somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শহর আলীর অন্যজীবন

১৩ ই আগস্ট, ২০১০ রাত ৯:৫৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

[ভাবতেই অবাক লাগছে উপন্যাস লিখেছি। না না ভুল বল্লাম। একটা উপন্যাসের এক দেড় পৃষ্টা লিখেছি। চতুর্মাত্রিক ব্লগে প্রায় ত্রিশজন মিলে একখানা উপন্যাস লেখা হচ্ছে। আমি সেই বারোয়ারী উপন্যাসের নবম পর্ব লিখেছি। যদিও উপন্যাসটার অনুষ্ঠানিক নাম ঠিক হয় নাই। আমি এই পর্বের একটা নাম দিলাম। যা শুধুমাত্র সামহোয়ারের জন্যই প্রযোজ্য।]

০১.
খিলখিল হাসি শুনে শহর আলী আবারও চমকে উঠে। লাইটপোস্টের আলো-আঁধারিতে সে কাউকে দেখতে পায় না। ভয় পেয়ে আয়াতুল-কুরসি মনে করার চেষ্টা করে। নির্জন রাস্তায় সবকিছু যেনো আউলা হয়ে আসে। মনে করার চেষ্টা করে সে বাড়ির বাইরে কেনো।
আবার হাসির শব্দ। এবার আরো কাছে। শহর আলী চমকে পিছন ফিরে।
তাকে দেখতে পরীর মতো লাগে। আকাশ থেকে নেমে আসলো বুঝি। কেমন যেনো ঝলমল করছে। মেয়েটার গা থেকে কী একটা সুবাস পরিবেশটাকে অন্যরকম করে দেয়। অপার্থিব কোনো স্বপ্ন মনে হয়। সে কী করবে ভেবে পায় না।
- কী মিয়া, ডর খাইছো নি?
তারপর আবার খিলখিল হাসির তরঙ্গ।
- তুমি ক্যাডা?
- আমারে চিনো নাই? মনে হইতাছে নতুন আমদানি! নতুন-পুরান দিয়া আমার কী! আমারে মনে ধরছে কিনা কও।
শহর বুঝতে পারে না। ভাবে, এই মেয়ে কী বলে। এতো রাতে এই মেয়ে ঘরের বাইরে কেনো।
শহর আলী ভয়-ডর খাওয়ার মানুষ না। ঘুম আসছিলো না। রাত বাজে তিনটা। শরীর-মন দুটোই কেমন যেনো ছটফট করছিলো। অস্থিরতা কমানোর জন্য রাস্তায় বের হয়। আনমনে হাঁটতে হাঁটতে কখন যে কোন দিকে এলো তার মাথায় ছিলো না। তারপর দেখে পরীর রূপ ধরে একটা মেয়ে যেনো আকাশ থেকে নেমে এসেছে।
শহর মেয়েটার দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখে। এবার যেনো তার কাছে সব কিছু পষ্ট হয়। শহর কিছু না বলে হাঁটা শুরু করে। মেয়েটাও তার পিছে পিছে আসে। শহর পেছন তাকিয়ে বলে, তুমি আমার পিছে পিছে আইবা না।
- আইলে কী অয়; আমি কি দেখতে এতোই খারাপ আমার দিকে তাকান যায় না?
- শুনো, তুমি আমারে ভুলাইতে পারবা না। আমি তেমন মানুষ না।
- পুরুষ মানুষরে আমার চেনা আছে। সব পুরুষই এক কিসিমের।
মেয়েটা তার হাত ধরে। শহর হাত ঝাকি দিয়ে হাত টেনে নেয়। মেয়েটা তারপরও পিছে পিছে আসে। শহর জোরে হাঁটে। একসময় মেয়েটা পিছনে পড়ে। মনে হয় আসলে কেউ ছিলো না, সব চোখের ভুল। শহর তার ঘরে ফিরে। হঠাৎ করে সেই মিষ্টি গন্ধটা টের পায়। আনমনে মেয়েটা যেখানটায় ছুঁয়েছিলো সেখানে হাত বোলাতে থাকে। তারপর কী যেনো হয়। শহর আলী বাথরুমে গিয়ে গোসল দেয়। ভালো করে সাবান ঘষে। তার যেনো কী হয়েছে বুঝতে পারে না।
০২.
শুয়ে শুয়ে শহর করিমনের কথা ভেবে অনুতপ্ত হয়। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায় মনে মনে। কেন চায় সে জানে না। সে তো কোনো অপরাধ করে নি। তার ঘুম আসে না। সে খালি বিছানায় ছটফট করে। কেমন যেনো উচাটন মন।
ফজরের আযানের দিকে শহরের চোখে তন্দ্রামতো ঘুম আসে। সে স্বপ্নে দেখে পরীর মতো মেয়েটাকে। সে স্বপ্ন বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। তার ঘুম ভেঙে যায়। সূর্য উঠি উঠি করছে। সে উঠে গিয়ে গেটের তালা খোলে। তার ডিউটি শুরু।
০৩.
- এতো টেনশন কিয়ের মিয়া। মউজ করতে ইচ্ছা করলে মউজ করো। এই শহরে হগ্গলে নিজ নিজ দিকগিরি নিয়া ব্যস্ত। হগ্গলে এই কাজই করে। আমাগো বড়সাব থেইকে এই আমি রহিম ডেরাইভার হগ্গলে মউজ করি।
রহিম ড্রইভারের কথা শুনে শহর অবাক হয় না। কেনো অবাক হয় না, এটা ভেবে সে অবাক হয়। তার কাছে কথাটা স্বাভাবিক মনে হয়। রহিম তাকে নানা কাহিনি বলতে থাকে। শুনে লজ্জা লাগে আবার নিজের ভেতর উত্তেজনাবোধ করে। ইচ্ছে করে রহিম ড্রাইভারকে গুরু মানে। আবার ভাবে, ছি! এইসব কী ভাবতাছি আমি, করিমন কী ভাববো।
রহিম ড্রাইভার বলে, কী মিয়া, বউয়ের কথা চিন্তা কর নি? তোমার বউ তোমারি থাকবো। পুরুষ মানুষের এক আধটু পরিবর্তন না হইলে রুচি নষ্ট হইয়া যায়। এইসব কিছু তোমার বউ জানবো না। কেউ না জানলে খুন করলেও খুন হয় না।
০৪.
করিমনের বুকটা ধক করে উঠে। কেন উঠে সে জানে না। সে একটা স্বপ্ন দেখছে । শহর আলী তার কাছ থেকে আস্তে দূরে সরে যাচ্ছে। এই স্বপ্নের মানে কী করিমন বুঝতে পারে না। পাশে তার শ্বাশুড়ি শোয়া। ইচ্ছে করে তাকে ডেকে তোলে। আজ কতোদিন হলো শহরের কোনো খোঁজ খবর নেই। পনেরোদিন আগে একদিন মোবাইল ফোনে জানিয়েছিলো সে ভালো আছে। এরমধ্যে টাকা এসেছে। শফি মিয়া নিয়ে এসেছিলো। সে বলেছে, শহর আলী বেশ ভালো কাম পাইছে। আগের চেয়ে মোটা হইসে।
করিমনের জন্য শহর লালপাড়ের একখানা শাড়ি সাজুগুজুর টুকিটাকি জিনিস পাঠিয়েছে।
করিমনের ইচ্ছে ছিলো এই শাড়ি পরে মনের মতো করে সাজবে। কিন্তু শ্বাশুড়ী তার ঘরে থাকে, তাই পরতে পারে না। বড়ই লজ্জা লাগে। তারপরও যখন মন চায়, শাড়িখানা হাতে নিয়া বসে থাকে। শাড়িতে হাত বোলায়। এই শাড়িতে শহরের হাতের উম লেগে আছে। যে নারীর স্বামী থাকে ভিনদেশে তার এতো সাজগোজ কিসের। তার কোন সাধ আহ্লাদ নাই।
শহরের উপর তার অভিমান হয়। কতো মানুষ বাড়ি আসে। শহর আসে না। কী এমন তার রাজকার্য, বাড়ি আসতে পারে না!
করিমন জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়। কী সুন্দর চাঁদ! চাদের আলোয় চারদিক থৈথৈ করছে। আহারে যদি শহর আলী থাকতো-- সেশঙ্খমিত্রার চরে শহরের কোলে মাথা রেখে শুয়ে থাকতো। তার মতো সুখী আর কেউ হইত না।
করিমন দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে। ইচ্ছে করে জানালাটা বন্ধ করে দিতে । এতো সৌন্দর্য তার সহ্য হয় না। পেটের বাচ্চাটার নড়াছড়া টের পায়। করিমন বলে, কিরে তোরও কি তার জন্য পেট পুড়িছে?
করিমন পেটে হাত বোলাতে থাকে। তার মনটা আনন্দে ভরে যায়। ঘরে মধ্যে ঢুকে পড়া এক টুকরো চাদের আলো ছুঁয়ে দেখে। সে ভাবে শহর আলী নিশ্চয় চাঁদনিরাতে তার কথা ভাবছে। তার মতো শহর আলীরও মন কাঁদছে। চাঁদের আলোয় করিমনে অশ্রুভেজা মুখ চকচক করে। সে আস্তে করে কপাট খুলে বের হয়। দাওয়ায় বসে নানা কথা ভাবে। কখনো হাসে কখনো কাঁদে।
০৫.
শহর আলী চাঁদটার দিকে তাকায়। তার কাছে মনে হয়, আজ অন্ধকার হলেই ভালো হতো। অথবা যদি চাঁদ মেঘের আড়ালে মুখ লুকাতো। গত তিনদিনে শহর আলী দ্বিধার মধ্যে বাস করেছে। কিন্তু থেকে থেকে সেই গন্ধ তার গায়ে একটা আদিম অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। যেনো শঙ্খমিত্রার ভরা জোয়ার তার গায়ে ভর করেছে। সে শুধু ছুটছে চায়। সে বার বার স্বপ্ন দেখে। সেই স্বপ্ন তারে অন্য জীবনের সন্ধান দেয়। নিজেকে একটা বাঘ মনে হয়। এই জঙ্গলের রাজা সে।
০৬.
শহর আলী সেই জায়গাটায় অপেক্ষা করে। চারদিক চুপচাপ। শহর আলী সেই হাসির কাচভাঙা তরঙ্গের অপেক্ষায় থাকে। জমাটবাঁধা ছায়াগুলোকে তার কাছে মনে হয় এই বুঝি কেউ দাঁড়িয়ে আছে। তার সামনে এসে দাঁড়ায় করিমন। তার গেঁয়ো গন্ধে বাতাস ভরে যায়। শহর অস্বস্থিবোধ করে। করিমনের শ্যামলা দেহ হাস্যকরভাবে তার সামনে দুলে।
হঠাৎ সেই গন্ধ ছাপিয়ে মিষ্টি সুবাস ভেসে আসে। করিমন কোথাও যে মিলিয়ে যায়। শহর আলী জগতটা অন্যরকম অনুভূতিতে ভরে যায়। সে কোন কথা বলে না। নীরবতাই তার ভালো লাগে। সে তার গন্তব্য ঠিক করে নেয়। না, তার আজ আর কোনো দ্বিধা নেই।

মূল পোষ্টের লিংকঃ বারোয়ারি-উপন্যাস: ৯মপর্ব
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই আগস্ট, ২০১০ রাত ৯:৫৮
৯টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×