[লেখাটি গতবছর দৈনিক নয়া দিগন্তে পড়েছিলাম। সামহোয়ারের ব্লগারদের হয়তো ভালো লাগতে পারে।]
কল্যাণমূলক ইসলামি জীবন ব্যবস্থায় সম্পদের সুষ্ঠু বন্টন নিশ্চিত করা, অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা করা ও জনগণের পিছিয়ে পড়া অংশের জন্য অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ে তোলার প্রধান হাতিয়ার হচ্ছে যাকাত। অর্থিকভাবে সামর্থবান মুসলমানদের সঞ্চিত সম্পদের শতকরা আড়াই ভাগ দরিদ্রকে যাকাত হিসাবে দিয়ে দেয়াকে ইসলামে অবশ্য কর্তব্য হিসাবে নির্ধারণ করেছে। বাংলাদেশে প্রতিবছর কত টাকার যাকাত দেয়া হয় তার কোন সঠিক হিসাব না থাকলেও অনুমান করা হয় যে তা কয়েক হাজার কোটি টাকা হবে। এ অনুমানের পিছনে যুক্তি হচ্ছে যে দেশের ১৫ কোটি মানুষের মধ্যে যদি ৫০ লক্ষ মানুষ যাকাত দেয় এবং তাদের গড় যাকাতের পরিমাণ যদি দশ হাজার টাকা হয় তাহলে মোট প্রদত্ত যাকাতের পরিমাণ হবে পাঁচ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যাকাতের অর্থ অপরিকল্পিতভাবে বন্টন করা হয়, তাতে যাকাত গ্রহীতার কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও তাকে স্বাবল্বী করার কোন ব্যবস্থা থাকে না এবং তা দেশজ উৎপাদন বৃদ্ধিতে কোন ভূমিকা রাখে না। যাকাতের অর্থে সাধারণতঃ দরিদ্রদেরকে কাপড়-চোপড় কিনে দেয়া হয়। তাতে গরীব মানুষদের কিছুটা উপকার যে হয় না তা নয়, কিন্তু দারিদ্র বিমোচন বা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে তা কোন ভূমিকা রাখতে পারে না; ফলে যাকাতের মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়ে যায়। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ পরিকল্পিতভাবে কর্মসংস্থানমূলক দারিদ্র বিমোচনে বিনিয়োগ করা গেলে অতি সহজে বাংলাদেশকে দারিদ্র মুক্ত করা এবং অপ্রত্যাশিত হারে জিডিপি বৃদ্ধি করা সম্ভব। দশ হাজার টাকায় খুব সহজেই একজন ব্যক্তির কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যায় এবং তার মাধ্যমে একটি পরিবার দারিদ্রমুক্ত হতে পারে। প্রতি বছর যদি ৫০ লক্ষ পরিবারের কর্ম সংস্থান করা যায় তাহলে কমপক্ষে আড়াই কোটি জনগণ বছরে দারিদ্রসীমার উপরে উঠতে পারে। সে হিসাবে বাংলাদেশ মাত্র কয়েক বছরে পুরোপুরি দারিদ্রমুক্ত হতে পারে।
রাসুল (সঃ) ও খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যাকাত সংগ্রহ ও বন্টন করা হতো। সরকারীভাবে যাকাত সংগ্রহ ও বন্টন করা হলে একদিকে যেমন তার পরিকল্পিত ব্যবহার নিশ্চিত করা সহজ তেমনি সামর্থবান সকলেই যেন সঠিক হিসাবে যাকাত প্রদান করেন তার ব্যবস্থাও করা যায়। বাংলাদেশ সরকারের ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি যাকাত তহবিল রয়েছে। তবে এ তহবিলে জমাকৃত যাকাতের পরিমাণ তেমন বেশী নয়। এর পিছনের প্রধান কারণগুলো হচ্ছেঃ
১· যাকাত দাতা চান যে তার প্রদত্ত যাকাত তার পছন্দের ব্যক্তি যেমন তার নিকত্মীয়, প্রতিবেশী, নিজ এলাকার মানুষ ইত্যাদির হাতে পৌঁছাক। ধর্মেও এ বিষয়ে দিক নির্দেশনা রয়েছে। ফলে যাকাত দাতা তার অর্থ সরকারী তহবিলে না দিয়ে নিজ হাতে নিজের পছন্দের ব্যক্তিকে দেয়াকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন।
২· সরকারের তহবিলে যাকাত দিলে তার বিনিময়ে যাকাত দাতাকে তেমন কোন সুবিধা দেয়া হয় না। না তিনি তেমন কোন কর রেয়াত পান, না তাকে কোন ধরণের রাষ্ট্রীয় সম্মান দেয়া হয়। মাত্র ২৫ হাজার টাকা আয়কর দিলে একজন শিল্পপতিকে সিআইপি হিসাবে গণ্য করা হয়, অথচ, কেউ ২৫ লক্ষ টাকা যাকাত দিলেও তার জন্য বিশেষ কোন সম্মান বা সুবিধার ব্যবস্থা নেই। বিদ্যমান আয়কর আইনে বলা হয়েছে যে সরকারী যাকাত ফান্ডে অর্থ দিলে প্রদত্ত অর্থের ১৫ শতাংশ কর রেয়াত দেয়া হবে। তবে যে পরিমাণ অর্থের উপরে কর রেয়াত দেয়া হবে তা করযোগ্য আয়ের ২০ শতাংশ বা দুই লক্ষ টাকার অধিক হবে না। কর রেয়াতের একই ব্যবস্থা রয়েছে সঞ্চয়পত্র, ডিপিএস ইত্যাদিতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও। অর্থাৎ আপনি যদি এক লক্ষ টাকা যাকাত দেন তাহলে যে ১৫ হাজার টাকা কর রেয়াত পাবেন, এক লক্ষ টাকার সঞ্চয়পত্র কিনলেও সেই পনের হাজার টাকারই রেয়াত পাবেন। ফলে সরকারের তহবিলে টাকাটা না দিয়ে তা দিয়ে বরং সঞ্চয়পত্র কেনাকেই যে অনেকে অধিক পছন্দ করবেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
৩· সরকারী যাকাত তহবিলের অর্থ ব্যয়ে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। জনগণের যাকাতের অর্থ দিয়ে কি কি কাজ করা হয়েছে সাধারণ নাগরিকদের তা জানার কোন উপায় নেই। ইতোপূর্বে এ তহবিলের অর্থ সরকারের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য অর্জনে ব্যবহার, যেমন সরকার প্রধানের নামে তৈরী এতিমখানা পরিচালনা ইত্যাদিতে ব্যয় করার নজীর রয়েছে। একজন নাগরিক তার অর্থ অন্য ব্যাক্তির রাজনৈতিক ইমেজ তৈরীতে খরচ করতে উৎসাহিত না হবারই কথা।
উপোরোক্ত বিষয়গুলো যথাযথভাবে মাথায় রেখে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা গেলে সরকারী যাকাত তহবিলে যাকাতের অর্থ সংগ্রহ যেমন বহুগুণে বাড়ানো যাবে তেমনি তার পরিকল্পিত ব্যবহারের মাধ্যমে দেশের দারিদ্র বিমোচন ও দেশজ উৎপাদন বৃদ্ধি করা যাবে। এ উদ্দেশ্যে সরকারের উদ্যোগে একটি উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা যেতে পারে। তাছাড়া সরকারী তহবিলে যাকাতের অর্থ প্রদান করতে জনগণকে উৎসাহিত করা এবং দারিদ্র বিমোচনে সে অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো সাহায্য করতে পারেঃ
১· সংগৃহীত যাকাত বন্টনের ক্ষেত্রে যাকাত দাতার পছন্দের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। যাকাত দাতা কোন এলাকায় এমনকি কাকে যাকাত দিতে চান তা জানানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে এবং তার ইচ্ছা যথাসম্ভব পালন করার চেষ্টা করতে হবে। তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে বিষয়টি সহজেই বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। প্রকল্পটি যদি একটি ডেটাবেজ ব্যবহার করে যাকাত দাতার অগ্রাধিকারের বিষয়টি এন্ট্রি করে রাখে, পরবর্তীতে সে অর্থ কাকে কি উদ্দেশ্যে প্রদান করা হলো তাও সংরক্ষণ করে এবং সে তথ্য ইন্টারনেটে প্রকাশ করে তাহলে যাকাত দাতা সহজেই জানতে পারবেন যে তার প্রদত্ত অর্থ কার উদ্দেশ্যে কি ভাবে ব্যয় হয়েছে। এর মাধ্যমে যে স্বচ্ছতা তৈরী হবে তা যাকাত দাতাদেরকে সরকারী তহবিলে যাকাত দেয়ার বিষয়ে অধিকতর উৎসাহিত করবে। এ ধরণের পদক্ষেপ নেয়া হলে প্রবাসীদের অনেকেই সরকারী তহবিলে যাকাত প্রদানে উৎসাহী হবেন এবং সে অর্থ সরকারের উন্নয়ন বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে।
২· যাকাতের অর্থে উৎপাদনমূলক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে এ ধরণের বিভিন্ন স্কীম যেমন হাস-মুরগীর খামার, গরু মোটা তাজাকরণ, মৎস পালন, ছাগল পালন, দুগ্ধ খামার ইত্যাদি গ্রহণ করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্ব হবে তার নিজস্ব বাজেট থেকে সরকারী কর্মীদেরকে দিয়ে যাকাত গ্রহীতাদেরকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া, স্কীমগুলোর বিভিন্ন ধাপে তাদেরকে কারিগরি ও ব্যবস্থাপনামূলক সহায়তা প্রদান করা এবং এক পর্যায়ে সেগুলো গ্রহীতাদের নিকটে পুরোপুরি হস্তান্তর করা। যেমন একটি গ্রামে যদি কয়েকজন যাকাত গ্রহীতাকে নিয়ে মৎস পালনের একটি স্কীম নেয়া হয় তাহলে যাকাতের অর্থ পুকুর কাটা বা লীজ নেয়া, সেখানে ছাড়ার উদ্দেশ্যে মাছের পোনা কেনা, মাছের খাবার কেনা ইত্যাদি উদ্দেশ্যে ব্যয় করা হবে। এগুলো ব্যবস্থাপনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও উৎপাদিত মাছের বিপননের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিতে হবে সরকারী উদ্যোগে, সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে। অপরদিকে শুধুমাত্র কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে কিন্তু দেশজ উৎপাদন বাড়বে না এ ধরণের উদ্যোগ যেমন রিকসা বা রিকসা ভ্যান কিনে দেয়া তুলনামূলকভাবে সহজ হলেও দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে তার তেমন কোন ইতিবাচক প্রভাব পড়বে না।
৩· যেহেতু সরকারের রাজস্ব ব্যয়ের অন্যতম প্রধান খাত হচ্ছে দারিদ্র বিমোচন এবং যাকাতের অর্থ পুরোপুরিই দারিদ্র বিমোচনে ব্যবহৃত হওয়ার কথা তাই যাকাতকে আয়করের অন্ততঃ একটি অংশের বিকল্প হিসাবে দেখা যেতে পারে এবং যাকাত দাতার জন্য সরকারী তহবিলে প্রদত্ত যাকাতের পরিমাণের একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে বিকল্প আয়কর হিসাবে বিবেচনা করা যেতে পারে। যেমন বছরে ছয় লক্ষ টাকা উপার্জন করেন এমন ব্যক্তি দশ বছরে চল্লিশ হাজার টাকা সহজেই সঞ্চয় করেন। আয়করের বর্তমান হিসাবে তার কর হবে ২০,০০০ টাকার মত। অথচ, যাকাত হবে এক লক্ষ টাকা। যদি বিধান করা হয় যে সরকারী তহবিলে প্রদত্ত যাকাতের অর্ধেককে বিকল্প আয়কর হিসাবে বিবেচনা করা হবে, তাহলে সরকার ২০,০০০ টাকার বদলে এক লক্ষ টাকা আদায় করতে পারবে।
৪· সরকার ধনী মুসলিম দেশসমূহ থেকে যাকাতের অর্থ সংগ্রহ করার চেষ্টা করতে পারে। আমরা দারিদ্র বিমোচন ও অন্যান্য বিভিন্ন খাতে বিদেশী দেশ ও সংস্থা থেকে ঋণ ও অনুদান নিয়ে থাকি। ফলে বিদেশ থেকে যাকাতের অর্থ সংগ্রহ নিয়ে কোন দ্বিমত থাকার কথা নয়। প্রস্তাবিত মানের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ থেকে এ বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যেতে পারে।
বিগত বছরগুলোতে বিভিন্ন বেসরকারী প্রতিষ্ঠান যাকাত সংগ্রহ ও সে অর্থে জনকল্যাণমূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন করে আসছে। অনেক প্রতিষ্ঠান যাকাতের মাধ্যমে দারিদ্র বিমোচনে যথেষ্ট সফলও হয়েছে। তাদের কারো কারো আবার সারা দেশে শাখা বিস্তৃত রয়েছে। এ সকল প্রতিষ্ঠানও যাকাতের অর্থ সংগ্রহ এবং দারিদ্র বিমোচনে সে অর্থ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এ সকল পরামর্শ বিবেচনা করে দেখতে পারে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

