দেশের সম্পদ, জনগণের সম্পদ। দেশের সকল সাধারণ মানুষ এসব সম্পদের মালিক বা অংশীদার। এসব সম্পদের ইতিবাচক ব্যবহার, ইতিবাচক সংস্কার, উন্নয়ন কিংবা দেশের ও দেশের মানুষের স্বার্থে ইতিবাচক ব্যবহর করার জন্য সারাদেশে প্রশাসনিক অবকাঠামো পরিচালনার জন্য একটি পক্ষ রয়েছে, যারা আমাদের কাছে সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারী হিসাবে পরিচিত। এরা সরকারী কোষাগার থেকে বেতন বাবদ অর্থ পায় এবং সাধারণ মানুষ নানারকম কর প্রদানের মাধ্যমে এ কোষাগার পরিপূর্ণ করে। যে হিসাবে এই সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আসলে জনগণের কর্মকর্তা-কর্মচারী বলাই শ্রেয়।
এই সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরিচালনা, জনগণের মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করা, জনগণের সমস্যা ও সঙকট দূর করা, দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন করা, বিভিন্ন বিষয়ে নীতি-সিদ্ধান্ত গ্রহণসহ নানারকম উন্নয়নমূলক কাজের জন্য আরেকটি পক্ষকে জনগণ ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় আনে, যাদের আমরা সরকার বলে জানি। এ সরকারের সংসদ জনগণের টাকায় চলে, এ সরকারের সংসদ সদস্য, মন্ত্রীরা জনগণের টাকায় নানারকম সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন।
যদিও এখন আমরা অনাকাঙ্খিত অনির্বাচিত সরকারও দেখছি। তাদের এখতিয়ারভূত না হলেও তারা বিভিন্ন রকম নীতি গ্রহণ করছেন। এসব নীতি আমাদের দেশের জন্য কতটা ভালো ফল বয়ে আনবে-তা সময়ই বলে দেবে।
আরেকটি গ্রুপ আছে, যারা আমাদের উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে ঋণ দেয়। এদেরকে ঋণদাতা গোষ্ঠী নামে অভিহিত করার কথা। কিন্তু এরা ঋণ প্রদান করার নামে এমন সব শর্ত দিয়ে বসে, যা একটি আমাদের দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৗমত্ব, সংবিধান পরিপন্থী। আমাদের অদূরদর্শি সরকারগুলো ঋণদাতা গোষ্ঠীর অনৈতিক শর্ত মেনে ঋণ গ্রহণ করে, যার নেতিবাচক প্রভাব সাধারণ মানুষের উপর পড়ে।
এই ঋণদাতা গোষ্ঠীগুলো উন্নয়নশীল দেশগুলোকে তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। যে কারণে ঋণ দেবার সময় কঠিন কঠিন সব শর্ত আরোপ করে। আমাদের সরকারী আমলা কিংবা সরকারগুলো যারা চালায়, তাদের কেউ কেউ এ ঋণদাতা গোষ্ঠীগুলোর কাছ থেকে নানারকম সুবিধা পায় বলে তাদের শর্ত নিয়ে চিন্তা করে না, চুক্তি করে তাড়াতাড়ি।
এ ঋণদাতা গোষ্ঠীগুলো কতিপয় সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীর দুর্নিতির কারণে একটি সরকারী অধিদপ্তর, একটি সরকারী কর্পোরেশনকে বেসরকারী করার কথা বলে।
এভাবে আমাদের সম্ভাবনাময় পাটশিল্পকে ধ্বংস করেছে এই ঋণদাতা গোষ্ঠীগুলো। অনেক সরকারী প্রতিষ্ঠান বেসরকারী করা হয়েছে। এখন মানুষের মৌলিক প্রয়োজন স্বাস্থ্যখাতকেও বেসরকারী করার ষড়যন্ত্র করছে এ ঋণদাতাগোষ্ঠী। রেলওয়েকে বেসরকারী করার যড়যন্ত্র করছে।
বলা দরকার, পৃথিবীর উন্নত কিংবা অনুন্নত অধিকাংশ দেশে রেলওয়ে সরকারী ব্যবস্থাপনায় চলে। পাশ্ববর্তী ভারতে রেল যাতায়াত ব্যবস্থায় সর্বাধিক জনপ্রিয় ও লাভজনক মাধ্যম। অথচ আমাদের দেশে রেলকে ধ্বংস করার চক্রান্ত চলছে। লোকসানের অজুহাতে এটি বেসরকারীকরণ করার প্রক্রিয়া চলছে বলে গণমাধ্যমে প্রকাশ। অথচ সংশ্লিষ্টদের আগে বোঝা উচিত, প্রথমত রেলওয়ে একটি সেবা খাত। সেবা খাত হিসাবে লাভের পরিবর্তে জনগণকে সেবা প্রদান করাই এর প্রথম ও প্রধান কাজ হওয়া উচিত।
দ্বিতীয়ত, রেলকে লোকসানখাত বলা হলেও রেল আসলে আদৌ লোকসানখাত কিনা-এটা ভাবতে হবে। কারণ রেল তার অবকাঠামো ব্যয় নিজস্ব আয় থেকে খরচ করে। যেখানে সড়ক পথে আবকাঠামো ব্যয় সরকারী কোষাগার থেকে খরচ করতে হয় সড়ক পথের উন্নয়ন করে সরকারের আর্থিক কোন লাভ হয় না। আরেকটি কারণে রেলকে লাভজনক বলতে হবে, সেটা হচ্ছে রেল কিন্তু আমাদের সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিডিআর, ডাক বিভাগসহ সরকারের বিভিন্ন বিভাগকে বিনামূল্যে কিংবা নামমাত্র মূল্যে সেবা দেয়। যদি তার অর্থমূল্য রেল পায় তবে এটি লাভজনক খাত হবে।
তাছাড়া একটি দেশের প্রধান যাতায়াত ব্যবস্থা বেসরকারী হবে, এটা কি গ্রহণযোগ্য? এসব বিষয়ে আমাদের নীতি নির্ধারকরা কখনো ভাবেন না বলে মনে হয়। রেল বেসরকারি হলে সাধারণ মানুষের, দরিদ্র জনগণের যাতায়াত ব্যবস্থা কর্পোরেট ব্যবসায়ীদের নিকট ব্যবসার মাধ্যম হয়ে যাবে।
রেল যদি দুর্নিতীগ্রস্ত হয়, তবে দুর্নিতি দূর করার উদ্যোগ নিন। লোকসানখাত হলে লাভজনক করার উদ্যোগ নিন। রেলওয়ে বিভাগের কার্যকর উন্নয়ন করুন। রেলকে আরো আরামদায়ক ও দ্রুতগামী করুন। সময়ানুবর্তিতা বিষয়ে রেল কর্মচারীদের শিক্ষা দিন, যেন ১০টার ট্রেন কয়টায় ছাড়বে-জনগণকে এরকম অনিশ্চয়তায না থাকতে হয়। কিন্তু খোড়া অজুহাত দেখিয়ে কতিপয় বিদেশী বেনিয়াদের মতামত নিয়ে এ খাতকে বেসরকারী করণ হবে আমাদের জন্য অবমাননাকর।
এরকম অনৈতিক কার্যক্রমের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে সচেতন হতে হবে। নির্বাচিত বা অনির্বাচিত যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, জনগণের সম্পতি বিক্রি, লিজ দেয়ার আগে জনগণের মতামত নিতে হবে। সংসদে এরকম আইন পাশ করতে হবে, কোন বিদেশী গোষ্ঠীর সঙ্গে চুক্তি করতে হলে সে চুক্তি বিষয়ে গণভোট নিতে হবে। এরকম আইন থাকলে স্বার্থান্বেষী মহলের অনৈতিক কার্যক্রম বন্ধ হবে।
শুধু রেলই নয়, রাষ্ট্রের যে কোন সম্পত্তি বেসরকারিকরণ প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে যার যার অবস্থান থেকে প্রতিবাদ জানানোর জন্য সবার প্রতি আহবান জানাই।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

