ছোঁয়া না ছোঁয়া (গল্প)

২২ শে জুলাই, ২০০৮ সন্ধ্যা ৭:০৯

শেয়ার করুন:                   Facebook

ছেলেটা বাস স্টপেজে দাড়িয়ে ছিল। বাস স্টপেজ বলতে ছিল শুধু একটা স্ট্যান্ড এবং তার মাথায় কালো টিনের পাতে সাদা রং দিয়ে আরবীতে বাসের নম্বরগুলো লেখা; সেখানে না ছিল কোন ছাউনি আর না ছিল বসার ব্যবস্থা।

রাস্তাটিতে বাস চলাচল করে কম। রাত বাড়ার সাথে সাথে তা আরও কমে গিয়েছিল। একটা বাস এলো। ছেলেটা উঠলো না। বাসের নম্বরটিও দেখলো না। রাস্তার অপর পার্শ্বে একটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোর। সেটি কিছুক্ষণ আগে বন্ধ হয়ে গেছে। তার মাথায় আরবীতে বড় বড় অক্ষরে নিওন সাইনে লেখা 'ওমর আফান্দী' - দোকানের নাম। ছেলেটা নিওন সাইনের দিকেই তাকিয়ে ছিল কিনা বোঝা গেল না।

বাস স্টপেজের কাছে একটা ক্যাফে। সেখানে তীব্র গন্ধযুক্ত টার্কিস কফি পাওয়া যায়। লোকেরা ডাইস খেলে, কফি খায়, লম্বা নলওয়ালা হুকা টানে আর আড্ডা দেয়। রাজনীতি নিষিদ্ধ। ফলে রাজা-উজির মারা যায় না। আড্ডা হয় ফুটবল কিংবা সিনেমা স্টারদের নিয়ে। রাত বাড়াতে ক্যাফেটিও খালি হয়ে গিয়েছিল।

আরও কয়েকটা বাস এলো। ছেলেটাকে দেখে থামলোও। কিন্তু সে বাসে উঠলো না। বাসের নম্বরটাও দেখলো না। হাত দুটো বুকের উপর ভাজ করে রাস্তার পাশে পার্ক করা গাড়ীতে হেলান দিয়ে একমনে ওমর আফান্দীর নিওন সাইনের দিকে তাকিয়ে থাকলো।

বেশ কিছুক্ষণ পর তার মধ্যে চাঞ্চল্য দেখা গেল। একটা মেয়ে হেটে আসছে। স্বাস্থ্যবতী সাধারন মিশরী চেহারার মেয়ে। কালো রংয়ের লম্বা স্কার্ট আর মেরুন রংয়ের শার্ট পরা। কাঁধের একটু নীচ পর্যন্ত লম্বা চুল স্টেপ করে কাটা। সে ছেলেটার সামনে এসে দাড়ালো। ডান হাতটা তার দিকে বাড়িয়ে তার মুখের দিকে চেয়ে একটু হাসলো। বললো,

- মা'লিস (দুঃখিত), অনেকক্ষণ দাড় করিয়ে রাখলাম।

ছেলেটা কিছু বললো না। হাত বাড়িয়ে নিজের হাতের মধ্যে মেয়েটির প্রসারিত হাতটি আলতো ভাবে নিল।

ছেলেটির নাম আইমান আর মেয়েটির নাম আমাল। আমাল মানে আশা। ছেলেটি কিন্তু অধিকাংশ সময়ই খুব বেশী আশা করতে পারে না। আমালের ডান পাশের মাড়ির কাছের একটি দাঁত একটু বাইরের দিকে। হাসলে ঐ দাঁতটি বেরিয়ে পড়ে। শুধুমাত্র তখন আমালকে তার নিজের মনে হয়। তাকে নিয়ে একটু আশা করতে পারে।

আমাল একটি ফার্ম্মেসীতে কাজ করে। তাহরীর স্টেশন থেকে কায়রো মিউজিয়মের উল্টো দিকে কিছুদূর গেলে একটা ট্রাম স্টেশন। নাম বাব আল লুক। ফাম্মেসীটি তার পাশেই। সেটি সারা রাত খোলা থাকে। আমালের ডিউটি অবশ্য রাত দশটা পর্যন্ত। সেখান থেকে বিদায় নিয়ে বেশ কিছুটা হেটে তাহরীর স্টেশনে আসতে তার সাড়ে দশটারও বেশী বেজে যায়।

আইমান একটা কাপড়ের দোকানে সেলসম্যানের কাজ করে। তার সকাল সকাল ছুটি হয়ে যায়। এর পর সে বাব আল লুক স্টপেজে এসে আমালের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। রাস্তার পাশে পার্ক করে রাখা গাড়ীতে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে সামনের বন্ধ ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের দিকে চেয়ে সে তখন নানা কিছু ভাবে। অনেক কথা মনে মনে গুছিয়ে রাখে আমালকে বলবে বলে।

কিন্তু আমাল যখন এসে তার সামনে দাঁড়ায়, একটু হেসে হাতটা বাড়িয়ে দেয়, তার ডানদিকের উচু দাঁতটি প্রকাশিত হয়ে পড়ে তার হাসিটিকে আরও আপন করে তোলে তখন তার আর কিছুই বলার থাকে না। আমালের বাম হাতটি আলতো করে হাতের মুঠোয় নিয়ে তারা হাটতে হাটতে তাহরীর স্টেশনে যায়। সিড়ি দিয়ে নেমে পাতাল রেলে ওঠে।

ওরা দুজন থাকে কায়রোর উপকন্ঠে। যায়গাটার নাম যায়তুন। তাহরীর থেকে অনেক দূর। তা প্রায় ঘন্টাখানেক লেগে যায়। প্রায়ই ফেরার পথে পাতাল রেলের দুলুনিতে আমাল ঘুমিয়ে পড়ে। তার খোলা চুল উড়ে এসে আইমানের চোখ-মুখ ছুয়ে যায়। রাতের ট্রের ফাঁকা। তবুও আইমান অনড় হয়ে বসে থাকে পাথরের মূর্তির মত। তার বুকের মধ্যে তখন খাখা করে। মনে হয় ট্রেনের মেঝেটা কখন খসে পড়ে যাবে। আমাল সাধারণ চেহারার মেয়ে, তাই এখনও রয়েছে। নইলে কবে টাকাওয়ালা কোন পুরুষের আংটি পরে রিজার্ভ হয়ে যেত। কিন্তু ক'দিনই বা এভাবে থাকবে!

আইমান অনেকবার বলি বলি করেও বলতে পারেনি। বিয়ের কথা উঠলেই আলাদা ফ্লাটের কথা উঠবে। আলাদা ফ্লাট ছাড়া কোন মেয়েই রাজি হবে না তার ঘরে যেতে। মেয়ে রাজি হলেও তার বাপ-মা তো হবেই না। বলবে, 'ঠিক আছে, মেয়ে অপেক্ষা করবে। তুমি টাকা জমাতে থাকো।' মেয়ে কিন্তু খুব বেশীদিন অপেক্ষা করে না। তেমন বর পেলে ঠিকই মালা পরিয়ে দেয়। বলে, 'কি করবো বলো, আব্বা-মার ইচ্ছা। তাছাড়া .....।' ঐ কথাটি কোন পুরুষই শুনতে চায় না। টাকা-কড়ির বিষয়টি বড় লাগে তাদের।

ট্রেন যায়তুন স্টেশনে আসলে আইমান আমালের ঘুম ভাঙ্গিয়ে দেয়। তারপর দুজন নেমে পড়ে। কাছেই আমালের বাড়ী। বিদায় নেবার সময় সে হাত বাড়িয়ে দেয় করমর্দনের জন্য। আইমান তার হাত ধরে। কিন্তু তার কি যেন হয়ে যায়। রোজকার মত হালকা করমর্দনের পর হাতটি না ছেড়ে দিয়ে সে একটু জোরেই নিজের দিকে হঠাৎ টান দেয়। আইমানের গায়ের উপর পড়তে গিয়েও তন্দ্রাচ্ছন্ন আমাল টাল সামলে নেয়। সদ্য ঘুম ভাঙ্গা চোখে অবাক হয়ে তাকায়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আইমান বলে,
- মা'য়া সালাম (বিদায়)।

আইমান হন হন করে হাটতে থাকে তার বাড়ীর দিকে।

আমাল ঠাঁই দাড়িয়ে থাকে। তার ইচ্ছা হয় আইমানকে ডাকতে। কিন্তু সে তখন অনেক দূরে চলে গেছে।
ই-মেইল:

উৎসঃ http://www.sonarbangladesh.com

 

 

  • ৪ টি মন্তব্য
  • ২১৯ বার পঠিত,
Send to your friend Print
রেটিং দিতে লগ ইন করুন
পোস্টটি ৩ জনের ভাল লেগেছে, ০ জনের ভাল লাগেনি
১. ২২ শে জুলাই, ২০০৮ সন্ধ্যা ৭:৪৮
comment by: নাফে মোহাম্মদ এনাম বলেছেন: গুড।
২৩ শে জুলাই, ২০০৮ সকাল ১০:৩৯

লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ।

২. ২২ শে জুলাই, ২০০৮ রাত ৮:১১
comment by: ছন্নছাড়ার পেন্সিল বলেছেন: কী এক ক্লান্ত সুর পুরো গল্প জুড়ে। থেমে থেমে পড়লাম, এজন্য। খুব ছুঁয়ে গেল!!!
২৩ শে জুলাই, ২০০৮ সকাল ১০:৪২

লেখক বলেছেন: অসংখ্য ধন্যবাদ এতো সুন্দর মন্তব্যের জন্য।

 



 


পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ

    কোন বিভাগ নেই

সর্বমোট হিট

 ৯৬৭৩