আমার প্রায়ই একটা ধারণা হতো, মানুষ ভালোবাসে কিভাবে? ভালোবাসলে অনেক অনেক কথা বলতে হয়। গাছতলায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দিতে হয়। এত কথা ওরা পায় কোথায়? তাছাড়া ভালোবাসার সঙ্গে মেয়ে পটানোর একটা ব্যাপার আছে? ওদের মিঠে মিঠে কথায় মন ভড়াতে হয়। আমি এত কথা কোথায় পাব? আমার কথা যে খুব অল্প। তা ছাড়া আমার মধ্যে বিশেষ তেমন কোনো গুণও নেই। অনেকে গলা সাধে, কেউ কবিতা আবৃত্তি করে, কেউ অভিনয়ে পটুÑ আমি এরকম কিছুই না।
অবশ্য আমার মেয়েদের সঙ্গে কথা হতো না, তা কিন্তু না। বীণার সঙ্গে আমার বেশ ভাব ছিল। অবশ্য পাশাপাশি বাসায় না থাকলে হয়তো এটাও হতো না। তা ছাড়া এক কাসে পড়তাম। কাস এইট পর্যন্ত ও আর আমি প্রায়ই এক রিকশায় করে স্কুলে যেতাম। এরপর একদিন ও বদলে গেল। মেয়েরা একরাতে কৈশোর থেকে যুবতী হয়ে যায়।
আমার যখন দাড়ি গোঁফের কোনো খরব নেই সেই সময়ই একদিন লক্ষ্য করলাম বীণার বুকটা দাঁড়িয়ে গেছে। তাই এক রিকশায় যাওয়া বন্ধ। অবশ্য কথাবার্তা বন্ধ হলো না। ওকে প্রায়ই দেখতাম ইয়া লম্বা লম্বা ওড়না পড়ে বড়দের মতো করে কথা বলত। আমার আক্ষেপ লাগত। কেন যে মেয়ে হলাম না। তাহলে হুট করে বড় হয়ে যেতাম।
বীণার ওপর আমার রাগও ছিল বেশ। আমার চেহারটা গোলগাল ছিল বলে ও আমাকে ‘গুট্টবাবু’ বলত। আমি ভীষণ ক্ষেপে যেতাম। কিন্তু মা খালাদের পর একমাত্র বীণাই আমার পরিচিত। তা ছাড়া ওকে আমি ভীষণ পছন্দও করতাম। ওর জন্য প্রায়ই মাস্টার বাড়ি থেকে আম চুরি করেছি। একদিন আম চুরি করে ধরা পড়লাম। সে কি কান্না!
কাস নাইনে ওঠার পর একদিন বীণার ওপর খুব ক্ষেপে গেলাম। ও হারুণ ভাইয়ের সঙ্গে সিনেমা দেখতে গিয়েছিল। এসে চুপি চুপি সেই সিনেমার গল্প বলল। আমার তখন গা জ্বালা করছিল। ও কেন হারুণ ভাইয়ের সঙ্গে সিনেমা দেখতে যাবে? ব্যাপারটা কিছুইতে মেনে নিতে পাছিলাম না। তা ছাড়া হারুণ ভাই সিগারেট খায়। সিগারেট খাওয়াকে তখন আমি বিরাট একটা পাপ মনে করতাম।
আমি রেগে বীণাকে বললাম, ‘এত বড় একটা লোকের সঙ্গে তুই সিনেমা দেখতে গেলি?’
‘বারে আমি বড় হয়ে গেছি না।’
‘হারুন ভাই সিগারেট খায়।’
‘তাতে তোর সমস্যা কি?’
‘সিগারেট খাওয়া পাপ।’
আমার উত্তর শুনে বীণার সে কি হাসি। ওর হাসির শব্দই বলে দেয়, ইবু, তুই একটা বোকা। আমিও বোকার মতো ওর হাসি দেখছি। ও হাসি থামিয়ে বলল, ‘শোন, সিগারেট না খেলে মুখ থেকে দুধের গন্ধ যায় না।’
‘কি বলছিস? ছি...’
‘এ জন্যই তো তুই এখনও গুট্টবাবু।’
এ কথা বলে ও আমার নাকে চাপ দিল। আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছি। কী করব বুঝতে পারছি না। বীণা বলল, ‘তোর এখনো বয়স হয়নি রে ইবু। তুই চিরকাল বোকাই থাকবি।’
আমি বোকা কী না জানি না। তবে বীণা হারুণ ভাইয়ের সঙ্গে বেড়াতে যাক, এটা আমি চাইতাম না। যদিও ও প্রায়ই হারুণ ভাইয়ের সঙ্গে এখানে ওখানে যেত। তখন আমার বুকের কোথায় যেন ব্যথা করত। পরে বুঝেছি ওরা প্রেম করে। কাস নাইনে উঠার পরও যে ছেলে প্রেম, ভালোবাসা কী তা বোঝে না, তাকে বোকাই বলা যায়। এ নিয়েও কষ্ট পেতাম।
বীণার কারণেই হয়তো বা মেয়েদের প্রতি আমার একটা ঘৃণা দেখা দিল। এমনকি প্রেম ভালোবাসার প্রতি অনীহাও বলা যায়। মনের মাঝে বারবার মনে হলো, এসব পাপ। সাক্ষাৎ পাপ। আমি কখনো এসবের ভেতরে যাব না। আমাকে অনেক বড় হতে হবে। অনেক বড়।
অথচ এই আমার মাঝেই একদিন ওলট পালট হয়ে গেল। আমাদের পাড়ায় দবির উকিল নামের এক ভদ্রলোক থাকতেন। তার দুটো মেয়ে। বড় মেয়ে রিমি, ছোট রিমু। সেই রিমিই একদিন আমাকে ডাকল। আমি মোড়ের দোকান থেকে বড় ভাইয়ের জন্য বৃস্টল সিগারেট কিনে ফিরছি। সে পেছনে থেকে ডাকল। স্পষ্ট। বলল, ‘এই, এই ইবু ভাই।’
আমি মাথা ঘুরিয়ে তাকালাম। চিনতে পারিনি। বললাম, ‘আমাকে ডাকছেন?’
‘হ্যা আপনাকেই। আমাকে চিনতে পারছেন না? আমি রিমি।’
আমি তখনো ভালোভাবে চিনতে পারিনি। তুবও হাসি মুখে বললাম, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, চিনব না কেন?’
‘দেখুন পাড়ার কয়েকটা ছেলে আমার পিছু নিয়েছে। আমাকে একটু বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিবেন?’
সে আমাকে চোখের ইশারায় ছেলেগুলোকে দেখাল। আমি ওদের চিনি। আমাদের স্কুলেই পড়ত। একজনের নাম মনির। গতবার এসএসসিতে ফেল মেরেছে। আমরা ফেল্টু মনির বলি। বজ্জাতের হাড্ডি। সবাই ওকে ভয় পায়। আমারও কেমন জানি ভয় ভয় করতে লাগল। কিন্তু সেই বয়সে একটা মেয়ে, তাও আবার জীবনের প্রথম সাহায্য চেয়েছে। আমি কি সাহায্য না করে পারি? এমন পরিস্থিতিতে যেকোনো কাপুরুষও বীরপুরুষ হয়ে যায়। কোথা থেকে যেন সাহস পায়। আমারও তাই হলো। আমি বললাম, ‘ভয়ের কিছু নেই। চলো।’
দুজন পাশাপাশি হাঁটছি। আমি আড়চোখে বার বার ওর দিকে তাকাচ্ছি। ও মনে হয় ভয় পেয়েছে। ল্যাম্পপোস্টের আলোতে ওকে আবছা আবছা দেখা যাচ্ছে। ওর ঠোঁট দুটো এতো দ্রুত কাঁপছে যে, বার বার তাকিয়ে দেখতে ইচ্ছে হয়। এই অসময়েও আমার মনের কোথায় যেন নড়ে উঠল। বার বার কেন জানি শরীর শিউরে উঠছিল। একটা মানুষের ঠোঁট এতো সুন্দর করে কাঁপতে পারে তা আমার আগে জানা ছিল না।
আমি বললাম, ‘তোমার হাঁটতে কি অসুবিধা হচ্ছে?’
‘না।’
‘রিকশা নেব। আমার কাছে টাকা আছে।’
কথাটা শেষ করতেই মনে হলো খুব ভুল কথা বলেছি। আমি বোকার মতো আবার তাকালাম। ওর ঠোঁট কাঁপছে। তখনই বুঝলাম মনির আর তার দল আমাদের পিছে পিছেই আসছে। কী ভয়ঙ্কর!
ভয় পেয়ে আমি রিমির হাত চেপে ধরলাম। ও কিছু বলল না। আমার শরীর শিউরে উঠছে বারবার। অজানা ভয়, অজানা আতংক, অথচ অজানা ভালোলাগা। যেন বহুদিনের একটা পুরোনো একটা ভালোবাসার গন্ধ।
রিমি হঠাৎ হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে দৌড় দিল। ওদের বাড়ির সামনে কখন এসে পড়েছি বুঝিনি। এক প্রকার বিভ্রম হলো আমার।
আমি উল্টো দিকে ফিরলাম। মনির এসে সামনে দাঁড়াল। বলল, ‘কি রে শালা তেলচাটা, খুব তো শিয়ানা হইছ।’
আমি কী বলব খুঁজে পেলাম না। ভয়ে দৌড় দিব কি না বুঝে উঠতে পারছি না। তা ছাড়া দৌড় দিয়েও তো পালাতে পারব না। ওরা তো অনেক, বুকটা কাঁপছে। মনির এগিয়ে এসে বলল, ‘কত দিনের পরিচয়?’
‘আজই।’
‘শালা তেলচাটা বলে কী? একদিনের পরিচয়ে হাত ধরিস?’
‘না মানে।’
‘চুপ থাক শালা। শালার এখনো নুনু ফোটেনি, শালা প্রেম করবে।’
মনির হাত উঁচিয়ে আমার পিঠে চড় বসিয়ে লাথি দিল। আমি ধপ করে পড়ে গেলাম। যেখানে পড়লাম ওখান থেকে রিমিদের বাসা সোজা দেখা যায়। বারান্দায় ও দাঁড়িয়ে আছে।
কী অবাক কাণ্ড! এতো দেখি বাংলা ছবি। নায়িকা বারান্দায়। আমি ভিলেনের সামনে। আবার পুরনো উত্তেজনা। নায়কের মতো একাই গুন্ডাদের শায়েস্তা করতে গেলাম।
পারলাম না। ওরা আমাকে এমন ধোলাই দিতে শুরু করল যে, বাপের নাম ভুলে গেলাম। রিমি নিশ্চয়ই সেই দৃশ্য দেখেছিল।
আমাকে ওদের হাত থেকে বাঁচাল সোলায়মান চাচা। তিনি ওপথ দিয়েই আসছিলেন। হট্টগোল শুনে এগিয়ে এলেন। মনির দৌড়ে পালানোর সময় চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলল, ‘শালা তেলচাটা, স্কুলে যাবি না। আগে স্কুলে আয়।’
সোলায়মান চাচা এসে আমাকে ধরলেন। আমার নাক দিয়ে রক্ত পড়ছে। এ অবস্থাতেও আমি বারান্দার দিকে তাকালাম। রিমি তখনো ওখানে দাঁড়িয়ে আছে।
আমি বাসায় ফিরলাম। সে রাতে আমার খুব জ্বর হলো। পরের ছ’সাত দিন স্কুলে গেলাম না। আমার ধারণা ছিল ব্যাপারটা রাষ্ট্র হয়ে যাবে। নিজের মাঝে এরকম ভয়, উত্তেজনা নিয়েই স্কুলে গেলাম। মনিরের সঙ্গেও দেখা হয়েছিল। কিন্তু এ নিয়ে আর কিছু হয়নি।
এ ব্যাপারটাকে আমি আমার জীবনের যতো বড় একটা ঘটনা ভেবে বসেছি আসলে মনিরের কাছে কিংবা অন্যদের কাছে তা নিছক একটা খেলামাত্র। অথচ কারো কারো জীবনে ছোট্ট একটা ঘটনাই বেশ বড় একটা দাগ কেটে যায়।
দাগ যে বেশ ভালোভাবেই কেটেছিল তা বুঝেছি কিছুদিনের মধ্যেই। রিমিকে নিয়ে আমি অনেক কিছু ভেবেছি। গভীর রাতে ওকে মনে করে আমি দুটি কবিতাও লিখেছি। নিজের মাঝে ভাবখানা এমন হয়েছিল যে, আমি মস্ত একটা কিছু হয়ে গেছি।
আমাকে বাস্তবে টেনে আনল আমার বোধ। কিছুদিনের মাঝেই আমি বুঝলাম এ আমার দিবাস্বপ্ন। এরপর অনেক চেষ্টা করেও তার সঙ্গে দেখা করতে পারিনি। বলা যায় আমার এত সাহস ছিল না। বিশেষ করে ওদের পড়াতেই যাইনি।
অস্বীকার করব না এটা ছিল আমার ভয়। আসলে প্রথম জীবনের এই ভয়কে আমি কোনোদিনই অতিক্রম করে যেতে পারিনি। এ কষ্টটার কথা আমি কখনো বোঝাতে পারি না।
সেই থেকে আমার পেছন ফেরা শুরু। সম্ভবত এ কারণেই আজ রিমিকে হারাতে হয়েছে।
আমি জীবনে বহুবার সাহসী হতে চেয়েছি। এসএসসি পাস করার পর হুট করে মনে হতো, এখন তো আমি অনেক বড় হয়ে গেছি। এখন আর ভয় কি? যাই না ও-পাড়ায়। একবার ওদের বাসার সামনে দাঁড়াই। অবশ্য এটাও বার বার মনে হয়েছে যে, ওদের বাসার সামনে গেলেই ওকে পাব। কিংবা ও জানালার পাশে আমার জন্য দাঁড়িয়ে থাকবেÑ এটা তো আর সম্ভব নয়।
অবশ্য মনের মাঝে ভয়ও ছিল অন্য একটা। আমি তাকে যেভাবে মনে রেখেছি। ওর চেহারা বুকের গহিনে যেভাবে এঁকে রেখেছি। কিংবা সেদিনের সন্ধ্যার ঘটনা আমার মনে যতটা দাগ কেটেছে, ওর মনে হয়তো দাগই কাটেনি। ছোট বয়সের নিতান্তই তুচ্ছ একটা ঘটনা। হয়তো আমাকে দেখলে চিনবেই না।
সুন্দরী মেয়েরা এসব ক্ষেত্রে অত্যন্ত অন্যরকম। অনেক ছেলে তাদের পেছনে ঘুরলে কাউকেই তেমন গুরুত্ব দেয় না। ওদের ভাব এ সময় খুব বেড়ে যায়। ওইসব মেকিভাব অবশ্য আমার একদম সহ্য হয় না। কেউ আমার সামনে এমন ভাব নিলে খুব জেদ লেগে যায়।
অবশ্য রিমির ব্যাপারটা ছিল আমার কাছে সম্পূর্ণ অন্যরকম। সব মানুষের জীবনেই কি কোনো এক সময় সব হিসাবের বাইরে ফলাফল আসতে থাকে? বিধাতা হয়তো তেমনি এক নিয়মের জালে আমাদের ভাবনাকে ডুবিয়ে দেন।
বিধাতার ভাবনাগুলো আমাকে বরাবরই অবাক করেছে। যখন আমি কলেজে পড়ি তখন দ্বিতীয়বার ওর সঙ্গে দেখা হলো।
ওকে মনে রেখেছিলাম অন্যভাবে। বলা যায় না পাওয়ার খাতায় তার নাম লিখেছিলাম। হঠাৎ দেখা হবে এ আশা করিনি। বরং ওকে দেখার পরপরই আমার পানি পিপাসা পেল। বার বার গলা শুকিয়ে আসছিল। অথচ ও কথা বলছিল খুব স্বাভাবিকভাবে। যেন বহুদিনের পরিচয়।
‘আপনাকে খুব ব্যস্ত মনে হচ্ছে?’
‘হ্যাঁ, আজ ফরম ফিলাপের লাস্ট ডেট।’
‘শেষের দিন ফরম ফিলাপ করছেন কেন? আগে থেকে পানচুয়াল হতে পারেন না?’
আমি লজ্জা পেয়ে আমতা আমতা করতে লাগলাম। যেন পানচুয়াল না হওয়াটা এক বিরাট অপরাধ।
‘সেদিনের ঘটনার জন্য আমি দুঃখিত। অথচ থ্যাংকস জানানো হয়নি।’
‘কোন দিন?’
আমি খুব অবাক হলাম। সে বলল, ‘ওই যে আমাকে এগিয়ে দিয়ে শুধু শুধু মার খেলেন।’
রিমি এমনভাবে কথা বলছিল যেন কদিন আগের ঘটনা। মার খাওয়ার ব্যথা পর্যন্ত শরীর থেকে যায়নি। অথচ এরই মাঝে দুটি বছর চলে গেছে। ও যে ব্যাপারটা মনে রাখবে এটা আমি কল্পনাই করতে পারিনি। ব্যাপারটা আমার কাছেই ঝাপসা হয়ে আসছিল।
আসলে মেয়েরা কি মনে রাখে আর কি মনে রাখে না তা তারা নিজেরাই জানে না। আমি সেদিন সত্যিই মারাত্মক অবাক হয়েছি। জীবনের খুব অল্প সময়েই মানুষ এমন মারাত্মক অবাক হয়। যেন আমি যা চাইনি তাই আমার হাতের মুঠোয় চলে এসেছে।
‘সেটা তো অনেক আগের কথা। তখন তো ছোট ছিলাম।’
‘এখন বুঝি বিশাল বড় হয়ে গেছেন?’
‘হ্যাঁ, তা তো কিছুটা ঠিকই।’
‘মোটেও ঠিক না। আপনি আপনার দুবছর আগের একটা ছবি আর আজকের একটা ছবি মিলিয়ে দেখুন। কোনো অমিল নেই। পার্থক্য শুধু এটুকু যে, এখন আপনি সেভ করেন।’
আমি হাসলাম। যেন সেভ করাটা একটা হাসির ব্যাপার। কিছুটা লজ্জাও পেলাম। সবকিছু কেমন যেন এলোমেলো হয়ে আসছিল।
আমাকে অবাক করে দিয়ে ও বলল, ‘আমার খুব ুধা পেয়েছে।’
‘চলো ক্যান্টিনে। গরম সিঙ্গারা খাওয়াব।’
‘শুধু সিঙ্গারা! সঙ্গে কিছু না?’
‘না মানে আর যা আছে সব।’
ওকে নিয়ে ক্যান্টিনে বসেই মনে হলো বিশাল এক বোকামি করে ফেলেছি। আসলে এসব ক্ষেত্রে আমি মোটেই পাকা নয়। ওকে ভালো কোনো ফাস্টফুডে নিয়ে যেতে পারতাম। ইদানীং তো রাস্তাঘাটে ব্যাঙের ছাতার মতো ফাস্টফুডের দোকানের ছড়াছড়ি। অথচ কেমন বোকার মতো তাকে ক্যান্টিনে নিয়ে বসালাম। নিজের বোকামির জন্য রাগ উঠছে।
রিমি বেশ আয়েশ করে সিঙ্গারা খাতে লাগল। খেতে খেতে বলল, ‘গত দুবছর কেন জানি বার বার মনে হচ্ছিল আপনার সঙ্গে আমার দেখা হবে।’
‘এই তো হলো।’
‘আরো আগে দেখা হওয়া উচিত ছিল।’
‘কেন?’
‘এমনি। কোনো কারণ নেই। তবে হ্যাঁ, আপনাকে একদিন স্বপ্নে দেখলাম।’
‘তাই নাকি!’
‘বিশ্বাস হচ্ছে না? তবে এটা সত্যি। দেখলাম বিশাল একটা মাঠ পেরিয়ে আপনাকে নিয়ে হাঁটছি। কি হাস্যকর স্বপ্ন, তাই না?’
‘হাস্যকর হবে কেন? সত্যি সত্যি হাঁটলেই বা কি?’
শেষের কথাটা বলার পর আমি নিজেই চমকে উঠলাম। সব পুরুষই কি আমার মতো তার ভালোবাসার মানুষের সামনে এভাবে সাহসী হয়! আমি কথাটা কিভাবে বললাম? ও কথাটাকে কিভাবে নিল? নিছক কথার কথা নাকি অন্য কিছু। বুঝলাম না।
‘ঠিক আছে যান। একদিন সত্যি সত্যি হাঁটব।’
‘হাত ধরে ধরে...’
এবার ও হাসল। আমি কথা ঘুিরয়ে বলাম, ‘আরো সিঙ্গারা দিতে বলি?’
‘না, না, থাক। খুব ুধা পেয়েছিল। ুধা পেলে আমি কেমন জানি হয়ে যাই।’
‘কেমন হয়ে যাও।’
‘পানির তলের মানুষের মতো।’
আমি হেসে উঠলাম। ও বলল, ‘হাসছেন কেন?’
‘এমনি। তুমি বেশ মজা করে কথা বলতে পার।’
‘এভাবে কথা বললে ছেলেরা চট করে প্রেমে পড়ে যায়। এটা হলো মেয়েদের কথা বলার বিশেষ স্টাইল। অনেকটা কারেন্ট জালের মতো। ছেলেরা যে জালে আটকে ইলিশ মাছের মতো ছটফট করতে থাকবে। কিন্তু ছাড়া পাবে না।’
‘ধ্যাৎ, কি যে বল?’
‘হ্যাঁ সত্যি বলছি। আমি কিন্তু আপনার চারপাশেও জাল পেতেছি। যদিও কারেন্ট জাল নিষিদ্ধ।’
এ কথা বলেই রিমি হো হো করে হাসল। বিশাল একটা রশিকতা করতে পেরে সে খুব খুশি। কোনো এক অজ্ঞাত কারণে সেদিনটা ছিল আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ দিন। এমন দিন জীবনে খুব কমই আসে।
ওর রশিকতা, ওর কথা বলার স্টাইল সবই আমার কাছে ভালো লাগত। এতটা ভালো যে মুখ ফুটে তা প্রকাশ করতে পারতাম না ঠিকই কিন্তু কথাটা যেন মনের আয়নায় বার বার দোল খেত।
কলেজের ঘটনাগুলো এত দ্রুত ঘটতে লাগল যে আমি তাল হারিয়ে ফেলাম। কি করব ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। তবে এতটুকু বুঝতে পারছিলাম ও আমাকে চাচ্ছে। সে বার বার বোঝাতে চাচ্ছে আমি যেন তাকে মুখ ফুটে কথাটা বলি।
আমিতো অবাক! যে যাকে আমি রাতের পর রাত ভেবেছি। যাকে নিয়ে আমার কত কত কল্পনা, সে আমাকে ডাকছে। অথচ আমি তাকে বলতে পারছি না কেন? কেন বলতে পারছি না তুমি যা চাইছ আজ থেকে দুবছর আগেই আমি তোমাকে দিয়ে রেখেছি। তুমিই আমার শ্রেষ্ঠ সম্পদ।
আমি আসলে দুর্বল মানুষ। নাইলে কথাটা মুখে আনতে পারছিলাম না কেন? কেন তার চোখে রেখে বলতে পারছিলাম না ‘তুমি কেবল আমার।’ অথচ সে আমাকে প্রায়ই চিঠি লিখত। বেশ কয়েকটা চিঠির পর একদিন সে অভিযোগও করল।
রিমির ধারণা ছিল আমি বীণাকে ভালোবাসি। এ কারণেই তাকে পাত্তা দিচ্ছি না। কী ভুল ধারণা ছিল তার। কী ভুল? অথচ ওর চিঠি আসার পরই ভাবতাম আজ একটা চিঠি আমিও লিখব। বেশি কিছু না লিখতে পারি। অন্তত আমার কথাটা শুধু তাকে জানাব।
কাগজ কলম নিয়ে বসি। কাগজের ওপর সম্বোধন লিখি। তারপর বসে থাকি অনেকক্ষণ। আর লেখা হয় না। কতটা দুর্বল আমি!
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই আগস্ট, ২০০৭ বিকাল ৩:৪১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

