বাসটা বিজয় সরণির সিগন্যালে পড়েছে। ইবু সামনের দিকে তাকাল। জনৈক চুলপাকা ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘না না, এটা বলার আপনার কোনো অধিকার নেই।’
‘দেখুন চাচা, আপনি অযথা নাক গলাচ্ছেন।’ কালোমতো একজন উত্তেজিত স্বরে বললেন।
ইবু এগিয়ে গিয়ে ঘটনা শুনল। বিষয়টা সামান্যই। এক ভিক্ষুক বাসে ওঠে ভিক্ষা চাইছিল। কালোমতো লোকটা ভিক্ষুককে বলল, ‘ওই ব্যাটা ভিক্ষা যে করস, দোয়া দরুদ কিছু জানস?’
বৃদ্ধ আমতা আমতা করতে শুরু করল। দোয়া দরুদ সম্ভবত সে তেমন জানে না। যদিও অনেকের মধ্যে ভাবটা একটু ভিন্ন। যেন কিছুই হয়নি। এত হৈ চৈ তাদেও গায়েই লাগছে না। একটা ভিক্ষুকের প্রতি দয়া দেখানোর মতো সময় তাদের নেই।
কিন্তু দু-একজন অতি উতসাহী তাকে নিয়ে রীতিমতো তর্কযুদ্ধ শুরু করে দিল। একজন বলল, ‘শালারা ছোটলোকের জাত। নামাজ-রোজা নেই। কালেমা পর্যন্ত জানে না। ওই ব্যাটা বল তো কালেমা তৈয়বা?’
দ্বিতীয় ব্যক্তি এটা শুনে খেকিয়ে উঠল, ‘শুনেন ভাই, ওরা পেটের দায়ে মিথ্যা বলে। আমাদের তো পেট ভর্তি, তবুও খাই খাই থামে না। পারলে পুরা দেশটাই একসঙ্গে গিলি।’
‘আপনি শুধু শুধু নাক গলাচ্ছেন। আপনার মতো লোকের জন্যই এরা মাথায় উঠেছে। ওভারব্রিজ পার হওয়া যায় না। ব্যবসা, বুঝলেন ব্যবসা। আজিমপুর গোরস্থানে এই ব্যাটাদের লিডার আছে। ব্যাটা চার বিয়ে করেছে। মোবাইল নিয়ে ঘোরে। পুরনো ঢাকায় চারতলা বাড়ি আছে, বুঝলেন?’
‘তো আপনেও বিয়ে করেন। কে মানা করছে? চারটা তো জায়েজ আছে।’
‘ধাপনে মুখ শামলে কথা বলেন।’
‘মুখ শামলে কথা বলার কি আছে? যা সত্য তাই বললাম।’
‘আপনে একটা পথের ফকিরের সাথে আমার তুলনা করবেন?’
তর্কাতর্কির চূড়ান্ত পর্যায়ে বাস এসে ফার্মগেট থামল। ইবু বাস থেকে নেমে পড়ল। দেশের মহান বুদ্ধিজীবীদের হাত থেকে এ যাত্রায় রক্ষা পেল। কিন্তু ভিক্ষুক নিয়ে একটা সূক্ষ্ম চিন্তা তার মাথার কোনায় আটকে রইল। কিছুতেই ওটাকে অতিক্রম করা যাচ্ছে না।
সরু একটা গলি ধরে হাঁটছে সে। নির্জনতা তার কষ্টটা জাগিয়ে তোলে। আচ্ছা ভিক্ষুক মানে কী? যে ভিক্ষা করে। কিছু নেই যার, নিঃস্ব। যার বাঁচার আর কোনো অবলম্বন নেই। সমাজের সবচেয়ে নিচু শ্রেণী। সবচেয়ে রুচিহীন পেশা। লাজলজ্জা ভুলে অন্যের কাছে হাতপাতা। গালাগালি ভুলে অভিনয়। ভিক্ষা দেবে নাকি দেবে না, অনিশ্চয়তার লুডু খেলা।
যখন কেউ ভিক্ষা করে তখন তার চাওয়ার ভঙ্গিটা হয় অসহায়। যার অসহায়তা যত বেশি ফুটে উঠবে তার ভিক্ষা পাওয়ার সম্ভাবনাও তত বেশি। সত্যিই কি তাই? আচ্ছা, কেমন ভিক্ষুক হলে ভিক্ষা পাওয়াটা নিশ্চিত হয়? প্রশ্নটা ঘুরতে থাকে ইবুর মনে।
পৃথিবীর সব মানুষ কখনো না কখনো ভিক্ষুক হয়। ভিক্ষুক হতেই হবে। ইবুও হয়েছিল। শিমিকে ভালোবেসে ভিক্ষুক হয়েছিল।
সে বহু আগের কথা। শিমিকে নিয়ে স্বপ্নের শেষ ছিল না তার। লাল স্বপ্ন, নীল স্বপ্ন, সবুজ স্বপ্নÑ কত কত স্বপ্ন। তার আর শিমির বিয়ে হবে। দুজনে অনেক দূরে বেড়াতে যাবে। তাদের মেয়ে হলে নাম রাখবে-মুগ্ধ। সত্যিই দীর্ঘমেয়াদি এক স্বপ্ন।
ছেলেরা সাধারণত স্বপ্নবিলাসী কম হয়। তারপরও কেমন করে যেন খুব বেশি স্বপ্নের রাজত্ব চলছিল তার বুকে। কিন্তু সব স্বপ্নবাজ পুরুষের মতো ইবুও হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে। কিন্তু ভালোবাসার ঢোল ততটাই জোরে বাজে, যার বাবার অর্থের প্রাচুর্য আছে। ইবুর তো কিছুই ছিল না।
খুব সাধারণ একজন মানুষের এতটা স্বপ্ন দেখাই সম্ভবত পাপ। হ্যাঁ সত্যি, সাক্ষাত পাপ। কারণ শিমি তখন ডাক্তারি পড়ত। অতি সাধারণ একটা ছেলের ভালোবাসার সামান্য সুতার টান থেকে তার স্ট্যাটাস, তার বাবার প্রতিপত্তি, তার সৌন্দর্যের তীব্রতাই ছিল তার কাছে মুখ্য। কত যোগ্য থেকে যোগ্যতর পুরুষ তার পায়ে লুটিয়ে পড়ে। সেখানে ইবুর বাঁশপাতার শন শন শব্দের ক্ষীণ ভালোবাসা গৌণই বটে।
ইবু অবশ্য বহু রাত ভেবেছে। আসলে যোগ্যতার মাপকাঠির বিষয়টা কী? আমরা কাকে যোগ্যতা বলি? টাকা-পয়সা, ধন-সম্পত্তি, যশ-প্রতিপত্তিই সম্ভবত সব যোগ্যতার একক। সে এসব যোগ্যতার কাছে বহু আগেই পরাজিত। আর যারা পরাজিত হয় তারাই তো ভিক্ষুক।
শেষবার যখন শিমির সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল তখন সে ছিল ভিক্ষুক, পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃস্ব একজন মানুষ। পৃথিবীর সব পাপ দেবতাকে ঘুষ দিয়ে সে শিমির হাত ধরে বলেছিল, -শিমি, আমি তোমাকে ভিক্ষা চাই, তুমি নিজেকে আমাকে ভিক্ষা দাও।’ কিন্তু ভিক্ষুক যা চাইবে তা তো আর সব সময় পায় না। সাত দুয়ার ঘুরে হয়তো এক দুয়ারে ভিক্ষা পায়। কিন্তু ইবুর তো দুয়ার ছিল একটাই।
আসলে ভালোবাসা মানুষকে অন্ধ করে, নিঃস্ব করে। এক মুহূর্তে বদলে দেয় সব হিসাবের খাতা। মানুষ হয়ে যায় ভিক্ষুক। তাই তো সে ভালোবাসা থেকে দূরে পালিয়ে এসেছে। হৃদয়ের সূক্ষ্ম কুঠুরি মোম দিয়ে বন্ধ করেছে বহু আগেই। তবুও কেন আজ হঠাৎ এসব মনে পড়ে যায়! কেন এমন হয়? তবে কী বাসের সেই ফরিকটার মতো আজও সে হাত পেতে আছে শিমির ভিক্ষা পাওয়ার আশায়?
ইবু এ প্রশ্নের উত্তর জানে না।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৭ বিকাল ৩:৪৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

