
আম্মা কিছুদিন ধরে খুব জ্বালাতন করতেছে। বুকের ব্যাথা নিয়ে ভেবে ভেবে তার সব ঘুম শেষ। “এই বয়সেই বুকে ব্যাথা হয় রে, জানিনা কয়দিন বাঁচব”,দুনিয়ার সকল কথার মাঝেই সে এই কথাটা বলে। বুকে নাকি তার চিনচিন করে ব্যাথা উঠে। কতবার বুঝাই বুকের ডান দিকে অল্প স্বল্প ব্যাথা হলে কিছু হয় না। হৃদপিন্ড থাকে বুকের বাম দিকে। ডান দিকের ব্যাথার তাই তেমন কোন ভয় নেই। কিন্তু, কে শোনে কার কথা! আম্মা অল্প দিনের মাঝেই বুকের ডান দিকের ব্যাথা নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে বুকের বাম দিকেও সমস্যা করে ফেলল। প্রথম মাইল্ড হার্ট এট্যাক। ডাক্তার বলছে অতিরিক্ত টেনশন এর কারণ। সেইটা উনার বলার আগে থেকেই আমি বুঝছি। ত তার পরদিন থেকেই আম্মার মাথায় উঠল যত দ্রুত সম্ভব একমাত্র ছেলেকে মানে আমাকে বিয়ে দিতে হবে। পাশ করেই একটা চাকরী পেয়ে গেছি। এখনই বিয়ের ইচ্ছা নেই। বিদেশে একটা ডিগ্রী নেয়ার ধান্দায় আছি। দেখি কী হয় ! তবে, আম্মার ইচ্ছা আক্বদটা হয়ে যাক। পরে মেয়েকে ঘরে উঠাবে। এই হল ঘটনা। প্রতিদিন নতুন নতুন পাত্রীর ছবি, কারও কারও সাথে চোখের দেখা, হাসি আর কথা বলা।
আমার কিন্তু সবাইকেই ভাল লাগে। কিন্তু, আম্মা একটাকে লিস্টে রাখেন, আরেকটাকে বাদ দেন। আম্মা আছে আম্মার তালে। আমি থাকি আমার মতন। অফিসে চাপ বাড়ছে প্রতিদিন। ভার্সিটিতে থাকতেই ভাল ছিল। পড়, ঘুর, খাও-দাও আর শেষে ঘুম। এখন কত ঝামেলা বাড়ছে। বস আবার ফ্যাচ ফ্যাচ করে সারাদিন। সিমেন্টের হিসেবে ভুল করল আরেকজন আর ঝাড়ি দিল আমারে। সেই ভুল ঠিক করতে পরে পিলারের দৈর্ঘ্য কমাতে হয়েছে আমার। এতে আবার পিলারের বেন্ডিং রেশিও বেড়ে যায়, করলাম ডিজাইন চেঞ্জ। এতসব করতে যেয়ে টাইম ওভার। ধূররর, এই মাথা গরম ভাব নিয়ে পাত্রী দেখতে যাই। অবশ্যই আম্মার সাথে। পাত্রীর পক্ষ থেকে কেউ কিছু মনে করে না। কুয়েট থেকে পাশ করা উঁচু বেতনের চাকরীজীবী পাত্র। ডানো গুঁড়াদুধের মত এটাই আমার লেবেল। এসব লেখা ট্যাগ ঝুলে আমার মাথার উপর। প্রতিটা পাত্রীপক্ষের চাচা এই ট্যাগ সম্পর্কে খোঁজ নেয় আম্মার কাছে। পরে, আমি আর পাত্রী কিছুক্ষণ গল্প গুজব করে হাসিমুখে ফেরত যাই। ডেইলি চাইনীজ। আম্মা বিল দেয়, আমার কী!
আম্মার মাথায় ঢুকছে এই দেশের আর এই যুগের সব মেয়েরা আসলে মহা টাংকিবাজ। আমিও আসলে এটা ভালই মানি। ভার্সিটিতে মেয়ে ছিল কম। আর, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টে মেয়ে বলতে গেলে নিতান্তই হাতে গোনা। অল্প কয়েকটাকে যা দেখতাম, সব বুকড। প্রেমিকের পাশে ঘষাঘষি করে হাঁটত। দেখলেই মেজাজ গরম হয়ে যেত আমার। এত ঢঙ কীসের এদের! আবার, মাঝে মাঝে মনে হয়, ইসস আমার যদি কেউ থাকত! আর, ডাবল টাইমিং এর ঘটনা ত বন্ধুদের কাছে শুনছি অহরহ। এই মেয়ে একবার এর সাথে ত আরেকবার ওর সাথে। আরেক মেয়ে আবার এক পাড়ার মাস্তানের জন্য প্রায় আত্মহত্যা করতে নিছিল। ঐ মেয়েটা আসলে গর্দভ। কোথাকার কে তার জন্য আত্মহত্যা করতে চায়। যাই হোক, আম্মা আমার জন্য আসলে মনে মনে একটু কম বয়েসী মেয়ে খুঁজছে। যেন এইসব টাংকিমারা ক্যাটাগরীতে না থাকে। মানে, এই প্রেম-ট্রেম করার আগেই যেন মেয়েকে পাওয়া যায়। আশে পাশে বন্ধুদের দেখে আমিও ভাবি, আম্মার চিন্তা মন্দ না।
দিন কাটে ঢিমে তালে। আম্মা খুঁজতেছে, বাসের লাইনে দাঁড়িয়ে আমিও যে মাঝে মাঝে আশেপাশে চোখ ফিরাই না, তা বলব না। মাঝে মাঝে কোথাও ডাক পড়লে দাঁত বের করে হাসিমুখে যাই। আমার ট্যাগ আছে না, আর কী লাগে!
একটা দাওয়াতে আসছিলাম। আসলে, এখানেও এক পাত্রীপক্ষের সাথে দেখা হবে। ত পাত্রীর সাথে কিছু কথা হল। মেয়েটা শ্যামলা কিন্তু মুখটা মিষ্টি। হালকা কমলা শাড়ি পড়ে এসেছে। দারুণ লাগছিল। মেয়েটা বোধহয় জানে না যে, তাকে আমি দেখতে এসেছি। আমাকে ওর বাসা থেকে পরিচয় করিয়ে দিল এক আত্মীয় হিসেবে। মেয়েটাও তাই খুব সহজ ভঙ্গিতে অনেক কথা বলল। ভাল, খুব ভাল। মেয়েটার মাঝে একটা ছটফটে ভাব আছে। সদ্য তরুণী মেয়ে। আম্মার এক কথায় খুব পছন্দ। আমার মনে হল, এবার একটা সুরাহা হবে।
দাওয়াত থেকে বের হতেই দেখা হল অভির সাথে। সেই অভি। সেই পালোয়ান অভি, যার সাথে কলেজে পড়তাম। গ্রুপের বন্ধু। ওর একটা ঘুষি খেলে যে কারও দাঁত খুলে যেত। আর, সেটা সে ভালই জানত। সেই অভি। কাছের একজনের সাথে কতদিন পরে দেখা। কতদিন পরে। অভি আরও ফর্সা হয়েছে। আরও মাসল বেড়েছে ওর। কিন্তু, চেহারাটা মনে হল কিছুটা মলিন। বিশাল একটা হাসি দিয়ে হাত বাড়িয়ে দিল। ধূরর, হ্যান্ডশেকের সময় আছে? লাফ দিয়ে কোলাকুলি।
“কীরে সব খবর কেমন?”, “ অমুক কেমন আছে, তমুক কেমন আছে ”, “ আমুকের সাথে কথা হয়? তমুকের সাথে যোগাযোগ আছে? ”, এইসব হাবিজাবি বলেই দুই ঘন্টা। এত রাতে আর ওকে ফিরতে দিলাম না। বাসায় নিয়ে গেলাম জোর করে। হঠাৎ মনে হল, তাড়াতাড়ি বললাম, “ বন্ধু বাসায় কিন্তু আনছি গল্প করতে, ঘুমাবা না। আর চট করে সেলফোনটা অফ কর। নইলে, তোমার ত সারারাত সেলফোনে কথা বলা লাগবে। ” অভির মুখটা যেন আরও মলিন হল, “ না রে, এখন আর কল আসে না। সেই দিন কী আ আছে রে?” হতভম্ব হয়ে গেলাম। এই ছেলে বলে কী ! সন্দেহ হল,“ কী রে শারমিন কি অসুস্থ খুব?” অভি হেসে ফেলল। “ কেন, সম্পর্ক কী ভেঙ্গে যেতে পারে না? কোনযুগে আছিস তুই? ”
ওর চেহারা দেখেই আমি বুঝলাম, ও এমনিই কথা ঘুরাচ্ছে। আমি শক্ত গলায় বললাম, “ আমি কখনই বিশ্বাস করব না যে তোর আর শারমিনের সম্পর্ক আর নেই।” অভি কিছু না বলে তাকিয়ে থাকল।
আমার মনে আছে, শারমিনকে ব্যক্তিগত ভাবে আমি একটু এড়িয়েই চলতাম। সব বন্ধুরা মিলে মেঘনা নদী যাওয়ার প্ল্যান করলাম একবার। সেই কলেজ যখন শেষ হল তখন। প্ল্যানটা ছিল আমার। সাথে অভি ত ছিলই। অচেনা একটা নাম্বার থেকে ফোন আসল সেসময়। “ ভাইয়া, প্লিজ ভাইয়া, অভিকে নিবেন না। ও ত সাঁতার পারে না, যদি কিছু একটা হয়ে যায়! এই ছেলে সাতাঁর পারেনা তবুও নদীর পাড়ে বসে থাকবে। ব্রিজের রেলিঙে উঠতে চাবে। আমি অনেক কষ্ট করেও বলে বলে রাজী করাতে পারছিনা। প্লিজ ওকে নেবেন না। আর, অভিকে বলবেন না যে আমি কল দিয়েছিলাম ”, এরপরে ফোঁপানী। যার পর নাই বিরক্ত হলাম আমি। আরে আজব মেয়ে ত, এত ন্যাকামীর কী আছে ! গলাটা শক্ত হয়ে আসলেও অভির দিকে তাকিয়ে কিছু বললাম না। কথাটা চেপে গিয়েছিলাম। কিন্তু, ব্যাপারটা শুধু এখানে থেকে থাকেনি। পরের দিনও আবার ফোন। আবার একই প্যাঁচাল। আমি বিরক্তির শেষ মাথায় পৌঁছে প্ল্যান উলটা এগিয়ে আনলাম। পরশু যাব আমরা। হ্যাঁ, পরশুই।
শেষে আসলে যাওয়া হল না আমার। আম্মার জন্য। আম্মার সারাদিন কান্নাকাটি। আমি সাতাঁর জানিনা, আমি নাকি পড়ে যাব। আমি নাকি ডুবে যাব। আমি নাকি অনেক কিছু বুঝি না, সাবধান না। আমাকে নিয়ে ভয় করেই হার্ট এট্যাক করবে আম্মা। আমি যদি আজকে বাসায় থাকি, আব্বু পাঁচশ টাকা দিবে, আম্মা পোলাও-কোরমা রান্না শুরু করবে। এত কিছুর লোভে রয়েই গেলাম। হমমম, সবাই গিয়েছিল। সবাই। না বোধহয়, অভি যায় নি। যেতে পারেনি। পাঁচশ টাকা আর পোলাও-কোরমার বদলে অন্য কিছু পেয়েছিল হয়ত। শুনেছিলাম, বাসা থেকে নাকি ঠিকই বের হয়েছিল। বাকিদের থেকে শুনলাম ওদের সাথে যায় নি। বুঝিনা এতকিছু। তবে, আমি নতুন কিছু বুঝতে শিখি। যাই হোক, সেই শারমিনের সাথে সম্পর্ক ভাঙতে পারেনা অভির, যদি না অভি খুব বড় কোন দোষ করে।
অভি আস্তে করে বলল, “ এই ত সামনের ঈদে শারমিনের বিয়ে হয়ে যাবে রে।” আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। “ শারমিন এই ত সেকেন্ড ইয়ারে উঠল। একবছর গ্যাপ গিয়েছিলনা আমার? ওই যে, ইন্টারের পড়েই যে টাইফয়েড আর জন্ডিস পরপর। একটা প্রাইভেট মেডিকেলে ফোর্থ ইয়ারের মাঝখানে আছি। শারমিনের ভাইয়ের এক বন্ধু, বিদেশ যাবে তাই সবার সাথে দেখা করতে সবাইকে খাওয়াতে দাওয়াত দিয়েছিল। শারমিন বোঝেনি, আসলে ওকে ওরা দেখেছে সেদিন। ওর বাসার সবাই জানত। ওকে বলেনি। ওদের ইচ্ছা, আক্বদটা হোক, ছেলে বিদেশ চলে যাবে। দুই বছর পর ফেরত এসে মেয়েকে ঘরে উঠাবে”, নিচু কন্ঠে বলে গেল।
“ছেলেটাকে পিটালে হয় না? বা, সবকিছু যদি বুঝিয়ে বলা যায়। আমিই না হয় দেখা করলাম”, আমার কথা শুনে অভি মাথা নাড়ল। “ নাহ, ওর ভাইয়ের বন্ধু না? ওর ভাই জেনে যাবে, সাথে সাথে ওকে আরেকজায়গায় বিয়ে দিয়ে দিবে। আমি যে বাসায় বলব সেই অবস্থাও নেই। এটা ত বুঝিসই। আরও একটা বছর বাকি। এরপরে ইন্টার্নী।” কিছুই আসলে বলার নেই। চুপ করে বসে রইলাম।
আমি ভাবি শারমিনের বিয়ের আগে শেষ যেদিন ওরা দেখা করবে, সেদিন ওদের চোখে সেই ছেলেটা আসলে কত বড় শত্রু। ছেলেটা টেরও পাবে না। সেই ছেলেকে কোন সম্মান করতে পারবে শারমিন? বিয়ের পর একদিন সব মানিয়ে নিবে। তাও কী সম্মান করতে পারবে? যাকে সম্মান করেনা, তার বিশ্বাস রাখার কার কী ঠেকা !
“ শারমিন সারাদিন কাঁদে জানিস। প্রথম প্রথম ফুপিয়ে কাঁদত, এখন হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে। ওর ভাই ওকে সন্দেহ করে। বলে এই বয়েসী মেয়েরা নাকি বিয়ে করার জন্য ব্যস্ত থাকে। কিন্তু, শারমিনের নিশ্চয়ই কোন ছেলের সাথে সম্পর্ক আছে বলে রাজী হয় না। ওর মা বলে যে, এমন সুন্দর, ধনী আর ইঞ্জিনিয়ার ছেলে নাকি পরে আর পাওয়া যাবে না। আর, ছেলেতো বিদেশ চলে যাবে। মেয়েও নিজের মত করে থাকতে পারবে। ছেলেটা ওকে দেখার এক সপ্তাহ পরে আবার দেখতে আসে। তখন ও বুঝে ফেলে। বুঝেই বা করবে কী? বাসায় চিল্লাচিল্লি করেছে অনেক। বাবা,মা,ভাই সবাই বিয়ের পক্ষে। ও করবে কী? এখনও রাগারাগি করে। লাভ ত নেই। আর, আমার ত আসলে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখা ছাড়া করার কিছু নেই রে। ও মাঝে আরও কী কী বলে ঠিক নেই।” অভি, সেই পালোয়ান অভি,আমরা যাকে আড়ালে ডাকতাম ‘মাস্তান’, ‘গুণ্ডা’ যার সাথে কেউ লাগতে সাহস পেত না, তাকেও এখন কাঁদতে হয়। আমি বুঝে যাই শারমিন কী বলে। চুপ করে থাকি। মৃত্যুর কথা ভাবলেই মাথা ব্যাথা করে। ভাবি না তাই।
হঠাৎ কী মনে হতে ওকে একটা ঝাঁকি দিলাম, “ আচ্ছা, শারমিন কী শ্যামলা করে না? একবার দেখছিলাম ত। ওই যে শ্যামলা করে মিষ্টি চেহারা।” অভি কিছুক্ষণ বিরক্ত চোখে তাকিয়ে থাকল। “ ধুরর, ও একদম ধবধবে ফর্সা। আর, ওকে সেই ছেলে দেখে গেছে দুই সপ্তাহ আগে। চুপ থাক।” আমি আবার হতাশ হয়ে চুপ করে ভাবতে থাকি। ভাবছি আম্মাকে কী বলব যে আরও একটু কম বয়েসী মেয়ে দেখার জন্য ? অভির সামনে বসে আমি উজবুকের মত আমার কথা ভাবছি।
হালকা কমলা শাড়ি পড়া শ্যামলা মেয়েটার কথা মনে পড়তে থাকে। ও বোধহয় বোঝে নি একটু আগে ওকে পাত্রী বানিয়ে দেখানো হয়েছে আমার সাথে। আর, জানলেই বা কী ! ওর কী কিছু করার আছে?ওর বাসার সবাই বোধহয় আমার পক্ষে !
© আকাশ_পাগলা
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ বিকাল ৩:৫৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



