বাংলাদেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা!
এবার ঢাকায় আসছে ভারতের কমান্ডোরা !
বাংলাদেশকে সন্ত্রাসী ও ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা এক ভয়ংকর পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নাকি মোটেও নির্ভরযোগ্য নয়, সশস্ত্র বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও নাকি অযোগ্য! এমন এক চিন্তার ভিত্তিতেই ভারত বাংলাদেশে তার কমান্ডো বাহিনী পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কোলকাতার প্রভাবশালী দৈনিক আনন্দবাজারের উদ্ধৃতি দিয়ে ঢাকার একটি দৈনিকে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, ভারত সরকার সে দেশের আধা-সামরিক বাহিনী এসএসবি'র ৫০ জন কমান্ডোকে বাংলাদেশে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই কমান্ডোরা ঢাকাস্থ ভারতীয় হাই কমিশনের নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব পালন করবে। শুধু তা-ই নয়, ভারতের কোনো ভিআইপি বাংলাদেশ সফরে এলে তাদের নিরাপত্তা রক্ষার জন্যও কমান্ডো দলটি নিয়োজিত থাকবে। ভিআইপিরা যেখানে যাবেন সেখানেই তাদের সঙ্গে থাকবে এসএসবির কমান্ডোরা। কমান্ডোদের ইতোমধ্যে বিশেষ প্রশিক্ষণও দেয়া হয়েছে। এখন চলছে অপেক্ষার পালা। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পাওয়ার পরই কমান্ডোদের ঢাকায় পাঠানো হবে। অন্য কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রে এভাবে কমান্ডো পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়ার কারণ সম্পর্কে আনন্দবাজার জানিয়েছে, বাংলাদেশের দেয়া নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ভারতের আস্থা নেই। তাছাড়া গত মাস নবেম্বরে বাংলাদেশ সরকারই জানিয়েছিল, পাকিস্তানের লস্কর-ই-তৈয়বা ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের ঢাকাস্থ দূতাবাসের ওপর হামলা চালানোর প্রস্তুতি নিয়েছে। বাংলাদেশে তখন তিনজন কথিত লস্কর সদস্যকে গ্রেফতারও করা হয়েছিল। এ ব্যাপারে তথ্য নাকি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই বাংলাদেশকে দিয়েছিল। অর্থাৎ বাংলাদেশ নিজের নিরাপত্তার জন্য এফবিআইয়ের ওপর নির্ভর করেছে। উল্লেখ্য, এসএসবির কমান্ডোদের ভারতীয় সেনাবাহিনীর চাইতেও দুর্ধর্ষ মনে করা হয় এবং এসএসবি নেপাল ও চীনের সঙ্গে ভারতের সীমান্ত রক্ষার দায়িত্ব পালন করে। বিদেশে পরিচালিত গোপন সশস্ত্র মিশনেও ‘র'-এর গোয়েন্দাদের পাশাপাশি ভারত এসএসবির কমান্ডোদের ব্যবহার করে থাকে। এখানে কিছু বিষয় লক্ষ্য করা দরকার। প্রথমত, কমান্ডোদের পাঠানোর প্রশ্নে ‘অনুমোদন' নেয়া হচ্ছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের, বাংলাদেশের নয়। অর্থাৎ বাংলাদেশকে তোয়াক্কাই করা হচ্ছে না। এমন ঘটনা অবশ্য এবারই প্রথম নয়। উদাহরণ হিসেবে সেপ্টেম্বরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনির সফরকালীন একটি ঘটনার উল্লেখ করা যায়। সেবার দীপু মনির সফর শেষে ১১ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে যে যুক্ত বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছিল তার কপি গভীর রাত পর্যন্তও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে পৌঁছেনি। ফ্যাক্সযোগে বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমকে বিবৃতির কপি পাঠিয়েছিল ঢাকাস্থ ভারতীয় দূতাবাস। অথচ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও অনুসৃত নিয়ম হলো, এ ধরনের যুক্ত বিবৃতি সংশ্লিষ্ট দুই দেশের রাজধানী থেকে দেশ দুটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একযোগে প্রকাশ করবে। অন্যদিকে দীপু মনির ক্ষেত্রে দেখা গেছে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে নয়াদিল্লি থেকে যুক্ত বিবৃতিটি প্রকাশ করা হয়েছে। ভারত বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ব্যাপারে কতটুকু শ্রদ্ধাশীল সে কথা যুক্ত বিবৃতি প্রকাশের এ ঘটনা থেকেই পরিষ্কার হয়েছিল।
লক্ষণীয় দ্বিতীয় বিষয় হলো, এসএসবির কমান্ডোদের পাঠানোর সিদ্ধান্তটির মাধ্যমে শুধু বাংলাদেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রশ্নেই অনাস্থা প্রকাশ করা হয়নি, একই সঙ্গে সেনাবাহিনী, র্যা ব, বিডিআর ও পুলিশ এবং এনএসআই ও ডিজিএফআইসহ নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত বাহিনীগুলোর যোগ্যতা সম্পর্কেও অবজ্ঞা প্রকাশ করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে ঘুরিয়ে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বাহিনীগুলো এতটাই অযোগ্য, দুর্বল ও অনির্ভরযোগ্য যে, তাদের ওপর ভারতীয়দের নিরাপত্তার ব্যাপারে আস্থা রাখা যায় না। এখানেই দেশপ্রেমিকদের মধ্যে আপত্তি ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। বস্তুত পিলখানা হত্যাকান্ডের পর থেকেই এমন একটি প্রচারণাকে শক্তিশালী করা হয়েছে যে, বাংলাদেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা একেবারে ভেঙে পড়েছে। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, এ ব্যাপারে বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকেও কম ‘রসদ' যোগানো হয়নি। বিদ্রোহের দোহাই দিয়ে সরকার একদিকে বিডিআরকে তছনছ করে ফেলেছে, অন্যদিকে ডজনে ডজনে সেনা অফিসারকে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বরখাস্ত করে ও অকালীন অবসরে পাঠিয়ে সেনাবাহিনীর মনোবল ভেঙে ফেলেছে। কিছু সংখ্যক অফিসারকে সন্ত্রাসী ঘটনার সঙ্গে জড়িত করার চেষ্টার ফলেও সেনাবাহিনীতে নিরাপত্তাহীনতা প্রবল হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি রয়েছে জঙ্গি সম্পর্কিত বানোয়াট প্রচারণা। বাংলাদেশকে সন্ত্রাসী ও ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করার পরিকল্পনা থেকে জঙ্গিদের নিয়ে কিছুদিন ধরে রীতিমতো শোরগোল তোলা হচ্ছে। বাংলাদেশে আজকাল শুধু পাকিস্তানের ‘লস্কর'রা নয়, ভারতের ‘মোস্ট ওয়ান্টেড'রাও ধরা পড়ছে! অথচ অনুসন্ধানে জানা যাচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন তথ্য। এসব জঙ্গি ও সন্ত্রাসী ভারতের ‘মোস্ট ওয়ান্টেড' নয়! তাদের কারো নাম নেই ভারতের ‘মোস্ট ওয়ান্টেডদের' তালিকায়। চট্টগ্রামে আটক তিন যুবকের ব্যাপারেও প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে, তারা সত্যিই পাকিস্তানের ‘লস্কর'! অন্যদিকে এসব কথিত জঙ্গিকে নিয়েই হইচই করা হয়েছে। এমনভাবেই প্রচারণা চালানো হয়েছে যেন বাংলাদেশ ভারতীয় ও পাকিস্তানী জঙ্গি ও সন্ত্রাসীতে ছেয়ে গেছে! এ ধরনের প্রচারণা চালানোর প্রধান উদ্দেশ্য বিশ্বকে একথাই জানানো যে, বাংলাদেশের পুলিশ, র্যা ব, বিডিআর, সেনাবাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের সঙ্গে পেরে উঠছে না। বাংলাদেশে তাই অন্য দেশের কমান্ডো ও সেনাবাহিনী ঢুকিয়ে দেয়া দরকার! ভারত এ অবস্থারই সুযোগ নিতে চাচ্ছে। বিশ্লেষণে দেখা যাবে, এসএসবির কমান্ডোদের পাঠানোর মতো পরিস্থিতি আসলে সুচিন্তিতভাবেই তৈরি করা হয়েছে। কারণ, প্রমাণিত সত্য হলো, সন্ত্রাসী কর্মকান্ড বলতে যা বোঝায় ভারতের তুলনায় তার কিছুই নেই বাংলাদেশে। অন্যদিকে ভারতের সন্ত্রাস পরিস্থিতি এক কথায় ভীতিকর। দেশটির ৬০৮টি জেলার মধ্যে ২৩১টি জেলায় অর্থাৎ দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ এলাকাতেই জঙ্গিরা হত্যা-সন্ত্রাস চালাচ্ছে। ভারতে বড় ধরনের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সংখ্যা ২৭০টি। হত্যা-সন্ত্রাসের কারণে ভারতের প্রধান আটটি রাজ্য মধ্য প্রদেশ, মহারাষ্ট্র, বিহার, উড়িষ্যা, ঝাড়খন্ড, ছত্তিশগড়, অন্ধ্র প্রদেশ ও পশ্চিমবঙ্গকে ‘লাল অঞ্চল' হিসেবে চিহ্নিত করতে হয়েছে। সন্ত্রাসী হামলায় ভারতে মৃত্যুর সংখ্যাও চমকে দেয়ার মতো। ১৯৯৪ থেকে ২০০৮ সালের নবেম্বর পর্যন্ত সেনা ও পুলিশসহ ৫৪ হাজার ৯৬৯ জন সন্ত্রাসী হামলায় মারা গেছে। এত বেশি হত্যাকান্ডের কথা বিশ্বের কোনো দেশে কল্পনাও করা যায় না। অর্থাৎ সন্ত্রাসে ভারত নিজেই যে কোনো দেশের তুলনায় অনেক বেশি এগিয়ে রয়েছে। সে ভারতই বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীগুলোকে অযোগ্য ও অনির্ভরযোগ্য প্রমাণ করতে উঠে-পড়ে লেগেছে।দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, আওয়ামী লীগ সরকারও ভারতের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করে দিচ্ছে। এখানে অরবিন্দ রাজখোয়া, শশধর চৌধুরী ও চিত্রাবন হাজারিকাসহ উলফা নেতাদের গ্রেফতারের ঘটনা উল্লেখ করা যায়। তারা সীমান্তে গিয়ে বিএসএফের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন বলে প্রচারণা চালানো হলেও তাদের মুখ থেকেই জানা গেছে, প্রত্যেককে আসলে ঢাকায় গ্রেফতার করা হয়েছে এবং ধরে নিয়ে গেছে ‘সাদা পোশাকধারী'রা। এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ আওয়ামী লীগ সরকার কিছুই না জানার কথা প্রকাশ করায় প্রমাণিত হয়েছে, সরকারের সহযোগিতায় ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র'-এর লোকজন এসে উলফা নেতাদের গ্রেফতার করে নিয়ে গেছে। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি নিঃসন্দেহে গুরুতর। কারণ, মালদ্বীপ, ভুটান ও নেপালে বহুবার ‘র' এ ধরনের অভিযান চালিয়েছে। বাংলাদেশেও ‘র'-এর ব্যাপক তৎপরতা রয়েছে। পিলখানায় সেনা অফিসারদের হত্যাকান্ডেও ‘র'-এর সংশ্লিষ্টতা গোপন থাকেনি। এতদিন ‘র' গোপনে তৎপরতা চালিয়ে এসেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সমর্থন-সহযোগিতা পাওয়ায় ‘র' এখন আর কোনো রাখঢাক রাখার প্রয়োজন বোধ করছে না। এর পাশাপাশি এসএসবির কমান্ডোরা যদি ঢাকায় এসে যায় এবং ভারতের দূতাবাস ও ভারতীয় ভিআইপিদের নিরাপত্তা বিধানের নামে যদি দেশজুড়ে তৎপরতা চালাতে শুরু করে তাহলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব মোটেও অক্ষুণ্ণ থাকবে কি না, তা ভেবে দেখা দরকার। আজ দূতাবাসের নিরাপত্তার নামে বাহিনী আনা হচ্ছে, পরে এই যুক্তিতেই তাদের স্থাপনা ও স্বার্থরক্ষার জন্য বাহিনী তারা আনবে। এক পর্যায়ে ভারতের রক্ষক বাহিনী বাংলাদেশ-স্বার্থের ভক্ষক সাজতে দেরী হবে না। পাকিস্তানে নাকি মার্কিনীদের নানা বাহিনী এমন রক্ষকের ভূমিকাই পালন করছে। আমাদের সার্বভৌমত্ব লংঘনের সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়ার সম্পূর্ণ দায়দায়িত্ব আওয়ামী লীগ সরকারকেই বহন করতে হবে।
-একটি পত্রিকা থেকে

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


