(সত্য ঘটনা অবলম্বনে)
ডাইরেক্ট, ডাইরেক্ট, কাজীপাড়া, শ্যাওড়াপাড়া, মিরপুর-১০,১১,১২ ডাইরেক্ট।-এভাবেই ডাকছিল ছেলেটা।নিউমার্কেটের মোড়ে বিকল্পের একটা গাড়ি। ওটাকে ৩৬ নম্বরও বলা হয়। অনেক যাত্রীর ভীড়ে ঠেলাঠেলি করে উঠলাম। পেছন দিকে একটা সিটে বসে পার করতে লাগলাম ঢাকার বিখ্যাত জ্যামগুলো।
রাতের অন্ধকারে মাঝে মাঝেই হানা দিচ্ছে সোডিয়ামের রঙজ্বলা আলো। বাইরে ব্যস্ত পায়ে পথচারীদের আনাগোনা, কন্ট্রাক্টর ছেলেটাকে ঠেলে এই সিটিং সার্ভিসের বাসেও ৩/৪ জন দাঁড়িয়ে রওয়ানা হয়েছেন গন্তব্যে।দু-একজন মৃদু প্রতিবাদ করেই থেমে গেলেন। মগ্ন হয়ে গেলেন নিজস্ব ভাবনায়। আমি সদ্য শেষ করে আসা রিহার্সেলের বিভিন্ন খুঁটিনাটি দিকগুলো ভাবছি।
সিটি কলেজ পার হলে ভাড়া তুলতে শুরু করে ছেলেটা। আমি পকেট থেকে টাকা বের করে প্রস্তুত ভাড়া মেটানোর জন্য। কিন্তু আমার সামনের সারিতে একটা ব্যতিক্রম হল। যাত্রিরা ভাড়া দিতে চাচ্ছে ছেলেটা ভাড়া নিচ্ছেনা। বরং জিজ্ঞেস করছে -কোথা থেকে উঠেছেন ? একসময় যাত্রী দুজন বলল অন্তত হাফ ভাড়া নেও। তা-ও নিলনা।
ভাড়া কেটে ছেলেটা আবার ওই দুজনের কাছে এসে দাঁড়াল। কবে এসেছিস ঢাকায়। এবার তুমি করেই সম্বোধন। বুঝতে পারলাম ওরা তার পরিচিত। তারপর তিনবন্ধুর আলাপচারিতা। জানতে পারলাম একসাথেই পড়ত ওরা। যাত্রী দুজন এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। ৫ বছর আগে এক্সিডেন্টে বাবা মারা যাবার পর ঢাকায় চলে আসে ছেলেটা। সংসারের দায়িত্ব তুলে নেয় কাঁধে। মা এবং ছোট ভাই বোনকে নিয়ে আসে নিজের কাছে ঢাকায়। একটা বোনকে এর মধ্যে বিয়েও দিয়েছে।
ছেলেটার চোখে আমি খেয়াল করলাম আনন্দাশ্রু। 'কতদিন পর তোদের সাথে দেখা হল। একজনকে ইঙ্গিত করে বলল -'ক্রিকেটে ওর সাথে আমার জুটি হত ভাল। আরো বলল, কোনদিন কোন স্যারের মাইর খাইনাই। পড়াশুনা, খেলাধূলা সবকিছুতেই তো ভাল ছিলাম। কিন্তু কি আর করা, বাপ মরে গেল এক্সিডেন্টে !' আমি হঠাৎ অনুভব করলাম বন্ধুদের দেখে ওর চোখের আনন্দাশ্রু আমাকেও প্লাবিত করছে। আমার চোখ দুটো জ্বালা করে উঠল।
খুব করে দু-বন্ধুকে বলল অবশ্যই বাসায় আসবি। পরিচিত মানুষজন দেখলে খুব ভাল লাগে। মিরপৃর যখনই আসবি আমারে জানাবি। আমি তোদের সাথে দেখা করব।তারপর তিনবন্ধুর আলাপ চলতে থাকে থেমে থেমে। আমি পৌঁছে যাই মিরপুর-১০।ওরা যায় আরো সামনে হয়তো ১২ নম্বর।
প্রতিদিন অতিরিক্ত যাত্রী তোলার কারণে কন্ট্রাক্টরের সাথে যাত্রীদের ক্যাচাল হয়। আমিও কতদিন এভাবে অতিরিক্ত যাত্রী তোলার প্রতিবাদ করেছি। কিন্তু এখন কেন যেন প্রতিবাদ করতে পারিনা। মনে হয় ওই ছেলেটার ইনকামে হয়তো চলছে তার গোটা পরিবার। হয়তো ছেলেটার বাবা মারা গেছে। মা আর ভাই বোনের দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছে সে। আমার সামান্য কষ্টে ওর যদি কিছু টাকা বেশি রোজগার হয় হোকনা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


