
মোটামোটি পরশুদিন থেকে প্ল্যান করছিলাম এইবার একটা চরম গল্প লিখতে হবে। নইলে আর চলছে না। গল্প লেখার নাম করে ঝিমাচ্ছিলাম বেশ অনেকদিন হল। হিসেব করে দেখলাম আর কোন লেখাই লিখতে পারছি না প্রায় সাড়ে আট মাস ধরে। ত এরপরেই কাগজ কলম নিয়ে বসলাম।
খুব দামী কাগজ না হলে আমার গল্পকে আমার কাছেই কেমন যেন কমদামী লাগে। আর সাথে কালিটাও ভাল থাকতে হবে, গল্পের কথাগুলো যেন চকচক করে। ত সব কিছু গুছিয়ে বসে পড়লাম, এবার কিছু একটা হবেই।
কিন্তু আসলে যেই সমস্যাটায় ভুগছি এতদিন ধরে, সেটা এখনও কাঁটেনি। একই টাইপ গল্প হলে ত হবে না, প্ল্যাটফর্মে বৈচিত্র্য আনতে হবে, লেখনী আরও ধারালো করতে হবে, আর সাথে যেমনটা আমি সবসময়েই বলি ভাল গল্প হতে হলে আঠা আঠা সেক্স এক চিমটি লাগবেই।
মনে মনে প্ল্যান করা শুরু করলাম। কী থিম নিয়ে গল্পটা লিখা যায়। আমি কী সেই বিদেশী ছেলেটাকে নিয়ে গল্পটা লিখব যার বাবা ভাই বাংলাদেশী ! আমি ওদেরকে দেখেছিলাম ফুলের আড়তে। হাজার হাজার ফুল, এর মাঝে একটা পিচ্চী, আর্মিদের ক্যামোফ্লাজ টি শার্ট পড়া সাথে তার ভাই। সৎ ভাই। বাংলাদেশী, প্রায় মধ্যবয়স্ক। এদের বাবা দুটো বিয়ে করেছেন, একটা দেশে আরেকটা বিদেশে। স্বাভাবিকভাবেই দেশে এটা কেউ মেনে নেয় নি।
বাকি কাহিনীকে মিলিয়ে, এরা এখানে কী করে আসল এসব ব্যাপার গুছিয়ে বলে, এটাকে গল্প হিসেবে চালিয়ে দিলে খারাপ হয় না।
অথবা হেনার কাহিনীও গল্প হিসেবে চালানো যায়। হেনা যখন প্রথমবারের মত ধর্ষিত হল, এরপরে সে যখন পুলিশের কাছে গেল আর তার তিন দিন পরের রাতে আবারও ধর্ষিত হল, আর তারও এক সপ্তাহ পরে বিচারকের সামনে কী কান্নাটাই না কাঁদল, এসব কিছুর বর্ণনা আর বাকি কাহিনী নিয়েও একটা গল্প লেখা যায়।
প্যাকেজ নাটকের মত করেও কিন্তু কাহিনী লেখা যায়।এগুলোও মনে হয় পাবলিক ভালই খাবে। মানে, কাহিনীর শুরুটা যদি হয় এমন যে একটা তরুণী মেয়ে, গল্পের নায়িকা হিসেবে তাকে অবশ্যই অনেক সুন্দর হতে হবে, তার মনের দুঃখ নিয়ে কবিতা লেখে। সেই কবিতায় থাকে শুধু দুঃখ আর একাকীত্বের কথা। তার আর তার প্রেমিক আলাদা বহুদিন, তাদের কষ্টের কথা। ত সেই মেয়ের খুব ভক্ত হল এক বুড়ো। এই বুড়ো জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে তার মনের সাথে অস্বাভাবিক মিল পায় এই কবিতাগুলোর মাঝে। বুড়ো দেখা করে মেয়েটার সাথে। প্রতি চারদিন পর পর। আর মেয়েটা তাকে তার মনের সব কথা বলে। মানে এসব মিলিয়ে ধারাবাহিক নাটকের মত পুরা জমজমাট কাহিনী বলা যায়।
আমি ভাবছিলাম, এসব গল্প বড় শক্ত হয়ে যাবে। মানে আর্ট ফিল্প টাইপের কাহিনী হয়ে যাবে, পাঠকের নার্ভের উপর প্রেশার পরে বেশি। আমাকে মনে হয় এই ধরণের গল্পে মানায় না।
আমি নিজে নিজে গল্পের কিছু ক্লাসিফিকেশন করেছি। আমার কাছে গল্প দুই ধরণের। কাহিনী বেইজড আর ফিলিংস বেইজড। কাহিনী বেইজড হল, কোন একটা কাহিনী নিয়ে গল্প লিখা। এটা যে কোন কাহিনী হতে পারে। এটাকে জ্ঞানীরা ঐতিহাসিক,রোমহর্ষক,প্রেম,পুরাণ,গোয়েন্দা হাজার ভাগে ভাগ করতে পারে। সব মিলিয়ে কাহিনী যেই গল্পে প্রধান সেগুলো এই ক্যাটাগরীতে রাখব।
আরেকটা হল ফিলিংস বেইজড লেখা। এখানেও কাহিনী থাকবে, তবে সেটা চিত্রকল্পের পেছনে। কোন সময়ে মানুষের বিশেষ অনুভূতি, আমার বিশেষ কোন চিন্তার প্রকাশ আর তার পেছনের কাহিনী সব মিলিয়ে এই টাইপ গল্প। মানে, এটা একটা শিল্পীর রঙতুলির ছবিকে কথায় কথায় বর্ণনা দেবার মত। কাহিনী একটা টুকরো, কিন্তু রঙ অনেক।
আমার মনে হয় আমার লেখাগুলোকে এই টাইপে ফেলা দরকার। কারণ কাহিনী বানানোর জন্য যতটুকু ক্রিয়েটিভিটি লাগে তা বোধহয় আমার নাই। তাহলে একটা সার্থক আর জমজমাট গল্প বানানোর একটা উপায়ই খোলা রইল। মুমু যখন আমাকে ছেড়ে চলে যায়, সেই সময়ে মাথার মাঝে যা ঘুরত, সেটাকেই বরং গল্প হিসেবে চালিয়ে দেয়া যায়। ঐ একটা সময় ছিল পাগলের মত রাস্তায় ঘোরাঘুরি করতাম। বন্ধুরা বাসায় চলে যেত, আর আমি এক আড্ডা থেকে অন্য আড্ডায় ঘুরতাম। আমার মনে হত, এক মুহূর্ত একা থাকলেই আমি পাগল হয়ে যাব। শুধু সময়টা কীভাবে কাঁটবে সেটার ভয়েই আমি সিঁটকে থাকতাম। মনে হত, কোন কিছু সম্ভব না আমার দ্বারা। টিকে থাকাটাই সে সময় এত কষ্ট হয়ে গিয়েছিল। একা হলেই শুধু খারাপ লাগত, গলায় মনে হত কী যেন আটকে থাকত। একটা দলা পাঁকানো কান্না যেন গলায় আঁটকে থাকত সব সময়েই। আচ্ছা, শুধু এগুলো বলেই কী গল্প লেখা যায় ! মুমুর সাথে আমার পরিচয় ওর মামার বিয়েতে। আজীবন সিনেমাতে দেখে এসেছি, বিয়ে বাড়িতে পরিচয় হলে সেটা প্রেম পর্যন্ত গড়াবেই। মাথাতেও তাই ছিল। আর হয়ত মুমুর মাথাতেও ছিল। অনেকটা কথার পরে, ঢিমে তালে শুরু হয় প্রেম। খুব একটা সিরিয়াস ছিলাম না আমি নিজেও। কিন্তু আসলে তিনটা বছর হয়ে যাবার পরে কখন যে কীভাবে এত কাছে এসে গিয়েছি দুজনে ঠিকমত বুঝে উঠতে পারিনি। আমি এখন বুঝি, আসলে এমনটাই হয়। প্রেম করব করব ভাব থাকলে প্রেম করা যায় না। এটা হয়ে যায়। খুব ভাল লাগা না থাকলে এতটা দিন একসাথে থাকতাম না। অথচ শেষে কী হল! আমি জানি এখন মুমু আমাকে স্বপ্নে দেখে।অথবা হয়ত স্বপ্নই দেখে না। অথচ আমার স্বপ্নগুলো কেমন গুঁড়িয়ে গেল। আমরা কেউ চাইনি, অথচ তবুও।
থাক, এসব নিয়ে গল্প লেখার দরকার নেই। এসব বলতে ইচ্ছা করে না। ব্যাপারটা আরও অনেক খারাপও হতে পারত। ভাগ্যই যেহেতু আমাদের প্রধান বাঁধা ছিল, তাই ভাগ্যটা মোতালেব আংকেলের মতও কিন্তু হতে পারত। একজনের সাথে থাকার জন্য কতই না ঝামেলা করলেন, একটা সময় প্রায় সবাই যখন নরম হয়ে এসেছিল, তখন একটা এক্সিডেন্টে উনি পরপারে। উনি আর উনার স্ত্রী সুসান। অবশ্য এটা মোতালেব আংকেলের দ্বিতীয় বিয়ে ছিল।উনার প্রথম বিয়েটা বাসা থেকে খুব জোর করে খালাত বোনের সাথে দেয়া হয়েছিল। পরবর্তী ঘটনা আমি যতটুকু জানি, দশ বছর পরে বিদেশে যেয়ে সুসানকে বিয়ে করে ফেলেন। দেশে উনার একটা ছেলে ছিল অবশ্য। সেদিন থেকে ভাবলে মনে হয়, কাজটা ঠিক করেন নাই। সুসান বাংলাদেশে সাংবাদিকের কাজ করত। একুশে বই মেলায় পরিচয় হয়েছিল উনাদের। সেই নব্বই দশকে। তখন থেকেই প্রেম। কিন্তু উনার বাসাতে কেউ মেনে নেয়নি। কিন্তু বিদেশে যাবার পরে সুসানকে আবারও খুঁজে পান মোতালেব আংকেল। নিজেকে বোধহয় আর ঠেকিয়ে রাখতে পারে নি দুজনের কেউ। তাছাড়া, সুসান তখনও কারও সাথে জড়ায় নি। দশটা বছর কারও সাথে না জড়ানো সুইজারল্যান্ডের একটা মেয়ের জন্য নিশ্চয়ই অনেক কিছু। ওখানে ওদের একটা ছেলে হয়েছিল। দারুণ চেহারা। পিচ্চী এখন তার বড় ভাইয়ের সাথে থাকে। পিচ্চী দেশে আসার পরে ওকে দেখে সবার মন বদলে গেছে। ওদের দেখি একটা ফুলের আড়তে। আর্মি ক্যামোফ্লেজ গেঞ্জি পড়ে ফুলের স্তুপের মাঝে দৌড়ে বেড়াচ্ছিল। পিচ্চীর সপ্তম জন্মদিনে তার ভাই তাকে এক হাজার গাঁদা ফুল গিফট করে। সেই ফুল কিনতে আড়তে আসা। গাঁদা ফুল কিন্তু কেজি হিসেবে বিক্রী হয়, অথবা মালা করা থাকলে দৈর্ঘ্য হিসেবে। কিন্তু ওরা গুণে আনে। আমিও সাহায্য করেছিলাম গুণতে।
এদের কাহিনীর সমাপ্তিটা সুখের নাকি দুঃখের আমি ঠিক বুঝি না। পিচ্চীটাকে দেখলেই মায়া লাগে। আবার মনে হয়, তাও ত টিকে আছে নিষ্ঠুর দুনিয়ায় ভাল মতই।
ভাগ্য এমনটা নাও হতে পারত। হেনার মতও হতে পারত। হেনা এখন ফুল বেঁচে। মধ্যবয়স্ক মহিলা। তার সামনের সবগুলো দাঁত ভাঙা।এক্সিডেন্ট না,হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে তার দাঁত ভাঙা হয়। তাকে রিমান্ডে নেয়া হয়েছিল। তার ঘরে প্রচুর মারজুয়ানা খুঁজে পায় পুলিশ। হেনার বাসা খুঁজে পেতে কোন সমস্যাই হয় নি পুলিশের। ঘটনার শুরু বেশ আগে থেকে। নেতার চামচাদের হাতে ধর্ষিত হয় সে। প্রথমে একবার। তখন তাকে ধর্ষণ করে তিনজন। এদের কাউকে সে চিনত না, কারও সাথে আগে কথাও হয়নি। যারা ধর্ষণ করেছে, এরাও তাকে চিনত না। এমনি রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল, মেয়েটাকে দেখে ভালো লেগেছে, গাড়িতে টেনে নিয়ে উঠিয়েছে। বস্তির মেয়ে, একজন হারানো গেলেই বা কী !
ব্যাপারটা এখানেই থেকে থাকেনি হেনার বেলায়। সে পুলিশের কাছে যায়। পেপারে এদের চেহারা দেখেছে সে, সেই পেপারও দেখায়। নেতার পাশে দাঁড়িয়ে তার দুই চামচা। তারাও নেতা, তবে একটু ছোট।
ব্যাপারটা আসলে এর চেয়েও বেশি গড়ায়। তার তিনদিন পড়ে নেতার চামচাসহ ছয়জন তার বাসার দরজা ভাঙে। অনেকেই দেখেছিল, কেউ এগিয়ে আসে নি। তাকে হাতুড়ি দিয়ে পেটানো হয়, তার দাঁত ভাঙা হয়, আবারো ধর্ষিত হয়। মেয়েটা হাসপাতালে থাকে তিন মাস। এলাকার লোকজন পুলিশ ডাকলে পুলিশ তার বাসায় মারজুয়ানা খুঁজে পায়। শোনা যায়, নেতার ঐ চামচাদের নাকি মারজুয়ানার ব্যাবসাই ছিল। যাই হোক, হাসপাতাল থেকে জেল। এই হেনা মুমুদের গ্রামের মেয়ে। মুমুর সাথে খুব একটা খাতির ছিল না, বলতে গেলে মুখচেনা। সেই সূত্রে কোনভাবে আমার সাথেও একবার কথা হয়েছিল। অই ওটুকুই।এখন এই হেনা এখন আমাদের মত মানুষের কাছে গুণে গুণে এক হাজার গাঁদা ফুল বেঁচে অথচ তার জীবনে ফুলের কোন ভূমিকা নেই।
এমন সব পেপার কাটিংগুলো শেষমেষ প্যাকেজ নাটকের মত রূপ নেয়। মনে হয় সারাটা জীবন ধরে যেন নাটকের কোন একটা চরিত্রে অভিনয় করে গেলাম। প্যাকেজ নাটক হিসেবে গল্পটা এগিয়ে নিলে এতক্ষণে জমজমাট হয়ে যেত কাহিনী। সেই তরুণী কবি মুমুর যে কীনা নাটকের নায়িকা হত, তার বিয়ে ঠিক হয়ে যায়। বাধ্য হয়েই আমার বাসাতে তার কথা বলতে হয়। আর যেমনটা সব নাটকেই হয়, আমার বাসা থেকে সরাসরি মানা করে দেয়, কারণ মুমুদের পারিবারিক অবস্থা তাদের কাছে একটু নিচেই মনে হয়। আর অসুস্থ দাদুর রাগ ছিল আমার উপর সবচেয়ে বেশি, কারণ আমার জন্য দাদুর নিজের একটা পছন্দ ছিল।
এরকম সিনেমেটিক কাহিনীতে যখন থমকে গেছি, ঠিক তখনই বুঝতে পারি সিনেমা আসলে দ্রুত এগিয়ে চলছে। তরুণী কবি মুমুর ভক্ত ছিল আমার অসুস্থ দাদুই, যিনি কী না শেষপর্যন্ত আমাদের বিয়েতেই সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছিলেন।
পুরো কাহিনীটাই যে নাটকের মত বা আসলে বলতে গেলে সিনেমেটিক, সেটা নিশ্চিত হই আরও কয়েকদিন পরে, সিনেমার শেষ অংশে এসে, যখন সিনেমার কাহিনী আর সময় দুটোই শেষ।
মুমুর কবরে আমি কখনও যাই নি। আমি একা সময় কাটানোর জন্য এখানে সেখানে কত ঘুরি। আমার খেয়াল আছে, মুমু চলে যাবার পর কেমন করতাম। মুমুকে মাঝে মাঝে খুব দেখতে ইচ্ছা করত। সময় কাটত না, ওর কথা মাথায় ঘুরত খালি। কিন্তু কখনও মুমুর কবরে যাই নি। এই চার বছরেও না। আমার ভাল লাগে না। জোর করে যাওয়ার মত ত কিছু নেই। মনে হয় আমি যদি ওর কবরে কখনও যেয়ে বসে থাকি, একটা সময় হয়ত মেনে নিতে পারব যে ও মৃত। কিন্তু মানতে ইচ্ছা করে না। তাই আমিও আর যাই না।
আসলে আমাদের একজনের সাথে আরেকজনের পার্থক্যটা কোথায় ! আমার মনে হয় শুধু ভাগ্যে। আর বাকিটুকু আমরা সবাই এক!
এসবের কোন কাহিনী নিয়েই আসলে গল্প লেখা যায় না।
গল্প লেখা বাদ দিয়ে আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে যাই। আর যেমনটা সবসময় করি, গাঢ় সন্ধ্যায় বারান্দার গ্রিলের সাথে কপাল ঠেকিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে শহরটাকে দেখি।
টিমটিমে চাঁদের নিচে কতশত আলো।
© আকাশ_পাগলা
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে জানুয়ারি, ২০১০ বিকাল ৫:৩৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




