অলঙ্করণ : সব্যসাচী হাজরা
Click This Link
দুপুরবেলা ঘুমিয়েছিলেন ইরতাজ উদ্দিন আহমেদ। হঠাৎ ঘুম ভাঙল। বাইরে তখনো তীব্র আলো কড়কড় করছে। বিরক্ত হয়ে বেলকোনিতে দাঁড়ালেন তিনি। সামনের গাছটায় কাক দু’টো কা কা করছে।
এমন জনাকীর্ণ শহরে কাকের বাসা, ভাবাই যায় না। তাও আবার এমন অভিজাত এলাকায়।
কাক দু’টোর সাথে তার সম্পর্ক বহুদিনের। প্রায়ই তিনি কাকের বাসাটা লক্ষ্য করেন। তার মতো বিশিষ্ট শিল্পপতিরা সামান্য কাক নিয়ে কখনো ভাবে না। তাদের এত তুচ্ছ ঘটনা ভাবার সময় নেই। কাক দু’টো যেদিন প্রথম বাসা তৈরি করল, সেদিন তিনি অবাক হয়ে দেখছিলেন।
একদিন প্রচণ্ড ঝড় হলো। তিনি ভাবলেন, কাক দু’টো নিশ্চয়ই উড়ে গেছে। কিন্তু না। বরং ঝড় শেষে একটা অদ্ভুত দৃশ্য লক্ষ্য করলেন। ঠিক কাকের বাসার সামনেই একটা কোকিল ডাকছে। একটু পরপর কাক দম্পতি তেড়ে যাচ্ছে কোকিলের দিকে। কাক আর কোকিলের এই বৈরিতার কারণ তিনি জানতেন না। তাকে এই বিষয়টা জানাল মিজান। কিভাবে কোকিল কাকের বাসার সামনে ডাকে? কিভাবে কাককে ফাঁকি দিয়ে কোকিল কাকের বাসায় ডিম পাড়ে? বেশ মজা করেই গল্পটা বলল সে। গল্প শেষে খোঁচা মেরে বলল, তা তুই এত কিছু থাকতে কাক নিয়ে ভাবছিস কেন?
এমনি বলতে পারিস। তবে যা-ই বলিস, কোকিল বাসা বানাতে পারে না, এটা আমি জানতাম না।
একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করেছিস। পৃথিবীর কোনো মা-ই তার সন্তানকে ছেড়ে চলে যায় না। ব্যতিক্রম কেবল কোকিল। এরা চুরি করে কাকের বাসায় ডিম পাড়ার পর চলে যায়। আর কখনো খোঁজ নেয় না।
কোকিল কেন এমন করে? এমন অদ্ভুত মাতৃত্ব কেন? এসব তুচ্ছ বিষয় নিয়ে ইরতাজ উদ্দিন দু’দিন ভাবলেন। পশু-পাখিদের ওপর বেশ কয়েকটি বইও জোগাড় করলেন। শুধু কোকিল আর কাক নয়, বরং আরো অনেক পাখির জীবনই তাকে অভিভূত করল। তবে কোকিল বাসা তৈরি করতে পারে না, আর এ কারণেই কোকিল ডিম পাড়ে কাকের বাসায়। তার বাচ্চাও বড় হয় সেখানে।
পুরো বিষয়টি জানার পর তিনি কিছুটা বিষণœ হয়ে পড়লেন। কোকিল কেন অন্যের ঘরে বাচ্চা দেবে? -এ বিষয়টি তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না। সন্তান লালন-পালনের যোগ্যতা না থাকলে জন্ম দেবে কেন? তিনি বেশ আগ্রহভরে বিষয়টি মিজানকে বললেন। সে তো হেসে খুন। বলল, আরে মানুষই যেখানে সন্তানের খোঁজ নেয় না সেখানে সামান্য কোকিল। মানুষের এত বিবেক, এত বুদ্ধি আর ওরা তো অবুঝ।
মানুষও তাদের সন্তান ছেড়ে যায় নাকি? কেউ কি তা পারে?
কেন পারবে না বন্ধু? কত ঘটনাই তো ঘটে। রাস্তার মধ্যে সন্তান পড়ে থাকে। খোদ আমেরিকাতেই তো এ ঘটনা বেশি। ওদের অনেক সন্তানের বাবা-মা নেই। ফ্রি সেক্সের কারণে জন্ম। আমাদের দেশ হলে ওরা হতো জারজ সন্তান। অথচ ওদের দেশে নাম-পরিচয়হীন সন্তানের অভাব নেই। ওদের সোসাইটিতে এটা কোনো ঘটনাই না।
তার মানে কোকিলের মতো সন্তান পরিত্যাগকারী মানুষও এ পৃথিবীতে আছে?
হ্যাঁ আছে, হাজার হাজার কোটি কোটি আছে। তুই এসব নিয়ে ভাবছিস কেন?
এমনি। বলতে পারিস কৌতূহল।
আসলে তুই যা-ই বলিস, তোর মধ্যে ইদানীং বিষণœতা কাজ করে। আর এ কারণেই এসব আজেবাজে চিন্তা করিস। আমি বলি কি আবারো বিয়ে করে ফেল।
মিজানের কথা শুনে এবার হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়েন তিনি। তারপর হঠাৎ চুপ হয়ে যান। ফ্লোরিয়া মারা যাওয়ার পর তিনি এভাবে হাসেননি। তার জীবনটা অদ্ভুত এক খেলায় মেতে আছে। এযাবৎ তিনি বিয়ে করেছেন চারটা। অদ্ভুত কোনো কারণে তার স্ত্রী মারা যায়। আশ্চর্য হলেও সত্যি তার তিন স্ত্রীর সবাই মারা যায় সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে।
ইরতাজ উদ্দিন প্রথম বিয়ে করেন ২২ বছর বয়সে। তখন তিনি বিএ পড়েন। লজিং থাকেন সুখানপুকুরে সরদার বাড়িতে। ঝুমির সাথে পরিচয় হয় তখন।
ঝুমির একটা পা ভাঙা ছিল। হাঁটত খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। সবাই তাকে বলত ‘খোঁড়া ঝুমি’। গ্রামের রাস্তার দু’মাইল হেঁটে স্কুলে যেত। তার দু’কাঁধে ঝুলে থাকত সুদৃশ্য বেণী। চোখগুলো ছিল কাজল কালো। তবু কেউ তার দিকে ফিরেও তাকাত না।
ইরতাজ উদ্দিন তখন বিএ পড়েন। রোজ দেখা হয় রাস্তায়। তিনি কলেজে যে পথে যেতেন, সেই পথেই ঝুমি হেঁটে যেত স্কুলে। তিনি ঝাড়কাঁটা বিলের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতেন। ঝুমির অদ্ভুত দুলে দুলে হাঁটা তাকে অভিভূত করত।
একদিন তিনি সাহস করে তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। তারপর চোখ বন্ধ করে বললেন- ঝুমি, তোমাকে আমারঃ এতটুকু বলেই ঢোক গিললেন। কথাটা শেষ করতে পারলেন না। কী বলবেন খুঁজে পেলেন না।
অনেকক্ষণ পর চোখ খুললেন তিনি। ঝুমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। এই ষোড়শীকে কেউ হয়তো ভালোবাসার উষ্ণতা দেয়নি। কেউ তার হৃদয় ছোঁয়ার চেষ্টা করেনি।
ঝুমি বলল, আমি খুঁড়া। ভালো করে দেখেন। আমার একটা পা ছোট। সবাই আমাকে খুঁড়ি বলে।
চুপ, চুপ। আর কোনো কথা না।
শেষ কথাটার মধ্যে একটা অধিকারের কথা ছিল। অস্পষ্ট অধিকার। ইরতাজ উদ্দিন সে অধিকার কোথায় পেয়েছিলেন কে জানে।
সরদার বাড়িতে বিষয়টা রাষ্ট্র হয়ে গেল। এক কান দুই কান করতে করতে সরদার সাহেবের কানে কথাটা পৌঁছল। সরদার সাহেব ছিলেন অত্যন্ত রাগী। ডেকে পাঠালেন তাকে। কিন্তু এই প্রথম তিনি ভয় পেলেন না। তাছাড়া তিনি তো কোনো অন্যায় করেননি।
সরদার সাহেব বসেছিলেন জলচৌকির ওপরে। সৌদির তুলতুলে জায়নামাজ পাড়া জলচৌকির ওপর। তিনি নামাজ পড়েন। বাহারি মোনাজাত করেন। গায়ে আতর দিয়ে ঘুরে বেড়ান।
ইরতাজ সরদার সাহেবের পেছনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। সালাম ফিরিয়ে তিনি বললেন, সামনে আসো। জরুরি কথা আছে।
চাচাজান কন, আমি শুনতাছি।
তোমার চাচীর কাছে যাও। হেয় কিছু টেকা দিব। টেকা নিয়া গঞ্জে যাবা। তারপর বিয়ার সদাই-পাতি করবা, পারবা?
পারব চাচা।
গেরামের হগলে নানা কতা কয়। এইসব শুনলে শইল্যের চামড়া জ্বলে। তাই ভাবছি আজ রাইতেই ঝুমির লগে তোমার বিয়া দিমু। তোমার মত আছে তো?
ইরতাজ উদ্দিনের বিয়ে হয় সেই রাতেই। বিয়ের পর ভাগ্য ফিরে তার। সুখানপুকুরে একটা কাপড়ের দোকান দেন। বছর না ঘুরতেই কাঁচা টাকা আসে হাতে। সরদার সাহেবের পরামর্শে আরো একটা দোকান কিনলেন। বাজারের পাশে পুকুর কিনলেন।
সবই চলছিল ঠিকমতো, কিন্তু বিধাতার নিয়তি বোঝা দায়। ফুটফুটে একটা শিশু কোলজুড়ে আসবে ঝুমির; কত স্বপ্ন তার। কিন্তু কী কপাল। সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে বাঁচল না সে।
ঝুমি মারা যাওয়ার পর তিনি সুখানপুকুর ছাড়লেন। কেন জানি একটা বিতৃষ্ণা জন্মেছিল। মনের কোথায় যেন একটা শূন্যতা। দু’বছর কেটে গেল এভাবেই।
একদিন সরদার সাহেব এলেন। জমি নিয়ে নাকি বিরাট ঝামেলা। মামলা-মোকদ্দমা করতে হবে। দু’দিন থাকলেন তিনি। তারপর যাওয়ার দিন বললেন- ইরতাজ, তুমি আমার ছেলের মতো। শখ করে তোমার সাথে ঝুমির বিয়া দিছিলাম। কিন্তু কপালে সুখ সইল না ।
চাচাজান, এইসব কথা থাক।
এইসব কথা কেন থাকব। আমি তোমার বাপের মতো। তাই কই কি, তুমি আবার বিয়া করো। জীবন তো চলতে হইব।
সরদার সাহেব চলে গেলেন। বিধাতার কী ইচ্ছা, তার দুইদিন পর তার মৃত্যুর খবর এলো। তিনি ছুটে গেলেন মাটি দিতে।
সরদার সাহেবের শেষ কথা রাখতেই তিনি আবারো বিয়ে করলেন। মেয়ে উচ্চশিক্ষিত। নাম বিন্দু। বউ মরা মানুষের কপালে এত ভালো বউ জোটে না। কিন্তু কেমন করে যেন জুটে গেল। কিন্তু সমস্যা দেখা দিলো অন্য একটা। বিন্দুর সন্তান হয় না।
কত কবিরাজ, কত ডাক্তার দেখানো হলো। কোনো কাজ হলো না। কেউ বলল, আজমীর শরীফে গিয়ে মানত করতে, কেউ বলল তোমার বউকে কেউ হয়তো তাবিজ করছে। কেউ বলে বান মারছে- কত কথা।
শেষমেশ যে যা বলে তা-ই করতেন ইরতাজ উদ্দিন। এ গাছের পাতা, ও গাছের শেকড়-বাকড়, অমুক কবিরাজের মহৌষধ সবই চলল ছয় বছর। সাথে চলল আধুনিক ডাক্তারদের চিকিৎসা।
আধুনিক চিকিৎসার জোরেই হোক আর শেকড়-বাকড়ের জোরেই হোক; বিন্দু মা হতে চলল। পৃথিবীটাই অন্যরকম হয়ে গেল তাদের। বহু অপেক্ষার পর তাদের কোলজুড়ে সন্তান আসবে। পৃথিবীর সব সুখ চমকাবে তাদের জীবনে।
কিন্তু চরম সত্য হিসেবে সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে বিন্দুর মৃত্যু ঘটল। আকস্মিক মৃত্যু। জন্মের সময় সন্তানের মাথার পরিবর্তে পা আগে বের হয়ে আসে। রক্তক্ষরণে মারা যায় সে। বিষণœ, ক্লান্ত, রিক্ত ইরতাজ উদ্দিন সৃষ্টিকর্তার এ খেলায় নির্বাক হয়ে যান। ব্যবসা গুটিয়ে পাড়ি জমান বিদেশে। সিডনিতে থাকেন ছয় মাস। ওখানে তার মন টেকে না। অবশেষে গেলেন ম্যানিলায়। ওখানেই পরিচয় হলো ফ্লোরিয়ার সাথে। তার ব্যবসায়িক পার্টনার। বয়স ৪০। অতিরিক্ত ফর্সা। চুলগুলো বাদামি। চোখের মণি সাদা।
মাঝ বয়সে এসে একা একা জীবনটা অসহ্য মনে হলো তার। অথবা ইংরেজি চালচলনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন তিনি। কিংবা বলা যায় সময়ের চাহিদায় একদিন ফ্লোরিয়াকে বিয়ে করলেন তিনি।
বছর না ঘুরতেই ফ্লোরিয়া শুভ সংবাদ জানাল। ইরতাজ উদ্দিন এবার আর ভুল করলেন না। সার্বক্ষণিক একজন ডাক্তার রাখলেন ফ্লোরিয়ার জন্য।
কিন্তু এবারো সৃষ্টিকর্তা বিমুখ হলেন। কেন হলেন তা তিনি জানেন না। তার জীবনে কী এমন পাপ আছে, তাও তিনি জানেন না।
ঘটনাটা সামান্যই, লিফট থেকে নামতে গিয়ে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যায় ফ্লোরিয়া। ডাক্তার দেখালেন সেদিনই। সন্তানের কোনো ক্ষতি হয়নি জানান ডাক্তার। কিন্তু কাকতালীয়ভাবে সিজারের সময় মারা যায় সে।
ইরতাজ উদ্দিন সন্তানের আশা ছেড়ে দিলেন। বেরিয়ে পড়লেন ভ্রমণে। জাপান, কোরিয়া, মালদ্বীপ, মালয়েশিয়া, আমেরিকা কোনো জায়গাই বাদ রাখলেন না। কিন্তু যার মনের ভেতর প্রকৃত আত্মা নেই, তার কি আর এসব ভালো লাগে? পৃথিবীর সব সুখ এক করলেও কি সন্তানের বাবা হওয়ার সুখের সমতুল্য হয়?
ইরতাজ উদ্দিন ফিরে এলেন দেশে। গাজীপুরে ১০ একর জায়গার ওপর একটা এতিমখানা দিলেন। মাঝে-মধ্যে ঘুরে আসেন। নিজে এক সময় এতিম ছিলেন। মনে পড়ে তার সেইসব দিনের কথা।
এত অর্থবিত্ত, এত প্রতিপত্তি তাকে সুখী করতে পারেনি। কিন্তু শাব্দিক অর্থে তিনি এ জীবনে তেমন কোনো পাপ করেননি। ব্যবসাও করেছেন সৎ। তবে জীবনের পূর্ণতা এলো না কেন?
৫৪ বছর বয়সে এসে এসব ভাবার কোনো মানেই হয় না। এখন জুলফিতে পাক ধরেছে। যৌবনের রক্ত ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। এ সময় জীবনের হিসাব কারো মেলে না। মেলার কথাও না। তারপরও মানুষ মেলাতে যায়।
একদিন তিনি পুরনো বন্ধুদের নিয়ে পার্টি দিলেন। বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য নয়। গুলশানে নতুন একটা ফ্ল্যাট কিনেছেন, এটাই একমাত্র উপলক্ষ।
বন্ধুরা এলো। সারারাত আড্ডা হলো। সেই আড্ডাতেই সবাই তাকে ধরে বসল নতুন করে। বংশের প্রদীপ জ্বালাতে আবারো তাকে বিয়ে করতে হবে।
ইরতাজ উদ্দিন হাসেন। এই বয়সে আবার বিয়ে। কিন্তু বন্ধুরা নাছোড়বান্দা। বিশেষ করে মিজান। তার এক কথা, বিয়ে করতেই হবে। পাত্রী সে দেখবে। তিনি বললেন, ঠিক আছে বিয়ে করব। তবে পাত্রীর বয়স হতে হবে ১৮। তার কথা শুনে সবাই হই হই করে উঠল। বলে কি ব্যাটা। বুড়ো দামড়া কিনা ১৮ বছর বয়সের কচি মেয়ে বিয়ে করতে চায়।
ইরতাজ উদ্দিন হাসেন। মনে মনে ভাবেন, এই বয়সে এমন পাত্রী জোগাড় করা চাট্টিখানি কথা নয়। কিন্তু বিধিবাম। মিজান কোত্থেকে পাত্রী জোগাড় করে ফেলল। তিনি তো আকাশ থেকে পড়লেন। তার মতো বুড়োকে কোন মেয়ে বিয়ে করতে রাজি হলো। তিনি মিজানকে ডেকে বললেন, মেয়ের মাথার ছিট নাই তো?
ছিট মানে?
মানে মেয়ে পাগলি-টাগলি না তো?
আরে ধ্যাত! ওসব কিছু না। মেয়ের বাবা গরিব। তোর মতো নামকরা শিল্পপতি ওদের জামাই হবে, এটাই ওদের সৌভাগ্য।
তার মানে লোভের কাছে পরাস্ত।
আমরা সবাই লোভী। মানুষ লোভী না হলে পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে পারত না। সবকিছু অর্থহীন মনে হতো। তাছাড়া তোর এত কিছু ভাবার দরকার কি? বিয়ে করে দেখ। তাছাড়া ছোট মেয়ে হলে তোর বাবা হতে সুবিধা হবে। ছোট মেয়েদের ঝামেলা কম হয়। বয়স বেশি হলেই যত সমস্যা।
সারথির সাথে বেশ ধুমধামেই বিয়ে হলো তার। তারপরও কেমন জানি একটা অপরাধবোধ থেকে গেল তার। এত ছোট একটা মেয়েকে বিয়ে করার অপরাধ।
সারথি অবশ্য সব কিছু বেশ হালকাভাবেই নিল। ঘোর সংসারী স্ত্রীর মতো সবকিছু গুছিয়ে নিল। কাক নিয়ে ইরতাজ উদ্দিনের মাতামাতি দেখেও কিছু বলত না, বরং একদিন উৎসাহ নিয়ে বলল- জানো, ঘুঘু পাখিটা অদ্ভুত। এরা জোড়ায় জোড়ায় থাকে। একটাকে খাঁচায় বন্দী করে রাখলে রাগ করে মরে যায়।
রাগ করে মরে যায় মানে?
রাগ মানে রাগ, মানে খাওয়া-দাওয়া করে না। না খেয়ে মরে। তাই নাকি?
হ্যাঁ তাই।
সারথির সাথে বেশ সুখেই দিন কাটছিল। এই তো মাস তিনেক আগেও বারান্দায় মাথা ঘুরে পড়ে গেল। ওকে নিয়ে গেলেন ক্লিনিকে। তখনই জানলেন সারথি মা হবে।
ইরতাজ উদ্দিন পার্টি দিলেন। বন্ধুরা এসে নাচানাচি করল। একদল বলল ছেলে হবে। অন্যদল বলল মেয়ে হবে। এই নিয়ে কত হই-চই।
বেলকোনিতে আরাম করে বসে ইরতাজ উদ্দিন এসব ভাবছিলেন। তার হাতের সিগারেটের আগুন কখন নিভে গেছে বুঝতে পারেননি। তিনি নেভানো সিগারেটেই টান দিলেন। হঠাৎ তার চোখ গিয়ে পড়ল কাকের বাসায়।
অদ্ভুত একটা দৃশ্য লক্ষ্য করলেন। অনেকক্ষণ এক ধ্যানে দৃশ্যটা দেখলেন তিনি। তার ধ্যান ভাঙাল মিজান।
কি রে নেভানো সিগারেট টানছিস?
ও হ্যাঁ, তাই তো। খেয়ালই করিনি।
কি রে। তোর কী হয়েছে বল তো? এত বছর পর বাবা হলি অথচ এখনো সন্তানকে দেখতে গেলি না।
যাব।
যাব তো বুঝলাম। ভাবী তো তোর অপেক্ষা করছে। তোর তো সবার আগে সন্তানের মুখ দেখার কথা। নাকি মেয়ে হয়েছে বলে খুশি হতে পারিসনি।
না, না, ওরকম কিচ্ছু না। আসলে শরীরটা ভালো যাচ্ছে না।
কী যে বলিস না। চল, চল।
ক্লিনিকে তিনি পৌঁছলেন সন্ধ্যার একটু আগে। কেবিনের সাদা বেডে সারথি শুয়ে আছে। ওর কোলে একটা শিশু। অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ইরতাজ উদ্দিনের দিকে। তিনি কোলে নিলেন। বুকে জড়িয়ে ধরলেন। অনেকক্ষণ চোখ বন্ধ করে থাকলেন। তারপর হঠাৎ বললেন- সারথি, কী নাম রাখা যায় বলো তো?
তুমিই রাখো। আমি অবশ্য মনে মনে একটা নাম ঠিক করেছিলাম।
কী নাম?
পরে বলব। এখন থাক।
আচ্ছা ঠিক আছে। তবে তোমাকে আজ একটা দৃশ্যের কথা বলব। মানে দুপুরে একটা মারাত্মক দৃশ্য আমি দেখলাম।
কী দৃশ্য?
ওই যে বাসার সামনে কাকের বাসাটায়।
আবারো কাক। এ গল্প তো শুনেছি।
এ গল্পের প্রথম অংশ শুনেছ। শেষ অংশ শোনোনি। তুমি শুধু জানো কোকিল কাকের বাসায় ডিম দেয়। কাক সেই ডিমে তা দিয়ে বাচ্চা ফোটায়। এতটুকুই।
হ্যাঁ, তা ঠিক।
আমাদের বাসার সামনে কাকের বাসাতেও একটা কোকিল ডিম দিয়ে গেছে। কাক তা নিজের ডিম মনে করে বাচ্চা ফুটিয়েছে।
সে তো অনেক আগেই ফুটিয়েছে।
কিন্তু আজ দুপুরে দেখলাম কাক দুটো ওই বাচ্চাকে ঠুকরিয়ে বাসা থেকে ফেলে দিচ্ছে।
তাই নাকি? কিন্তু কেন?
কারণ বাচ্চাগুলো ডাকতে শিখেছে। ওরা কা-কা না করে কু-কু ডাক দিচ্ছে। ফলে কাক দুটো বুঝে গেছে, যে বাচ্চাকে তারা এতদিন তা দিয়েছে তা আসলে কোকিলছানা।
সারথি গল্পটা শুনে হাসতে লাগল। হাসি থামিয়ে বলল, এই দৃশ্যটা তোমার কাছে এত মজার মনে হলো। তুমি আসলে কাক নিয়ে খুব ভাব।
হ্যাঁ সারথি, তুমি ঠিকই বলেছ। কাক নিয়ে আমি অনেক ভাবি। কারণ সম্ভবত আমি নিজেও কাক। কিন্তু আমার কোলে তুমি যে সন্তান তুলে দিয়েছ তা আমার না। আচ্ছা সত্যি করে বলো তো এটা কোন মানুষরূপী কোকিলের সন্তান?
সারথি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। যে সত্যকে সে লুকিয়ে ফেলতে চেয়েছিল তা সম্ভব হয়নি। এখন কী করবে সে? অল্প বয়সের প্রেম যে তার এত বড় ক্ষতি করবে তা কে জানত? কে জানত যে ছেলেকে ভালোবাসত সে তাকে ধোঁকা দেবে।
সারথি মাথা নিচু করে অঝোরে কাঁদছে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে বাইরে। আর একটু পরেই পৃথিবী অন্ধকার হয়ে যাবে। সে অন্ধকারে আস্তে আস্তে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে তার অশ্রু। সারথি এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ইরতাজ উদ্দিন আহমেদের দিকে। অজানা একটা ভয়, অজানা একটা আশঙ্কায় হৃদয় দুলছে তার।
ইরতাজ উদ্দিন সারথির দিকে তাকালেন। তার চোখে জল। তিনি তার কপালে হাত রাখলেন। সারথি কাঁপছে। হঠাৎ দমকা একটা হাওয়া ছুঁয়ে গেল তাদের। ইরতাজ উদ্দিন বললেন, আমি কাক নই, আমি মানুষ।
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে জানুয়ারি, ২০০৮ বিকাল ৫:৪৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

