ছবি তোলাই আমার হাত কখনো ভালো না। অন্তত অরূপের তাই ধারণা। সে যত বিখ্যাত ফটোগ্রাফার তোলা ছবি দেখে বলবে, এমন ছবি সেও তুলতে পারবে। অনেক চেষ্টা চরিত্র করে কিভাবে ক্যামেরার ফোকাস অ্যাডজাস্ট করতে হয় আমাকে শেখাতে পারে নাই। তার এই দুঃখটা কখনো যাবে না। ছিলো বলছি এই কারণে ও থাকে বান্দরবন। কবেই বা দেখা হবে খোদা জানে। ওর ছিলো নিজের ছবি তোলার বাতিক। যা দেখে তার সাথে একটা ছবি তুলবে। হয়তো কোথাও গেলাম। দেখল রাস্তার পাশে একটা ছাগল ঘাস খাচ্ছে। ছাগলটা কোলে নিয়া অথবা পাশে দাড়াইয়া ছবি তুলবে। এমন কীর্তি কারখানা। পোজগুলা হবে নায়কদের মতো। দেখবে আর প্রশংসা করবে। আর ছবি যদি আমি তুলি আমার চৌদ্দ গুষ্ঠি উদ্ধার করবে।
নিজের ছবি তোলায় আগ্রহ থাকলেও কেমন যেন লজ্জা লাগে। কখনো হাসি হাসিমুখে কখনো ভাবুকের মতো এবঙ অবশ্যই ঘাড় সোজা করে ছবি তুলতে চাইতাম। কিন্তু বেশীরভাগ ছবিতে আমার ঘাড় থাকতো একদিকে হেলানো। আমরা তিনজন ছিলাম। আমি শফিক অরূপ। শফিক শরীয়তপুর থাকে। সেতো ক্যামেরা দেখলেই অন্যরকম ভাব ধরে ফেলত। ভার্সিটি থেকে ট্যুরে গেলাম। প্রায় প্রত্যেকের ক্যামেরাতে শফিকের ছবি ছিলো। আল্লায় মালুম সে কেমনে এতো সময় ম্যানেজ করলো।
আমি অরূপ আর নাজিম গিয়েছিলাম সেন্ট মার্টিন। তিনটা রিল নিয়েছিলাম। ক্যামেরা ছিলো আমার কাছে । রিল নিতে ভুলে গেলাম। টেকনাফে হোটেলে রেখে গিয়েছিলাম দুটো রিল। ক্যামেরাতে ছিলো একটা। সেন্ট মার্টিন গিয়ে কি যে বকা শুনলাম। আমি অবাক, একরত্তি দ্বীপে এতো কি ছবি তুলব। পরে অন্য রিলনিতে হয়েছিলো। বাকি দুটো রিল কক্সবাজার গিয়ে শেষ করলাম। সেইবার কক্সবাজার ভ্রমনটা ছিলো বোরিং। ছবি তোলা ছাড়া কোন কাজ ছিলো না। এরপর আমি শফিক অরূপ গেলাম সিলেটে। চা বাগানে পুরো একটা রিল শেষ করে কি যে খুশি। চা বাগানে চমৎকার চমৎকার ছবি তুলেছে। কিন্তু বিধি বাম। চা গাছের পাতা ভর্তি যে জগে ক্যামেরাটা রেখেছিলো তা ছিলো পানি ভর্তি। এরপর থেকে ডিজিটাল ক্যামেরায় যাত্রা শুরু। তখন তো রোজ ছবি তোলা হতো। ক্লাস করতে গেলাম, বিকেলে হাটতে গেলাম, ফয়’স লেক গেলাম, বীচে গেলাম, ঢাকায় কোথায় না... সর্বশেষ গত ফেব্রুয়ারীতে পদ্মার চরে ছবি তোলা নিয়ে মজার মজার ঘটনা।
এখন এসব স্বপ্ন মনে হয়। কে কোথায়। হঠাৎ কিছু জিনিস পড়ায় ও দেখায় একথাগুলো মনে পড়ল। হুমায়ুন আহমেদের একটা বই পড়ছিলাম। হিমু সিরিজের তোমাদের এই নগরে। হিমু বলছিলো, বাঙলাদেশের মানুষ ছবি তুলতে খুবই পছন্দ করে। সেই ছবি হবে হাসি মুখে। একাত্তর সালে ফায়ারিং লাইনে দাড় করিয়ে অনেক বাঙালীর ছবি তুলেছিলো পাকিস্থানী কোন কোন সেনা কর্মকর্তা। সেই ছবিগুলোতেও নাকি বাঙালীরা হাসিমুখে পোজ দিয়েছে। হিমুর কথাটা সত্য কিনা জানি না। তবে দেখেছি ছবিতে মানুষ নিজেকে সুখী হাসি খুশী দেখতে চায়। অনেক বদরাগী মানুষের ছবি দেখেও চমকে উঠতে হয়। কখনো কখনো মনে হয় ছবির মানুষ কোনকালে বাস্তব হয়ে উঠবে না। সে এমনকিছুকে তার প্রতিবিম্ব বানাতে চায় যা ভুল কথা বলে। অথবা মানুষ এমনই। জীবন সংগ্রাম দুঃখ কষ্ট তাকে পাল্টে দেয়। ছবি আসলেই সত্য কথা বলে। এই ভালো।
সেদিন দৃক গ্যালারীতে একটি প্রদর্শনী দেখতে গিয়েছিলাম। গার্মেন্টস শ্রমিকদের জীবন ও সংগ্রাম নিয়ে তাসলিমা আখতারের তোলা ছবির প্রদর্শনী। ছবিগুলো দেখে মন খারাপ হয়ে গেলো। ছবির কোন কোন মানুষ সেখানে উপস্থিত ছিলো। সাংবাদিকরা ফটফট ছবি তুলছিলেন। কিছু সুন্দরী মেয়েকে একজন বলল, আপনারা এই ছবি দেখতে থাকেন। আমি ছবি তুলে নিচ্ছি। তারা হাসি হাসি মুখে ছবির সামনে দাড়াঁলেন। সাংবাদিক বললেন, উহু, হাসি মুখে না। চোখে মুখে কষ্ট আনুন।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে জুলাই, ২০১০ রাত ১২:৫৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




