somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

উপন্যাস_ দ্বিতীয় জীবন_পর্ব-০০১

১৩ ই আগস্ট, ২০০৭ বিকাল ৫:৫৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বাইশ ডিসেম্বর
আকাশ ভেঙ্গে জ্যোৎস্না পড়ছে। জ্যোৎস্নার সঙ্গে মানুষের অনুভূতির একটা সূক্ষ্ম সম্পর্ক আছে। হুট করে মন নরম হয়ে যায়। বিন্দুর মনটা কী সেরকম কোন সূক্ষ্ম আবেগে নরম হয়েছে? বুঝতে পারছি না।
বিন্দুর ক্যাসেট প্লেয়ারের শব্দ রাতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ওর আবার আজব স্বভাব। যে রাতে যে গান শোনে বারবার তা বাজাতেই থাকে। আজ চলছে ‘এ খাঁচা ভাঙ্গব আমি কেমন করে’।
যে খাঁচা ভাঙ্গা যায় না তা ভাঙ্গার দরকার কি? যত্তসব উদ্ভট গান। কোন মানে হয়!
বাজছে তো বাজছেই। প্রথম একবার দু’বার শুনতে ভালোই লাগছিল। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে থাপড়া মেরে ওর কানের লতি ছিড়ে ফেলি।
রাগটা প্রায় মাথায় চড়ে যাচ্ছিল। পরক্ষণেই তা নামিয়ে ফেললাম। অবশ্য কাঁচা বয়সে এমন স্বভাব আমারো ছিল। গভীররাতে রবীন্দ্র পাগলার গান না শুনলে ঘুম হতো না। সে সময় আমার নানী বেঁচে ছিলেন। তিনি মুখ বাঁকা করে চিবিয়ে চিবিয়ে বলতেন, ‘ঐসব শুনলে অমঙ্গল হয়।’
‘কি অমঙ্গল হয়?’
‘বিয়ার পর বুঝবি। যে পুলা গান-বাজনা, রঙ্গ-তামাশা বেশি করে, তার বউ সোয়ামীর কথা শুনে না। বউ পোয়াতি হয় না।’
তার কথা শুনে আমি হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ি। তিনি রেগে যান। আমাকে ধমকিয়ে বলেন, ‘ব্যাঢং পুলা, আইজ বুঝবি না বুঝবি কাইল, পাছা থাপড়াইয়া পারবি গাইল।’
নানীজানের ছিল বিচিত্র স্বভাব। দুইটা কথা বললে তিনটা শ্লোক বলতেন।
আমি তাকে বলতাম, ‘ঐসব কুসংস্কার আমি বিশ্বাস করি না। কুসংস্কার বিশ্বাস করে দূর্বল মানুষ।’
সত্যিই আমি সংস্কার মানতাম না। কিন্তু সময় সংস্কার মানতে বাধ্য করে। এই তো সেদিনের কথা। শাহবাগের মোড়ে চঞ্চলভাবে হাঁটছি। হঠাৎ এক বৃদ্ধ এসে হাত বাড়িয়ে ভিক্ষা চাইল। বলা নেই কওয়া নেই আমি হঠাৎ ক্ষিপ্ত হয়ে ধমকে উঠলাম, ‘লাথি দিয়ে ব্যাটা তোর পাছা...’
কথাটা শেষ করতে পারিনি। লক্ষ্য করলাম ডান পা’টা লাথি দেয়ার ভঙ্গিতে অনেকখানি এগিয়ে গেছে। বৃদ্ধা গড়গড় করে বলল, ‘যে পা দিয়ে লাথি দিতে চাইছস। ঐ পা কিরায় খাইব।’
কানের সাথে কথাটা বহুদিন আলপিনের মতো গেঁথে ছিল। কিছুতেই মন থেকে মুছে ফেলতে পারছিলাম না। সেই প্রথম আমার মনে কুসংস্কার ঢুকল। কারণ সত্যি সত্যিই একদিন আমার ডান পা’টাই ভাঙ্গল।
সেদিন বিকেলে হই চই করে বাড়ি ফিরছিলাম। মাত্র দিন দশেক আগের কথা। পারুলের বিয়েতে গিয়েছিলাম। জায়গাটা একেবারে অজপাড়াগাঁ। কী যেন গ্রামের নামটা? হ্যাঁ, সুখনগরী। কিন্তু গ্রামের লোকে সুখনগরী বলে না। বলে শুকনেগাড়ী। সেই অজপাড়াগাঁয়েই আমাকে যেতে হল। কিরণ এত করে ধরল, না করতে পারলাম না। শেষে গেলাম। পারুলের বিয়েও হলো।
বিয়ে শেষে প্রায় সত্তর আশিজন গাদাগাদি করে বাসের মধ্যে বসেছি। কিছুদূর আসতেই এক্সিডেন্ট। কারও কিছু হলো না। এমনকি কারও হাতও মচকালো না। অথচ আমার ডান পা’টা ভেঙ্গে গেল। সেই থেকে আজ দশদিন বিছানায় পড়ে আছি। ভেবেছিলাম অনেক বন্ধু-বান্ধব আমাকে দেখতে আসবে। কিন্তু আমি যে কতটা নিঃসঙ্গ তা ক’দিনে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি।
গত দশ দিনে কিরণ এসেছে দু’বার। প্রতিবারই এক কথা, ‘দোস্ত এমন একটা ঘটনা ঘটবে ভাবিনি। আসলে আমার জন্যেই...।’
‘আরে রাখ না। জানে বেঁচে গেছি এটাই তো বড় কথা।’
প্রসঙ্গ পাল্টাতে বলি, ‘পারুল কেমন আছে?’
‘তা আছে একরকম। সেদিন ফোন দিয়েছিল। ওর বরটা মাই ডিয়ার টাইপ।’
‘কি রকম?’
‘আর বলিস না। পারুলের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। গ্লাস ভেঙ্গে পারুল নাকি কেঁদে কেটে অস্থির।’
আমি জোর করে ঠোঁটের কোনে কিছুটা হাসি ফুটালাম। যেন পারুলের গ্লাস ভাঙ্গার গল্পে আমি মুগ্ধ। এ জাতীয় অভিনয় আমি বেশ ভালোই পারি। আর নিজে অভিনয় পারি বলেই অন্যের অভিনয় ধরতে তেমন কষ্ট হয় না।
এই যে কিরণ আমাকে দেখাতে এসেছে। একগাঁদা ফল কিনে এনেছে, এটা কিন্তু ইচ্ছে করে নয়। নেহাত বাধ্য হয়ে। কারণ ওর বোনের বিয়েতে গিয়েই আমার পা’টা ভেঙ্গেছে।
কিরণ এখানে আসলেই ওর মনের মাঝে সম্ভবত ছটফট করে। কখন সে মুক্তি পাবে, এই আশায়। ওকে আমি দ্রুত মুক্তি দেই। ও চলে যায়। আমি একলা হয়ে যাই।
দশ দিনেই আমি কান্ত হয়ে উঠেছি। অথচ ডাক্তার বলেছে, ডান পায়ে তিন জায়গায় ভেঙ্গেছে। পুরোপুরি রেস্ট না নিলে, ঠিকভাবে চিকিৎসা না করলে, হয়তো হাঁটতেই পারব না। এমনভাবে কোমড় পর্যন্ত প্লাষ্টার করেছে যে নড়তেই পারি না।
প্রথম দু’দিন কোমরে ঝিঁ ঝিঁ ধরে গেল। সে কী ভীষণ ব্যথা! এখন কেমন জানি একটা গা সওয়া ভাব এসেছে। মাঝে মাঝে মনে হয় শরীরের নিচের অংশই যেন আমার নেই।
একত্রিশ বছর বয়সে এসে এমন হবে কখনো ভাবিনি। সবকিছু কেমন জানি এলোমেলো হয়ে গেল। অথচ ছোটবেলা থেকেই আমি অন্যরকম ছিলাম। বড্ড লাজুক। স্কুলের বন্ধুদের সাথে হই চই করতাম ঠিকই কিন্তু অচেনা লোকের সামনে একেবারে লজ্জায় লাল হয়ে যেতাম। তবে সেই বয়সে কেন জানি সবকিছুর প্রতি প্রবল আকর্ষণ ছিল। তখন আর বয়স কত হবে? ছয় কী সাত। একটু একটু বুঝতে শিখেছি। যদিও নিজেকে বেশ বড় পন্ডিত ভাবতাম। কিন্তু মুখ ফুটে তেমন কিছু আওড়াতে পারতাম না।
একবার লুকিয়ে লুকিয়ে বাপ্পী ভাই আর রুনী আপুকে দেখেছিলাম গল্প করতে। ওরা তখন কলেজে পড়ত। তখন কলেজে পড়া মানে ছিল বিশাল বড় কোন ব্যাপার। প্রায়ই ভাবতাম ‘ইস্! কবে যে বড় হব!’ বড় হওয়ার বাসনাটা এতই প্রবল ছিল যে মাঝে মাঝে ছোট বলে মনে মনে খুব দুঃখ পেতাম।
সে সময় বাপ্পী ভাইকে দেখতাম প্রায়ই রুনী আপুকে জড়িয়ে ধরত। জোর করে ধরে চুমু দিত। কিন্তু রুনী আপুতো কখনো চুমু দিত না?
রুনী আপু রেগে দিয়ে বলত ‘অসভ্য’। এ কারণেই ব্যাপারটার প্রতি আমার প্রবল আকর্ষণ ছিল। রিপন বলত, ‘বোকা এটা বুঝলি না? চুমু দিলে বাচ্চা হয়।’
আমি ওর উত্তর শুনে মনে মনে রোমাঞ্চ অনুভব করলাম। কিন্তু পরক্ষণেই মনে মনে দুমরে গেলাম। কারণ গতকাল আমি যখন ফুটবল খেলে বাড়ি ফিরছিলাম। তখন সন্ধ্যার একটু পরপর। সিঁড়ির তলাটা বেশ খানিকটা অন্ধকার। তখন শ্রাবনী আমাকে জড়িয়ে ধরে চুমু দিয়েছিল। আমার পেটে আবার বাচ্চা হবে না তো?
চিন্তায় সারাদিন কাটল। ভয়ে কুকরে গেলাম। বারবার পেটে হাত দিয়ে চাপ দিলাম। কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করতে পারছি না। বেশি চাপাচাপির ফলেই হয়তো রাতে খুব পেটব্যথা করল। অনেক রাত পর্যন্ত ঘুমোতে পারলাম না।
পরদিন সেই শৈশব জীবনের গোপন চুমুর গল্প রিপনকে বললাম। কিভাবে শ্রাবনী আমাকে জড়িয়ে ধরল। কিভাবে ঠোঁটে কামড় দিয়ে বলল, ‘তোকে ভালোবাসি ইবু। তুই কিন্তু কাউকে বলবি না। বাঁদর রিপনকেও না।’
শেষের লাইনটা বাদ দিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ঘটনা রিপনকে বলে কাঁদো কাঁদো হয়ে বললাম, ‘এখন কী আমার পেটে বাচ্চা হবে?’
ও আমাকে ধাক্কা দিয়ে বলল, ‘যাহ্ শালা, ছেলেদের আবার বাচ্চা হয় না কী?’
আমি ওর কথার প্যাঁচ বুঝলাম না। মোটামুটি গভীর চিন্তায় যখন হাবুডুবু খাচ্ছি তখন রিপন দুম করে বলল, ‘আমাকে হাওয়ার মিঠাই খাওয়া। ঘেটুর দোকানে এক টাকায় আটটা দিচ্ছে।’
আমি ঠোঁট উল্টে বললাম, ‘তোকে হাওয়ার মিঠাই খাওয়াতে যাব কেন?’
‘নইলে আমি সবাইকে বলে দেব তুই শ্রাবনীকে জড়িয়ে ধরে চুমু দিয়েছিস।’
‘কেন বলবি?’
আমি রাগে কাঁপছি। আমার সঙ্গে চালাকি!
‘আমার ইচ্ছে।’
‘আমি তো চুমু দেইনি। ওই আমাকে জোর করে দিয়েছে।’
‘তাহলে হাওয়ার মিঠাই খাওয়া। বলব না।’
আমার সাথে চালাকি? মনে মনে খুব রেগে গেলাম। আমার পা কাঁপতে লাগল। যদিও আমি চালাক না। তবুও ব্যাপারটা মেনে নিতে পারলাম না। ইচ্ছে হচ্ছিল ঘুষি মেরে ওর নাকের বদনা ফাটিয়ে দেই। ও পাড়ার রহিম যেমন মিজানকে দিয়েছিল। সে কী রক্ত!
কিন্তু আমি জানি আমি খুব দূর্বল। রিপনের সাথে মারামারি করে কোনদিন পারব না। সে বয়সে আমার এসব নিয়ে বেশ কষ্ট ছিল। মনের মাঝে কোথায় যেন কষ্ট পেতাম। ঠিক ধরতে পারতাম না।
আমাকে পরাজিত হতে হলো। মিতু খালা আদর করে আমাকে এক টাকার একটা নোট দিয়েছিল। কী সুন্দর চকচকা টাকা! ওটা পকেটে নিয়ে ঘুরলে নিজেকে বেশ বড়লোক বড়লোক মনে হতো। সেই টুনির গল্পের মতো ‘রাজার কাছে যে ধন আছে, আমার কাছেও সে ধন আছে।’
প্রায়ই টাকাটা নাকে চেপে ঘ্রান নিতাম। মিতু খালার গন্ধ পেতাম। অবশেষে ও টাকা দিয়েই রিপনকে হাওয়ার মিঠাই খাওয়ালাম। আমি আট আনার মিঠাই খাওয়াতে চাইালাম। কিন্তু ও ছোঁ মেরে টাকাটা কেড়ে নিল।
সে বয়সে এক টাকার যে কী মূল্য তা এই বয়সে হাজার টাকাতেও বুঝি না। এখন ক্যাটবেরি চকলেটও সেই হাওয়ার মিঠাইয়ের মতো মজা লাগে না। সেই কাঠ বিস্কুট, সেই হাওয়ার মিঠাই জীবন থেকে কোথায় হারিয়ে গেল।
রিপন অবশ্য এর পরও শ্রাবনীর ব্যাপারটা সবাইকে বলে দিল। বলা যায় ব্যাপারটা এ বাড়ি ও বাড়িতে মুখরোচক একটা গল্পে পরিণত হলো।
আম্মা একদিন খালার সামনে বলল, ‘ইবু তো এখন অনেক বড় হয়ে গেছে। ওকে বিয়ে দিতে হবে।’
প্রচন্ড রাগ উঠল রিপনের উপর। সেই প্রথম আমার রণযাত্রা। রিপনকে আজ খুন করে ফেলব।
যদিও রিপনের সাথে আমি পারিনি। ও আমাকে এমন ধোলাই দিল যে চোখ মুখ ফুলে গেল। ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত বড়দের মাঝেও গড়াল।
আমার বন্ধু-বান্ধব আমাকে দেখলে কেমন জানি আড়চোখে তাকাত। শ্রাবনীকে চুমু দিয়েছি এটাকে তারা ভালোভাবে দেখল না। যেন বিশাল বড় এক পাপ করে ফেলেছি। ফুটবল খেলতে গেলে রাজীব প্রায়ই বলত, ‘যা শালা, তুই তো বড় হয়ে গেছিস। তোর সাথে মিশলে আমরাও খারাপ হয়ে যাব।’
ওরা আমাকে খেলতে নিত না। কিন্তু আমার কিছু করার ছিল না। কোন প্রতিবাদ করতে পারতাম না। আমি আসলে দূর্বল, সেই প্রথম জীবন থেকে দূর্বল।
একদিন শ্রাবনীর সাথে সিঁড়িতে দেখা হল। ও চোখ বড় বড় করে বলল, ‘ভীরু, কাপুরুষ।’Ñ বলেই আমার গালে ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে দিল।
আমি কিছুই বুঝে উঠতে পারলাম না। সে বয়সে কেউ কাপুরুষ বললে গায়ে খুব লাগত। আমারও লাগল। কিন্তু কিভাবে সাহসী হতে হয়, সে বয়সে তা জানা ছিল না।
শ্রাবনীর আব্বা আম্মা আমাকে দেখলেই বলত ‘জামাই বাবা’। আর আমার আব্বা আম্মাকে বলত ‘বেয়াই বিয়ান’। আমি তখন খুব লজ্জা পেতাম।
লজ্জা পেয়ে দৌড়ে পুকুর পাড়ে যেতাম। ওখানে একটা হিজল গাছ ছিল। ওখানে দাঁড়িয়ে কাঁদতাম। সেই ছোট বয়সে কেন কাঁদতাম জানি না।
এখন বড় হয়েছি। এখন সব বুঝি। এখনও খুব কষ্ট হলে দৌড়ে হিজল গাছের নিচে যেতে ইচ্ছে করে। মনে হয় প্রাণ খুলে সেই ছোটবেলার মতো করে কাঁদি। কিন্তু তা হয় না। এই যে পা ভেঙ্গে একটা ঘরের মধ্যে বন্দী হয়ে আছি। যেন নির্জন একটা দ্বীপে রবিনসন ক্রুসোর মতো আমি একটা বন্দী মানুষ। কিছুতেই আমার সময় কাটতে চায় না।
এ ক’দিনে আমি বুঝতে পেরেছি আমি কতটা ব্যস্ত মানুষ। চুপচাপ একটা ঘরের মাঝে বসে থাকা আমার জন্য কতটা কষ্টদায়ক। যদিও আমি বেকার। গত দু’বছর হলো এম এ পাশ করে বসে আছি।
আমার বিশ্বাস পৃথিবীতে বেকার মানুষরাই সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত। আমার ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। এত কষ্টের পড়ালেখা, মানুষ হওয়ার বাসনা সব বিফলে গেছে।
আমার ধৈর্য দেখে আমি নিজেই মুগ্ধ। গত দু’বছর কত কত জায়গায় যে চাকুরি খুঁজেছি, তার কোন ইয়াত্তা নেই।
একদিন এক অফিসে চাকুরি খুঁজতে গিয়ে রিমুর সঙ্গে দেখা। সে কী লজ্জা আমার! কিন্তু বেকার মানুষের কী লজ্জা পেলে চলে! বেকারদের সবচেয়ে ভালো করে শিখতে হয় অভিনয়। সম্ভবত অভিনয়ে আমি এ কাস টাইপের।
অনেক গল্প হলো। রিমু জোর করে ক্যান্টিনে নিয়ে চা সিঙ্গারা খাওয়াল। সেই সময় হুট করে আমার মনে হলো রিমির কথা জিজ্ঞেস করি। পরক্ষণেই বহু কষ্টে সে ইচ্ছা দমন করেছি। যদিও মনে মনে প্রার্থনা করছিলাম সে যেন রিমির কথা বলে । অন্তত ও কেমন আছে এটা জানতে। কিন্তু আমাকে হতাশ করে ও কিছুই বলল না। যেন রিমি নামে তার বড় বোন আছে, এটা সে বেমালুম ভুলে গেছে।
মেয়েরা সম্ভবত খুব চাপা স্বভাবের হয়। যদিও আমি সারাজীবন এদের কখনো বুঝতে পারিনি। একেবারে যখন চলে আসব তখন সে বলল, ‘রিমি আপার গত সপ্তাহে চাকুরি হয়েছে?’
আমি আমার উচ্ছ্বাস দমন করে বললাম, ‘কেমন আছে রিমি? কি চাকুরি?’
আমি রিমুর দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকলাম। কিন্তু ও কিছু বলল না। বরং হুট করে বলল, ‘সেভ করেন না কেন?’
‘বাসায় ব্লেড নেই।’
‘সেলুনে সেভ করবেন।’
‘আমার সুরসুরি লাগে।’
হো হো করে ছেলেদের মতো বিকট শব্দে হেসে উঠল সে। এই তো সেদিনও রিমু কত ছোট ছিল। ফ্রক গায়ে দৌড়ে বেড়াত। সেই মেয়ে এখন ক্যান্টিনে বসে ছেলেদের মতো করে হাসে। আশেপাশের অনেকেই চোখ বড়বড় করে তাকাল।
সে হাসি থামিয়ে বলল, ‘এক কাজ করেন, ুর দিয়ে সেভ করে ফেলেন।’
কথাটা বলেই সে আবার হাসতে শুরু করল। সেভ করার মধ্যে সে কি এমন হাসি খুঁজে পেল বুঝলাম না।
‘হাসছ কেন?’
‘বোকাদের আমরা বান্ধবীরা কি বলি জানেন?’
‘না। তাছাড়া জানা আগ্রহ নেই।’
‘ভ্যাদাইম্যা, বুঝলেন, ভ্যাদাইম্যা...’
রিমু কথাটা শেষ করতে পারল না। আবারও হাসছে। আমার উচিত ওর গালে টাস করে একটা চড় বসিয়ে দেয়া কিংবা জোরে একটা ধমক দেয়া। কিন্তু আমি জানি এর কোনটাই সম্ভব না। হয়তো আমি সত্যি সত্যিই বোকা।
আমার ইচ্ছে হচ্ছিল রিমি সম্পর্কে আরো দুএকটা কথা বলি। কিন্তু বলা হল না। রিমু কেন জানি এড়িয়ে গেল।
সে রাতে আমার ভালো ঘুম হলো না। আসলে আমি হৃদয় থেকে কিছুতেই রিমিকে মুছে দিতে পারিনি।
আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পরাজয় এখানেই। অবশ্য সে আমাকে আদৌ ভালোবাসত কিনা জানি না। অথচ ওর কথা মনে হলেই আমার মন কাঁদে। কিছুতেই নিজেকে স্থির রাখতে পারি না।
পা ভেঙ্গে আমি খুব অসহায় হয়ে পড়েছি। গল্প করার কেউ নেই। সময় কাটে না। তাই ভাবলাম সময় কাটাব কিভাবে? অবশেষে একটা পুরোনো ডায়েরি জোগাড় করলাম। তাতেই লেখা শুরু করলাম আমার অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যত। নেহাত সময় কাটানোর জন্য লেখা।
পা’টা যে কবে ঠিক হবে কে জানে। যতদিনে ভালো হবে ততদিনে হয়তো অনেক কিছু লেখা হয়ে যাবে। অবশ্য কি লাভ এসব লিখে? আমি তো সাধারন একজন মানুষ, কি দাম আছে এ জীবনের।
ভেবেছিলাম রিমির কথা কখনো লিখব না। ওর কথা মনে হলে আমার নি:শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। সময় থেমে যায়। তবু বারবার মনে পড়ে যায়। এখনও খুব কষ্ট হচ্ছে। আজ থাক। ওর কথা আমি কিছুতেই লিখতে চাই না।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই আগস্ট, ২০০৭ বিকাল ৫:৫৮
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১১ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪

আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬

লিখেছেন আঘাত প্রাপ্ত একজন, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:২৬

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬

[সম্ভাবনার ক্রমানুসারে নয়ঃ]

আর্জেন্টিনা: আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ তার ডিফেন্স আর ইনজুরি । ৩৮ বছরের তরুণ(!) সেন্টারব্যাক ওতামেন্দি আর কমপক্ষে এক হালি হাফ-ফিট ফুটবলার নিয়ে ১৯ জুলাই পর্যন্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলা সাহিত্যে জায়গা পাচ্ছেন ওসমান হাদী

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১২ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:১৭


সংবাদপত্র যা বলছে
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ জুন ২০২৬ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবই পরিমার্জন-সংক্রান্ত কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকসহ... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

×