সংস্কৃতি বলতে আমরা হরক সংস্কৃতি এবং সহজাত সংস্কৃতি অর্থাৎ যা মানুষের আচার-আচরণ, কর্মকাণ্ড এবং সামাজিক ও ব্যক্তিক সম্পর্কসমূহে কোন প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই প্রতিফলিত হয়- উভয়কেই গণ্য করে থাকি। হরক সংস্কৃতি অর্থাৎ শিক্ষা থেকে যা আহরিত। তার একটা সুবিধা আছে -বিশ্বের শ্রেষ্ঠ চিন্তা, চেতনা ও চর্চাগুলো শিক্ষার মাধ্যমে আমাদের জানা যায়। তবে কেবল শিক্ষিত মানুষের সংস্কৃতি নিয়েই ব্যস্ত থাকলে চলবে না। আমাদেরকে গ্রামের শিক্ষাবঞ্চিত মানুষদের সহজাত সংস্কৃতিকেও গুরুত্ব দিতে হবে এবং তা গৌরবের সাথে স্বস্খানে পুনরাধিষ্ঠিত করার নিয়ন্তন প্রয়াস চালাতে হবে। ভাবতে হবে এই সংস্কৃতি আমাদের সংস্কৃতির আদি এবং পরিচ্ছন্ন সমৃদ্ধ একটি রূপ। বর্তমান সময়ে প্রায় সর্বেক্ষেত্রেই শুভসংস্কৃতির দৈন্য অথবা সংকট সংকুলতা লক্ষ্য করা যায়। নামধারী শিক্ষিত মানুষের আচরণ থেকে এমন বোঝা মুশকিল যে, তাদের মধ্যে শুভসংস্কৃতির চর্চা আছে কিনা। আবার লোকজ সংস্কৃতিতেও 'নামধারী শিক্ষিত' শহুরে সংস্কৃতির প্রভাবে সংকট লক্ষ্য করা যায়। অথচ সংস্কৃতি এবং শিক্ষার অন্তরঙ্গ বিষয়টি উপলুব্ধ হয় ইলেট্রনিক্স মিডিয়ার মধ্য দিয়েই। একটি দেশের শিক্ষার প্রসার কতখানি তা বোঝার জন্য দেখা হয় সংবাদপত্র পাঠক সংখ্যা, শ্রেণী ও পেশার প্রতিনিধিত্ব। আর তেমনি করে প্রকাশিত সংবাদপত্রের এবং সে দেশের ইলেকট্রনিক্স মাধ্যমের মানসহ ফুটে উঠে দেশের সংস্কৃতির মান। সম্প্রতি ভারতে একটি মিডিয়া গবেষণা থেকে জানা যায়, সাম্প্রতি বছরগুলোতে সংস্কৃতির একট বাজারমুখী প্রবণতা সৃষ্টি হওয়ার কথা। যার পেছনে ইলেট্রনিক্স মিডিয়ারই রয়েছে বড় ভূমিকা। পণ্যের অবস্খানে এখন পৌঁছে গেছে সংস্কৃতির প্রকাশভঙ্গি। আমাদের দেশও এদিক দিয়ে কম যায়নি। টিভি চ্যানেলগুলোর দিকে তাকালে পরিষ্কার হয়ে উঠে সংস্কৃতির একটি সস্তা চেহারা। যা ইলেকট্রনিক্স ভয়াবহ সংস্কৃতিরই অনেকটা বহি:প্রকাশ। শিক্ষা বিষয়টা আদতেই পরিশ্রম ও চর্চার। শিক্ষাদানে যেমন পরিশ্রম আছে, শিক্ষা গ্রহণেও তাই। এই পরিশ্রমের কায়িক অংশটি গুরুতর নয় ইট ভাঙ্গা, মাল টানা কিংবা খেতখামারে কাজ করা অনেক বেশি পরিশ্রমের। কিন্তু শিক্ষার শ্রম অংশটি আসে মেধা ও মননের মধ্য থেকে। পুরানো চিন্তা, মত, সংস্কার ও চর্চাকে বদলানোর মধ্যেই প্রকৃত শিক্ষা নিহিত এবং শিক্ষার শ্রম সার্থক হয়। এই অর্থবহ শ্রম দিতে যারা আগ্রহী, তারাই প্রকৃত শিক্ষার সংস্কৃতিকে গ্রহণ করতে পারে। আমাদের ভাবতে হবে, সংস্কৃতি কোনো জড় পদার্থ নয়; এটি একেরবারে অর্জন করা, অপরিবর্তনশীল কোনো সামাজিক চর্চা নয়। সংস্কৃতি সতত পরিবর্তনশীল। যদিও এই পরিবর্তনটি সহসা দৃশ্যমান উপায়ে ঘটে না। সংস্কৃতির ভেতরের সময়টি খুব দীর্ঘ এবং সংস্কৃতির পরিবর্তনশীলতার পেছনে কার্যকর হয় প্রকৃত শিক্ষা। বিষয়টি সহজ করে বললে সংস্কৃতির গতিশীলতার চালিকাশক্তি হচ্ছে প্রকৃত শিক্ষা। যেমন শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ করে প্রকৃত সংস্কৃতি। আর এই দুইয়ের মধ্যে সেতুবন্ধনটি অতি সুদৃঢ়। কিন্তু শিক্ষা বলতে যদি আমরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকেই বুঝি, তাহলে আমরা বরাররই ভুল করবো। যদিও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ; প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়া জগতে চলাচল মানে অকারে বসবাস। জ্ঞান বিজ্ঞানের রাজ্যে প্রবেশের অধিকার এ শিক্ষাই আমাদের দেয়। কিন্তু কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই পূর্ণতা লাভ করে না, যদি তাতে না হয় যুক্ত প্রকৃত সাংস্কৃতিক শিক্ষা। প্রচলিত ধারার প্রতিষ্ঠানগুলো সব সময় নিরেট সাংস্কৃতিক শিক্ষা আমাদের দিতে পারে না, বরং এর উল্টোটাই সিংহভাগ সময়ে শিক্ষার্থীরা পেয়ে থাকে। প্রথমত আমরা এই শিক্ষাটি পরিবার ও সমাজ থেকেই পেয়ে থাকি। তবে এক্ষেত্রে মিডিয়ারও একটি ক্রমবর্ধমান ভূমিকা লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে নিম্নসংস্কৃতি এবং অপসংস্কৃতির যে রকম আগ্রাসন নিয়ে আসছে পশ্চিমা এবং ভারতীয় টিভি চ্যানেল, তার বিপরীতে একটি সুস্খ সংস্কৃতির পরিবেশ সৃষ্টি করা ও প্রতিপালনের মানসিকতা তৈরি করা কোন বিকল্প আছে বলে মনে করি না। আর তা আমরা পরিবার সমাজ থেকেই পেতে পারি। একজন শিক্ষার্থীকে প্রকৃত মানুষ হতে হলে সর্বপ্রথমে পরিবার থেকেই এসব বিষয়ে জ্ঞান লাভ করতে হয়। তথাকথিত অশিক্ষিত মানুষও পরিবার থেকে সাংস্কৃতিক শিক্ষা পেলে তথাকথিত অনেক শিক্ষিত মানুষ থেকে বেশি শিক্ষিত হবে। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। যেহেতু শিক্ষার সংস্কৃতিকে সে গ্রহণ করে অনেক সহজে। এক্ষেত্রে কিছু উদাহরণ তুলে ধরা যায়। গত কয়েক বছর থেকে দেশের পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে নকলের মাত্রা অনেকাংশে কমেছে। যা এখন সকলের কাছে আশার আলো হিসেবেই দেখা দিয়েছে। পূর্বে যার চিত্র ছিল ভয়াবহ। নকলের মহোৎসবকে ঘিরে বিভিন্ন সংবাদ ছাপা হতো পত্রিকার হেড লাইনে। পরিবারের সদস্য ছাড়াও অন্যদের অনেক অনৈতিক পন্থায় নকলের আদান প্রদান ছিল লক্ষণীয়। তাদের চিন্তার বলয়ে কাজ করতো নকল করে শিক্ষার্থীরা পাস করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভাল ভাল পদে চাকরিতে অধিষ্ঠিত হবে। তারা ভাবেন না যে নকল করে শিক্ষার স্তর পার হয়ে সনদ হাতে বেরিয়ে আসলেই এ শিক্ষার প্রয়োগ যোগ্যতা থাকে না। থাকে না গ্রহণ যোগ্যতাও। এ নামধারী শিক্ষিতদের সমাজ গ্রহণ করে না। তাদের পরিবার সম্পর্কেও স্পষ্ট হয়ে উঠে তারা কতটা সুশিক্ষায় শিক্ষিত এবং মূল্যবোধ ও রুচির মানদণ্ডের প্রশ্ন এসে যায় এ সময়। যে কারণে আমাদের সমাজে সৃষ্টি হচ্ছে অসুস্খতা পচন ধরেছে মানসিকতায়। তৈরি হচ্ছে অশিক্ষিত জনগোষ্ঠী। ক্রমে ক্রমে এক ভয়াবহ পরিস্খিতির সম্মুখীন হচ্ছে দেশ ও জাতি। তেমনি করে আরেকটি উদাহরণ তুলে ধরতে পারি এ লেখায়। ধরুন বিজ্ঞানের একটি বিষয়ে ফাস্ট হয়ে এমএসসি পাস করেছে একজন শিক্ষার্থী। অত:পর দু'বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতাও করল ওই পাস করা ছেলেটি। কিন্তু তার মাঝে আচার আচরণ শিষ্টতা অথবা সৌজন্যবোধ ও স্ব-জাতীয় সংস্কৃতির কিছুই লক্ষ্য করা যায় না।
পশ্চিমা সংস্কৃতিতে ছাত্র-শিক্ষক এতটাই খেলামেলা চলাফেরা করে যে, একে অপরকে নাম ধরে সম্বোধন করে এবং সিগারেট টানাসহ যৌন বিষয়েও গোপন বলতে কিছু থাকে না। যা তাদের সংস্কৃতিতে দোষের কিছু নয়। কারণ, এটা তাদের জন্য নতুন কিছু নয়। কিন্তু আমাদের তরুণ অধ্যাপক পশ্চিম থেকে এসব চর্চা শিখে কিংবা আধুনিকতার পাল্লায় পড়ে তার আচার-আচরণের মাধ্যমে বিষ বাষ্প ছড়িয়ে দিচ্ছে শিক্ষাঙ্গনে। যদিও ক্ষেত্র বিশেষে তার কাছ থেকে আহরিত জ্ঞান দ্বারা ছাত্ররা গবেষণায় মত্ত হয়ে গবেষক বনে যাবেন; ভাল কিছু উপহার দেবেন দেশ-জাতিকে। কিন্তু এই শিক্ষককে মানুষ গড়ার প্রকৃত কারিগর বলা হলে মূর্খতারই বহি:প্রকাশ ঘটবে। যে কারিগর তার ব্যবহার সুস্খ সুন্দর ও নৈতিকতার শিক্ষা গ্রহণ করেনি এবং শিক্ষার্থীকেও তা করানি তাকে যথাযথ কারিগর বলার কোনো সুযোগ থাকে না। যেহেতু সাংস্কৃতিক শিক্ষা ও শিক্ষার সংস্কৃতির মধ্যে যোগসূত্রে সর্বেক্ষেত্রে মানুষ তৈরির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান প্রাধান্য পায় সেহেতু এই উপাদানগুলোর মধ্যে অবশ্য প্রয়োজনীয় অর্থাৎ যার অভাবে মানুষ প্রকৃত মানুষ হয় না বরং এ শিক্ষা কলুষিত করে ব্যক্তি সমাজ ও জাতীয় পর্যায়েও। শিক্ষার উদ্দেশ্য মুখস্ত বিদ্যায় পারদর্শিতা অর্জন নয় বরং যুক্তি তর্ক ও বিচার বোধসম্পন্ন মনন সৃষ্টি করা। সংকীর্ণতা পরিহার করে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি, সহনশীল এবং প্রজ্ঞাবান দৃষ্টি নিজের মধ্যে প্রয়োগের পাশাপাশি অন্যদের মাঝেও তার যথাযথ ব্যবহার উদ্বুদ্ধকরণে নিরন্তর অনবদ্য প্রয়াস চালনা। বলা হয়ে থাকে পশ্চিমে আধুনিক যুগ শুরু হয়েছে পঞ্চদশ শতাব্দীর রেনেসাসঁ-এর সময় থেকে এবং এর পরিপূর্ণতা এসেছে অষ্টাদশ শতকের এনলাইটেনমেন্ট বা জ্ঞানালোক প্রাপ্তিকালে। এই সময়ে মানুষ নিজের মধ্যে বিশ্বকে অবলোকন করেছে, প্রশ্ন করেছে, সংস্কার ও অ প্রচলন ভেঙ্গেছে।
বস্তুত যে মানুষ প্রশ্ন করতে জানে না, যুক্তি বিচার ছাড়া অভাবে সকল কিছু গ্রহণ করে, আবেগটাকেই সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে মনে করে সে কোনভাবেই আধুনিক মানুষ হতে পারে না। প্রকৃত শিক্ষার সংস্কৃতি হচ্ছে এই আধুনিক মনষ্কতাকে গ্রহণ করে আলোর অন্বেষণ করা। শিক্ষার সংস্কৃতি হচ্ছে ভাল-মন্দ, শুভ-অশুভের বিশ্লেষণ ও পার্থক্য করতে শেখা এবং নান্দনিক দৃষ্টির অধিকারী হয়ে সুউন্নত জীবনযাপনে ব্রতী হওয়া। চলমান ধারার শিক্ষা সংস্কৃতি আমাদের যা শেখায় তা প্রকৃত মানুষ হওয়ার শিক্ষার সংস্কৃতি নয়। বরং দিনে দিনে আমাদের মাঝে এর কু-প্রভাব নীল বিষ হয়ে পচন ধরিয়ে দেয়। প্রকৃত পাঠটি গ্রহণ করা এবং পাঠ গ্রহণের মাধ্যমে হৃদয়ে তা ধারণ করা ব্যাপক ব্যাপার। অপ্রিয় হলেও সত্য যে, আমাদের দেশের দুর্নীতির প্রায় নব্বই ভাগ সংঘটিত হয় তথাকথিত শিক্ষিত লোক দ্বারা। যা বরাবরই প্রমাণ করে প্রচলিত ধারার শিক্ষায় প্রকৃত শিক্ষিত হওয়া যায় না। বরং দুর্নীতির কারিগর বানায় আমাদের এই অশুভ শিক্ষা-সংস্কৃতি। আমাদের এখনও সময় আছে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকে ভেবে দেখার। প্রকৃত শিক্ষা অর্জন ব্যতীত প্রকৃত সংস্কৃতির প্রসার লাভ কোনো ক্রমেই সম্ভব নয়। যে কারণে শিক্ষা ব্যবস্খাকে ঢেলে সাজিয়ে বঙ্গীয় সংস্কৃতির প্রসার ঘটাতে হবে ব্যক্তি-সমাজ ও জাতির জীবনে।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই নভেম্বর, ২০০৮ সকাল ১১:১৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


