লিখতে শুরু করার আগে ভেবেছিলাম শিরোনাম দেবো "মাসভিত্তিক ভাষাপ্রেম থেকে বের হয়ে আসার কঠিন শপথ নিই"। নিজেকে প্রশ্ন করলাম আমি নিজে কি এর বাইরে? সঙ্গত করণেই শিরোনাম পরিবর্তন করে বর্তমান শিরোনামে লিখলাম। যদিও শিরোনামটি মৌলিক নয় ধার করা। প্রখ্যাত ভাষা বিজ্ঞানী ও সাহিত্যিক হুমায়ন আজাদ বলেছেন- "কত টাকা জমলে বাংলাকে ঘৃণা করতে ইচ্ছে হয়।" আমি মনে করি টাকার চেয়ে শিক্ষা অর্জনের পরিমাণই বাংলাকে ঘৃণা করার একটা বড় ধরনের প্রভাবক।
আমাদের দেশের প্রায় সত্তর শতাংশের মতো মানুষ গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস করে। তাদের মধ্যে বড়দের বেশীভাগের ভাগ্যেই শিক্ষা অর্জনের সুযোগ হয় না। তাই বলে তারা কম জ্ঞানী তা কিন্তু নয়। তারা তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় ও তাদের মূল পেশা কৃষির সকল হিসাব বাংলায় করে, এমন কি তারিখ ও মাসের। তাদের তখনই ইংরেজী ক্যালেন্ডারের হিসেব রাখার প্রয়োজন হয় যখন তারা কোন সরকারী বা এজিও অফিসের সাথে যোগাযোগ করতে চায় বা তাদের শহরে পড়াশোনা করা সন্তানদের মাসিক খরচ পাঠানোর প্রয়োজন পরে। তাদের খুব কম সংখ্যকই প্রভাত ফেরীতে যায় বা ফেব্রুয়ারী এলে আমার মতো এমন লেখা লিখে অথবা পড়ে। তবুও আমি মনে করি তারা আমার চেয়ে অনেক বেশি বাংলাকে ভালবাসে। যাদের জীবনের সাথে বাংলা মিশে আছে তাদের তো আর আলাদা করে বাংলাকে ভালবাসার প্রয়োজন পরে না। প্রয়োজন পরে না প্রভাতফেরীর মতো আনুষ্ঠানিকতার।
দেশের বেশিরভাগ মানুষের ভাষা বাংলা হবার পরও শুনতে হয় আমাদের প্রাণের বাংলা ভাষা বর্তমানে বিলুপ্তির হুমকিতে! প্রায় এরকমই একটা কথা শোনা গিয়েছিল যখন কম্পিউটারে বাংলা লেখা যেত না সেই সময়ে। তারপর একটা হাতুরে পদ্ধতি ব্যবহার করে যখন বাংলা লেখা সম্ভব হলো তখন বলা হতো লেখালেখি যাই কর না কেন যোগ-বিয়োগ তো আর করা যায় না, ওয়েবে লিখা তো দূরের কথা একটা ইমেলই তো করা যায় না। এসব ইঙ্গিতপূর্ণ কথার পিঠে তীব্র কশাঘাত করে এলো ইউনিকোড ভিত্তিক বাংলা। এখন শুধু যোগ-বিয়োগ বা ইমেলই নয়, কম্পিউটারের (এমন কি মোবাইল ফোনের) ওপারেটিং সিস্টেমও চলে এসেছে বাংলায়। যদিও সেই সফটওয়ার তৈরির প্রতিষ্ঠানের প্রধান/মালিক বাঙ্গালী নয়। অথচ আজ আমরা বাঙ্গালী হয়ে সেই বাংলা ওপারেটিং সিস্টেম ব্যবহার করতে হীনমন্যতায় ভূগী আবার কারও কাছে তা ইংরেজির চেয়ে কঠান মনে হয়। অপর বাঙ্গালীকে আমরা বাংলায় ইমেল করি না, পাছে আবার হাসাহাসি হয় এই ভয়ে। এই হচ্ছে আমাদের শহুরে শিক্ষিত বাঙ্গালীর মানষিকতা। কিন্তু প্রভাতফেরীর সামনে থাকতে আমাদের ভুল হয় না।
আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসিন্দা। তাই আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই বলি। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশীরভাগ শিক্ষক কম্পিউটার ব্যবহার করলেও তাদের সিংহভাগই বাংলা কম্পোজ করতে পারেন না। (বাংলার এই দশা শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।) কারণ আর কিছুই নয় কারণ তাদের বাংলার প্রয়োজন হয় না। তারা গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করেন ইংরেজীতে, পড়েন এবং পড়ান ইংরেজীতে। শ্রেণীকক্ষে বাংলা বললেও তা ঐ ক্রিয়া পদ পর্যন্ত, টার্ম গুলো ইংরেজীতেই থাকে। টার্মগুলোর উপযুক্ত বাংলা কি হতে পারে বা তার ব্যাখ্যা বাংলায় কি হতে পারে তা নিয়ে নেই কোন মনোযোগ । উচ্চশিক্ষা স্তরে বাংলায় লিখা পাঠ্য বই নেই বললেই চলে। যা আছে তাও নানা দোষে পুষ্ট। দোষ দিতেই আমাদের বেশি ভাল লাগে। বাংলায় ভাল বই নেই বিধায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী বাংলাকে দূরে রাখতে পছন্দ করেন আবার পাঠক নেই বলে লেখকগন (বিশেষত বিজ্ঞানের) বাংলায় লিখতে আগ্রহী নয়। আবার অনেকের কাছেই বিশ্ববিদ্যালয় অর্থ বিশ্বমানের জ্ঞান সৃষ্টির প্রতিষ্ঠান নয় বরং বিশ্ববিদ্যালয় অর্থ বিশ্বপর্যায়ে শিক্ষা প্রদানের প্রতিষ্ঠান। ফলাফল এই যে সেখানে স্থানীয় ভাষা (বাংলা) ব্যবহার শুধু অনুচিতই নয় হাস্যকরও বটে যদিও সেখানে বাংলা ভাষা জানে না এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এমন অনেক সেমিনারে উপস্থিত হবার সুযোগ আমার হয়েছে যেখানে আলোচক, সমালোচক, দর্শক সবাই বাংলা জানে। আলোচনার প্রক্ষাপট বা গবেষণার ক্ষেত্রও বাংলাদেশ অথচ আলোচনা গুরুগম্ভীরভাবে বাংলায় না হয়ে ভিনদেশী ইংরেজীতে চলে। একটা ভাষার জন্য এর চেয়ে মর্মান্তিক আর কি হতে পারে?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




