জন্ম মানেইতো মৃত্যু। কি অবাক কান্ড! এই দুটো শব্দ পরস্পর হাত ধরে হাটছে অবলিলায়, কোন বাধা ছাড়াই! অথচ মৃত্যুতো আমাদের কারোরই কাম্য নয়, কাম্য হতে পারে না....কারন মৃত্যু মানেই হারানেরা বেদনা, প্রিয় মানুষকে চিরতরে হারিয়ে কিছু জ্বল জ্বলে স্মৃতি নিয়ে শুধুই লম্বা পথ চলা..........
১৯৯৯ সালের ১০ জুলাই। বন্ধুরা সবাই আমাকে নিয়ে ব্যাস্ত। কারন এই দিনটিতে আমি পৃথিবীতে এসে এই ধরনী কে ধন্য করেছি। হুম ধন্য করেছিতো বটেই......তবে সত্যি বলতে কি জন্মদিনটি আমার কাছে কখনোো খুব গুরুত্বপূর্ন মনে হয়নি কখনো। ছেলেবেলা জন্মদিনটা কীভাবে পালন হবে তা মোটামুটি আমার আগে থেকেই জানা ছিল। অন্ততঃ বাংলাদেশে থাকাকালিন একই নিয়মেই জন্মদিন পালনে আভ্যস্থ হয়ে গিয়েছিলাম। আর সে কারনেই জন্মদিন মানেই রাত বারটা এক মিনিট এ রঙিন কাগজের মোড়কে আব্বার ছোট্ট একটা গিফ্ট। কোন রকম ভুমিকা ছাড়াই আমার পিতা এমন ভাবে আমাকে তার উপহারটা দিতেন মেন হত তিনি যেন এর জন্য নিজেই খুব লজ্জিত। সম্ভবত উপহারটা থাকতো খুবই সাদামাটা ধরনের। রবি ঠাকুরেরর সঞ্চিয়তা, জীবননান্দ দাশের বনলতা সেন আথবা খুব বেশি হলে টেনেটুনে একটা ৫ নাম্বার সাইজের ফুটবল। না, আমার এই সামন্য গিফ্ট এর জন্য মন খারাপ হত না কখনই। বরং এর জন্য আমার প্রিয় পিতার উপর শ্রদ্ধায় মাথা নত হত বার বার। আগেই বলে রাখি আমি বড় হয়েছি নিম্ন মধ্যবিত্ত একটা পরিবারের আকাশ ছোয়া স্বপ্ন দেখে দেখে। স্বপ্ন ছিল আনেক কিন্তু তার বাস্তবায়ন ছিল কঠিন...কারন আমার বাবা ছিলেন একজন সৎ শিক্ষক। একটা কলেজের আধ্যাপনা করেই তিনি আমাদের মত কিছু উচ্চাকাঙ্খি ছেলেমেয়েদের মানুষ করার চেষ্টা করে গেছেন.....মার কাছ থেকে গিফ্ট পেতাম একটু আন্য রকম ধরনের। একটা সুন্দর কলম, সার্ট আথবা জুতো। বিষয়টা ছিল এমন যে জন্মদিনের উপহারটা যেন আমার প্রতিদিনের জীবনের অভাবটা মেটাতে পারে। সে কারনেই আমি আমার জন্মদিনটা কেমন হবে তা আগে থেকেই টের পেতাম। প্রতি বছর ১০ জুলাই আমার কাছে নতুন কোন বিষয় ছিল না মোটেো......
তবে জন্মদিনটা একটু আন্যরকম হয়ে গেল যখন পড়াশুনা করতে যুক্তরাষ্ট্র চলে এলাম। বন্ধরাই যেন দায়িত্ব নিল এই দিনটি পালন করার। তাই প্রবাস জীবনে জন্মদিন মানেই ছিল বন্ধুদের সাথে রেস্তোরায় ডিনারে যাোয়া, নতুন কাপড় পরে লং ড্রাইভ........
যা বলছিলাম। ১৯৯৯ সালের ১০ জুলাই। জন্মদিনে এক বন্ধুর বাসায় ধুম আড্ডা দিচ্ছি। হঠাৎ একটা ফোন কল। বন্ধুটি আমাকে রিসিভারটা দিল। হ্যালো বলার সাথেই সাথেই উপাশ থেকে মামার কন্ঠ। মামা নিউইয়র্কেই থাকেন। শুধু বললেন," এক্ষনি আমার বাসায় চলে আয়। জরুরী খবর আছে।" বুকটা যেন ধুক করে উঠল। কি হল?? কোন খারাপ সংবাদ নয়তো! না যতদুর জানি সবাইতো সুস্থ আছে। আমি ভয়ে ভয়ে মামার বাসায় পৌছলাম। মামা একথা-সেকথা বলার পর আসল কথা বললেন। বললেন ...আমার প্রিয় বাবাটা নাকি আর নেই। বাবাটা নাকি হার্ট এটাক করে এই কিছুক্ষন আগেই চলে গেছেন। মনে পরল তার শেষ কথাটা। আমি বাসা থেকে আমেরিকার উদ্দেশ্যে পা বারাবো। এমন সময় বাবাটা আমার হাত ধরে বললেন, " তোর সাথে আমার মনে হয় আর দেখা হবে না।' আমি বলেছিলাম," আরে ধাৎ!! এই যাবার সময় তুমি কি যে সব বল!"' না আব্বার লাশ দেখতে আমি বাংলাদেশে যেতে পারে নি। কারন তখন আমার আই-টুয়েন্টির মেয়াদ ফুরিয়ে গিয়েছিল। প্রচন্ড যন্ত্রনা নিয়ে এই এতগুলো বছর আমি জন্মদিনের মত একটা অভিশাপ কাধে নিয়ে বেরাচ্ছি। এর থেকে মুক্তি কবে পাব কেউ কি বলতে পারেন?
১০ জুলাই আমার বাবার মৃত্যু বার্ষিকী। তার জন্য সবাই দোয়া করবেন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


