কালের কন্ঠে একটা রিপোর্ট প্রকাশিত হল। সত্য-মিথ্যা যাচাই হলনা। রায় হল । রায়কে স্বাগতম। আমার ভাল লেগেছে এই রায়। তবে খারাপ লেগেছে অধ্যক্ষর কথা ভেবে। একজন শিক্ষক, তার দাবী অনুযায়ী, ষড়যন্ত্রের শিকার হলেন।
আমরা প্রত্রিকায় অধ্যক্ষর কথা পড়েছি। তিনি বোরকা বাধ্যতামূলক করেন নাই। বরং যারা বোরকা পরে আসে তাদেরকে একই কালারের বোরকা পরে আসার কথা বলেছেন। তার কথা সত্য হলে, তাকে আদালতে কিসের ভিত্তিতে হাজির হতে বলা হল? পত্রিকার একজন রিপোর্টারের কথার উপর ভিত্তি করে? আমরা আগেও বলেছি, তথ্য যাচাইয়ের জন্য আদালতের নিজস্ব ব্যবস্থা থাকা দরকার।
এ রায়ের কারণে নতুন করে বিতর্ক শুরু হল ।অনেকে বলতে লাগলেন সরকার পর্দা নিষিদ্ধ করেছে । আমি অবাক হই । ওরা কি মিথ্যা দিয়ে সত্য প্রতিষ্ঠা করতে চায় ? বাধ্য করা যাবেনা আর নিষিদ্ধ এক হল ?
এবার আসি রাসুল (সাঃ) এর ইসলাম প্রচারের মৌলিক নীতির দিকে । তিনি যতটা ছিলেন ধর্ম প্র্রচারক, তার চেয়ে বেশি ছিলেন সমাজ সংস্কারক । তিনি কোন কিছুই জোর করে চাপিয়ে দেননি । ইসলাম পালনের জন্য তিনি জোর করে কোন মুসলিমের সাথে কিছু করেছেন এমন কিছু আমাদের জ্ঞানে নেই । কুরআন নিজেই বলছে-ধর্মের ব্যাপারে জোর জবরদস্তি নেই । অন্যত্র রাসুল (সাঃ)কে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে-আপনাকে দাড়োয়ান করে পাঠানো হয়নি ।এসবের মূল কথা হল ইসলাম মানুষের কল্যাণের জন্য । এর প্রয়োগটাও হবে কল্যাণকামী উপায়ে । মারধোর, হত্যা-সন্ত্রাসের মাধ্যমে নয় ।
এবার আসি সম্প্রতিক সময়ে এদেশের ইসলামপ্রিয় জনতার মনে উদয় হওয়া দুটি বিতর্ক প্রসঙ্গে ।
১. সম্পদে নারীর অংশ।
২. পর্দা ।
সম্পদে নারীর অংশঃ
প্রস্তাবিত নারী নীতিতে সম্পদে নারীর অংশ পুরুষের সমান বলা হয়েছিল বিধায় তৌহিদী জনতা ব্যাপক বিক্ষোভে ফেটে পড়ে । "কুরআনের স্পষ্ট বিরোধিতা করে আইন ! এত বড় সাহস !!" ওই সব তৌহিদী জনতাকে আমার প্রশ্ন এদেশের সব কিছু কি ইসলাম সম্মত উপায়ে হচ্ছে ? নাকি এদেশে ইসলাম পালন করা হচ্ছে রাস্ট্রসম্মত উপায়ে ? রাস্ট্র আপনাকে ইসলাম পালনের সুযোগ দিচ্ছে বলেই আপনি ইসলাম পালন করছেন, অন্যথায় পালন করতে পারতেন না ।এখানে রাস্ট্র আগে ইসলাম আগে নয় । হ্যাঁ আপনারা যদি ইসলামী রাস্ট্র কায়েম করতে পারেন তাহলে অন্যদেরও একথা শুনিয়ে দিয়েন যে আগে ইসলাম, তারপর রাস্ট্র !!
এর পর আসি নারীর প্রাপ্য নিয়ে । ইসলামী রাস্ট্র ব্যবস্থায় নারীর অর্থনৈতিক দায়িত্ব সবসময়ই পুরুষের উপর অর্পিত থাকে।অন্তত, শরীয়া আইন তা-ই বলে । তাকে কখনোই অর্থনৈতিক দায়িত্ব পালন করতে হয়না । তাই তাকে সম্পত্তির অর্ধেক দেয়া হলে সেটা পুরুষের তুলনায় বেশীই হয় । কিন্তু আমাদের রাস্ট্র যেহেতু ইসলামী নয়, কিংবা এখানে যেহেতু নারীর দায়িত্ব সবসময় পুরুষ পালন করেনা । রাস্ট্র পুরুষকে বাধ্যও করেনা এবং ইসলামী রাস্ট্রের ন্যায় আর কেউ না থাকলে রাস্ট্র তার দায়িত্বও নেয়না । তাই এখানে নারীকে পুরুষের অর্ধেক দেয়াটা নারীর প্রতি অবিচারই বটে । তাই নারীনীতির এই বিষয়টা আমি সমর্থন করি । আমি আবারও বলতে চাই, একটা সিস্টেম পুরোপুরি পালন না করা হলে তাতে ওই সিস্টেমের সৌন্দর্যহানিই ঘটে । তার মহত্ব এবং উদারতা চাপা পড়ে যায় ।
পর্দাঃ-
পর্দা কখন ফরজ হয়- এটাও কিন্তু লক্ষ্যণীয়। মদীনায় রাসূল (সাঃ)এর নেতৃত্বে ইসলামী রাস্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবার অনেক পরে, যতদুর জানি ৬ষ্ঠ হিজরীতে, পর্দা ফরজ হয় । কেন এত পরে পর্দা ফরজ হল ? এ প্রশ্নটা নিয়ে একটু এগুলেই কিন্তু বিষয়টা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, বাংলাদেশের মত একটি রাস্ট্রে পর্দা পালন ফরজ নয় । পর্দা নামাজ রোজার মত দ্বীনের অংশ নয় । এটা শরীয়তের অংশ ।
বিষয়টি আরেকটু খোলসা করি-
পর্দা সংক্রান্ত বিধান আমরা পাই সুরা নুরে । এ সুরাটি নাযীল হয় ৬ষ্ঠ হিজরীতে । ৩০ নং আয়াতে পুরুষদের পর্দা করতে বলা হয়েছে- "হে রসুল আপনি মুমিনদের বলে দিন তারা যেন তাদের চক্ষু নিম্নগামী রাখে, লজ্জাস্থানের হেফাজত করে,এটা তাদের জন্য বেশি পবিত্র্র, তারা যা করে আল্লাহ তা জানেন ।" ৩১ নং আয়াতে নারীদের পর্দার বিধান এসেছে-"মুমিন মহিলাদের বলে দিন, তারা যেন তাদের চক্ষু নিম্নগামী রাখে, লজ্জাস্থানের হেফাজত করে,আর সৌন্দর্য না দেখায় যা আপনা আপনি প্রকাশিত হয় তা ছাড়া ।"
সুরাটা পড়লে বুঝা যাবে এটা সামাজিক বিধি বিধান সংক্রান্ত । সমাজে যাতে ব্যভিচার না হয় সে জন্য বিভিন্ন বিধানের কথা বলা হয়েছে । আর সামাজিক বিধি বিধান গুলো শরীয়তের অংশ দ্বীনের নয়।
আরো লক্ষ্যণীয় হল, পর্দার কথা আগে বলা হয়েছে পুরুষদের জন্য পরে নারীদের জন্য । অথচ পুরুষরা পর্দা করেনা কিন্ত নারীকে বাধ্য করা হয় । আমাদের আলেমরা নারীর পর্দার ব্যাপারে যত উচ্চকিত পুরুষের পর্দার ব্যাপারে তত উচ্চকিত নন । ফলে পর্দার বিধান বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে ।
ইসলাম ব্যভিচারের জন্য চরম শাস্তি রেখেছে । একই সাথে ব্যভিচার যাতে না হয় তার জন্য সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করেছে । এই সতর্কতারই একটা হল পর্দা । সুতরাং যে সমাজে ব্যভিচারের শাস্তি নেই সে সমাজে পর্দা ফরজ হওয়াটা হাস্যকরই বটে । এখানে শাস্তি নেই বলতে ইসলামী শাস্তির কথা বলছি ।
এবার আসি রায় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র প্রসঙ্গে । ওখানে বলা হয়েছে ধর্মীয় পোষাক পরতে বাধ্য করা যাবেনা । সুতরাং যারা বলছেন এতে প্রতিষ্ঠানের নির্দিস্ট পোষাক পরতেও বাধ্য করা যাবেনা তারা ভুল করছেন । আর যারা ভাবছেন এখন কেউ ব্রা আর বিকিনি পরে আসলেও কিছু বলা যাবেনা তারা আরো বড় ভুল করছেন । কারণ সবাই বোধহয় একমত হবেন যে, ব্রা আর বিকিনি ধর্মীয় পোষাক নয় ।
এবার আসি এই রায় এবং পরিপত্র ধর্ম অবমাননা করছে কিনা সে প্রসঙ্গে ! এখানে বলা হয়েছে পরতে বাধ্য করা যাবেনা । পরা নিষিদ্ধ এই কথা বলা হয়নি । সুতরাং ধর্ম অবমাননা হয়নি এটা নিশ্চিত । তবে আমি আতংকিত এই ভেবে যে এই সব মিছিল-মিটিং আবার আদালত অবমাননার পর্যায়ে পড়ে কিনা !
তৌহিদী জনতার প্রতি আমার আহ্বান হল, এসব বিষয় নিয়ে আন্দোলন না করে নিজেদেরকে যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলুন । আপনি যদি যোগ্য হন তাহলে আপনি ইসলামের উপকার করতে পারবেন । আপনার অযোগ্যতা ইসলামের ক্ষতিই করবে । পৃথিবী এগিয়ে যাচ্ছে আর আপনারা বিবি তালাকের ফতোয়া নিয়া পরস্পরকে কাফের ফতোয়া দিয়া দিন গুজরান করছেন । এতে কোন লাভ হবেনা । বরং দেশের এবং সাধারণ মানুষের উপকার করতে হলে পুরনো ভুল ধারনা থেকে বের হয়ে ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য উপলব্ধি করতে হবে এবং সে অনুযায়ী নিজেকে তৈরি করতে হবে ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

