
অন্যান্য পর্ব Click This Link
পর্ব – ৫
[হূমায়ূন আহমেদের একটা কথা আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে দারুণ খাটে। আমাদের দেশে মধ্যবিত্ত ঘরে ছেলেদের প্রথম প্রেম নাকি কাজিন আর মেয়েদের বেলায় গৃহশিক্ষক। এই পর্বে আমি মেয়েদের পছন্দ অপছন্দের পেছনে মনস্তত্ব খোঁজার চেষ্টা করছি। আমি মনে করি, মানসিক দিক থেকে কোনভাবেই প্রভাবিত ‘নয়’ এমন একটা মেয়ে আর একটা ছেলের পছন্দ অপছন্দের মূলত কোন পার্থক্য নেই। আমরা আগে থেকেই জানি, একটা মানুষের পছন্দ আর মানসিকতা নির্ভর করে পরিবেশের উপর আর কিছুটা বংশগতির উপরেও। ভাই বোন দুজনের(একই বংশগতি) বেড়ে উঠার পরিবেশ আমরা যতদিন একই রকম পাচ্ছি, ততদিন এদের মন মানসিকতা মোটামুটি একই রকম থাকবে, সেই সাথে তাদের পছন্দের বিষয়গুলোও।]
খেয়াল করে দেখেন, আপনি যখন ছোট ছিলেন, আপনি আর আপনার কাছাকাছি বয়সের বোন দুজনকেই যখন বলা হত, তোমাদের চোখে আদর্শ পুরুষ কে? এক কথায় উত্তর, “আব্বু ।” তোমাদের কাছে সবচেয়ে মজা লাগে কাকে? সাথে সাথে চিৎকার, “ছোট মামা।” এই সব বিষয়ে ছেলে আর মেয়ের মাঝে আমাদের পরিবেশ কোন সীমারেখা দেয় নি। তাই তাদের পছন্দের ধরণও একই রকম হচ্ছে। কিন্তু দেখবেন, খেলনার সময় ছেলেটা খেলছে পিস্তল দিয়ে, মেয়েটা পুতুল দিয়ে। এখানে পার্থক্য কেন? কেউ কেউ বলে থাকেন, মেয়েরা বংশগত ভাবেই নাকি এমন। আসলে এটা পুরাই ভুয়া কথা। মেয়েটাকে আসলে বুঝানো হয়েছে যে, পিস্তল তোমার খেলার জিনিস না। এটা সচেতন ভাবে কোন ব্যক্তি বোঝায় না, বোঝায় আমাদের পরিবেশ। টেলিভিশনে যখন দেখায় ওই মেয়ের বয়েসী কিছু পিচ্চী মেয়ে পুতুল দিয়ে খেলছে, অথবা, পাশের বাসার একটু বড় মেয়েকে পুতুল দিয়ে খেলতে দেখেই সে পুতুলের ব্যাপারে আগ্রহী হয়। ওই মেয়েকে কেউ হয়ত সরাসরিভাবে এমনটা বুঝিয়েছে। আর, তাছাড়া, আরেকটা ব্যাপার কাজ করে। সেটা হল অনুকরণ। মেয়েটা তার মাকে অনুকরণ করছে। মাকে রান্না করতে দেখে সেও রান্নাবাটি খেলে। ব্যাপারটা জাস্ট সিম্পল। এখানে বংশগতির হাত নেই। মার সাথে সাথে যেই ছেলেটা ঘোরে, তাকেও দেখবেন মার দেখাদেখি এটা সেটা কাটতে চাচ্ছে। কিন্তু মেয়েটাকে যদি সত্যি সত্যি রান্নার কাজ দেন, দেখবেন প্রথমে আগ্রহে এগিয়ে আসলেও একটু পরে সে পিছু হটছে। কারণ, কাজ করতে কষ্ট লাগে আর তার আগ্রহও শেষ।
ছেলেদের মন মানসিকতার গড়ণ নিয়ে একবার ব্যাখ্যা হয়ে গেছে আগের পর্বগুলোয়। আমি আর রিপিট করব না। মেন্টালি আনটাচড অর্থাৎ যার উপর মানসিক প্রভাব খাটানো হচ্ছে না, সে রকম একটা মেয়ের পছন্দ অপছন্দ নিয়ে গবেষণা করা যাক। একটা কথা আমাদের দেশে প্রচুর বলে, মেয়েরা নাকি শক্ত সমর্থ আর পুরুষালি চেহারার ছেলেদের খুব পছন্দ করে। আমি জানি না এটা কতটুকু সত্য, তবে এই ব্যাপারটা আরেকটু খুঁচিয়ে দেখা যায়। হিন্দী সিনেমার নায়ক রণবীর কাপুরের নারীভক্ত কয়জন আর পুরুষালী চেহারের অর্জুন রামপালের নারীভক্ত কয়জন? অথবা, টম ক্রুজের নারীভক্ত কী ভিন ডিজেলের নারী ভক্তের চেয়ে কম? তাহলে, আসলে তাদের পছন্দ কীসের উপর নির্ভর করে?
আমাদের অবচেতন মন অনেকভাবে আমাদের ছোট বেলার স্মৃতি রেখে দেয়। তাই বড় হবার পরেও ছোট বেলার অভ্যাস থেকে আমরা মাকড়সা অথবা কেউ কেউ আরশোলাকে ভয় পাই। একটা মানুষের ছোট বেলার আচরণ সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে তার পছন্দ অপছন্দের উপর।
ছোট থেকেই একটা মেয়ের কাছে সবার আগে আদর্শ পুরুষ হল, তার বাবা। মেয়েটা পুরুষ বলতে ছোট থাকতে চিনেছে যাকে, সে হচ্ছে তার বাবা। বাবার সাথে যদি মেয়েটার স্বাভাবিক সম্পর্ক থাকে, তাহলে বাবার আচরণই মেয়েটার কাছে পারফেক্ট পুরুষের আচরণ হবে। একটা ছোট মেয়েকে নিশ্চয়ই তার বাবা অনেক আদর করে তাই না? ধরা যাক, তার বাবা তার সাথে বদরাগী পুরুষালী ভাব নিয়ে ঘোরাফিরা করে না। উনি ভদ্র এবং চুপচাপ। তাহলে মেয়েটার কাছে সুইট টাইপ ছেলেই পছন্দের হবে বেশি। বাবা এখানে উদাহরণ, যার সাথে ভাল সম্পর্ক বেশি আমি তাকেই বুঝাচ্ছি। বড় ভাই কিংবা মামাও কিছু কিছু ক্ষেত্রে হতে পারে। তবে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাবা।
বাবার গায়ে লোম কম থাকলে, বেশি লোমওয়ালা পুরুষকে দেখে মেয়েটা বলবে, “ ইয়াল্লা, এইটা ত বনমানুষ।” আর উল্টাটা হলে, সেই একই পুরুষকে মেয়েটা বলত, “এরকম জাদরেল ভাব না থাকলে আবার পুরুষ বলে বুঝা যায় নাকি!”
ধরা যাক, মেয়েটার মন মানসিকতা এখনও কোন নির্দিষ্ট লাইনে আসে নি। এতদিনে মেয়ে কিছুটা বড় হয়েছে, মেয়ের উপর বাবার এখন বিধি নিষেধ জারী হয়েছে, বাবা এখন পড়াশুনা না করলে মেয়েকে ধমকও দেন খুব। তাহলে, বাবা আর তার আগের পজিশন মেয়েটার মনে ধরে রাখতে পারবে না। এখন মেয়েটা যেহেতু চোখের সামনে অন্য কোন ছেলেকে পাচ্ছে না, তাই মোটামুটি ভাবে যে তার কাছাকাছি, সে তাকে আদর্শ পুরুষ ধরবে। বলেন ত সেটা কে? ছোট ভাইকে আমরা গণায় ধরছিনা। বড় ভাই মাঝে মাঝে একটা ফ্যক্ট।সেও আদর্শ পুরুষ হতে পারে, তবে একেও যদি বাদ দেই, সেটা সেই মেয়ের গৃহ শিক্ষক, মোস্ট অব দ্যা টাইম। যদি এদের বয়সের পার্থক্য কম হয়, তাহলে ছেলেটাও হালকা প্রশ্রয় দেবে, আর এই বয়েসী মেয়ে যে কী না মাত্র স্বপন দেখা শুরু করল, সে প্রথমবারের মত একটা ছেলেকে অন্য চোখে দেখা শুরু করবে।গৃহ শিক্ষকের পরে এই লাইনে কাছাকাছি আসে কে?
তাহলে পাচ্ছি বারান্দার সামনের দেয়ালে রাস্তায় টাংকি মারার জন্য যে ছেলেটা দাঁড়িয়ে থাকে সে। তেমন হয়ত কথা হয় না এদের, কিন্তু, হালকা চোখাচোখিও স্বপ্ন দেখতে যথেষ্ট। কারণ, ছেলেটা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, মেয়েটার কাছেই এটাই তখন আদর্শ, ব্যাকা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে, তখন তাই ভাল।
মেয়েদের এই বয়সটায় মেয়েরা খুবই আবেগী হয়। ছেলেদেরও আসলে একই অবস্থা হয়, কিন্তু সেই বয়সে ছেলেরা অন্যান্য মেয়েদের থেকে পাত্তা পায় না। সেখানে একটা মেয়েকে স্বপ্ন দেখাতে লাইন পড়ে যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মেয়েরা পরবর্তীতে আফসোস করে যে, প্রথম জীবনে কী করে এমন এক জনের প্রেমে পড়েছিল !
এ সবই কিন্তু মেনটালি আনটাচড, অর্থাৎ মানসিকভাবে প্রভাবিত ‘না’ এমন মেয়েদের ক্ষেত্রে। যতক্ষণ না সে কোন মুভি বা কোন গল্পের বই বা কোন এক্সট্রা পাকনা বান্ধবী থেকে শিখছে যে, তার একটা মেয়ে হিসেবে কী ধরণের ছেলেকে পছন্দ করা উচিত। এখন সেই এক্সট্রা পাকনা আবান্ধবী হয়ত মুভি বা গল্পের বই থেকেই আগে শিখেছে। একটা বয়সের পর আর এসব মুভি বা বান্ধবীর কথায় গুরুত্ব দিলেও তেমন এফেক্ট ফেলবে না। এখন কথা হল, আপনি বুঝবেন কী করে যে মেয়েটা মেন্টালি প্রভাবিত কী না? দশ মিনিটের কথাতেই বোঝা যায়।এটা এমন বড় ব্যাপার না। এমনিতেও মধ্যবিত্ত ফ্যামিলিতে মানসিক ভাবে ‘প্রভাবিত’ মেয়ে আসলে কম। ১০% এর মত হবে হয়ত।
আরও একটা ব্যাপার এখানে ফ্যাক্ট। বংশগতির দিক থেকে মেয়েরা একটা আচরণ ঠিকই পায়, সেটা হল বাচ্চাদের প্রতি আলাদা মায়া, ছেলদের থেকে বেশি। একটা বাচ্চার কী দেখে ওরা আকৃষ্ট হয়? নিশ্চয় সাইজ না, সেটা হল কিউটনেস। বাচ্চার আদুরে ভাব। একটা মেয়ের মধ্যে অনেক আগে থেকেই এই ব্যাপারটা কাজ করে। সুতরাং, যেসব ছেলেদের মধ্যে একটা শিশুটাইপ আলাভোলা ব্যাপার থাকে, অথবা কিউটনেস থাকে, বেশিরভাগ মেয়েরা তাদের বেশি পছন্দ করে। এই থিওরী দেশের প্রায় ৮০% মেয়েদের বেলাতেই খাটবে।
সুতরাং, এত বেশি মানুষের মুখে আমরা যেটা শুনি যে, খুব পুরুষালী চেহারার ছেলে বা জাদরেল চেহারার ছেলে অথবা খুব শক্ত টাইপ ছেলে "ছাড়া" মেয়েরা পছন্দ করে না, এসব কথার ভীত কতটুকু শক্ত তা নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে।
কিউট মানে কিন্তু মেয়েলী বা শিশুসুলভ পুরুষদের কথা বুঝাচ্ছি না। এইটা অন্য এঙ্গেল। পছন্দ অপছন্দ এরকম নির্দিষ্ট ফরম্যাটে হয় না। একটা মেয়ে/মানুষের পছন্দ অপছন্দ তার পরিবেশের উপরই নির্ভর করে। আর, এক্ষেত্রে একটা মেয়ে কী ধরণের পরিবেশ পায়, আমাদের দেশে আমি মূলত সেটা নিয়েই ভেবেছি।
একটা মেয়ে যে মেনটালি প্রভাবিত, তাকে প্রভাবিত করা যায় বা কীভাবে তার মন মানসিকতা কাজ করে, সেটা নিয়ে সামনের পর্বে আলোচনার আশা রাখি।
© আকাশ_পাগলা
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে অক্টোবর, ২০০৯ রাত ১২:৫৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


