যখন শাহবাগ, প্রেসক্লাব বা অন্য কোথাও গাড়িত ওঠার জন্য চেষ্টা করি আর যখন পিছনের লোকটা আমারে ধাক্কা দিয়া আগে যাইতে চায় তখন নিজেরে কুকুর ছাড়া আর কি মনে হয়? এক টুকটা খাবার দেখলে পাঁচটা কুকুর তো এভাবেই একটা আর একটাকে না দিয়ে খাওয়ার চেষ্টা করে।
ফার্মগেট থেকে শাহবাগ ২ টাকার ভাড়া ৮ দিতে হয়। আর তা দিয়াও যখন পাঁচ মিনিটের পথ ত্রিশ মিনিট কখনও চল্লিশ মিনিট বসে থাকতে হয় তখন কি মনে হয়? আস্তাকুড়ে বসে আছি বলে মনে হয় না?
রিক্সাওয়ালা যখন বোঝে বিপদে পরছি তখন ১০ টাকার ভাড় ৩০ টাকা চেয়ে বসে থাকে তখন ওকে মানুষ মনে হয়, নাকি নিজেকে?
হসপিটালে কোনো সুস্থ মানুষ যায় না। প্রয়োজনীয় কিছু কিনুন হসপিটালের আশে-পাশে থেকে -- একটা ডাব বা কলা অথবা একটা মাদুর -- আপনার নিশ্চই ধারণা আছে বাজার মূল্যের থেকে কত বেশি নেবে ওরা। ওরা যদি মানুষ হয়ে থাকে তাহলে ওদের সামনে দাঁড়ান আমি কে?
মতিঝিল, দিলখুশা বা নিউমার্কেট গেলে দেখবেন রাস্তা দখল করে সারি সারি গাড়ি রাখা আছে। এসব গাড়ির বেশির ভাগ মালিকই তথাকথিত শিক্ষিত মানুষেরা। ঐসব গাড়ির ফাঁক গলে যখন হাঁটতে হয় তখন নিজেকে ঐ বিশেষ প্রাণীটার মত মনে হয়।
ফুটপাতগুলো কথা কি নতুন করে বলার কিছু আছে? আমি যা বলেছি তাতে নতুন কথা বোধ করি একটাও নাই। তবে হ্যাঁ, যদি তাদের কারও চোখে পড়ে আমার লেখা তাহলে উত্তরে বলবে -- এই দ্যাশটাই খারাপ গাড়ি রাখার জায়গা নাই, ব্যবসা করার জায়গা নাই।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা কি করে, শিক্ষরা কি করে আপনে আমার চাইতে বেশি ভাল জানেন বলেই আমার ধারণা। ডাক্তাররা রোগীর সঙ্গে কেমন আচরণ করে?
ঢাকা শহরে যত শাক-সবজি, ফল, মাস-মাংস বিক্রি হয় কোনোটা কি ভেজালহীন? যে মিনারেল পানি খাই সেটা? ঢাকা ওয়াসা যে পানি সাপ্লাই দেয় সেটা? হোটেলগুলাতে যে খাবার বিক্রি হয় তার কী অবস্থা? বলবেন এইগুলা খাইয়াই কোটি কোটি মানুষ বেঁচে আছে। সেটা কি মানুষের জীবন? উত্তর যদি হ্যাঁ, হয় তাহলে আমার মনুষত্ব নিয়ে প্রশ্ন আছে কেননা আমি এটাকে মানুষের জীবন বলে স্বীকার করি না।
সামুতে প্রায়ই খালেদা-হাসিনার মত বড় বড় মানুষ নিয়ে লেখা হয়। এদেশের রাজনীতিবিদ-আমলা-বিচারকদের কার্যক্রমের বিচার বিশ্লেষণ করা হয়। আমি তাদের সাণ্নিধ্যে যেতে পারি না। যে সব মানুষগুলোর কথা উপরে লিখেছে বা তাদের মতো আরও অনেক সাধারণ বা প্রান্তিক মানুষের মধ্যেই আমার বসবাস। তবে একটা জিনিস বুঝি ঐসব বড় মানুষেরা এই সাধারণ বা প্রান্তিক মানুষদের ভেতর থেকেই উঠে আসা। তারা কেউ ভিন্ন গ্রহ বা ভিন্ন কোনো দেশ থেকে আসে নাই। এই দেশেরই আলো-হাওয়া, সমাজ-সংস্কৃতিতে তাদের বেড়ে ওঠা। এই প্রান্তিক সাধারণ মানুষগুলোর চাইতে তাদের ভিন্ন চরিত্র আসবে কোত্থেকে?
যে রাস্তায় রিক্সা বন্ধ, দুইটা টাকা দিলে আনসার রিক্সাটা ছেড়ে দেয়। দোষ কার যে আনসার দুই টাকার লোভ এড়াতে পারে না, না, যে মানুষটা দুই টাকা দিয়ে ঐ আনসারকে আরও দুই টাকা পাওয়ার জন্য বাঁচিরে রাখে। বাঁচিরে রাখে এই কারণে বলেছি সরকার ওকে যে বেতন দেয় তাতে ওর ঢাকা শহরে বেঁচে থাকা ভীষণ মুশকিল হওয়ার কথা। বহুজন তাকে দুই টাকা দেয় বলেই সে বেঁচে আছে।
ফার্মগেটে হকার আর ভিক্ষুকের জন্য ফুটপাথ-ওভার ব্রিজে হাঁটা যায় না। মানুষ যদি ফুটপাথ আটকে দাঁড়িয়ে থাকা হকারের কাছ থেকে কিছু না কেনে তাহলে ও কতদিন দাঁড়াবে? ভিক্ষুক যদি কোনো টাকা না পায় তাহলে কেন সেখানে থাকবে?
হ্যাঁ, সরকারের দায়িত্ব আছে। কিন্তু সরকার এই মানুষগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। সরকারে পুলিশকে যে টাকা দিয়ে ম্যানেজ করা হয় তাও ঐসব সাধারণ মানুষের পকেট থেকেই আসে, ঐ হকার তার বাপের জমিদারি বিক্রি করে দেয় না।
পুলিশকে দোষ দেবেন? যে পুলিশে চাকরি করে বা যার ভাই, বোন, বাবা, স্বামী পুলিশে চাকরি করে সে জানে, যে বেতন তাকে দেওয়া হয় তা দিয়ে বেঁচে থাকা কঠিন।
এই সব মানুষের কথা বাদ দিয়ে একটু অন্য মানুষদের দিকে চোখ ফেরাই। মিনি বিশ্বকাপ হইছিল বাংলাদেশে। টিকিট কাইট্টা লাইনে খারাইছি স্টেডিয়ামে ঢোকার জন্য। দেখলাম বুদ্ধিমানেরা লাইন খারায় না। তারা সামনে যাইয়া আর একজনের জায়গা কেনে। একদল মানুষ 'পেটের দায়ে' লাইনে খারাইছে জায়গা বেচার জন্য আর অন্য দল্ লাইনে খারানোর কষ্ট করতে চায় না তাই টাকা দিয়া লাইনে জায়গা কিনছে। তাতে অন্যায় কি হইছে? এবার বিশ্ব কাপের টিকিট বেচা নিয়াও এই রকম কিছু একটা হইছে। সামুতে, পত্রিকায় দেখছি।
আমি জানি না আপনার মূল্যবান সময় নষ্ট করে এই পর্যন্ত পড়া শেষে করেছেন কিনা। যদি পড়ে থাকেন তাহলে আর একটু কথা বলেই শেষ করব।
এমপি-মন্ত্রী-আমলারা ক্ষমতাবান মানুষ। টাকা দিলে তার চাকরি দিতে পারে। টাকা ছাড়া চাকরি হয় না তাই মানুষ অনোন্যপায় হয়ে ঘুষ দিয়ে চাকরি নেয়। চাকরি না পেলে বাঁচবে কি করে। এদেশে সৎ পথে তো কিছু হয় না।
দ্যাশে সংখ্যা গরিষ্ঠ কারা রাজনীতিবিদ-আমলা-মন্ত্রীরা না রিক্সাওয়ারা সবজি বিক্রেতা হকার আনসার পুলিশ ও তাদের অর্থ যোগান দেওয়া সাধারণ মানুষ, নাকি ঘুষ দিয়ে চাকরি পাওয়া মানুষগুলো? এই সব আমলা মন্ত্রীদের এত ক্ষমতা, এদের ক্ষমতার উৎস কোথায়?
লোকে বলে সিন্দাবাদের ঘারে চেপে বসা ভূতের ন্যায় এই সব রাজনীতিবিদরা এদেশের সাধারণ জনগণের ওপর চেপে বসেছে। আর সাধারণ জনগণ সিন্দাবাদের চেয়েও বেশি দয়ালু। ছোটবেলায় পড়েছিলাম। সিন্দাবাদ দয়ার সাগর তাই বৃদ্ধে অনুরোধে তাকে কাঁধে নিয়েছিল এবং তাকে সে ইচ্ছা করে ফেলে দেয় নাই। সিন্দাবাদ আছাড় খেয়ে পড়ে গেলে বৃদ্ধের মাথা একটা পাথরে লেগে ফেটে যায় এবং এতেই সে রক্ষা পায়। এ দেশের মানুষ বার বার আছাড় খেলেও এইসর চেপে বসা ক্ষমতা ধরদের মাথাও ফাটলেও জনগণ তাদের ফেলে দেয় না। আবার তুলে মাথায় নেয়।
কারও জানা আছে এরশাদকে ও তার দলকে কারা ভোট দেয়? হাসিনা তাকে কোলে নিয়েছে, খালেদা তার বিচার করে নাই। কিন্তু দেশের প্রকৃত মালিক যারা সেই জনগণ এরশাদ বা তার দলকে ভোট দেয় কেন? এরশাদ যে জোটে আছে সেই জোটকে কেন ভোট দিল?
এসব প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নাই। আর এরা সবাই মানুষ, আমার তাই ধারণা। আমি এদের সঙ্গেই বেঁচে আছি। সুনীলের কাছ থেকে ধার করা কয়েকটা লাইন
আমি কীরকম ভাবে বেঁচে আছি তুই এসে দেখে যা নিখিলেশ
এই কী মানুষজন্ম? নাকি শেষ
পরোহিত-কঙ্কালের পাশা খেলা! প্রতি সন্ধ্যেবেলা
আমার বুকের মধ্যে হাওয়া ঘুরে ওঠে, হৃদয়কে অবহেলা
করে রক্ত; আমি মানুষের পায়ের কাছে কুকুর হয়ে বসে
থাকি--তার ভেতরের কুকুরটাকে দেখবো বলে। আমি আক্রোশে
হেসে উঠি না, আমি ছারপোকার পাশে ছারপোকা হয়ে হাঁটি,
মশা হয়ে উড়ি একদল মশার সঙ্গে; খাঁটি
অন্ধকারে স্ত্রীলোকের খুব মধ্যে ডুব দিয়ে দেখেছি দেশলাই জ্বেলে--
(ও-গাঁয়ে আমার কোনো ঘরবাড়ি নেই।)
আমার কোনো কথায় যদি কষ্ট পেয়ে থাকেন বা এত কথা পড়তে যদি বিরক্ত লাগে তাহলে হাতজোড় করে ক্ষমা চাচ্ছি।


অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



