somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

উপন্যাস_দ্বিতীয় জীবন_পর্ব-০০৩

১৬ ই আগস্ট, ২০০৭ বিকাল ৪:২০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আটাশ ডিসেম্বর
আসলেই আমি খুব দুর্বল মানুষ। দুর্বল মানুষ বলেই হয়তো এমন হচ্ছে। নইলে এই রাত দুপুরে কেন রিমির চিঠি পড়ব? কেন বারবার তার কথা মনে করব? তার গল্প তো অনেক আগেই শেষ হয়েছে। অবশ্য গল্প যে শেষ হয়েছে এ কথাও জোর দিয়ে বলতে পারি না।
সত্যিই আমি দুর্বল মানুষ। দুর্বল মানুষ বলেই ওর চিঠি মাঝে মাঝেই পড়ি। কতবার যে পড়েছি তার ঠিক নেই। আর এখন তো অফুরন্ত সময়। সময় কাটতেই চায় না। অবশ্য আমি সময় কাটাতে ওর চিঠি পড়ছি তা কিন্তু না। ওর চিঠিগুলোতে তেমন কিছু লেখা থাকত না। তবুও কেন জানি পড়তে ভালো লাগে।
ইবুভাই,
এক সাথে কখনো হাসি আর কান্না দেখেছেন? ঠিক আছে আপনাকে একদিন দেখাব। আজ বাসায় আম্মা নেই। আমাকেই রান্না করতে হবে। আমি কিন্তু সব রান্না করতে পারি। ডাল থেকে শুরু করে চাইনিজÑ যে কোনো রান্না। আমি খুব ভালো চা বানাতে পারি। আপনাকে একদিন এক কাপ বানিয়ে খাওয়াব। তখন বলবেন, ‘প্লিজ রিমি, তুমি কত ভালো, লক্ষ্মী, আমাকে আরো এক কাপ...’
তখন আমি হাত থেকে কাপটা কেড়ে নিয়ে বলব, ‘উহু, দেয়া যাবে না। কারণ আমি মোটেও লক্ষ্মী মেয়ে না। আমি একটা পচা মেয়ে।’
আচ্ছা আপনি এক কাপে কত চামচ চিনি খান? দেড় চামচ? আপনি মুখটা ওমন করে রেখেছেন কেন? চা খেতে ইচ্ছে করছে? ঠিক আছে অপেক্ষা করেন। আমি সাত মিনিটে চা বানিয়ে নিয়ে আসছি। রং চা খান তো? ঘরে কিন্তু দুধ নেই। তেজপাতা দিয়ে বানিয়ে দেই? আমার বানানো তেজপাতার চা’ও কিন্তু মজা। ঠিক আছে সাথে একটা লং দিচ্ছি।
কী বলেছিলাম না আমার চা মজা হয়। আপনার খাওয়ার স্টাইলটা কিন্তু সুন্দর। ‘থ্যাংকস’ বলেন? তা না হলে কিন্তু চিমটি দেব। আমার চিমটি কিন্তু মারাত্মক। একবার দিলে আমাকে ছাড়া অন্য কারো কথাই মনে পড়বে না। আমি কিন্তু কামড়ও দিতে পারি। রাক্ষসের মতো। ছোটবেলায় আমাকে নাকি বাচ্চারা ভীষণ ভয় পেত। আপনাকে কামড় দিয়ে সাথে সাথে রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করে দেব। দেখছেন আমার দাঁত, কত সুন্দর। আহা, দেখেন না। একেবারে তুথপেস্টের অ্যাড করা যাবে। ই-ই-ই। কী সুন্দর না?
বলেন তো ধ্রুব আর ইবুর মধ্যে পার্থক্য কি? ইবু হলো আমার পরিচিত একজন মানুষ। আর ধ্রুব হলো আমার ভালোবাসা। জানেন তো একতরফা ভালোবাসায় স্বার্থপরতা থাকে না। সুতরাং আমি একজন নিঃস্বার্থপর। অর্থাৎ আমি খুব ভালো মেয়ে। খুব ভালো মেয়েরা একসাথে হাসি আর কান্না করতে পারে।
আজ আমি শাড়ি পরেছি। কারণ আজ আপনার জন্মদিন। আমাকে কিন্তু খুব সুন্দর দেখাচ্ছে। যতবার আয়নায় তাকাচ্ছি, ততবারই মুগ্ধ হচ্ছি। মনে হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের লাবণ্যও ফেল। কী বিশ্বাস হচ্ছে না? না হোক। কারণ আমি সুন্দর অসুন্দর যাই হই না কেন আপনি তো আর আমাকে ভালোবাসবেন না। আসলে আমার ভাগ্যটাই খারাপ। এজন্য মাঝে মাঝেই মন খারাপ হয়। মন খারাপ হলে রাগও হয়। তখন মনে হয় বিলাই চিমটি দিয়ে আপনাকে গোছল করিয়ে দেই। নিমপাতার শরবত খাওয়াই। আপনি হচ্ছেন শীল মাছ, গোলাপের কাঁটা, কাবাবের ভেতর হাড্ডি, হনুমান, ইঁদুর, কাঠবিড়ালী, তেলাপোকা, ভাঙা চেয়ার, কাজু বাদাম, পাঠ্যবই, গাড়ির কালো ধোঁয়া, টক কমলা, নষ্ট চুইংগাম, পচা বড়ই আরো আরো সব।
আপনাকে গতকাল রাত বারোটায় ফোন করতে চেয়েছিলাম। ভাবলাম উইশ করি। কিন্তু আপনি তো আর আমার ফোনের অপেক্ষা করেন না। আপনি তো আবার বীণার ফোনের জন্য অপেক্ষা করেন। কিন্তু ওকে ভালোবেসে কী পেলেন? শূন্য। আমার মতো কেউ আপনাকে ভালোবাসবে না। তাই আপনার জন্মদিন পালন করতেই শাড়ি পরেছি। এখন যদি আমাকে দেখতেন তাহলে বলবেন, আল্লাহ, মেয়েটা এত সুন্দর! আগে তো খেয়াল করিনি। কিন্তু এটা আমার কল্পনা। আমি জানি আপনি কোনোদিন আমাকে বলবেন না। আমার খুব কান্না পাচ্ছে।
ইতি
একটা পচা মেয়ে

রিমির ধারণা ছিল আমি বীণাকে ভালোবাসি। ওকে কখনো ভালোবাসব না। অবশ্য প্রথম দিকে আমারো তাই মনে হয়েছে। কিন্তু ভলোবাসার রঙ বদলায়। আমি ওকে অবশ্য মুখ ফুটে বলতে পারিনি বহুদিন। ও প্রায়ই অভিযোগের চিঠি লিখত। আসলে এই ভালোবাসার ধরনটাই আমার কাছে অধরা ছিল।
একদিন সাহস করে বীণাকে বললাম, ‘জানিস রিমি আমাকে চিঠি লেখে।’
‘কোন রিমি?’
‘ও পাড়ার রিমি।’
‘ও আচ্ছা, উকিলের বেটি। ওর পেটে তো বাপের মতোই প্যাঁচের বুদ্ধি। তা চিঠি লিখে কেন?’
‘জানি না। সম্ভবত আমাকে পছন্দ করে।’
‘তোকে পছন্দ করে মানে?’
‘মানে ভালোবাসে।’Ñ আমি বেশ উৎসাহ নিয়ে গর্বের সঙ্গে ওকে কথাটা বললাম।
‘উকিল আর পুলিশের বেটি বেশি ভালো হয় না।’
‘কে বলেছে তোকে?’
‘একজন মিথ্যার ব্যবসা করে, অন্যজন করে চোর-ছ্যাচ্চরের ব্যবসা।’
‘কথাটা তো এমনও হতে পারেÑ একজন সত্যের সন্ধানী, অন্যজন অপরাদ দমনকারী।’
‘তোর তো দেখি বুদ্ধি খুলে গেছে। বলে ফেল।’
‘কি বলে ফেলব?’
‘ওকে মনের কথাটা বলে ফেল। আরো বুদ্ধি খুলে যাবে।’
আমি ওর দিকে বোকার মতো তাকিয়ে আছি। বীণা আমাকে নিয়ে মস্করা করছে না তো?Ñ বোঝার চেষ্টা করছি। অবশ্য বুঝেই বা কি লাভ?
বীণা বলল, ‘আমার মনে হয় তোর ওর সঙ্গে প্রেম করাটা ঠিক হবে না, ও তোকে ভাজা ভাজা করে ছাড়বে।’
‘কেন?’
‘রোজ রোজ চাইনিজ খাবে। সারাদিন তো ফাস্টফুডের দোকানে দেখি। সেদিন দেখলাম ইমতিয়াজকে নিয়ে বার্গার খাচ্ছে।’
‘বার্গার খাওয়া কি খারাপ?’
‘বার্গার খাওয়া খারাপ না। তবে আমার ধারণা ও তোকে একথা ওকথা বলে তোকে পটিয়ে পটিয়ে ব্যবহার করবে।’
‘ব্যবহার করবে মানে? আমি কি গামছা যে মুখ মুছবে। নাকি পায়জামা যে গিট্টু মারবে।’
‘তুই বুঝবি না রে ইবু, তুই খুব বোকা।’
‘আর তুই খুব চালাক।’
‘আহা রাগ করিস কেন?’
‘তুই আমার সঙ্গে কথা বলবি না।’
‘দেখ ইবু, তুই আমার ওপর রেগে যাচ্ছিস। কিন্তু আমি জানি তুই ভুল করছিস।’
আমি বীনার সঙ্গে তর্কে গেলাম না। এরপর ওর সঙ্গে কিছুদিন কথাও বললাম না। সেই থেকে ওর সঙ্গে আমার দূরত্ব বাড়ল।
আজ মনে পড়ে, সেদিন বীণার কথাটা রাখাটা আমার জন্য কত জরুরি ছিল। সেদিন ওর কথা রাখলে আজ আমার এমন পরিনতি হতো না। আজ রাত জেগে স্মৃতির নুড়িপাথর কুড়িয়ে বেড়াতাম না। ওর চিঠি পড়ে বিচিত্র ভাবনায় ডুবে যেতাম না।
আমি জানি ওর চিঠির মধ্যে কোন সত্য নেই। কখনো ছিল না। কেবলই মিথ্যা দিয়ে সাজানো কথার ফুলঝুড়ি। তারপরও অজানা ভালোলাগা ছুয়ে যায়। মনে হয় এগুলো শুধু লেখা না। এসবের মধ্যেই আছে ওর অনেক অনেক না বলা কথা। ওর আবেগ-অনুভূতি, যা একান্তই আমার মতো করে আমি সাজিয়ে নেই।
রিমির উদ্দেশ্য কি ছিল আজ তা ভাববার অবকাশ আমার নেই। কারণ কোন ভাবনারই হিসেব আমার কাছে মেলে না। বরাবরই যোগফল শূন্য।
আজ আমার জন্মদিন। আমার একত্রিশ বছর পূর্ণ হলো। আমি ছোট একটা বন্দি ঘরে বসে তাকে ভাবছি। ঘরটা অবশ্য আমার। এই ঘরটাতে আমি ছোট থেকে বড় হয়েছি।
একত্রিশ বছর বয়সটা বড্ড অদ্ভুত। এই বয়সটা জীবনকে দু’ভাগে বিভক্ত করে। বলা যায় একত্রিশ বছর বয়সের পর মানুষের দ্বিতীয় জীবন শুরু হয়। এ ব্যাপারটা আমার পা না ভাঙলে হয়তো বুঝতেই পারতাম না।

সর্বশেষ এডিট : ২১ শে আগস্ট, ২০০৭ সকাল ১১:১১
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১১ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪

আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬

লিখেছেন আঘাত প্রাপ্ত একজন, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:২৬

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬

[সম্ভাবনার ক্রমানুসারে নয়ঃ]

আর্জেন্টিনা: আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ তার ডিফেন্স আর ইনজুরি । ৩৮ বছরের তরুণ(!) সেন্টারব্যাক ওতামেন্দি আর কমপক্ষে এক হালি হাফ-ফিট ফুটবলার নিয়ে ১৯ জুলাই পর্যন্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলা সাহিত্যে জায়গা পাচ্ছেন ওসমান হাদী

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১২ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:১৭


সংবাদপত্র যা বলছে
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ জুন ২০২৬ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবই পরিমার্জন-সংক্রান্ত কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকসহ... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

×