ভলবো বাসটা এই এলাকায় নতুন ছেড়েছে। যারা এই বাসে ভ্রমণ করে তারা সবাই বলে ‘মাটিতে শান্তির নীড়।’ বেশ নাম করেছে ক’দিনেই। সমস্যা একটাই। ভাড়াটা মাত্রাতিরিক্ত। একটু বেশি হলেও মেনে নেয়া যেত।
ইবু বেশ সখ করেই এবার ভলবো বাসের টিকিট কেটেছে। সত্যি কথা বলতে কী, এ বাসে ভ্রমণ করার মতো সামর্থ্য তার নেই। ৯০০ টাকায় টিকিট কাটায় মনের কোথায় যেন খচখচ করতে থাকে। তবে ভ্রমণের সময় পাশের সিটের দিকে তাকিয়েই মনটা চুপ হয়ে গেল।
সাদা ধবধবে চুলওয়ালা এক বৃদ্ধ বসে আছে। তার চোখে ছলছল জল। পাশে এক তরুণী। নীল জামা পরে চুপচাপ বসে আছে। মাঝে মধ্যে বৃদ্ধের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। তারও মন ভার।
ভলবো চলতে শুরু করল। পাহাড়ের ধার ঘেঁষে প্রচণ্ড বেগে ছুটছে। তার চেয়েও প্রচণ্ড বেগে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে বৃদ্ধের চোখ বেয়ে। কিসের এত কান্না তার? কান্নার জল ছুঁয়ে মেয়েটা বলল, বাবা তুমি এভাবে ভেঙে পড়লে আমাদের কি হবে? তুমিই তো বলেছিলে, জীবনের সব মুহূর্ত এক রকম হয় না। কোনো কোনো গাঢ় নীল হয়। কোনোটা হয় মেঘের মতো সাদা শুভ্র।
বৃদ্ধ ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। মেয়েটার কাঁধে মাথা ঠেকিয়ে দিল। তখনো চোখ বেয়ে এক বুক কান্নার জল ঝরছে। যেন শত বছরে প্রাচীন কোনো বাঁধ ভেঙে গেছে এই সন্ধ্যায়। পশ্চিমের লাল টকটকে রঙ সাদা মেঘ করেছে রক্ত লাল। একটা দিনের শেষ সময়ে অদ্ভুত একটা মুহূর্তে দাঁড়িয়ে বৃদ্ধ। পাশে বসা তার মেয়ে।
ভলবো থামল একটা নির্জন এলাকায়। নিঝুম বাংলা রেস্তোরাঁয়। ৩০ মিনিট বিরতি। সবাই একে একে নেমে পড়ল ভলবো থেকে। শুধু বাসে বসে বৃদ্ধ আর তার মেয়ে। ইবু নামতে গিয়েও নামল না। নামার কোনো ইচ্ছেও তার নেই। বৃদ্ধ হেলান দিয়ে শুয়ে ছিল সিটে। চোখ খুলে বলল, ‘মামণি তুমি একটু কিছু খেয়ে নাও।’
‘বাবা, আমার খাওয়ার রুচি নেই।’
‘কিন্তু আমি খাব। তুমি কিছু খেয়ে আমার জন্য কিছু কিনে আন।’
বৃদ্ধকে রেখেই নেমে পড়ল মেয়েটা। আস্তে আস্তে নেমে রেস্তোরাঁর সামনে দাঁড়াল। দুটো স্যান্ডউইচ কিনে রেস্তোরাঁর পাশের গাছের নিচে দাঁড়িয়ে রইল। অন্ধকার হয়ে এসেছে ততক্ষণে।
ইবু এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল। মেয়েটা তেমন কিছু বলল না। ইবুই আগ বাড়িয়ে বলল, কিছু মনে করবেন না। আপনার বাবার কি হয়েছে?
ইবু ভেবেছিল মেয়েটা কি না কি মনে করে। তবে খুব স্বাভাবিকভাবেই সে বলল, ‘হঠাৎ করেই মা মারা গেলেন গত বছর। কাল মায়ের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। তাই বাবা খুব ভেঙে পড়েছেন’
‘মা’কে নিশ্চয়ই খুব ভালোবাসতেন?’
‘হ্যাঁ, তা তো অবশ্যই। ৪০ বছর এক সাথে থাকার পর হঠাৎ একজনের বিদায় সত্যিই কষ্টদায়ক।’
‘আসলে কারো কারো ভালোবাসার গভীরতা বেশি থাকে। তবে থাক সে কথা। আপনি কিছুই খেলেন না যে?’
‘আসলে আমার খেতে ইচ্ছে করছে না। তবে আপনি ভাবতে পারেন আমি এখানে অপেক্ষা করছি কেন? কারণ এখন বাবার কাছে গেলে তিনি বুঝে ফেলবেন, আমি কিছুই খাইনি।’
‘মিথ্যে অভিনয়?’
‘যে অভিনয় মানুষকে আনন্দ দেয়। মানুষের কোনো ক্ষতি করে না। সে অভিনয় সত্যই হোক আর মিথ্যেই হোক। কি আসে যায় বলেন?’
‘আপনি বেশ গুছিয়ে কথা বলল। বাই দ্য বাই, আমি এবার সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করলাম। এখনো চাকরি হয়নি। চিটাগাং যাচ্ছি চাকরির জন্যই। ওখানে একটা ভালো চাকরি পেতে পারি।’ ‘আমি ইংলিশে অনার্স শেষ করেছি। সামনের মাসে মাস্টার্সে ভর্তি হবো। চলুন দেরি হয়ে যাচ্ছে।’
ভলবো আবারো ছুটছে। মাঝে মধ্যে আবছা আলোয় মেয়েটার মুখ দেখা যায়। কোথা থেকে একটা ভালো লাগা ছুয়ে যায় ইবুর বুকে। এসব ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়ে সে। একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখে। তবে মনে নেই স্বপ্নটা, শুধু মনে আছে স্বপ্নটা মেয়েটাকে নিয়েই।
ভলবো পৌঁছাল সকাল ৬টায়। বাস থেকে নামল ইবু। তখনি তার মনে হলো মেয়েটার নাম সে জানে না। ঠিকানাও জানে না। কাল রাতে ঠিকানাটা নেয়া উচিত ছিল। এখন কিভাবে ঠিকানা চাইবে। তবুও এগিয়ে গেল। বলল, ‘আংকেল কোন দিকে যাবেন? আমি একটা অটো ঠিক করে দেই?’
বৃদ্ধ রাজি হয়ে গেল। সিএনজি ঠিক করার ফাঁকে মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করে জানল ওর নাম মেঘেশ্বরী। বেশ আনন্দ নিয়েই ইবু বলল, ‘আপনার মোবাইল নাম্বার যদি দিতেন। মানে আমি সরাসরিই বলি। আমার চাকরিটা হলে আপনার বাবার সাথে আমি দেখা করতে চাই।’
মেঘেশ্বরী হাসল। তারপর বলল, ‘আমার বাবা বেঁচে নেই। উনি ১৭ বছর আগে আমাদের ফাঁকি দিয়েছেন।’
‘তাহলে উনি?’
‘উনি আমার শ্বশুর বাবা! আর হ্যাঁ, আমার তো কোনো মোবাইল নম্বর নেই। তবে আমার স্বামীর মোবাইল আছে। ওর একটা কার্ড রাখুন।’
সবুজ একটা সিএনজিতে চড়ে মেঘেশ্বরী হারিয়ে যাচ্ছে। ইবু কার্ড হাতে দাঁড়িয়ে। রাস্তায় গাড়ির ব্যস্ততা বাড়ছে। তারও যেতে হবে। কেন জানি তার কোণটাও বৃদ্ধের চোখের মতো ভিজে যাচ্ছে। ৪০ বছর নয় কিছু কিছু আবেগ চার মিনিটে অনেক গভীর হয়ে যায়।
আকাশে সাদা মেঘ উড়ে যায়। মেঘের ডানায় ভাসতে ইচ্ছে করে ইবুর...
আলোচিত ব্লগ
দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল
আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬
[সম্ভাবনার ক্রমানুসারে নয়ঃ]
আর্জেন্টিনা: আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ তার ডিফেন্স আর ইনজুরি । ৩৮ বছরের তরুণ(!) সেন্টারব্যাক ওতামেন্দি আর কমপক্ষে এক হালি হাফ-ফিট ফুটবলার নিয়ে ১৯ জুলাই পর্যন্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন
বাংলা সাহিত্যে জায়গা পাচ্ছেন ওসমান হাদী

সংবাদপত্র যা বলছে
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ জুন ২০২৬ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবই পরিমার্জন-সংক্রান্ত কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকসহ... ...বাকিটুকু পড়ুন
Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ
![]()
প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।