বোধহয় মানসিক কোন সমস্যা আছে আমার। আমার কিছু ভাল লাগে না। বিশ্রী এই গ্রহটাতে কাউকে সহ্য হয় না। প্রাণহীন এই মূর্খ যন্ত্রগুলোকে দেখলেই মেজাজ খিঁচড়ে যায়। পৃথিবীতে থাকার সময় আবার মানুষগুলোকে দেখলে এমন লাগত। আমার নিজের আসলে কী হল !!
এই গ্রহটাতে শুধু বরফ আর বরফ। কিন্তু, পানির না, নাইট্রোজেনের। আমি একটা ছোট্ট বলয়ের মাঝে থাকি। এটার ব্যাস ১৭ কি মি। এখানে থাকে একগাদা জড় পদার্থ আর আমি। বস আসেন মাঝে মাঝে, প্রতি ২ বছরে যে কোন সময়ে ১ বার। আমার ভাল লাগে না।
সামনে বেকুবের মতন দাঁড়িয়ে থাকা রোবটটাকে থাপ্পড় মেরে এন্টেনা ভেঙ্গে দিতে ইচ্ছা করতেছে। এগুলার কোন অনুভূতি নাই। অকারণে বানানো। বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “ঐ, সামনে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?”
“স্যার, আপনি ডেকেছেন।”, বেকুবটা উত্তর দেয়। আমি আবারও বিরক্ত হই। ওর কণ্ঠ এত বাজে কেন? বেকুবটা বলতে থাকে, “ স্যার আপনি কফি খেতে চেয়েছিলেন, সেটা এনেছি। ”
“ কবে? আর তুই আনার কে? যেই বেকুবটা রান্না করে ওটা কই? ”, উত্তর দিলাম।
“ ২ মাস ১৭ দিন ৮ ঘণ্টা ৩ মিনিট আগে। পৃথিবী থেকে কিছুক্ষণ আগে এই কফি এসে পৌঁছল।আর, যে রান্না করে, সে এখনও রান্না করছে স্যার।”, বেকুবটা ওর বাজে কণ্ঠে উত্তর দিল। ইচ্ছা হল, ওর এন্টেনাটা ভেঙ্গে দেই। রাগে মাথা জ্বলা শুরু করল। বললাম, “ হারামজাদা, আমার ওই কোনার ড্রয়ারটা খুল। ওখানে দুইটা বোল্ট শটগান আছে। বের কর। নিয়ে আয়। ”
রোবটটা ড্রয়ার খুলে বলে, “ স্যার এখানে ২টা আছে, কোনটা আনব? ” ওকে বললাম, “ যেটা থেকে তোর গুলি খাওয়ার ইচ্ছা হয়, সেটা আন। ”
রোবটটা একটা বোল্ট শটগান নিয়ে হাজির হল। সেটা হাতে নিয়ে আর কিছু না ভেবে ওর কপোট্রনের মাঝখান দিয়ে একটা প্লাজমা বোল্ট ঢুকিয়ে দিলাম। ছোট্ট করে ব্লাস্ট হল। উতকট ধোঁয়ায় আগুন লাগার এলার্ম বেজে উঠল। উপর থেকে পানি পড়ে আমাকে ভিজিয়ে দিল। আবারও বিরক্ত হলাম। দুইটা রোবট ছুটে আসল। ওদের বললাম, “ তোদের মধ্যে মেডিকেলের দায়িত্বে কে রে? ” একটা উত্তর দিল, “ আমি স্যার। ”
কী দিন আসল, রোবট করবে মানুষের চিকিতসা !! হুহ। ওকে বললাম, “ এদিকে আয়, তোর কপোট্টন ফাটায়া দিলে আওয়াজ কেমন হয় জানতে ইচ্ছা করছে। ” বেকুব রোবটটা আসল। আর কিছু না ভেবে ওকেও ধ্বংস করে দিলাম।
ধোঁয়ার কারণে আগুল লাগার এলার্মটা আবার বেজ়ে উঠল। আমি আবারও পানিতে ভিজে গেলাম।
এখন এসবেও মজা পাই না। প্রতিদিনই ত দুটা তিনটার কপোট্রন উড়িয়ে দেই। এসব আর গায়ে লাগে না এখন।
বিরক্তিকর ক্রিং ক্রিং আওয়াজটাতে ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। ভাল একটা টোন দেয়া যেত। একবার দিয়েছিলাম, শুনলে আরও ঘুম পায়।
বিছানা ছাড়তে ইচ্ছা করছে না।
আওয়াজটা হতেই লাগল। ঘড়ি আসলে রোবটের চেয়ে বেশি বিরক্তিকর।
আরে ঘড়ি না তো, এটা ত কানেক্টর পড। আমি দ্রুত অন করলাম। আমার সাথে আবার কে যোগাযোগ করতে চায়?
“ বস? আপনি? স্যরি বস, ঘুমিয়ে গেছিলাম। ভেরি স্যরি বস। আছেন কেমন বস? ” হন্তদন্ত হয়ে বললাম।
“ আরে এই সময়টা ত ঘুমানোরই। স্যরি বলার কিছু নেই ত। শোন দুই ঘণ্টার মধ্যে তোমার গ্রহে আসব। সাথে আমার বসও থাকছে। কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে, বুঝছ? আমরা আসছি। তুমি ড্রপ ডাউন প্যাড রেডি রেখ। ঠিক আছে না সব? ” বস বললেন।
আমিও সাথে সাথে উত্তর দিলাম, “ ব্যাপারনা বস। সব ঠিক। আপনি আসেন। ” চেঁচামেচি করে রোবটগুলাকে ডাক দিলাম, “ গর্দভের দল, এখনই ড্রপ ডাউন প্যাড রেডি কর। তাড়াতাড়ি ২ ঘণ্টার মধ্যে তৈরি করতে হবে। ”
রোবটগুলি উত্তর দিল, “ স্যার এই ফ্যাকাল্টিতে ৭০ টা রোবট ছিল। ২ ঘণ্টার মধ্যে ড্রপ ডাউন প্যাড রেডি করতে ৫৬ টা রোবট লাগবে। কিন্তু এখনও টিকে আছি মাত্র আমরা ৪ জন। কাজটা আমাদের করতে ২৮ ঘণ্টার মত লাগবে।”
আবারও সেই আগের অনুভূতিটা হল। রাগে মাথায় আগুন জ্বলছে। চিতকার দিলাম, “ একটা এটমিক ব্লাস্টার আন। তাড়াতাড়ি। ”
রোবট টা বলল, “ স্যার এখানে এটমিক ব্লাস্টার নেই। কিন্তু, সিকিউরিটি রোবটগুলার কাছে আছে। ”
আমি আবারও চিতকার করে বললাম, “ যা নিয়ে আয়। ” হঠাত কী মনে হওয়াতে বললাম, “ থাক। আনা লাগবে না। ওদের থেকে এটমিক ব্লাস্টার নিয়ে সেটা নিজ নিজ কপোট্রনে লাগিয়ে ট্রিগার চাপবি তোরা ৪ টা বেকুব। আর আমি যেন এখান থেকে আওয়াজ পাই। ”
একটু পরে পর পর ৪ টা আওয়াজ পেলাম। তবুও মনের থকে টেনশনটা গেল না। বসকে কী বলব!
শুকনো মুখে বুড়ো হাবড়া বসটাকে কানেক্টর পড থেকে ডায়াল করলাম। নকিং হচ্ছে। ধরলে পরে কী বলব সেটা নিয়ে ভাবছি।
“ কী ব্যাপার মেসক্রট ? কোন সমস্যা নাকি ? ”, বসের কণ্ঠ উদ্বিগ্ন। “ না বস, কোন সমস্যা না, মানে ইয়ে, একটা ছোট সমস্যা। মানে, এখন এই গ্রহে নামাটা ঠিক হবে না বস। ”,উত্তর দিলাম। বললাম, “ প্রাকৃতিক দুর্যোগ চলছে বস। আপনার এত কিউট স্পেস টর্ক ফ্লাইং মেশিনটা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। ” মনে মনে দুইটা গালিও দিলাম।
“ কী বল! নেভিগেশন কম্পিউটার ত দেখাচ্ছে যে সব ঠিকই আছে। তাছাড়া, আমি ত আগেই বললাম, সাথে করে আমার নিজের বস এসেছেন। উনাকে ত এখন আর এসব বলে ফিরিয়ে নিতে পারিনা। উনার ক্ষমতা সম্পর্কে তোমার কিছুটা হলেও ধারণা থাকা উচিত। ”,বস উত্তর দিলেন। শুনে আমি ঘাবড়ে গেলাম। বসেরও বস ! আমার কেমন যেন লাগছিল।
“ মেসক্রট? তোমার কী আবার আগের সমস্যা হয়েছে নাকি? এখন কয়টা রোবট আছে তোমার ফ্যাকাল্টিতে? ”,সন্দেহের চোখে বস জিজ্ঞাসা করলেন। “ ইয়ে, মানে, আপনি ত জানেন, এখানে বলয়ের বাইরে এক ধরণের সাআ সবুজ শৈবাল পাওয়া যায়, ওগুলাকে শুটকি করে খেতে খুব মজা লাগে বস। তাই রোবটগুলাকে বলয়ের বাইরে পাঠিয়েছি। পরে একটা ঝড় হল, আর, মানে বুঝেনই ত বস। ” আস্তে করে উত্তর দিলাম।
বস চোখ গরম করে তাকালেন। বললেন,“ এখন কী একটাও নেই? ” আমি আমতা আমতা করে বললাম, “ প্রাকৃতিক দুর্যোগের ব্যাপারে ত মানুষের কোন হাত নাই। আমি এখানে কী করতে পারতাম? সিকিউরিটি রোবট কয়েকটা আছে মনে হয়। রান্না করারটাও আছে।” বসের চোখ একটু নরম হতে হতে জ্বলে উঠল। বললেন, “ আমি ভাল মতই জানি এখানে কোন শৈবাল নেই। শৈবালের শুটকি খাওয়ার মত এত বাজে অজুহাত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গর্দভটাও দিবেনা। আর শৈবাল খুঁজতে ৭০ টা রোবটকে পাঠানো লাগে না। ”
আমি আমতা আমতা করতে লাগলাম।
“ মন দিয়ে শোন মেসক্রট। আমার বস একজন মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ। উনি যদি তোমাকে মানসিক রোগী হিসেবে চিনহিত করেন, সাথে সাথে তোমার চাকরী বাতিল হবে। আর সাথে সাথে তোমাকে রিক্রুট করার জন্য আমার প্রোফেশনাল রেপুটেশনও নষ্ট হবে। ”, বস বলতে থাকলেন, “ তুমি আর সময় নষ্ট না করে, তোমার ফ্লাইং রাইডারে করে রওনা দাও। আমি আমার স্পেস টর্ক ফ্লাইং মেশিনকে স্ট্যাবল করছি। তুমি সোজা আমার এখানে ল্যান্ড করবে।”
আমি বললাম, “ আচ্ছা, বস আসতেছি।”
কিছুক্ষণ পরে রওনা দেই। বসের সাথে দেখা হবার পরে আমার নিজেকেও ত আবার এই গ্রহে নামতে হবে। সেই কথা চিন্তা করে সিকিউরিটি রোবটগুলাকেই ড্রপ ডাউন পড বানাতে দিয়ে এসেছি।
বস এবং তার বসের বস। আর আমি মাঝখানে। একটু যেন গরম লাগছে।
চলবে……………….(মনে হচ্ছে)।
পরের পর্বের জন্য Click This Link
© আকাশ_পাগলা
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই অক্টোবর, ২০০৯ রাত ১১:১৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



