প্রকাশ : যায় যায় দিন কিডস, ১৫ আগস্ট ২০০৭
গত পাচদিন হলো মানকুর কোনো খোজ নেই। স্কুলের আশপাশে ওর ছায়া পর্যন্ত পড়েনি। অথচ অন্যরা সবাই মিলে স্কুলে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করছে। হেড স্যার বলেছেন, সবাই মিলে কোনো কাজ করলে কোনো কাজই ছোট না। ইবু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করছে দল নেতা হয়ে। কারণ সে ফার্স্ট বয় ও ক্লাস ক্যাপ্টেন।
বন্যাতে স্কুলে পানি উঠেছিল। স্কুলের ছাদে আশ্রয় নিয়েছিল এলাকার বন্যার্তরা। স্কুল খোলার পর ক্লাস নেয়ার মতো অবস্থা ছিল না। তাই সবার দায়িত্ব বেড়েছে। ছাত্র- শিক্ষক-কর্মচারী সবাই মিলে নেমে পড়েছে পরিচ্ছন্নতা অভিযানে। এমনিতেই বন্যাতে অনেকদিন ক্লাস হয়নি। তাই যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব স্কুল পরিষ্কার করা দরকার। কিন্তু ইবু দেখতে পেল, ক্লাসের সব ছাত্র থাকলেও মানকুর কোনো খোজ নেই। ও কাজের ভয়ে পালিয়েছে। ব্যাপারটা কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না। কুদজাত স্যারকে বিচার দিতে হবে। ক্লাস ক্যাপ্টেন হিসেবে তার একটা দায়িত্ব আছে।
ইবু অবশ্য অনেক আগে থেকেই মানকুকে দেখতে পারে না। গতবার রেজাল্ট বের হওয়ার পর সে জাম গাছের নিচে বসে ছিল। ইবু এগিয়ে গিয়ে বললো, দেখলি তো এবারও তুই প্রথম হতে পারলি না! আমিই প্রথম হলাম।
মানকু ওর কথায় হেসে বলে, তুই প্রথম হইছস, আমি খুশি। আমার রোল দুই হইছে তাতে আমার কোনো দুখ নাই। আমরা দুই নম্বর মানুষ।
মানকুর উত্তর শুনে খুব রাগ উঠেছিল ইবুর। রোল দুই তার সঙ্গে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাই করতে পারে না। প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়া ফার্স্ট বয় হয়ে কোনো মজা আছে নাকি? তাছাড়া ও প্রায়ই স্কুলে ময়লা জামা গায়ে দিয়ে আসে। একদিন শার্টের হাতায় হলুদের দাগ লাগিয়ে এলো। কি হাস্যকর! এখন আবার কাজের ভয়ে পালিয়েছে। কোনো মানে হয়?
ইবু মানকুর ব্যাপারটা নিয়ে সবার সঙ্গে আলোচনা করে। শাকিল বললো, ঠিক বলেছিস, ওই ব্যাটা আমাদের এড়িয়ে চলে। ব্যাটা পেয়েছে কি?
সোহাগ বললো, চল, ব্যাটাকে বাড়ি গিয়ে ধরে আনি।
কিন্তু ওর বাড়ি কোথায়?Ñ ইবু বললো।
হিরণ বললো, আমি চিনি। বাশের পুলের ওপাড়ে থাকে।
সোহাগ বললো, কিন্তু বন্যায় তো পুল ভেঙে গেছে। বাশের পুল তো পানির চাপ সহ্য করতে পারেনি।
সবাই স্কুল ছুটির পর পুলের কাছে পৌছাল। বাশের পুলটা নেই। কলাগাছের ভেলায় এলাকার মানুষ পার হচ্ছে। একবার পার হতে দুই টাকা লাগে। সবাই মিলে সেই ভেলাতেই পার হলো। ইবু বললো, কলাগাছের ভেলায় চড়তে তো খুব মজা!
হিরণ বললো, মজা না ছাই। উল্টে গেলেই বুঝবি। পচা পানিতে গা ভিজবে। গায়ে চুলকানি হবে।
কলাগাছের ভেলাটা অবশ্য উল্টে যায়নি। মানকুদের বাড়িও খুজে পাওয়া গেল না। তবে দূরে একটা বকন গাছের নিচে তাকে পাওয়া গেল। হেলান দিয়ে বসে আছে সে। সবাইকে একসঙ্গে দেখে বললো, তোরা?
ক্লাসের দুই রোল তোর। অথচ কাজের ভয়ে পালিয়েছিস?Ñ বললো ইবু।
না বন্ধু, পালাইনি। কিন্তু আমি কি পরে স্কুলে যামু। বাশের পুলটাও ভেঙেছে। দুই টেকা লাগে পার হতে।
মানে?Ñ অবাক হয়ে প্রশ্ন করে রবিন।
ঘর বানে ভাইস্যা গেছে। ফসল নাই। এখন আমরা কি খাই, কোথায় থাকি?
মানকুর বন্ধুরা চুপ করে থাকে। ইবু এগিয়ে এসে বললো, তোর বই-খাতা?
বই খাতা নাই। বানের পানির টানে ভাইস্যা গেছে। আমার মনে হয় আর পড়াশোনা হবে না। তোরা প্রাইভেট পড়িস, নোটবই পড়িস, আমি ওগুলো জন্মেও দেখিনি। রাতে ঘরে কেরোসিন না থাকলে কুপি জলত না। শেষরাতে উঠে পড়তাম। এখন তাও হইবো না। Ñবলতে বলতে কেদে ওঠে সে।
ইবু ওর কাধে হাত রেখে বললো, কেন হবে না? আমরা আছি না! তুই আর দুই নাম্বার মানুষ থাকবি না। স্কুলের সবাই মিলে আমরা একটা ব্যবস্থা করবোই। বন্ধুর জন্য আমরা এতোটুকুই যদি না করতে পারি তাহলে আমরা কিসের বন্ধু?
সবাই একবাক্যে হ্যা বলে উঠলো।
রবিন বললো, শফিকের বাবা বাজার কমিটির চেয়ারম্যান। তাকে বলে তোদের জন্য একটা বাড়ি ঠিক করার ব্যবস্থা করবো।
মাহফুজ বললো, স্কুলেরও তো একটা ফান্ড আছে। হেড স্যারকে বললে নিশ্চয়ই ওখান থেকে সাহায্য করবেন।
কাল স্কুলে গিয়ে ঘোষণা দেবো, যেন সবাই একদিনের টিফিনের পয়সা মানকুর জন্য দেয়।Ñ ইবু বললো।
রবিন বললো, আমরা সবাই এগিয়ে আসবো। আমরা ছোট বলে পিছিয়ে থাকবো কেন? ছোট-বড় সবারই দায়িত্ব সমান।
সবাই মাথা দুলিয়ে হ্যা বললো। মানকু এগিয়ে এসে বন্ধুদের জড়িয়ে ধরলো। মেঘের আড়াল থেকে সূর্যমামা বেরিয়ে এলো। হলুদ রোদে ওদের শরীর উজ্জ্বল হচ্ছে। একঝাক সাদা মেঘ উড়ে যাচ্ছে নীল আকাশে...।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই আগস্ট, ২০০৭ বিকাল ৩:৫৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

