somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্প_ভিক্ষুক

৩০ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৭ বিকাল ৩:৪১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ব্যাপারটা সামান্যই। তারপরও যতদূর সম্ভব চোখ বুজে বাইরের যানজট দেখছিল ইবু। বাসের সামনের দিকটায় চেঁচামেচি শুরু হয়েছে। ইবু লক্ষ্য করেছে, ইদানীং দেশে বুদ্ধিজীবীর সংখ্যা বেড়েছে। দুর্নীতিতে দেশ কেন প্রথম হলোÑ এ প্রসঙ্গে বাসে কথা তুললেই হুট করে দু-তিনজন বুদ্ধিজীবী বের হয়ে যায়। আজও হয়তো সেরকমই কিছু হবে।
বাসটা বিজয় সরণির সিগন্যালে পড়েছে। ইবু সামনের দিকে তাকাল। জনৈক চুলপাকা ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘না না, এটা বলার আপনার কোনো অধিকার নেই।’
‘দেখুন চাচা, আপনি অযথা নাক গলাচ্ছেন।’ কালোমতো একজন উত্তেজিত স্বরে বললেন।
ইবু এগিয়ে গিয়ে ঘটনা শুনল। বিষয়টা সামান্যই। এক ভিক্ষুক বাসে ওঠে ভিক্ষা চাইছিল। কালোমতো লোকটা ভিক্ষুককে বলল, ‘ওই ব্যাটা ভিক্ষা যে করস, দোয়া দরুদ কিছু জানস?’
বৃদ্ধ আমতা আমতা করতে শুরু করল। দোয়া দরুদ সম্ভবত সে তেমন জানে না। যদিও অনেকের মধ্যে ভাবটা একটু ভিন্ন। যেন কিছুই হয়নি। এত হৈ চৈ তাদেও গায়েই লাগছে না। একটা ভিক্ষুকের প্রতি দয়া দেখানোর মতো সময় তাদের নেই।
কিন্তু দু-একজন অতি উতসাহী তাকে নিয়ে রীতিমতো তর্কযুদ্ধ শুরু করে দিল। একজন বলল, ‘শালারা ছোটলোকের জাত। নামাজ-রোজা নেই। কালেমা পর্যন্ত জানে না। ওই ব্যাটা বল তো কালেমা তৈয়বা?’
দ্বিতীয় ব্যক্তি এটা শুনে খেকিয়ে উঠল, ‘শুনেন ভাই, ওরা পেটের দায়ে মিথ্যা বলে। আমাদের তো পেট ভর্তি, তবুও খাই খাই থামে না। পারলে পুরা দেশটাই একসঙ্গে গিলি।’
‘আপনি শুধু শুধু নাক গলাচ্ছেন। আপনার মতো লোকের জন্যই এরা মাথায় উঠেছে। ওভারব্রিজ পার হওয়া যায় না। ব্যবসা, বুঝলেন ব্যবসা। আজিমপুর গোরস্থানে এই ব্যাটাদের লিডার আছে। ব্যাটা চার বিয়ে করেছে। মোবাইল নিয়ে ঘোরে। পুরনো ঢাকায় চারতলা বাড়ি আছে, বুঝলেন?’
‘তো আপনেও বিয়ে করেন। কে মানা করছে? চারটা তো জায়েজ আছে।’
‘ধাপনে মুখ শামলে কথা বলেন।’
‘মুখ শামলে কথা বলার কি আছে? যা সত্য তাই বললাম।’
‘আপনে একটা পথের ফকিরের সাথে আমার তুলনা করবেন?’
তর্কাতর্কির চূড়ান্ত পর্যায়ে বাস এসে ফার্মগেট থামল। ইবু বাস থেকে নেমে পড়ল। দেশের মহান বুদ্ধিজীবীদের হাত থেকে এ যাত্রায় রক্ষা পেল। কিন্তু ভিক্ষুক নিয়ে একটা সূক্ষ্ম চিন্তা তার মাথার কোনায় আটকে রইল। কিছুতেই ওটাকে অতিক্রম করা যাচ্ছে না।
সরু একটা গলি ধরে হাঁটছে সে। নির্জনতা তার কষ্টটা জাগিয়ে তোলে। আচ্ছা ভিক্ষুক মানে কী? যে ভিক্ষা করে। কিছু নেই যার, নিঃস্ব। যার বাঁচার আর কোনো অবলম্বন নেই। সমাজের সবচেয়ে নিচু শ্রেণী। সবচেয়ে রুচিহীন পেশা। লাজলজ্জা ভুলে অন্যের কাছে হাতপাতা। গালাগালি ভুলে অভিনয়। ভিক্ষা দেবে নাকি দেবে না, অনিশ্চয়তার লুডু খেলা।
যখন কেউ ভিক্ষা করে তখন তার চাওয়ার ভঙ্গিটা হয় অসহায়। যার অসহায়তা যত বেশি ফুটে উঠবে তার ভিক্ষা পাওয়ার সম্ভাবনাও তত বেশি। সত্যিই কি তাই? আচ্ছা, কেমন ভিক্ষুক হলে ভিক্ষা পাওয়াটা নিশ্চিত হয়? প্রশ্নটা ঘুরতে থাকে ইবুর মনে।
পৃথিবীর সব মানুষ কখনো না কখনো ভিক্ষুক হয়। ভিক্ষুক হতেই হবে। ইবুও হয়েছিল। শিমিকে ভালোবেসে ভিক্ষুক হয়েছিল।
সে বহু আগের কথা। শিমিকে নিয়ে স্বপ্নের শেষ ছিল না তার। লাল স্বপ্ন, নীল স্বপ্ন, সবুজ স্বপ্নÑ কত কত স্বপ্ন। তার আর শিমির বিয়ে হবে। দুজনে অনেক দূরে বেড়াতে যাবে। তাদের মেয়ে হলে নাম রাখবে-মুগ্ধ। সত্যিই দীর্ঘমেয়াদি এক স্বপ্ন।
ছেলেরা সাধারণত স্বপ্নবিলাসী কম হয়। তারপরও কেমন করে যেন খুব বেশি স্বপ্নের রাজত্ব চলছিল তার বুকে। কিন্তু সব স্বপ্নবাজ পুরুষের মতো ইবুও হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে। কিন্তু ভালোবাসার ঢোল ততটাই জোরে বাজে, যার বাবার অর্থের প্রাচুর্য আছে। ইবুর তো কিছুই ছিল না।
খুব সাধারণ একজন মানুষের এতটা স্বপ্ন দেখাই সম্ভবত পাপ। হ্যাঁ সত্যি, সাক্ষাত পাপ। কারণ শিমি তখন ডাক্তারি পড়ত। অতি সাধারণ একটা ছেলের ভালোবাসার সামান্য সুতার টান থেকে তার স্ট্যাটাস, তার বাবার প্রতিপত্তি, তার সৌন্দর্যের তীব্রতাই ছিল তার কাছে মুখ্য। কত যোগ্য থেকে যোগ্যতর পুরুষ তার পায়ে লুটিয়ে পড়ে। সেখানে ইবুর বাঁশপাতার শন শন শব্দের ক্ষীণ ভালোবাসা গৌণই বটে।
ইবু অবশ্য বহু রাত ভেবেছে। আসলে যোগ্যতার মাপকাঠির বিষয়টা কী? আমরা কাকে যোগ্যতা বলি? টাকা-পয়সা, ধন-সম্পত্তি, যশ-প্রতিপত্তিই সম্ভবত সব যোগ্যতার একক। সে এসব যোগ্যতার কাছে বহু আগেই পরাজিত। আর যারা পরাজিত হয় তারাই তো ভিক্ষুক।
শেষবার যখন শিমির সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল তখন সে ছিল ভিক্ষুক, পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃস্ব একজন মানুষ। পৃথিবীর সব পাপ দেবতাকে ঘুষ দিয়ে সে শিমির হাত ধরে বলেছিল, -শিমি, আমি তোমাকে ভিক্ষা চাই, তুমি নিজেকে আমাকে ভিক্ষা দাও।’ কিন্তু ভিক্ষুক যা চাইবে তা তো আর সব সময় পায় না। সাত দুয়ার ঘুরে হয়তো এক দুয়ারে ভিক্ষা পায়। কিন্তু ইবুর তো দুয়ার ছিল একটাই।
আসলে ভালোবাসা মানুষকে অন্ধ করে, নিঃস্ব করে। এক মুহূর্তে বদলে দেয় সব হিসাবের খাতা। মানুষ হয়ে যায় ভিক্ষুক। তাই তো সে ভালোবাসা থেকে দূরে পালিয়ে এসেছে। হৃদয়ের সূক্ষ্ম কুঠুরি মোম দিয়ে বন্ধ করেছে বহু আগেই। তবুও কেন আজ হঠাৎ এসব মনে পড়ে যায়! কেন এমন হয়? তবে কী বাসের সেই ফরিকটার মতো আজও সে হাত পেতে আছে শিমির ভিক্ষা পাওয়ার আশায়?
ইবু এ প্রশ্নের উত্তর জানে না।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৭ বিকাল ৩:৪৩
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১১ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪

আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬

লিখেছেন আঘাত প্রাপ্ত একজন, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:২৬

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬

[সম্ভাবনার ক্রমানুসারে নয়ঃ]

আর্জেন্টিনা: আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ তার ডিফেন্স আর ইনজুরি । ৩৮ বছরের তরুণ(!) সেন্টারব্যাক ওতামেন্দি আর কমপক্ষে এক হালি হাফ-ফিট ফুটবলার নিয়ে ১৯ জুলাই পর্যন্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলা সাহিত্যে জায়গা পাচ্ছেন ওসমান হাদী

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১২ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:১৭


সংবাদপত্র যা বলছে
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ জুন ২০২৬ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবই পরিমার্জন-সংক্রান্ত কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকসহ... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

×