নিজামীর মুক্তি বাংলাদেশের রাজনীতিতে কি প্রভাব ফেলবে?
আনিসুর রহমান
প্রায় দুই মাস আটকে রাখার পর গত ১৫ জুলাই জামায়াতে ইসলামী দলের আমীর মতিউর রহমান নিজামীকে জামিনে মুক্তি দেয়া হয়েছে। তিনি হচ্ছেন প্রথম সিনিয়র নেতা যিনি জরুরী অবস্থায় গ্রেফতার হওয়ার পর জামিনে মুক্তি পেলেন। এমন এক পরিস্থিতিতে তাঁকে মুক্তি দেয়া হলো যখন আওয়ামী লীগের সাথে সরকারের অনেকটা প্রকাশ্য সমঝোতার মাধ্যমে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হতে যাচ্ছে, যা বিএনপি-জামায়াত বয়কট করেছে। তাছাড়া সরকার বিরোধী আন্দোলনের পথেও বিএনপি-জামায়াত অনেকদূর এগিয়ে গিয়েছে। ফলে নিজামীর মুক্তি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি প্রভাব ফেলতে পারে। সেটি কি হতে পারে, তা বুঝতে কেয়ারটেকার সরকারের সাথে জামায়াতের সম্পর্কটা বোঝা প্রয়োজন।
শুরু থেকেই জামায়াত বর্তমান কেয়ারটেকার সরকারকে সন্দেহের চোখে দেখে এসেছে। এই সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই দলটিই প্রথম সরকারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল এবং জাতিসংঘের ভূমিকার প্রতিবাদ করেছিল। কিন্তু তার পর দলটির ভূমিকা হয়ে পড়ে নিস্ক্রিয় পর্যবেক্ষণ, এমনটি কখনও কখনো মৌন সমর্থনের, যা প্রায় বছরখানেক চলতে থাকে। এর কারণও ছিল। জামায়াতের আস্থা অর্জনের জন্য কেয়ারটেকার সরকার কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিল। এর মধ্যে ছিল নিজামীর ঘনিষ্ঠ সচিব আইয়ুব কাদেরীকে উপদেষ্টা নিয়োগ। তাছাড়া দলটি হচ্ছে একটি শক্তিশালী সেনাবহিনীর প্রবল সমর্থক। তাদের বিভিন্ন প্রকাশনায় বলা হয়েছে যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের জন্য একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনীর কোন বিকল্প নেই। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দলটি নিজেকে সেনা বাহিনীর সহায়ক শক্তি মনে করে। সেনা সমর্থিত হবার কারণে এ সরকারের প্রতি তার স্বাভাবিক একটি দুর্বলতা ছিল। এছাড়া দুর্নীতির বিরুদ্ধে এই দলটিই ছিল সবথেকে বেশী সোচ্চার। ফলে প্রথম যখন সরকার দুর্নীতি বিরোধী অভিযান পরিচালনা করে, তখন তার বিরুদ্ধে দলটির কিছু বলার ছিল না। হয়তো দলটির নেতা-কর্মীরা বিশ্বাসও করেছিলেন যে, এ সরকার সত্যি সতিই দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে চায়।
প্রথম দিকে সরকার মোটামুটি নিরপক্ষেভাবে দুর্নীতি বিরোধী অভিযান চালালেও আস্তে আস্তে তার প্রকৃত চেহারা প্রকাশিত হতে থাকে। এটি স্পষ্ট হয়ে পড়ে যে, নির্বাচন অনুষ্ঠান, এমনকি দুর্নীতি দমনও এ সরকারের লক্ষ্য নয় বরং বাংলাদেশকে একটি দীর্ঘস্থায়ী বৈদেশিক নিয়ন্ত্রণের অধীনে নিয়ে যাবার জন্য কাজ করা হচ্ছে। প্রাথমিক শিক্ষাকে ব্রাকের হাতে তুলে দেয়া হয়, তারপর স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনাকে খাতকেও এনজিওদের হাতে দিয়ে দেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি অকল্পনীয় হলেও সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরকে এনজিওদের অধীনে দিয়ে দেয়া হচ্ছে। দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো ধ্বংসের কাজ অনেকটাই সম্পন্ন করা হয়েছে। এমনকি ভারতকে ট্রানজিট দেয়ার কাজটি আওয়ামী লীগ না করতে পারলেও এই সরকার করে ফেলতে চেষ্টা করছে। তাছাড়া নারী উন্নয়ন নীতি নিয়ে সরকার সরাসরি দেশের ধর্মীয় শ্রেণীর সাথে সাংঘর্ষিক অবস্থানে চলে যায়। ফলে দলটির বিভিন্ন পর্যায় থেকে সরকার বিরোধী আন্দোলনের চাপ বাড়তে থাকে।
এ রকম পরিস্থিতিতে আমিরের গ্রেফতারের পর দলটি সরকার বিরোধী কঠোর অবস্থানে চলে যায়। টিভি চ্যানেলগুলোতে ৪ দলীয় জোটের সমাবেশের যে ভিডিওচিত্র দেখা যাচ্ছে, তা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, বিএনপির চেয়ে জামায়াতের সরকার বিরোধী ভূমিকা অনেক বেশী অনমনীয়। আমীরের মুক্তির পর এই ভূমিকা কতটুকু অক্ষুন্ন থাকে সেটিই দেখার বিষয়। এ ক্ষেত্রে দুটি বিকল্প ঘটনা ঘটতে পারে:
১. সরকার জামায়াতের প্রতি সহানুভূতিশীল এ ধরণার বশবর্তী হয়ে আন্দেলনমূখী অবস্থা থেকে দলটি সরে আসতে পারে। সে ক্ষেত্রে ক্ষমতাশীনেরা তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেতে কিছুটা সুবিধা পাবেন। কেননা, বিধ্বস্থ বিএনপির একার পক্ষে আন্দোলন গড়ে তোলা অনেকটাই অসম্ভব। এদিকে জামায়াত স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতিগ্রস্থ হবে। দীর্ঘদিনের মিত্র বিএনপির সাথে তার দূরত্ব সৃষ্টি হবে, আতাতকারী দল হিসাবে পরিচিত হবে এবং নেতা-কর্মীদের মনোবল ভেঙ্গে যাবে।
২. আমীরের মুক্তিতে দলটির নেতা-কর্মীরা আরও বেশী আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতে পারে এবং গণতন্ত্রকে বাধাগ্রস্থ করা ও জাতীয় স্বার্থ হানি করার মত সকল প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে কার্যকর আন্দোলন গড়ে তুলতে আগ্রহী হয়ে উঠতে পারে। বিএনপি ও জামায়াত ঐক্যবদ্ধ থাকলে নব্বই এর মত একটি গণ আন্দেলন গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। এ ধরণের কিছু ঘটলে দলটি দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সমর্থন পাবার পথে আরও একধাপ এগিয়ে যাবে।
জামাযাত দল হিসাবে খুব বেশী বড় না হলেও গত দুই দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুধু যে একটা ফ্যাক্টর হয়ে আছে তা নয়, বরং রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে তার একটা ভূমিকাও রয়েছে। ১৯৮৭ সালে দলটির দশজন সংসদ সদস্য একযোগে পদত্যাগ করার পর এরশাদ সংসদ ভেংগে দিতে বাধ্য হন এবং স্বৈরাচার বিরোধী আন্দেলান নতুন মাত্রা পায়। একানব্বইতে দলটির সমর্থনে বিএনপি সরকার গঠন করে আবার ১৯৯৬ তে বিএনপিকে ডুবিয়ে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় যাবার পিছনেও দলটির যথেষ্ঠ অবদান ছিল। চিরবৈরী আওয়ামী লীগের সাথে দলটি কেয়ারটেকার সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন করেছিল যা জনগণের ধর্মপ্রবণ অংশের মধ্যে আওয়ামী লীগের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধিতে এবং বিএনপির সমর্থন কমাতে সাহায্য করে। ২০০১ সালে দলটির সাথে প্রকাশ্য ঐক্যের মাধ্যমে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বিজয়ী হয়। এবার দলটি কি ভূমিকা রাখে সেটিই দেখার বিষয়।
ই-মেইল: [email protected]
উৎস: http://www.sonarbangladesh.com

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


