‘পাহাড়ের পাদদেশের গহিন পান-সুপারির বাগান। নির্জন, নীরব স্তব্ধ এলাকা। কোথাও কেউ নেই। মশার ভন-ভন চারদিকে। মাঝে মধ্যে পাহাড়ি সাপ পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে। ভারতীয়দের নির্যাতনে শরীর দিয়ে রক্ত ঝরছে। প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় শরীর পাথর হয়ে গেছে। এরপরও মন গলেনি ভারতীয় খাসিয়াদের। সকালে এসে আবার নির্দয়ের মতো হাতের লাঠি দিয়ে নির্মমভাবে পেটায়। যখন তারা পেটায় তখন বাঁচাও বাঁচাও করে চিৎকার করছিলাম।’ আমরা মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছি। অঝোরে কাঁদছিল আর এই কথাগুলো বলছিল সিলেটের জৈন্তাপুরের কিশোর সাহেদ আহমদ ও মোরশেদ আহমদ। প্রথমে ভারতীয় খাসিয়া এবং পুলিশের হাতে টানা দুই দিনের বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে তারা গতকাল ফিরে এসেছে বিধ্বস্ত শরীর নিয়ে। তাদের শরীরে লেগে আছে ভারতীয় খাসিয়াদের অমানবিক নির্যাতনের ক্ষত। এই দুই কিশোরের মতো আরও চার কিশোর ছিল এক সঙ্গে। তাদের অবস্থাও একই। আর তারা যখন বাড়ি ফিরে এলো তখন অঝোরে কাঁদছিল ৬ কিশোরই। যেন নির্বাক হয়ে গেছে তারা। হাউ-মাউ করে কাঁদছে আর স্বজনদের কাছে তাদের ওপর নির্যাতনের কথা বলছে। তাদের ওপর নির্যাতনের বিবরণ শুনে আত্মীয়-স্বজনরাও কাঁদছে। তাদের কান্নায় গতকাল জৈন্তাপুরের অবহেলিত গুচ্ছগ্রামের শ’ শ’ মানুষও কাঁদলো। শিশু-কিশোরদের ওপর এভাবে কেউ নির্যাতন চালাতে পারে তা না দেখলে বোঝার উপায় নেই। নির্যাতনের শিকার হওয়া গুচ্ছ গ্রামের মোর্শেদ মানবজমিনকে জানায়, কোন মানুষ মানুষকে এরকম মারে না। আমাদের ওপর ওই রকম নির্যাতন করা হয়েছে। ঘটনার শুরু রোববার সকালে। ঘটনাস্থল সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার শ্রীপুর পাথর কোয়ারি। এর পাশ ঘেঁষে গুচ্ছগ্রাম। এ গ্রামের বেশির ভাগ মানুষ দিনমজুর। দিন আনে দিন খায়। খুপরির মতো ঘর বানিয়ে জীবিকার তাগিদে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা মানুষ বসতি গেড়েছে এই গ্রামে। পাশেই পাথর কোয়ারি থাকায় কাজ পেয়ে যাওয়ায় ধীরে ধীরে গুচ্ছগ্রামে বসতি গড়া শুরু হয়। এই গুচ্ছগ্রামে এখন প্রায় ৫ হাজার মানুষের বসতি। কিন্তু গ্রামে এখনও লাগেনি কোন উন্নয়নের ছোঁয়া। এ কারণে গুচ্ছগ্রামের প্রায় সব মানুষেরই আয়ের এক উৎস শ্রীপুর কোয়ারির পাথর। সকাল হলেই গ্রামের পুরুষ, শিশু এমনকি মহিলারাও পাথর তোলার কাজ শুরু করেন। বিকাল পর্যন্ত তারা পাথর তুলে যা টাকা পান তাই দিয়ে চলে তাদের সংসার। গত রোববার সকাল ৯টায় প্রতিদিনের মতো শ্রীপুর কোয়ারিতে পাথর তুলতে যায় গুচ্ছগ্রামের হুমায়ুন আহমেদ (১৫), নুরুল ইসলাম (১১), করিম মিয়া (১২), সামাদ মিয়া (১৪), সাহেদ আলী (১৩), মোরশেদ আলম (১১) ও একই গ্রামের সেলিম আহমদ (৩৫)। কোয়ারির অভ্যন্তরে যখন তারা কাজ করছিল তখন একদল ভারতীয় খাসিয়া বন্দুক তাক করে ধরে তাদের দিকে। বলে ওঠে, ‘কেউ নড়বে না। গুলি করবো।’ এসময় সবাই এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে। ভারতীয় ১০-১২ জন খাসিয়া এসে তাদের দিকে বন্দুক তাক করে তাদের সঙ্গে যেতে বলে। বন্দুক হাতে থাকায় কথামতো ৬ কিশোর ও এক যুবক তাদের সঙ্গে নো-ম্যানস্ ল্যান্ড এলাকা পাড়ি দিয়ে ভারতে ঢুকে যায়। এ সময় আশপাশে তারা বিজিবি’র কোন সদস্যকে দেখতে পায়নি। পিঠে বন্দুক তাক করে বাংলাদেশের ৬ কিশোর ও এক যুবককে বেলা ১১টার দিকে তারা নিয়ে যায় পাশের পান-সুপারির জুমে। ফিরে আসা কিশোররা জানিয়েছেন, ভারতের ওই পানপুঞ্জি ডাউকে পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত। নির্জন জুম। কোথাও কেউ নেই। জুমের ভেতরে নিয়েই খাসিয়ারা তাদের সবার হাত-পা বেঁধে ফেলে। এ সময় হাতে থাকা লাঠি ও লোহার রড দিয়ে মারধর শুরু করে। প্রায় ১৫ জন খাসিয়া তাদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালায়। এ সময় তারা ভারতীয় খাসিয়াদের হাতে পায়ে ধরলেও তাদের মন গলেনি। রোববার দিনের বেলা কয়েক দফা তাদের ওপর নির্যাতন চালায়। নির্যাতনের সময় এবং বন্দি থাকাকালে কয়েকজন খাসিয়া সব সময় বন্দুক তাক করে ধরেছিল তাদের দিকে। রোববার বিকালের দিকে আবার কয়েকজন মিলে তাদের মারধর করে। মারধরের সময় কিশোররা ‘পানি পানি’ বলে চিৎকার করলেও প্রথমে তাদেরকে পানি দেয়া হয়নি। পরে কিছু পানি এনে তাদের দেয়া হয়। সন্ধ্যা নামতেই হাত-পা বাঁধা অবস্থায় জুমের ভেতরের সুপারির গাছের সঙ্গে বেঁধে ফেলা হয় সবাইকে। রাতে আবার কয়েকজন খাসিয়া এসে তাদের মারধর করে। হাতে থাকা লাঠি ও লোহার রড দিয়ে প্রহার করার সময় কিশোররা ‘বাঁচাও বাঁচাও’ বলে চিৎকার করলেও আশেপাশে মানুষজন না থাকায় কেউ আসেনি। এরই মধ্যে রাতে ব্যাঙ ও কুচিয়া রান্না করে এনে তাদের খেতে দেয়। কিন্তু বাংলাদেশের বন্দি থাকা কিশোররা সে খাবার খেতে পারেনি। সকালে শুধু চা ও বিস্কিট খেয়ে কাজে নামা শ্রমিকরা দিনভর মারধর খাওয়ার পর রাতে আধা মরা হয়ে পড়ে থাকে। ঘটনার বিবরণ দিয়ে ভারতের বন্দিদশা থেকে ফিরে আসা মোর্শেদ, সাহেদ আহমদ জানায়, জুমের ভেতর আমাদের মনে হয়েছে আর মায়ের কোলে ফিরতে পারবো না। এখানেই আমাদের জীবন দিতে হবে। এই ভেবে ভেবে আমরা কান্না করেছি। সবাই মানসিকভাবে ভেঙে পড়ি। কখন এসে খাসিয়ারা এসে বুকে বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করবে সে প্রহর গুনছি। তারা জানান, মৃত্যুর কাছাকাছি থাকায় শেষ রাতের দিকে তার আর ভয় পায়নি। মনে মনে বুঝে গেছি হয়তো জুমের জীব-জন্তু খেয়ে ফেলতে পারে তাদের। ভোর হতে আবার কয়েকজন খাসিয়া সশস্ত্র অবস্থায় আসে। তারা এসে আবার আমাদের ওপর নির্যাতন চালায়। হাতের লাঠি ও বন্দুকের নলা দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারে। এ সময় তাদের হাতে পায়ে ধরে অনুনয় করলেও তারা নির্যাতন থামায়নি। এক পর্যায়ে তারা বিএসএফকে খবর দেয়। বিএসএফ জওয়ানরা এসেও আরেক দফা মারধর করে। সোমবার দিনভর অভুক্ত থেকে মারধর খাওয়ার পর বিকালের দিকে ভারতের পুলিশের হাতে তাদের তুলে দেয় খাসিয়ারা। ভারতীয় পুলিশ এসে সবাইকে ক্যাম্পে নিয়ে যায়। রাতে ক্যাম্পে যাওয়ার পর তাদের রুটি খেতে দেয়া হয়। পানিও খেতে পায় তারা। তবে রাতের বেলা ভারতীয় পুলিশের কয়েকজন সদস্য তাদের মারধর করে। মঙ্গলবার সকাল থেকে তাদের ফেরত দেয়ার প্রস্তুতি চালায়। দুপুর একটার দিকে ভারতের ইমিগ্রেশন পুলিশের কাছে তাদের হস্তান্তর করা হয়। বেলা ২টার দিকে ইমিগ্রেশন পুলিশ তাদের বাংলাদেশের ইমিগ্রেশন পুলিশের কাছে তুলে দেয়। যাদের ফেরত দেয়া হয়েছে, তারা হচ্ছে- হুমায়ুন আহমেদ (১৫), নুরুল ইসলাম (১১), করিম মিয়া (১২), সামাদ মিয়া (১৪), সাহেদ আলী (১৩), মোরশেদ আলম (১১)। এরপর বাংলাদেশ পুলিশ মুচলেকার মাধ্যমে তাদের ছেড়ে দিলে বিকাল ৩টার দিকে তারা বাড়ি ফিরে আসে। যারা বাড়ি ফিরে এসেছে তাদের বয়স ১৬ বছরের নিচে। এ কারণে বাংলাদেশের পুলিশের হাতে হস্তান্তরের সময় ভারতের ইমিগ্রেশন পুলিশ শিশু-কিশোর হওয়ায় মানবিক দিক বিবেচনা করে তাদের ফেরত দেয়া হয়েছে বলে জানায়। তবে ভারতে এখনও আটকা রয়েছে গুচ্ছগ্রামের সেলিম আহমদ (৩৫)। ফিরে আসা কিশোররা জানায়, ভারতীয় খাসিয়ারা সবচেয়ে বেশি নির্যাতন চালিয়েছে সেলিমের ওপর। সেলিম বার বার পানি পানি বলে চিৎকার করলেও তাকে পানি দেয়নি খাসিয়ারা। ভারতীয় খাসিয়াদের পাশাপাশি বিএসএফ ও পুলিশ সেলিমের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে। তারা জানায়, সেলিমকে তাদের সঙ্গে ভারতের পুলিশ ক্যাম্পে আনা হয়। এরপর তারা ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে এলেও সেলিম ওখানে থেকে গেছে। নির্যাতনের কারণে সেলিমের শারীরিক অবস্থা বেশি ভাল নয় বলে দাবি করে তারা। সে ভালভাবে হাঁটা-চলা করতে পারছিল না। কিশোররা জানায়, তারা শুনেছে সেলিমকে মামলায় আসামি করে কারাগারে পাঠানো হবে। তবে ভারতীয় ইমিগ্রেশন পুলিশ সেলিমের ব্যাপারে কোন তথ্য দেয়নি বাংলাদেশের পুলিশকে। এ ব্যাপারে সিলেটের তামাবিল ইমিগ্রেশন পুলিশের এএসআই আনোয়ার হোসেন মানবজমিনকে জানিয়েছেন, আমরা ৬ জনকে পেয়েছি। সেলিমকে আমাদের হাতে তুলে দেয়া হয়নি। এদিকে, গুচ্ছগ্রামে সেলিমের বাড়িতে শোকের মাতম চলছে। অবুঝ তিন শিশুকে নিয়ে কাঁদছেন সেলিমের স্ত্রী নাজমা বেগম। তিনি জানান, তার স্বামী দিন আনে দিন খায়। স্বামীকে ধরে নেয়ার পর থেকে গত দুই দিন ধরে তার ঘরে চুলা জ্বলেনি। বাচ্চারা কিছুই খায়নি। সেলিমকে ফিরিয়ে আনতে তিনি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়েছেন। এ ব্যাপারে জৈন্তাপুর ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার করিম আহমদ জানিয়েছেন, যারা ফিরে আসছে তাদের ওপর যে নির্যাতন চালানো হয়েছে তা তাদের শরীর দেখলেই বোঝা যায়। স্থানীয় জৈন্তাপুর পরিষদের চেয়ারম্যান আলমগীর হোসেন জানান, ফিরে আসাদের কাছ থেকে আমরা জেনেছি সেলিমকে সবচেয়ে বেশি মারধর করা হয়েছে। তার স্ত্রী-সন্তানরা না খেয়ে আছে। তিনি এ জন্য সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সহায়তা কামনা করেন।
মানবজমিন থেকে শেয়ার করা।
লিনক
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


