“যে দেশের তেরো কোটি মানুষের গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি তো দূরের কথা, পিতৃভূমির স্বাধীনতা ও স্বার্বভৌমত্ব পর্যন্ত বিদেশী পরাশক্তিগুলোর হাতে জিম্মি রেখে দেশ ও জনগণের ‘অকৃত্রিম বন্ধুরা’ সোনায় বাঁধানো দাঁত বের করে বিজয় ও গৌরবের হাসি হাসে এবং তাদের উচ্চকিত হাসিতে দেশের লাখো-কোটি হতভাগ্য জনগণের দীর্ঘশ্বাস চাপা পড়ে থাকে যুগের পর যুগ, সেই দেশের জনগণের একমাত্র কাজ বিপ্লব ছাড়া আর কি-ই বা হতে পারে ?”
(আন্ডারগ্রাউন্ড জীবন সমগ্র : রইসউদ্দিন আরিফ পৃ:৩৭৫ প্রকাশক- পাঠক সমাবেশ, প্রথম সংস্করণ)
সূর্য সন্তান নই । নই দুনিয়া কাঁপানো নয় মাসের সশস্ত্র যোদ্ধা । বাংলার বনে বাদাড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নিষিদ্ধ জীবনের মোহগ্রস্থ টগবগে তরুন নই । আল্লার নামে যে তরুণ আদালতে বোমা হাতে আত্মাহুতি দেয় আমি তাদেরও কেউ নই । নই শঠ , তঞ্চক, কিংবা বর্বর কোন লুটেরা । রাতের আঁধারে যে সব দানবের হাত থেকে বাঁচার জন্য আজো কোন কোন গ্রামে মেয়েরা সারাক্ষণ আল্লার অলৌকিক শক্তির আরাধনা করে আমি সেই দানবদেরও দলভুক্ত নই ।
পৃথিবী কাঁপানোর শক্তি নেই । নেই এই দেশটাকে হাতের মুঠোয় এনে কাদামাটির খেলনার মতই আপন মাধুরী দিয়ে গড়ে দেবার ক্ষমতা । মানব মুক্তির কোন মতবাদই আমাকে আকৃষ্ট করেনা । ইসা, মোহাম্মদ, মার্কস কিংবা হাল আমলের কোন মহান বিপ্লবীর সাহচর্য পায়নি এ জনপদ । পাইনি আমি ।
উদয়াস্ত জীবনের ঘানি টেনে ক্লান্ত অবস শরীরে যে বৃদ্ধ অভিশাপ দেন তার জন্মকে- আমি ভালবাসি তাকে। সম্মান করি তার না পাওয়া চাওয়াকে । স্বাধীন স্বদেশে আমার বারবার মনে পড়ে শামসুর রাহমানের সেই অমর কবিতাখানি:
"তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা,
তোমাকে পাওয়ার জন্যে
আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায় ?
আর কতবার দেখতে হবে খান্ডবদাহন ?"
কিংবা জেলখানায় বসে আল-মাহমুদের সেই নিঃশংক উচ্চারণ-
"হায় স্বাধীনতা, অভুক্তদের রাজত্ব কায়েম করতেই কি আমরা
সর্বস্ব ত্যাগ করেছিলাম ?"
শব্দের কারিগর নই । নই বিক্ষিপ্ত ভাবনাগুলোকে তরঙ্গায়িত নদীর বহতা প্রদানে সক্ষম কোন ভাষা বিপ্লবী । রুদ্র মোহাম্মদ শহীদুল্লাহর কবিতার মাঝে আমি যেন খুঁজে পাই শব্দবিপ্লবের রসদ :
"কথা ছিল রক্ত-প্লাবনের পর মুক্ত হবে শস্যক্ষেত
-----------
কথা ছিল আর্য বা মোঘল নয় এ জমিন অনার্যের হবে
অথচ এখনো আদিবাসী পিতাদের শৃংখলিত জীবনের ধারাবাহিকতা
কৃষকের রন্ধ্রে রক্তে বুনে যায় বন্দিত্বের বীজ।
মাতৃভূমি - খন্ডিত দেহের পরে তার থাবা বসিয়েছে আর্য বনিকের হাত
আর কী অবাক ! ইতিহাসে দেখি সব
লুটেরা দস্যুর জয়গানে ঠাসা
প্রশস্তি, বহিরাগত তস্করের নামে নানা রঙ পতাকা ওড়ায়।
কথা ছিল আমাদের ধর্ম হবে ফসলের সুষম বন্টন
আমাদের তীর্থ হবে শস্যপূর্ণ ফসলের মাঠ।
অথচ পান্ডুর নগরের অপচ্ছায়া ক্রমশ বাড়ায় বাহু
অমলিন সবুজের দিকে, তরুদের সংসারের দিকে
জলোচ্ছাসে ভেসে যায় আমাদের ধর্ম আর তীর্থভূমি
আমাদের বেঁচে থাকা ক্লান্তিকর আমাদের দৈনন্দিন দিন।”
এই সব শব্দরাশি আমার ভেতর চৈতন্যে জলপ্রপাতের শক্তি নিয়ে হানা দেয় । আমাকে দাঁড় করিয়ে দেয় বিপ্লবের সামনে । আমার মনে হয় :
“ মুখোমুখি দাঁড়াবার এই তো সময়”
আমার রক্তে ডাকে বান । আমার তারুণ্যের আস্তিন খামচে ধরে টান দেয় সহসা সাইরেন । আমি চিৎকার করে বলে উঠি :
“ প্রয়োজন এসেছে আজ জ্বলে ওঠো আর্ত মানুষ
জ্বলে ওঠো বৃক্ষ,গ্রাম,জনপদ,শ্রমিক,শহর, অবরুদ্ধ লোকালয়
হত্যা আর সন্ত্রাসের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে ব্যথিত জীবন
আজ বড়ো দুঃসময়-ইটের দেয়ালে বন্দী ফুলের চিৎকার
ওই শোন কাতর কান্নার ধ্বনি ভেসে আসে নিষিদ্ধ বাতাসে।
কথা বলো, কথা বলো অমিতাভ
শানিত শোনিতে জ্বেলে প্রতিবাদী আগুনের লাভা
একবার বলে ওঠো: দুঃশাসন আমি মানিনা তোমাকে
একবার বলে ওঠো: ভুল মানুষের কাছে নতজানু নই
পৃথিবীতে তিন ভাগ জল-
ওদের জানিয়ে দাও- প্লাবনে পাহাড় ধসে, ধসে যায় মাটি
শিলার বিপুল মাংশ খসে পড়ে দুর্বিনীত জলের আঘাতে।
অমীমাংসিত ক্ষোভ যার মিশে আছে অস্থি শোনিতে
রক্তাক্ত হযেছে বুক- নতজানু সে-মানুষ হয়নি কখনো।”
চলমান রাজনৈতিক ছেনালীপনায় আমার আস্থা নেই । আমি বিশ্বাস করি-
“বেশ্যাকে তবু বিশ্বাস করা চলে
রাজনীতিকের ধমনী শিরায় সুবিধাবাদের পাপ”
হাজারো তরুনের কন্ঠে যেদিন ধ্বনিত হবে "আগামী যুদ্ধের নিষিদ্ধ সংলাপ" ।সেদিনই জনতা জাগবে ।কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে আজকের সব শোষকের নাম-নিশানা ।সুকান্তের মত তাই বলতে ইচ্ছে করছে-
"আজ আর বিমূঢ় আস্ফালন নয়,
দিগন্তে প্রত্যাসন্ন সর্বনাশের ঝড়;
আজকের নৈঃশব্দ হোক যুদ্ধারম্ভের স্বীকৃতি।
দুহাতে বাজাও প্রতিশোধের উন্মত্ত দামামা,
প্রার্থনা করোঃ
হে জীবন, যে যুগ-সন্ধিকালের চেতনা-
আজকে শক্তি দাও, যুগ যুগ বাঞ্ছিত দুর্দমনীয় শক্তি,
প্রাণে আর মনে দাও শীতের শেষের
তুষার-গলানো উত্তাপ।
টুকরে টুকরো ক'রে ছেঁড়ো তোমার
অন্যায় আর ভীরুতার কলঙ্কিত কাহিনী।
শোষক আর শাসকের নিষ্ঠুর একতার বিরুদ্ধে
একত্রিত হোক আমাদের সংহতি।
তা যদি না হয় মাথার উপরে ভয়ঙ্কর
বিপদ নামুক, ঝড়ে বন্যায় ভাঙুক ঘর;
তা যদি না হয়, বুঝবো তুমি মানুষ নও-
গোপনে গোপনে দেশদ্রোহীর পতাকা বও।"
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে মে, ২০১৩ দুপুর ১২:৫৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


