জানুয়ারি, ১৯৯২, এক
গাঢ় নীল রঙের একটা প্যান্ট পরে ইবু দাঁড়িয়ে আছে। অবশ্য গাঢ় নীল বললে ভুল হবে। কারণ রঙ কিছুটা উঠেছে, কিছুটা জ্বলে গেছেÑ সবমিলিয়ে একটা বিশ্রী কালার কম্বিনেশন। অবশ্য হকার্স মার্কেট থেকে মাত্র ৬০ টাকা দিয়ে কেনা প্যান্টের অবস্থা এরচেয়ে আর কী ভালো হবে? সে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। মাত্র ১৫ বছরের একটা কিশোরের নাকের ডগায় এমন গম্ভীর দীর্ঘশ্বাস মানায় না। তারপরও চলে আসে।
রাব্বীকে দেখা গেল মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে আসছে। এসেই বলল, ‘ভিতরে চল।’
‘এখনো একঘণ্টা দেরি আছে। মেশিনটা নাকি এখনো চালুই করা যায়নি।’
‘মেশিন না রে বলদ, কম্পিউটার। সবচেয়ে দামি কম্পিউটার, ৩ লাখ টাকা দাম।’
একটা কম্পিউটারের দাম ৩ লাখ টাকা! রাব্বী নিশ্চয়ই চাপা মেরেছে। কিন্তু হতেও পারে। আসলে কম্পিউটার সম্পর্কে তার তেমন ধারণা নেই। শুনেছে এটা নাকি বিজ্ঞানের আরেক আশ্চর্য। এই মফম্বল শহরে ভিটিটিআই কর্তৃপক্ষই প্রথম এ কম্পিউটারটা এনেছে। আজ সাধারণ জনগণকে তা দেখানো হবে। কিন্তু কম্পিউটার দেখার জন্য এত ভিড় হবে এটা ইবুর আগে জানা ছিল না। আগে জানলে সে আসতই না। কম্পিউটার তো আর উটপাখি না যে দেখতেই হবে। আর দেখেই বা কী?
ছোটবেলায় একবার এমন ঘটেছিল। তখন ইবুর বাবা বেঁচে ছিল। খবর এল আটোয়ারী উপজেলার হিজল নদীর ধারে জলহস্তি ধরা পড়েছে। সেই নিয়ে কত গল্প। এক জেলে নাকি মাছ ধরার জাল ফেলেছে। জালের মাথায় জলহস্তি ওঠে এসেছে। খুবই হাস্যকর গল্প। কারণ জলহস্তির যা জ্ঞান তাতে একটা সাধারণ তইরা জালে তাকে আটকানো সম্ভব না।
জলহস্তি আটকের খবর পেয়ে ছেলে বুড়ো সবাই ছুটছে। রাস্তায় শোনা গেল কিছু উদ্ভট গল্প। এক গ্রামের বুড়ো নাকি দেখেছে। ওটা নাকি জলহস্তি না। এক বিচিত্র প্রাণী ধরা পড়েছে। সেই প্রাণীর নাকি আবার চোখ একটা। সেই প্রাণীকে যে একবার দেখে তারই নাকি ডায়েরিয়া হয়। ওটা নাকি আসলে প্রাণী না, ইচ্ছারূপী জিন। ইবু তার বাবার সঙ্গে ছুটল সেই অদ্ভুত প্রাণী দেখার জন্য। ইতোমধ্যে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষকে খবর দেয়া হয়েছে। অজপাড়াগাঁয়ের মধ্য দিয়ে হিজল নদীর পাড়ে পৌঁছাল তারা। প্রাণীটাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে বাঁশের ফাঁদে আটকে রাখা হয়েছে। তার শরীরের কয়েক জায়গায় রক্ত ঝরছে। পরে জানা গেল ওটা জলহস্তিও না, কোনো জিনও না। ওটা বিরল প্রজাতির একটা গল্গার, যা হিমালয়ের গহিন জঙ্গলে পাওয়া যায়। আর যে গণ্ডার জেলেরা ধরেছে তা ভারতের এক সার্কাস দলের। ওটা খাঁচা ভেঙে পালিয়েছে। এদিকে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ জলহস্তি নিয়ে যাওয়ার ভ্যান এনেছে। এসে দেখে ওটা জলহস্তি না, বরং গণ্ডার।
পরে পত্রিকা পড়ে ইবু জেনেছে গণ্ডারটা ভারতের সার্কাস দলে ফেরত দেয়া হয়েছে। তবে তিন দিন না খাওয়া অবস্থায় থেকে মারা গেছে। কম্পিউটার সম্পর্কে রাব্বী যেভাবে বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলছে তাতে এটাও যে আহামরি কিছু হবে নাÑ এমন ধারণাই করছে ইবু। কোনো একটা অজ্ঞাত কারণে ইদানীং তার কোনো কিছুই ভালো লাগে না। বিশ্বাসেও কেমন জানি অবিশ্বাস ঢুকে গেছে। রাব্বী বলল, বুঝলি, কম্পিউটারের কিন্তু জ্বর হয়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

