নৌকা মার্কা আওয়ামী লীগ এখন দেশের মানুষকে হাতুড়ি পেটানোর থেতলানো শরীরে চিরস্থায়ী যন্ত্রণা উপহার দিতে শুরু করেছে। তাদের ‘স্বপ্নে'র বাংলাদেশেও দিনবদলের খোয়াব বাস্তবায়নের নামে ক্ষমতার আস্ফালন নব্য বাকশালের আতঙ্ক তৈরি করেছে। নৌকার লগি-বৈঠার তান্ডব সৃষ্টি এবং নারকীয় কায়দায় প্রকাশ্য রাজপথে মানুষ হত্যার বর্বরতার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট দিনবদলের যে আতঙ্ক তৈরি করেছিল, তারই ধারাবাহিকতায় এখন হাতুড়িধারী আওয়ামী ক্যাডারদের দ্বারা শিক্ষক থেকে সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, রাজনীতিক পেটানোর মহোৎসব শুরু করেছে সারাদেশে। ১৯৯৬-২০০১ পর্বে ক্ষমতায় থাকতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রামে গিয়ে তাঁর দলের ছাত্র-যুব কর্মীদেরকে একটি লাশের বদলে ‘দশটি লাশ ফেলে দেবার' নির্দেশ দিয়েছিলেন। চট্টগ্রামের স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের কাপুরুষতাকে ব্যঙ্গ করে সেদিন শেখ হাসিনা তাদেরকে ‘হাতে চুড়ি পরে ঘরে বসে থাকার' খোঁটা দিয়েছিলেন। ফেনীর সন্ত্রাসের গডফাদার জয়নাল হাজারীর অত্যাচার থেকে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা শেখ হাসিনার কাছে গিয়ে নিষ্কৃতির আকুতি জানালে তিনি তাদের ধমক দিয়ে বলেছিলেন, প্রতি জেলায় তার একজন করে জয়নাল হাজারী না থাকায় বরং আফসোস হচ্ছে। অবশ্য নানা কারণে জয়নাল হাজারীর এখন দুর্দিন চলছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ভেতরে এখন অসংখ্য জয়নাল হাজারী কিলবিল করছে। এসব হাতুড়িধারী ক্ষুদে হাজারীদের উদ্দীপনা সঞ্চারে প্রধানমন্ত্রী নিজেই মাঝে মাঝে বিরোধীদলের বিরুদ্ধে ডিজিটাল থেরাপির টনিক দিচ্ছেন। শহীদ জিয়া'র নাম বিমান বন্দর থেকে বাদ দেবার পর এখন জিয়ার মাজার উপড়ে ফেলার ষড়যন্ত্র চলছে। কয়েকদিন আগে প্রধানমন্ত্রী হুমকি দিয়ে বলেছেন, বিরোধীদলের অফিস কাঁটাতারে ঘিরে রাখার নির্দেশ দেবেন তিনি পুলিশকে। বিডিআর বিদ্রোহ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে বিশেষ কারাগারে স্লো পয়জনিং করে হত্যার চক্রান্তের ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিরোধীদলকে টেনে আনার ইঙ্গিত প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে প্রতিফলিত। পিলখানার বিডিআর বিদ্রোহ ও সেনা হত্যার তদন্তে সিআইডি এর আগে জামায়াত নেতা, বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার রাজ্জাককে পর্যন্ত জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। এসব করেছে তারা মূল ঘটনা ও কালপ্রিটদের আড়াল করার জন্য। ইন্ডিয়ান মিডিয়া পিলখানার ঘটনায় জামায়াতকে জড়িয়ে নানা গসিপ স্টোরি প্রকাশ করে প্রোভোক করতে চেয়েছে। ২৬শে ফেব্রুয়ারি/০৯ জাতীয় প্রেসক্লাবের টিভিরুমে বসে যখন পিলখানার সর্বশেষ খবর শুনছিলাম, তখন আমার পাশে বসা এক সহযোগী সিনিয়র সাংবাদিক, যিনি একাধিক ইন্ডিয়ান মিডিয়ার প্রতিনিধি হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করছেন, তার কাছে একটি টেলিফোন কল আসে। কল পেয়ে রুমের বাইরে বারান্দায় গিয়ে তিনি কিছুক্ষণ কথা বলে উত্তেজিত হয়ে টেলিফোন কলার ইন্ডিয়ান সাংবাদিকের প্রতি ক্ষুব্ধ মন্তব্য করতে করতে আমার কাছে আবার এসে বসলেন। ইন্ডিয়ান ঐ সাংবাদিক তার কাছে পিলখানার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর ইনভল্বমেন্ট সম্পর্কে কোনো এক্সক্লুসিভ তথ্য আছে কিনা, জানতে চাওয়ায় বন্ধুবর ক্ষুব্ধ হয়েছেন। ইন্ডিয়ান সাংবাদিকদের জামায়াত ফোবিয়ায় ও গসিপ জার্নালিজম নিয়ে তিনি কিছু বাজে মন্তব্য করেন। জামায়াতের ব্যাপারে নির্দয় সমালোচক বন্ধুবর সাংবাদিকও ভারতের সাংবাদিকদের জামায়াত ফোবিয়ায় বিরক্ত হয়ে তাদের উদ্দেশ্যে বেশ কিছু রূঢ় মন্তব্য ছুঁড়ে মারেন।
এরপর বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খান সহ আওয়ামী লীগের আরও কিছু কুশীলব পিলখানা ঘটনায় ইসলামী জঙ্গিদের সম্পৃক্ততার আজগুবী তথ্য হাজির করে বেশ সমালোচিত হন। তদন্ত টিমের প্রধান আওয়ামী ঘরানার রোবট আবদুল কাহ্হার আখন্দ পর্যন্ত ফারুক খানের ইসলামী জঙ্গি তত্ত্ব প্রমাণ করতে পারেননি। ফলে ফারুক খান তার ঐ বক্তব্য এক প্রকার প্রত্যাহার করে নেন এবং বলেন যে, ঐ মন্তব্য তার ব্যক্তিগত, তদন্ত টিমের নয়। এদিকে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা গত বৃহস্পতিবার সংসদে প্রদত্ত বক্তব্যে তাঁর অফুরন্ত বিষের থলে উদগীরণ করে যেসব কথা বলেছেন, তাতেও ডিজিটাল গণতন্ত্রের হাতুড়ি থেরাপির হুমকি প্রতিফলিত হয়েছে। বিরোধীদলের চীফ হুইপ জয়নাল আবদীন ফারুক প্রধানমন্ত্রী তনয়, সদ্য আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেওয়া সজিব ওয়াজেদ জয়-এর বিরুদ্ধে দ্বিতীয় দফা দুর্নীতির অভিযোগ তোলায় সংসদে উপস্থিত আওয়ামী লীগ এমপিদের মাথায় রক্ত উঠে গেছে। এর পটভূমিতেই প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনা করতে গিয়ে একরকম বেসামাল ও অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্য রেখেছেন। বোঝাই যায়, আওয়ামী লীগ এমপি, নেতা-নেত্রী, কর্মী, সমর্থক এবং খোদ প্রধানমন্ত্রী তাঁর ‘উচ্চশিক্ষিত-রুচিবান' ছেলের বিরুদ্ধে কোনরকম কুৎসা বা সমালোচনা একেবারেই সহ্য করতে রাজী নন। এর আগে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সেক্টরের এক ডীলে দুর্নীতির সাথে প্রধানমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর পুত্র জয় এবং প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক ইমামের দুর্নীতির কথিত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে একটি দৈনিকে প্রকাশিত রিপোর্টকে কেন্দ্র করে শাসক মহলের উগ্রতা ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ড মিডিয়ার স্বাধীনতা ও মানবাধিকারকে বিপন্ন করে তুলেছে। প্রকাশিত রিপোর্টের প্রতিবাদ ছাপার পরও পত্রিকার সম্পাদক, প্রকাশক, প্রতিবেদকের ওপর সন্ত্রাসী হামলা চালানো এবং দুই ডজনেরও বেশি মামলা দায়েরের মধ্য দিয়ে প্রমাণ হয়েছে যে, শাসক মহলের দুর্নীতির মৌচাকে খোঁচা দিলে তার পরিণতি কত ভয়ঙ্কর ও তিক্ত হতে পারে। সরকারের প্রশাসনিক ও পুলিশী ব্যারিয়ার অতিক্রম করে উচ্চ আদালতের নির্দেশ নিয়ে ‘আমার দেশ' সম্পাদক মাহমুদুর রহমান লন্ডন গিয়ে সেখানেও আওয়ামী দুর্বৃ&ত্তদের হামলার শিকার হয়েছেন। সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় শেষে ফেরার পথে আওয়ামী লীগের চাকুধারী [হাতুড়ি হাতের কাছে ছিল না] মাস্তানরা তার ওপর হামলা করে বিদেশে তাদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছেন। এরাই হবেন ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকার!
এদিকে ঢাকায় জাতীয় সংসদে জয়-এর ভিওআইপি সম্পর্কিত দুর্নীতির তথ্য উপস্থাপন করা মাত্রই ডেপুটি স্পীকার বিরোধী দলের চীফ হুইপের মাইক বন্ধ করে দিয়ে দলীয় অন্ধত্বের কাছে স্পীকারের সাংবিধানিক সত্তা ভূলুণ্ঠিত করেছেন। জয় এই কথিত দুর্নীতির সাথে জড়িত না থাকলে বরং স্পীকারকে বিরোধীদলের চীফ হুইপের বক্তব্যদানে সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের সহযোগিতা করা উচিত ছিল। কথা বলতে না দেয়া কিংবা দুর্নীতি সম্পর্কিত অভিযোগ খন্ডন করে ট্রান্সপারেন্সী প্রমাণ না করে দুর্নীতির খবর প্রকাশের দায়ে সম্পাদক-সাংবাদিকদের শূলে চড়ানোর আওয়ামী সরকারের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস জনগণের কাছে এই বার্তা দিচ্ছে যে, ‘ডাল মে কুছ কালা হ্যায়।'
‘জয়'-একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বই শুধু নন, তিনি প্রধানমন্ত্রীর পুত্র হিসেবেও জনগণের কাছে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার জন্য দায়বদ্ধ। সে কারণে তথ্য-প্রমাণ দিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ থেকে অব্যাহতি নিয়ে ‘মিঃ ক্লিনম্যান' হিসেবে জনসমক্ষে আসাই জয়-এর জন্য গণতান্ত্রিক শিষ্টাচার হওয়া উচিত। জয়কে কেন্দ্র করে কেউ যদি সত্যি সত্যি কোন ‘কুরুচিপূর্ণ' অভিযোগ আনয়ন করে, তবে তার পূর্ণ শুনানি, তদন্ত ও অন্যান্য নৈতিক ও আইনগত প্রক্রিয়াকে তাঁর নিজের স্বার্থেই নিন্ন হতে দিতে হবে। কিন্তু দুর্নীতির কথা উচ্চারণের সাথে সাথেই যেখানে সরকারি দল সংসদে এবং মিডিয়ায় কণ্ঠরোধের ফ্যাসীবাদী চরিত্র প্রদর্শন করতে শুরু করেছে, তাতে করে জয়কে নিয়ে জনমনে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হবে। এবং তিনি অচিরেই আওয়ামী রাজনীতিতে নতুন দুষ্টগ্রহ হিসেবে আবির্ভূত হবেন, এটা বেশ স্পষ্ট।
বিরোধী দলীয় হুইপ সংসদে কথা বলতে না পেরে মিডিয়ার মাধ্যমে জয় সম্পর্কিত কথাগুলো বলেছেন। সেখানে তিনি ভিওআইপি-খাতে জয়-এর দুর্নীতির মুখবন্ধ খোলাসা করে বলেছেন যে, এ সম্পর্কিত তথ্য-প্রমাণ তাঁদের কাছে আছে। এমনকি তিনি এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক তদন্তও দাবি করেছেন। কিন্তু বিরোধীদলীয় চীফ হুইপকে জয়-এর ব্যাপারে কথা বলার কারণে টেলিফোনে দু'দফা হুমকি দেয়া হয়েছে। এই হুমকির উৎস কোথায়, সেটা পরিষ্কার হয়েছে সৈয়দ আশরাফের ‘সমুচিত জবাব' দেবার হুমকিতে। এর আগে নিউএজ-সম্পাদক নুরুল কবীরকে ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের ক্ষতি করাসহ তাঁর কাছ থেকে চাঁদা আদায়সহ জীবননাশের হুমকি দেওয়া হয়েছিল। কয়েকজন সম্পাদক এ ব্যাপারে যৌথ বিবৃতি দেবার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘুম ভাংলেও তিনি এখনও হুমকিদাতাদের সনাক্ত করতে আইনের কাছে সোপর্দ করতে পারেননি। ব্যারিস্টার তাপসকে টেলিফোনে হুমকিদাতা ও ঐ টেলিফোন কোম্পানীর নিরীহ কর্মচারীকে পর্যন্ত কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়েছে। একটি বিশ্বস্ত সূত্রমতে, নিউএজ সম্পাদককে পুলিশ আন-অফিসিয়ালি নাকি জানিয়েছে যে, তাঁর নিরাপত্তার ব্যাপারে পুলিশ কিছুই করতে পারবে না। তারা কেবল নুরুল কবীরের জন্য দোয়া করতে পারেন। মৃতজনের জন্যই দোয়া উপযুক্ত। জীবিত ব্যক্তির পুলিশের কাছে দরকার প্রোটেকশন।
এতকিছুর পরও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবি, দেশে আইন-শৃক্মখলার অবনতি ঘটেনি। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তাঁর সরকারের আমলে দ্রব্যমূল্য বিগত সরকারের চেয়ে কম। প্রধানমন্ত্রী এ প্রসঙ্গে লক্ষ্যহীন আক্রমণ করে বিরোধীদলকে জনগণের চোখে হেয় করতে চেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, চারদলীয় জোট ক্ষমতায় থাকলে চালের কেজি হতো ৮০ টাকা। এখানেই থেমে থাকেননি তিনি। বলেছেন, বিএনপি-জামায়াত জোট তাদের লুটপাটের টাকা ছড়িয়ে জিনিসপত্রের দাম বাড়াচ্ছে।... তাদের উদ্দেশ্য হলো, আমাদের শান্তিপূর্ণভাবে দেশ চালাতে না দেওয়া।' বিরোধীদলের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর এ অপবাদের বিচার করবেন দেশের মানুষ। বিরোধী দলে থাকতে শেখ হাসিনা বরং বলেছিলেন : ‘একদিনের জন্যও সরকারকে শান্তিতে থাকতে দেবেন না। ঝাঁকি দিয়ে সরকার ফেলে দেবেন'- ইত্যাদি। প্রধানমন্ত্রী নিজেও বুঝতে পারছেন না যে, এসব কথা নিয়ে ছেলে-ছোকড়াও পথেঘাটে টিপ্পনি কাটছে।
অর্থমন্ত্রী প্রকাশ্যেই বলেছেন, সিন্ডিকেট চক্রের কারণে বাজারদর বাড়ছে। সিন্ডিকেটের ওপর সরকারের কোন নিয়ন্ত্রণ না থাকার সরল স্বীকারোক্তিও দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। তবে প্রধানমন্ত্রী এখনও বলেননি যে, সিন্ডিকেটও নিয়ন্ত্রণ করছে বিরোধী দল। এখানেই প্রশ্ন আসে, সরকার এবং সরকারের প্রশাসনিক মেকানিজম নিয়ন্ত্রণকারীরা কী আংগুল চুষছে? দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতাটাই জনগণ বিচার করবে। সরকার মূল্যবৃদ্ধির জন্য একবার সিন্ডিকেট চক্রকে স্কেপগোট বানাবে, আর একবার বিরোধীদলের ওপর ষড়যন্ত্রের দায় চাপাবে, আর দারিদ্র্যপীড়িত, সীমিত আয়ের মানুষগুলো সরকারের সব অনাচার, ব্যর্থতা মুখ বুজে সহ্য করে হাততালি দিয়ে বাহবা দিয়ে যাবে? সরকার কী এটাই আশা করছেন?
বাংলাদেশের ক্ষুধা-পীড়িত, কায়-ক্লেশে বেঁচে থাকা মানুষ নিয়ে ক্ষমতার রাজনীতির হাড়িকিঁড়ি অনেক হয়েছে। ব্রুট মেজরিটির লালঘোড়া দাবড়ানির রক্তস্রোতে শাসক-জনগণ, দু'পক্ষই অতীতে ভেসেছে। আর কত? ক্ষমতার ঔদ্ধত্য, ক্ষমতা প্রলম্বিত করার অপকৌশল এবং বিরোধী দল ও মত নির্মূলই যখন একটা সরকারের টিকে থাকার একমাত্র অবলম্বন হয়ে দাঁড়ায়, তখন প্রকৃতিও ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে। এটাই ইতিহাসের শাশ্বত সত্য। ইতিহাস সময়ের বাহনে চড়ে আপন গতিপথ নির্মাণ করে। বহমান সময় এবং সময়ের নিয়ন্ত্রণ মহান রাববুল আলামীনের ইচ্ছার প্রতিধ্বনি। আল্লাহ নিজেই বলেছেন, সময়কে তোমরা নিন্দা বা গালমন্দ করোনা। অন্যদিকে-সময়ের টুটি চেপে ধরে কোন বলদর্পী হিংস্র শাসকই তার নিজের ইচ্ছায় সময়ের গতিপথ আগলে রেখে প্রলয় বন্ধ করতে পারে না। অন্ধ হলেই প্রলয় বন্ধ হয় না। কোন সরকারই শেষ সরকার নয়। কিংবা কোন সরকারই অনন্তকাল নিষ্ঠুরতা ও মুর্খতার ফুলশয্যা রচনা করে সুরক্ষা পায় না। এটাই ইতিহাসের শিক্ষা।
১৯৯১-'৯৬ এবং ২০০১-০৬ পর্যন্ত দু'পর্বের বিরোধীদলীয় নেত্রী হিসেবে শেখ হাসিনার রেকর্ড খুলে দেখলে সে তুলনায় বর্তমান বিরোধী দলকে রাজনীতিকে সুবোধ ও শান্তিপ্রিয় বালকসুলভ বললেও কম বলা হবে। বিরোধী দল গণতন্ত্রকে বড্ড বেশী ভালোবাসে। কিন্তু নির্বাচিত সরকার হলেই যে সেটা গণতান্ত্রিক হয় না, আওয়ামী লীগ বার বার তার প্রমাণ দিয়েছে। আওয়ামী লীগের কাছে যারা গণতন্ত্রের মেওয়া চায়, তারা মাকাল ফলও পায় না। কেননা গণতান্ত্রিক শাসন দেবার সামর্থ্য তাদের নেই। এখনকার আওয়ামী লীগ বারোভূতের ঠিকানা। জনবিচ্ছিন্ন পোড়খাওয়া লালমিয়া আর গলাকাটা রাজনীতির দানবরা সরকারের ঘাড়ে চড়ে প্রতিহিংসার আগুনে প্রতিনিয়ত ঘি-ঢালছে। বাংলাদেশকে ঘিরে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক লবীর যতো খেলা ও স্বার্থ-চিন্তা এতকাল পল্লবিত হয়েছে, তার সবগুলো বাস্তবায়নের অফিসিয়াল এজেন্ট হয়েছে আওয়ামী লীগ। প্রধানমন্ত্রীর পুত্রের ইন্টারন্যাশনাল কানেকশন এবং মার্কিনী পুত্রবধূর (মতান্তরে ইহুদী কন্যা) সুবাদে তাঁর রাজনীতির পাখা এখন দিগন্ত বিস্তারী। বাংলাদেশ নামের এই দেশের যারা ‘জনক' তাদেরকে দেশরক্ষার দীক্ষা দেয়াকে তারা ধৃষ্টতা বলে মনে করেন। বাংলাদেশের ওপর ভারতীয় আধিপত্য প্রতিরোধ এবং বাংলাদেশকে ভারতের আশ্রিত রাষ্ট্র বানানোর পরিণতি-জিল্লতি থেকে মুক্তির জন্য যারা রাজনীতি করছেন, তাদের খেতাব হচ্ছে ‘স্বাধীনতা বিরোধী!' আর যারা কংগ্রেসের অখন্ড ভারত তত্ত্বে বাংলাদেশের সার্বভৌম জাতি-রাষ্ট্রের ধারণাকে সেক্যুলারিজম এবং অভিন্ন নিরাপত্তা প্যাকেজের নামে নেহেরু ডকট্রিনে একাকার করতে চায়, তারাই হচ্ছে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক-বাহক! জনগণের স্বাধীনতার স্বপ্নের এই বিকৃতকরণকে তাহলে জনগণ মেনে নিয়ে আবার শৃক্মখলিত হবার ষড়যন্ত্র মেনে নেবেন? হায় স্বাধীনতা, হায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা! সুতরাং স্বাধীনতার চেতনা এখন রাজনীতির ঘোরের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। জাতীয়তাবাদী ইসলামী শক্তির অতি ভদ্র, বিনয়ী নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির ডিফেনসিভ লাইন সরকারকে অফেনসিভ হতে সুযোগ দিয়েছে। এবারে ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা ক্ষমতার অভিষেক মুহূর্তেই বিড়াল মারার সুযোগটি নিয়েছেন। মুজিব হত্যার বিচার কার্যকর করে তারা তাদের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও ক্ষিপ্রতা প্রমাণ করেছেন। ১৯৭৫-এর আগস্ট পটপরিবর্তনকে আওয়ামী লীগ স্রেফ হত্যাকান্ড হিসেবেই প্রমাণ করেছে। ইনডেমনিটি আইন তুলে নেবার সময় আদালতে যারা এমিকাস কিউরি ছিলেন, তাদের মধ্যে বিএনপি ঘরানার সিনিয়র আইনজীবীরাও আওয়ামী ঘরানার আইনজীবীদের সাথে কণ্ঠ মিলিয়েছেন। আগস্ট পটপরিবর্তন-উত্তর বহুমাত্রিক গণতান্ত্রিক রাজনীতির বেনিফিট নিয়েছেন যারা, তারাও রক্তের দায় নিতে চাননি। চারদলীয় জোট সরকারের আমলের পাঁচ বছর মুজিব হত্যা মামলা ফাইলবন্দী হয়েছিল। এমনকি সিরাজ সিকদার হত্যা মামলা এবং এরশাদের বিরুদ্ধে জেনারেল মঞ্জুর হত্যার মামলা নিয়েও বিএনপি সরকার কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। কনফিউশন নিয়ে রাজনীতি হয় না। বিএনপি'র অন্যতম শীর্ষ নীতি নির্ধারক মওদুদ আহমদ মুজিব হত্যার দন্ডিতদের ফাঁসির রায় কার্যকর হবার পর বলেছেন, ‘জাতি স্বস্তি পেয়েছে।' কিন্তু যে একদলীয় স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে জাতিকে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত রক্তের দায় শোধ করতে হয়েছে, সেই বাকশালের অপছায়া জাতির গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎকে আবারও গ্রাস করতে যাচ্ছে। তাহলে স্বস্তি কোথায়? বেদনাদায়ক অতীতের চেয়ে শঙ্কিত ভবিষ্যতের দায় অনেক বেশি ক্ষতিকর। সম্ভবত আমাদের দেশপ্রেমিক রাজনীতিকরা ইতিহাসের এ সত্য অনুধাবন করতে পারছেন না। তারা মনে করছেন, নব্য বাকশালীদের চন্ডনীতি, দুঃশাসন, শোষণ-লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অনাস্থা ও বিদ্রোহের তরঙ্গে তারা রাজনীতির পাল তুলে ক্ষমতার তীরে নোঙ্গর বাঁধবেন। তবে সম্ভবত এখনকার রাজনীতি সাবেকী ধারায় সরল রৈখিক পথে নাও চলতে পারে। নীরব সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের অনেক ক্ষোভ, অভিমান জমে আছে। জনগণ কার জন্য, কেন ঝুঁকি নেবেন? দেশপ্রেমিক জনগণ ও সামাজিক শক্তির পক্ষে এতকাল যারা রাষ্ট্র রক্ষার দায়বোধ নিয়ে লড়েছেন, তাদেরকে বিধ্বস্ত চেতনায় বিপথগামিতায় দুর্বল করে রাখা হয়েছে।
১/১১-এর যে রাজনৈতিক প্যাকেজে আওয়ামী লীগের কালো কোটের খোলসে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক অপশক্তি জাতির ঘাড়ে সিন্দবাদের বুড়ো দৈত্যের মতো সওয়ার হয়েছে, তারা আওয়ামী লীগের প্রাণভোমরাও তাদের হাতে রেখে দিয়েছে। আওয়ামী লীগ একটি ফেয়ার নির্বাচন দিয়ে প্রতিপক্ষকে ক্ষমতায় যাবার সুযোগ দিয়ে গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য রক্ষা করবে, এমন আশা করা ভুল হবে। আওয়ামী লীগ ২০২১ সাল পর্যন্ত তাদের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার সময় নির্ধারণ করেছে। প্রধানমন্ত্রী সংসদে বলেছেন, সরকার ক্ষমতায় এসে দু' বছর পার করে পরিকল্পনা নিতে। বাকি ২/৩ বছরে দেশের উন্নয়ন করা যায় না। এজন্য তারা এক মেয়াদ ক্ষমতায় থেকে এবার তুষ্ট হতে চান না, সেটা আগেই জানান দিয়ে রেখেছেন। বিরোধীদলকে তারা তাদের আশ্রিত ও নতজানু করে রাখতে চায়। জাতীয় ইস্যু ও জন-ইস্যুতে বিরোধীদলকে রাজনীতির আটপৌঢ়ে বৃত্ত থেকে বেরিয়ে দেশ কাঁপানো ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলতে না পারলে লালঘোড়ার দাবড়ানি চলতেই থাকবে। জনগণের সমর্থন ও বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার করে জাতি-রাষ্ট্র রক্ষার মহাসংগ্রামের আহবানে সম্পৃক্ত করা সম্ভব না হলে এবারের বাকশালী নৈরাজ্য ও হিংস্রতা হবে আরও ভয়ঙ্কর। নীরবে সহ্য করার যে অবক্ষয় জনগণকে প্রায় বাকরুদ্ধ করে রেখেছে, তার দায় কিন্তু বিরোধীদলেরও আছে। রাজনীতির ওয়াচ ডগ হিসেবে মুক্তকণ্ঠ সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবীদের স্বাধীনতা না দিলে অবস্থা আরও গুমোট হবে।
-একটি পত্রিকা থেকে সংগৃহীত

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




