্মা ঝাড়ি দিতেছে আমার বোকামির জন্য। আমার নিজেরও রাগ হচ্ছে আমার বোকামিতে।আর তাছাড়া, ওর ওপরেও রাগ উঠতেছে।১৪ তারিখ নাকি তার খালার বিয়ে, সে গ্রামে যাবে। আমি একা একা ঢাকায় থাকলে আমার নিশ্চয়ই খুব বোরিং আর বন্চিত লাগতো নিজেকে....।তাই আব্বুকে রাজি করালাম আমাকে শ্রী-মঙ্গল নিয়ে যেতে।আব্বু ওখানকার কৃষি অফিসার (বি সি এস অফিসার) হিসেবে আছেন। এখানে বদলি হয়েছেন বোধহয় প্রায় ৩ মাস হল। প্রতি শুক্রবার আসে। এখনও আমার যওয়া হয়নি ওখানে। কয়েকবার বলতেই আব্বু রাজি।হঠাত আম্মাও রাজি। আম্মাও অফিস থেকে ছুটি আনল। আমিও মনে মনে বাঁচলাম যে ১৪ তারিখ (ফেব্রুয়ারি) টা আর একা একা বোরিং কাটবেনা। আব্বু ওখানেই থাকবে এই সপ্তাহে। আমি আর আম্মা ঢাকা থেকে যাবো। মিরপুর ১০ থেকে সায়েদাবাদ হয়ে একটু সামনে জনপথের মোড়। সেখানেই থাকবে বাস কাউন্টার।কিন্তু আমি নেমেছি তার আরো সামনে। আম্মা বেশ কয়েকবার সাবধান করেছিল, তবু ভূলটা করলাম।এখন সেই মোড়ের দিকে ভারি দুটো ব্যাগ নিয়ে হাঁটছি। ও যদি গ্রামে না যেত তাহলে আমিও আর একা একা আব্বুকে ছাড়া রওনি হতাম না। আবার সেই কাহিনীর শুরুতে ফিরে আসলাম।

বাসে উঠতে না উঠতেই বাস ছাড়ল। বিশাল বাস। ৪ ঘন্টার যাত্রাপথ। মাঝে হোটেল উজান-ভাটি তে ২০ মিনিট যাত্রা বিরতি। বাসে একটা ছেলেকে দেখলাম। কেন যেন মনে হল ও একাই যাচ্ছে। স্কুল ড্রেসেই আছে। সবাই হোটেলের সামনে নামলেও ও নামেনি। এই ছেলেটা আমার কাহিনীতে আর আসবেনা। তবু হঠাত, ওর কী হয়েছিল তা জানতে ইচ্ছা হচ্ছে। ওর কথা থাক।

চারপাশের পরিবেশটা এত সুন্দর যে চোখ ফেরানো যাচ্ছে না। বিস্তৃত খোলা মাঠ আর সারি সারি গাছ। বাস প্রায় খালি। যে যার ইচ্ছা মত বসেছে। জানালার পাশে থাকায় মুখে বাতাসের ঝাপটা লাগছে। যেখানে বাস থামবে ওখানেই আব্বু থাকবে। দেখতে দেখতে একটু পর শুরু হল গভীর জংগল আর বড় বড় পাহাড়। দারুন। চমতকার। বাস থামতেই আব্বুকে পেলাম। রিকশা নিয়ে শহরে ঢুকলাম। উপজেলা বলতে আমাদের দেশে যা বোঝায় তা বিল্ডিং আর রাস্তা আছে এমন একটি গ্রাম। কিন্তু শ্রী-মঙ্গল বেশ উন্নত। ঢাকায় মিরপুর ২ এ আমার বাসার সামনের এলাকা আর এই শহরের বাস্তব কোন পার্থক্য নেই। আসেপাশের সব গলিতে কমার্স কলেজের পোলাপান ছাড়া আর গলিতে গলিতে বিউটি পার্লার ছাড়া মোটামোটি আর সব এক। একটু যেন হতাশ হলাম।

আমরা উঠেছিলাম বিশাল এক রেস্ট হাউজে। শহর থেকে দূরে। বড় বড় সাত টা রুম। সব রুমে খাত ২ টা আর ড্রেসিং টেবিল আছে। টিভি আছে, ডিশও আছে। রেফ্রিজারেটরও আছে। চারপাশে শুধু গাছ আর গাছ। ছাদে উঠলাম। স্ট্রবেরি গাছের চারা দেখলাম। বর্ডারের দিকে অনেক রাবার গাছ দেখলাম। নাহ, ঢাকা থেকে অনেক অনেক বেশি সুন্দর। শহরটাই শুধু ঢাকার মত। ক্লান্ত ছিলাম। পরে আবার শহরটা দেখতে বেরুবো বলে ঠিক করলাম। এখন বরং একটু ঘুমানো যাক।পরের দিন আবার সকালে আব্বুদের অফিস থেকে একটা পিকনিক ছিল। সেদিন ১৩ তারিখ। আব্বু এখানে একদম নতুন। সব কলিগদের সাথে পরিচয় আর এই পিকনিক – দুটোই আমাদের এখানে আনার অন্যতম কারণ।
এখানে একজনের কথা না বললেই না, সে হল রিমিস। এ হল এই রেস্ট হাউজের বাবুর্চি। প্রথম কথাতেই লোকটা কে ভাল লেগেছে আমার। দারুন রান্না করে। যা খাব তাই দেবে, একেবারে শেষে বিল দেবে। একটু পর পর চা, ঝালমুড়ি লাগবে কী না জানতে চায়।

রাতে ঘুম ভেঙ্গে যায়, ৩টায়। অনেক দূরে, বোধহয় কোন পাহাড়ের উপর থেকে কিছু লোকের জারি গান ভেসে আসছিল। এত রাতে এখন কী করব বুঝতে পারছিলাম না। একা একা শুয়ে শুয়ে মনে হচ্ছিলো যেন ভেসে আসা সুরটা কোন গানের না, পাহাড়ী পাথর আর শীতের বাতাসের মায়াবী আর্তনাদ। অদ্ভূত সেই অনুভূতি। সারাটা জগত জুড়ে শুধু যেন আমি আর ওই সুর।

পরের দিন ৯ টায় আব্বুর অফিস দেখতে যাব। সেখান থেকে ৯.৩০ এ বাস ছাড়বে। আব্বু আমাদের আগেই নাস্তা খেয়ে নিতে বলল। রিমিস এতো দারুন রান্না করছে যে একটু বেশীই খেয়ে ফেললাম। আব্বুর অফিস ঘুরে ৯.৩০ এ যখন বাসে উঠি, তখন উত্তেজনায় লাফাচ্ছি। বাস ছাড়তে একটু দেরি হল। ১০ টায় বাস ছাড়ে। এফ রহমান টি গার্ডেন হল আমাদের পিকনিক স্পট।বিশাল বিশাল টিলা আর এতো এতো চা বাগানের মাঝে আমাদের পিকনিক। ওখানে যাওয়ার পর সবাইকে নাস্তা দেয়া হয়। সেখানে কিছু পাউরুটি ছিল। খাইনি। ফেলে দিতেও পারছিলাম না, তাই ব্যাগে রেখে দিছি। ওখানকার বাংলো টা এতো দারুন। ২ তলা কিন্তু ১০ তলা তেও বোধহয় এত খরচ করেনা কেউ। প্রথম প্রথম ভালই লাগছিল, কিন্তু একটু পর শুরু হল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। একই গান বার বার শুনতে শুনতে আমার মাথা খারাপ হয়ে গেল। এক আন্টি রেডিও তে গিটার বাজান, এখানে এসে গিটার দিয়ে খ্যাত মার্কা কিছু সুর তোলার চেষ্টা করে আমাকে চরম বিরক্ত করলেন। আমি তাই পালালাম। এই স্পট থেকে বেরিয়েই আমি মুগ্ধ। এতো সুন্দর যে ব্যাখ্যা দেয়া যাবেনা। আলিম্পাস ক্যামেরাটার শাটার টিপে টিপে হাত ব্যাথা করে ফেললাম।
হঠাত পকেটের পাউরুটির কথা খেয়াল হল। আমি ৫ মিনিট করে এগুই আর ছোট এক টুকরো করে পাউরুটি ফেলে ফেলে যাই। যেন পরে পথ আবার খুঁজে পাই। শীতকাল বলে পাতা কম, তাই পাহাড়ের মাটি দেখা যায়। শুকনো পাতা পড়ে পড়ে পিছল হয়ে আছে মাটি। হাঁটা যায় না, এমন দুর্গম পাহাড়ে উঠলাম। দূরে আরো বড় আর বিশাল আরেকটা পাহাড়। কিন্তু ওটার ক্লিয়ার শট এ ছবি আসছে না। তাই ওখানে যাব ঠিক করলাম। কিন্তু পাউরুটি তো শেষ। পরে যদি পথ খুঁজে না পাই ? তবু ঝুকি টা নিলাম। হাঁটতে হাঁটতে প্রায় দেড় কিমি.।যাই হোক, পাহাড়ে উঠে দেখি একটা কাঁচা মাটির বাড়ি। শুধু ২ টা পিচ্চি। ওদেরো ছবি তুলে নিলাম।
সবকিছু আসলেই অপূর্ব। শীত বলে গাড় সবুজ নেই। এতে পাহাড়গুলার উপরে উঠার রাস্তাগুলো দেখা সহজ। পাহাড়ের আরেকপাশে ধূসর সবুজ।শীতে কত যে পাতা ঝরেছে, সেগুলোয় পা দিলেই পিছলে যাচ্ছিলাম।হাঁচড়ে উঠতে হচ্ছিল প্রতিটা পাহাড়ে। এতোক্ষণে আব্বু কল করে ঝাড়ি শুরু করে দিয়েছে যে আমি ওখানে আসিনা কেন ? আমি পথ হারিয়ে ফেলবো, এইসব। আব্বু বলায় মনে পড়লো, পথ টা চিনতে পারবো তো ? যাই হোক,উঁচু উঁচু টিলার ঢালে অসংখ্য রাবার গাছ।একটু করে ছাল ছাড়িয়ে রাবারের রস সংগ্রহের জন্য কালো কাপ ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে। এ মৌসুমে রাবার রস আর তেমন নেই।জায়গা থেকে কাপ সরিয়ে ফেললেও অনেক গাছে থেকেই রস বেরুচ্ছে। সব গাছে নাম্বার দেয়া। আমি মনের অজান্তে ১০ থেকে শুরু করে ৫০৪ নাম্বার গাছ পর্যন্ত চলে গিয়েছিলাম।
পাহাড় থেকে নামার পরে যে ভয়টা ছিল তাই সত্যি হল। এতোক্ষণে রাস্তা পুরোপুরি ভুলে গেছি। আমি পথ হারিয়েছি।


[জানি না সামনে আরও চলবে কী না।]

© আকাশ_পাগলা
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×