যারা ফুটপাথে কিংবা রেলওয়ে, বাসে বা লঞ্চটার্মিনালে রাত কাটায়, যারা গৃহহীন ও ভাসমান জনগোষ্ঠী তারাও আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজের একটি অংশ, এ দেশের নাগরিক, সর্বোপরি তারা মানবগোষ্ঠীরই অংশ। সমাজের আর সব মানুষের যেমন রোগ-শোক হয় তাদের সেসব হয় আরো বেশি। অথচ রাষ্ট্রীয় বা সরকারি চিকিৎসার সুবিধা এমনকি এনজিওদের স্বাস্থ্যসেবারও খুব নগণ্য অংশ তাদের দ্বার পর্যন্ত পৌঁছায় বা তারা তা গ্রহণ করতে পারে। সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মূল ধারা থেকেই তারা যেখানে বঞ্চিত, সে ক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা বা সুযোগের ব্যাপারটি যে প্রায় অনুপস্থিত সেটি আমাদের স্বীকার করতেই হবে। বিভিন্নভাবে এইডস ও মাদকাসক্ত বিষয়ে কিছু কাজ হচ্ছে, যা পরোক্ষভাবে হলেও মানসিক স্বাস্থ্যসেবার কিছুটা সুযোগ তাদের কাছে পৌঁছে দেয়ার মাধ্যম হিসেবে কাজ করতে পারে।
এ বছর বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছেÑ ‘পরিবর্তনশীল বিশ্ব ও মানসিক স্বাস্থ্য : সংস্কৃতি ও বৈচিত্র্যের প্রভাব।’ এই প্রতিপাদ্যের একটি মূল সুর হচ্ছে সমাজের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর, বিশেষ করে যারা সমাজের মূল স্রোত বা ধারার বাইরে তাদের মানসিক সমস্যার ধরন নির্ণয় করতে সে বিশেষ ‘প্রেক্ষাপট’ অনুযায়ী তাদের উপযোগী মানসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ধরন ও পদ্ধতি খুঁজে বের করা। অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, দেশের মূল যে স্বাস্থ্য কাঠামো তাকেই মানসিক স্বাস্থ্য সুবিধার বিষয়টি যেখানে এখনো তেমন গুরুত্ব পাচ্ছে না, যেখানে সমাজের মূল স্রোত ধারার লোকই এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত, সেখানে গৃহহীন, ভাসমান জনগোষ্ঠীকে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের বিষয়টি উল্লেখ করা অনেকটাই বাহুল্য আবদারের মতো শোনাবে। এভাবে ব্যাপারটি ভাবলে তা আইনগত, নীতিগত ও মানবিক কোনো দিক থেকে তা সঙ্গত প্রশ্ন হবে না। আপনার আসার যে সুযোগ ও সুবিধা পাওয়ার অধিকার রয়েছে, আইন, নীতি ও মানবিকতার যেকোনো মানদণ্ডে প্রান্তিক, বিচ্ছিন্ন ও পশ্চাদপদে থাকা যেকোনো নাগরিকের অন্তত সমান ততটুকু সুযোগ ও সুবিধা পাওয়ার অধিকারী তারাও। বরং তাদের প্রয়োজন আরো বেশি বলে, তাদের সুবিধা নেয়ার সুযোগ কম বলে, এদিকে রাষ্ট্র, সমাজ ও অন্যদের বরং ‘অগ্রাধিকার’ ভিত্তিতে নজর দেয়ার প্রয়োজন রয়েছে। এরা উপেক্ষিত, বঞ্চিত বলেই এবারের বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয়টি তাদেরকে লক্ষ্য করেই নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে তাদের প্রয়োজনের দিকটি আমাদের দৃষ্টির বাইরে না থাকে।
সামাজিক অর্থনীতির (ঝড়পরধষ ঊপড়হড়সু) কারণে উন্নত দেশেও গৃহহীনদের সমস্যা বাড়ছেÑ বেকারত্বের হার বাড়া, স্বল্প দামে বাসা ভাড়া না পাওয়া, প্রথাগত পারিবারিক বন্ধনে ক্ষয় শুরু হওয়া এবং সমাজকল্যাণ কর্মসূচির আওতা সরকারিভাবে কমিয়ে আনা প্রভৃতি কারণে। সাধারণ জনগোষ্ঠীর তুলনায় গৃহহীনদের মত শিক্ষার হার, কর্মসংস্থানের হার অনেক কম। উল্টো তাদের মধ্যে মা-বাবা বা অভিভাবকদের থেকে নির্যাতনের (অনঁংব) ও প্রত্যাখ্যানের হার থাকে অনেক বেশি। দারিদ্র্যতা, সামাজিক বঞ্চনা ও উপেক্ষার কারণে গৃহহীন ও ভাসমানদের মধ্যে মানসিক রোগ ও সমস্যার প্রকোপ অনেক বেশি থাকে। বেশিরভাগ জরিপেই দেখা গেছে তাদের মধ্যে ৩০-৫০ শতাংশ মানসিক ব্যাধিতে ভুগে থাকে এবং যারা জরুরি আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থান করে সে ক্ষেত্রে এই হার ৬০ শতাংশ পর্যন্ত হয়ে থাকে।
রাস্তা-ঘাটে ঘুরে বেড়ায়, এমন লোকদের মধ্যে সিজোফ্রেনিয়া ও অন্যান্য গুরুতর মানসিক ব্যাধির হার বেশি থাকে। যাদের জায়গা হাসপাতালেও নেই, পরিবারেও নেই। আবার ভবঘুরে তরুণ ও কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে বিষণœœতা রোগ, উদ্বেগাধিক্য রোগ ও নিজেকে আহত করা (ঝবষভ-মধৎস) প্রবণতা বেশি। এদের মধ্যে পুরুষদের দুই-তৃতীয়াংশ ও মহিলাদের এক-তৃতীয়াংশই মদ কিংবা মাদকসক্তিতে ভুগে থাকে। আমরা জানি, যারা মাদকাসক্ত হয়, তাদের মধ্যে অন্যদের তুলনায় মানসিক রোগও হয়ে থাকে অনেক বেশি। এর সাথে শারীরিক সমস্যা যেমন : ফুসফুসের রোগ, বিভিন্ন প্রদাহ ও আঘাতের (ঞৎধঁসড়) হারও থাকে বেশি। এ ছাড়া, পুষ্টির অভাবে, অস্বাস্থ্যকর জীবন-যাপনের জন্য ও মাদকাসক্তির জন্যও তারা বিভিন্ন ধরনের শারীরিক ও মানসিক রোগে ভুগে থাকে।
এসব গৃহহীন ও ভাসমান লোকের জন্য প্রয়োজন বাসস্থান, খাদ্য, বস্ত্র এবং শারীরিক-মানসিক রোগের জন্য স্বাস্থ্য সুবিধা। এসবই প্রত্যেক মানুষের মৌলিক চাহিদা, কিন্তু এদের জন্য এসব একান্তই অত্যাবশ্যকীয়। দুঃখের বিষয়, তাদের প্রয়োজন ও চাহিদা বেশি অথচ এসব পাওয়ার ক্ষেত্রে তারাই বঞ্চিত বেশি। তারা দরিদ্র বলে ও মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে বলে এসবের সুবিধা তারা কম পেয়ে থাকে। হয়তো বহুবিধ শারীরিক ও মানসিক ব্যাধি তাদেরকে অক্ষম করে তুলে। ফলে তারা এসব সুবিধা নিতে পারে না, অপেক্ষাকৃত ‘সবল’দের তুলনায়। তৃতীয়ত, সমাজকল্যাণমুখী কর্মসূচি আমাদের দেশে নিতান্তই অপ্রতুল এবং যেটুকুও রয়েছে সেখানে রয়েছে সমন্বয়হীনতা। কেবল কিছু ‘প্রাতিষ্ঠানিক’ সুবিধা সমাজকল্যাণ অধিদফতর দিয়ে থাকে। ঘুরে বেড়ানো, ঠিকানাবিহীন ও ভাসমান জনগোষ্ঠীর জন্য তেমন বিশেষ স্থায়ী কোনো কর্মসূচি রয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। চতুর্থত, রয়েছে দৃষ্টিভঙ্গিজনিত সমস্যা। অনেকেই মনে করেন, ওই গৃহহীনদের জরুরি প্রয়োজন খাদ্য, বাসস্থান ও নিরাপত্তা। তাই তাদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা তো দূরে থাক, শারীরিক স্বাস্থ্যের ব্যাপারটিও ভাবা হয় কম গুরুত্বের সাথে। অথচ উপরিউক্ত জরুরি প্রয়োজনের পাশাপাশি সু-স্বাস্থ্য (শারীরিক/মানসিক) নিশ্চিত করতে না পারলে তাদের দুঃখ-কষ্ট, দারিদ্র্য ও বঞ্চনার কোনোটিরই অবসান হবে না। এসবই একে-অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
তাদের যেসব সুযোগ-সুবিধার প্রয়োজন : (১) তাদের মৌলিক প্রয়োজন, যেমন : খাদ্য, বাসস্থান ও উপার্জনের ব্যবস্থা করে দেয়া। (২) তাদের শারীরিক রোগ-ব্যাধির প্রতি যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা। (৩) তাদের মানসিক রোগ-ব্যাধি, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা (ঝড়পরধষ ওংড়ষধঃরড়হ) প্রতিরোধ ও প্রতিকারে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ।
উপরিউক্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হলে একটি জাতীয় ‘টিম’ গঠন প্রয়োজন। যেখানে বিভিন্ন সংস্থা ও মন্ত্রণালয়ের যৌথ প্রতিনিধিত্ব থাকবে। যেমন : স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, পূর্ত মন্ত্রণালয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আইন মন্ত্রণালয়, কমিউনিটি অ্যান্ড সোস্যাল সাইকিয়াট্রি বিভাগ, এনজিও, সাংবাদিকসহ অন্যান্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলো। এই ‘টিম’ পুরো ব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকবে। শুধু আইনকানুন, রীতি পদ্ধতি ও অন্যান্য প্রশাসনিক ঝুটঝামেলা যাতে মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত করতে না পারে, সেটিও এই ‘টিমের’ দেখাশোনার মধ্যে থাকা প্রয়োজন।
মানসিক স্বাস্থ্য এই পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব যে বিভাগটির, তার নাম কমিউনিটি অ্যান্ড সোস্যাল সাইকিয়াট্রি বিভাগ। আমাদের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে এই বিভাগটি সবে কাজ শুরু করেছে। এই বিভাগের উদ্যোগে ও তত্ত্বাবধানে মাঝে-মধ্যে বিভিন্ন এলাকাভিত্তিক বিশেষ ‘সার্ভিস’ দেয়ার জন্য বিশেষজ্ঞ টিম পাঠতে পারে। বিদেশে এই সার্ভিকে বলে ‘এসারটিভ আউটরির’ মানসিক চিকিৎসাসেবা।
যেহেতু সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থার অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তাই এ ব্যাপারে দাতা সংস্থার আনুকূল্যে বিভিন্ন এনজিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বিক্ষিপ্তভাবে যেসব কাজ হচ্ছে তাদের সবাইকে নিয়ে একটি জাতীয় ‘নেটওয়াক’ তৈরি করা যেতে পারে। এতে অর্থেরও সাশ্রয় হবে, সেবার মানও বৃদ্ধি পাবে।
আলোচিত ব্লগ
দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল
আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬
[সম্ভাবনার ক্রমানুসারে নয়ঃ]
আর্জেন্টিনা: আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ তার ডিফেন্স আর ইনজুরি । ৩৮ বছরের তরুণ(!) সেন্টারব্যাক ওতামেন্দি আর কমপক্ষে এক হালি হাফ-ফিট ফুটবলার নিয়ে ১৯ জুলাই পর্যন্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন
বাংলা সাহিত্যে জায়গা পাচ্ছেন ওসমান হাদী

সংবাদপত্র যা বলছে
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ জুন ২০২৬ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবই পরিমার্জন-সংক্রান্ত কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকসহ... ...বাকিটুকু পড়ুন
Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ
![]()
প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।