নীচের লিখাটি গত ১২ জুলাই বাংলাদেশ অবজারবারে সম্পাদকীয় হিসেবে ছাপা হয়েছিল Bangladesh Needs Liberation from “Political Totemism” শিরোণামে। লেখকের অনুমতিক্রমে আমি এটির বাংলা অনুবাদ করে আমার ব্লগে হোস্ট করছি। চিন্তা করার প্রচুর উপাদান রয়েছে এতে সচেতন নাগরিকদের জন্য। লেখাটি একটু দীর্ঘ।
=============
বাংলাদেশের প্রয়োজন “রাজনৈতিক ব্যক্তিপূজার কুসংস্কার” থেকে মুক্তি / মুঃ সাইদুল ইসলাম
=============
বছর দুয়েক আগে বিবিসির এক জনমত জরিপে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সর্বকালের সেরা বাঙ্গালী নির্বাচিত করা হয়। যদিও পদ্ধতিগত সমস্যার কারনে এই জরিপের ফলাফল বেশ সন্দেহযুক্ত, তবুও আমাদের জাতীয় স্বাধীনতা আনয়নে বঙ্গবন্ধুর বীরত্বপূর্ণ ভুমিকাকে আমরা অস্বীকার করতে পারিনা। হতে পারে, ইতিহাসে এমন জাতীয় বীরের দেখা আর পাবেনা বাংলাদেশ। আর একারনেই কাউকে শেখ মুজিবের সমকক্ষ বানানো দুঃসাধ্য।
অন্যদিকে রাস্ট্রনায়ক (state-man) হিসেবে তাঁর রয়েছে ব্যর্থতার বিশাল খতিয়ান। কেউই, এমনকি আওয়ামী লীগের অন্ধ-সমর্থকরাও, তা অস্বীকার করার মতো কাজ করতে পারেনা। তিনি যুদ্ধ-বিদ্ধস্ত দেশ পূনর্গঠনে ও তাঁর নিজের লোকদের দূর্নীতি দমনে পুরোপুরি ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। একনায়ক-তান্ত্রিক ব্যবস্থা চালুর প্রচেষ্টা, রক্ষীবাহিনীর মাধ্যমে নির্যাতনকারী ব্যবস্থা চালু এবং তাঁর শাসনামলে সংগঠিত ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ রাস্ট্রনায়ক হিসেবে তাঁর ভুমিকাকে পুরোপুরি মলিন করে দিয়েছে। পরিণামে তাঁকে বরণ করতে হয়েছে সেনাবাহিনীর কিছু সদস্যের হাতে মর্মান্তিক মৃত্যু।
সত্যিকার নিরপেক্ষ ও যৌক্তিক বিশ্লেষণ করলে আমাদেরকে একটা উপসংহারে আসতে হবে; আর তা হলো তিনি নিঃসন্দেহে একজন জাতীয় বীর, যাঁর সফলতা এবং ব্যর্থতা দু’টোই রয়েছে। তিনি একদিকে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অবিসংবাদিত নেতা যে কারনে আমরা তাঁকে নিয়ে গর্ব করতে পারি; ঠিক একই সাথে তিনি একজন ব্যর্থ রাস্ট্রনায়ক, যা আমাদের লজ্জায় মাথা হেঁট করতে বাধ্য করে। একদিকে তাঁর যেমন রয়েছে অসাধারণ কারিশমা ও বুলডোজারের চেয়েও অধিক ক্ষমতাধর বাকশক্তি, অন্যদিকে তেমনি রয়েছে তাঁর নিন্দনীয় ব্যর্থতার বিশাল খতিয়ান।
আমরা এগুলোর কোন কিছুই অস্বীকার করতে পারবোনা। সত্যিকার দেশপ্রেমিক হিসেবে আমাদেরকে এমন মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে যার মাধ্যমে আমারা আমাদের জাতীয় বীরদের কৃত ভাল কাজের স্বীকৃতি দিতে ও এর যথার্থ মূল্যায়ন করতে পারি, আবার সাথে সাথে এ সমস্ত নেতাদের কৃত ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহন করতে পারি।
আমাদের মাঝে অনেকেই আছেন যাঁরা দেশকে গভীরভাবে ভালবাসেন, কিন্তু দূর্ভাগ্যজনকভাবে সঙ্কীর্ণ দলীয় গোষ্ঠিচিন্তার ফাঁদে আটকা পড়ে থাকেন। নিজের পরা সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক মতাদর্শের শিকল তাঁদের মধ্যে জন্ম দেয় চিন্তার সঙ্কীর্ণতা। এটা এমন এক রোগে পরিণত হয় যা তাঁদেরকে এমন এক বিপজ্জনক চোরাবালিতে নিমজ্জিত করে দেয় যেখান থেকে তাঁরা তাঁদের সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক মতাদর্শের বাইরে ভাল কিছু আর দেখতে পাননা। আর যতই তাঁরা তাঁদের এই মতাদর্শ দিয়ে চালিত হতে থাকেন ততই তাঁরা নৈর্ব্যক্তিক চিন্তা, উদার দৃষ্টিভঙ্গী ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে থাকেন। শেষাব্ধি তাঁরা তাঁদের রাজনৈতিক বিরোধিদের ভাল কাজগুলোর যথার্থ মূল্যায়ন করার ক্ষমতা পুরোপুরি হারিয়ে বসেন। বস্তুতঃপক্ষে, তাঁদের দৃষ্টি হয়ে পড়ে ঘোলাটে যাতে তাঁরা রাজনৈতিক বিরোধিদের সব ভাল কাজগুলোকেও দেখেন মন্দ ও ধ্বংসাত্বক রুপে। অন্যদিকে নিজেদের কাজ জাতির জন্য ক্ষতিকর হলেও তাঁদের দৃষ্টিতে উপস্থাপিত হয় জাতির জন্য কল্যাণকর হিসেবে।
এসব কিছু সমাজে জন্ম দেয় তিন ধরণের বিচ্যুতির – বিভেদ, বন্ধ্যাত্ব ও ধ্বংস, যা এখন বাংলাদেশী রাজনীতির সাধারণ বৈশিষ্ট্য ও দীর্ঘসূত্রী ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে।
একজন সত্যিকার রাজনীতিকের উচিত সব ধরণের রাজনৈতিক সঙ্কীর্ণতার উর্ধ্বে উঠে ঘৃণা, বিভেদ ও দলীয়করণের পরিবর্তে জাতিকে উন্নয়ন ও ঐক্যের দিকে চালিত করা। কিন্তু রাজনৈতিক অন্ধবিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে কেউ কেউ শেখ মুজিবকে মনে করেন অতিমানব (super-man), যিনি সব ধরণের ভুল-ত্রুটির উর্ধ্বে। অন্যদিকে আরেকটি গোষ্ঠি আছেন যারাও একই ভাবে ভাল কাজ মূল্যায়ন করার যোগ্যতা হারিয়ে বসে আছেন, তারা এই মহান নেতার স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরাট ভুমিকাকে স্বীকার করার মত সামান্যতম সৎ সাহস দেখাতে পারেননা।
দুটো গোষ্ঠিই ব্যাধিগ্রস্ত ও গোঁড়ামীতে আক্রান্ত – যেখানে একটি গোষ্ঠি জন্ম দিয়েছে মুজিববাদ নামক এক আদর্শের, আর অন্য গোষ্ঠিটিও তাদের নেতার (যেমন শহীদ জিয়াউর রহমান) আদর্শ প্রতিষ্ঠাই নিয়োজিত রয়েছে। এভাবে আমাদের রাজনীতিতে সৃষ্টি হয়েছে গোষ্ঠি চিন্তার, ঘৃণার, চরমপন্থার ও গোঁড়ামীর।
দূর্ভাগ্যজনকভাবে এ জাতীয় চরিত্রই আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির উপর প্রভাব বিস্তার করে আছে গত তিন দশকেরও বেশী সময় ধরে। অবস্থাটা সেখানেই থেমে থাকেনি। পরলোকগত রাজনৈতিক নেতা তাঁর অনুসারীদের চিন্তা-চেতনা দখল করে বসেছেন। অনুসারীদের অনেকেই এখন তাঁদের নেতাকে পুজনীয় আসনে স্থাপন করেছেন। পরলোকগত নেতা এখন হয়ে পড়েছেন এক পবিত্র সত্ত্বা।
সমাজতত্বের (sociology) প্রতিষ্ঠাতা বিজ্ঞানীদের একজন এমিল দুরখাইম (Emile Durkheim) এরুপ অবস্থার নাম দিয়েছেন “Totem/টোটেম” যা এক ধরণের অতিভক্তিমূলক ধর্ম-বিশ্বাসের নামান্তর [cult]। [“টোটেম” এর বাংলা মানে দাঁড়াবে “এমন প্রাণী বা বস্তু যাকে কোন সম্প্রদায় তাদের সাম্প্রদায়িক প্রতীক হিসেবে গ্রহন করে পুজনীয় করে নিয়েছে”]। কুসংস্কারাচ্ছন্ন বিশ্বাসের এই প্রতীককে [টোটেম] বড় করে তোলার জন্য যেমন দরকার হয় বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের, তেমনি এর ভক্তরা তাদের সমস্ত শক্তি নিয়োগ করে তাদের পূজণীয় প্রতীকের গুনগান গাইতে। তারা তখন এই প্রতীকের স্তুতিমূলক কবিতা, গল্প ও উপন্যাস লিখেন; পূজণীয় প্রতীকের পবিত্র-রুপের প্রকাশ ঘটাতে তৈরী করেন নানান শিল্পকর্ম ও ভাস্কর্য; এবং পরলোকগত পুজ্যব্যক্তির মহত্ব বর্ণনা করতে আয়োজন করেন নানান অনুষ্ঠান ও তৈরী করেন নানান শ্রুতিমধূর শ্লোগান। বস্তুতঃপক্ষে এই অবস্থা রাজনীতির সীমা ছেড়ে তখন প্রবেশ করে সাংস্কৃতিক ও সামাজিক অংগনে এবং পরিশেষে অনুসারীদের দৈনন্দিন জীবনে। তাদের হৃদয়, মন, ধ্যান এবং রক্তকণিকা তখন এক নতুন রঙ ধারণ করে, যে রঙ মূলতঃ তাদের আরাধ্য দেবতার।
এর সবকিছু তখন বিভিন্ন অনুষ্ঠান – যেমন, মুজিব দিবস, শোক দিবস, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস; বিভিন্ন আচার – যেমন বঙ্গবন্ধুর (অথবা শহীদ জিয়ার) কবরে পুস্পার্ঘ অর্পণ, কাঙ্গালী ভোজ; বিশেষ ধরণের পোষাক – যেমন মুজিব-কোট; বিভিন্ন শ্লোগান ও বাগধারা – যেমন জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু, জাতির জনক, ইত্যাদি; এবং বিভিন্ন শিল্পকর্ম ও ভাস্কর্যের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। পূজারীরা তাদের নিজের নামের সাথে আরাধ্য দেবতার নাম জুড়ে দিতে গর্ব করেন – যেমন মুজিব সেনা। প্রয়াত মুজিব, পূজনীয় মূর্তি [the totem], তখন হয়ে পড়েন এমন এক কেন্দ্রবিন্দু যাকে ঘিরে আবর্তিত হয় তাঁর অনুসারীদের সব কর্ম। মৃত ব্যক্তি তখন নতুন জীবন লাভ করেন যা অনুসারীদের অন্তরে চিরস্থায়ী আসন দখল করে বসে। আর এভাবে মৃত মুজিব হয়ে পড়েন জীবিত মুজিবের চেয়ে অধিকতর শক্তিশালী।
এমতাবস্থায় দেশপ্রেমিক হওয়ায় দাবী হয়ে পড়ে নিচক একটা দাবী মাত্র। গোটা সমাজ তখন তাদের দূষিত আত্মার প্রতিফলন দেখতে পায় তাদের কথা ও কাজের বিরাট ফারাকের মাধ্যমে। দেশপ্রেমের ধারণাটাও তখন দুষিত হয়ে পড়ে। তারা জনতাকে ক্ষেপিয়ে তোলার জন্য বক্তৃতা দিয়ে যান; গণমানুষকে সম্মোহিত করার জন্য নানান ওয়াদা করে থাকেন; আর বাস্তবে করেন এর সম্পূর্ণ বিপরীত কাজ। এরা নিজেদের কলুষিত আত্মা ও কর্ম ঢাকতে বারবার নিজেদের দেশপ্রেমিক ও স্বাধীনতা সংগ্রামী হওয়ার ঢাক পেটাতে থাকেন।
কিন্তু এদের ছড়ানো বিষ ততক্ষণে সমাজের সর্বস্তরে প্রবেশ করে। গোটা সমাজ-কাঠামো হয়ে পড়ে দূর্নীতিগ্রস্ত, যা ধীরে ধীরে সমাজে সাধারণ-নৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়ায় এবং অবশেষে সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্দ্য অংশরুপে পরিগণিত হতে থাকে। কেরাণীরা তখন “বখশীশ” ছাড়া অফিসে কাজ করেনা; হাসপাতালে ডাক্তার যথাযথ দায়িত্ব পালন না করে রোগীকে পরামর্শ দেন তাঁর চেম্বারে দেখা করতে; স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকরা যথাযথ শিক্ষা প্রদান করা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রীদের তাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত প্রাইভেট টিঊশনির শরণাপন্ন হতে বাধ্য করেন। এভাবে এ ব্যবস্থা আমলা হয়ে মন্ত্রী পর্যন্ত পৌঁছায়, যারা জাতীয় স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করার কাজে লিপ্ত হন।
সমাজ এই অবস্থায় এক চরমতম বিচ্যুতি ও ধ্বংসের মুখোমুখি হয়ে পড়ে। বিচ্যুতি ও দূর্নীতির রয়েছে বিভিন্ন স্তর ও মাত্রা। ভুলক্রমে একটা অপরাধ করে ফেলা হলো একটা সাধারণ মাত্রার বিচ্যুতি। কিন্তু যখন জেনে-বুঝে স্বেচ্ছায় কোন অপরাধ করা হয় আর সে অপরাধকে সিদ্ধ প্রমাণ করার জন্য নানামূখী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় তখন তা নিঃসন্দেহে এক উঁচু মাত্রার বিচ্যুতি। যখন সমাজে অপরাধ একটা সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় এবং সমাজের অবিচ্ছেদ্দ্য অংশ হয়ে পড়ে, আর যারা অপরাধের বিরোধীতা করেন তাদেরকেই অপরাধী সাব্যস্ত করে হেয় প্রতিপন্ন করা হয় তখন সমাজ নিকৃষ্ট মাত্রার বিচ্যুতির চোরাবালিতে আটকা পড়ে।
এইসব রাজনৈতিক অনমনীয়তা ও পশ্চাদমূখীনতা হলো মূলতঃ “কুসংস্কারাচ্ছন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিপূজার” [political totemism] স্পষ্ট উত্তরাধিকার। একবিংশ শতকে উন্নয়ন ও ঐক্যের পথ ধরে এগিয়ে যাবার জন্য বাংলাদেশের আজ প্রয়োজন এই দীর্ঘসূত্রী রাজনৈতিক রোগ থেকে মুক্তি। রাজনৈতিক সংস্কারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে এ বিষয়টি আসু গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।
[লেখক কানাডার টরন্টোতে ইয়র্ক বিশ্বাবিদ্যালয়ের সমাজতত্ব (sociology) বিষয়ে পি-এইচ, ডি, গবেষক]

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

