অজয় দাশগুপ্ত
রায়দিঘি(দক্ষিণ ২৪ পরগণা)
অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে তিনি। ডানহাতে ঝক্ঝকে করে মাজা কাঁচের গ্লাসে টলটলে স্বচ্ছ জল। অন্যহাতে একটা কাগজের ঠোঙা। অধীর প্রতীক্ষায় কার জন্য দাঁড়িয়ে এই মুসলিম রমণী?
কৌতুহল মিটলো একটু এগোতেই। দক্ষিণ বিষ্ণুপুর থেকে রায়দিঘি যাওয়ার রাস্তায় খটির বাজারের কাছে বাঁদিকেই লালপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের চিত্রগঞ্জ। সাতসকালে নির্বাচনী প্রচারে কান্তি গাঙ্গুলি। কখনো ভ্যাুনরিকশায়, কখনো হেঁটে। সঙ্গে মানুষের স্রোত। কাছে আসতেই তিনি হাতে তুলে দিলেন কাঁচের গ্লাস, ঠোঙা থেকে বের করলেন একটা ছোট্ট টিফিন কেক। ‘বাবা, অনেক সকালে বের হয়েছ, একটু কিছু মুখে দাও।’ জলটুকু মুখে দিয়ে ‘মেয়ে’-র মাথায় হাত দিয়ে ‘বাবা’-র সস্নেহ উত্তর, ‘না রে মা, আমার তো সুগার।’ কেকটা হাতে নিয়ে ভেঙে খাইয়ে দিলেন ‘মেয়ে’-কে, তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বাচ্চা ছেলে-মেয়েদের।
এগিয়ে গেলেন সামনের দিকে। রাস্তা থেকে বাঁদিকের ঢালে একলপ্তে ৬-৭খানা বাড়ি। মধ্যিখানে বড় উঠোন। সেখানেও অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে পুরুষ-মহিলা নিয়ে অন্তত জনা কুড়ি। তাঁদের দিকে এগোতেই বৃদ্ধ রোশন আলি পেয়াদা এগিয়ে হাত ধরে এনে বসালেন জামরুল গাছের ছায়ায়। আগে থেকেই একটি লাল রঙের চেয়ার পাতা। ‘আপনাকে আর যেতে হবে না। এখানেই বসুন।’ কাঁধের গামছা দিয়ে সস্নেহে মুছিয়ে দিলেন মাথা। সেখানে একটু ঘাম জমেছিল। রোশন আলির ছেলে নিয়ে এলেন একটা ডাব। রহিমা বেওয়া হাত পাখা দিয়ে বাতাস করতে লাগলেন। যেন পরিবারের নিকটাত্মীয় কিছুক্ষণের জন্য ঘরে এসেছেন এমনভাবেই আলাপচারিতা চললো রোশন আলি, ঈশা পুরকাইত, গোপাল মোল্লা, নাসির গাজিদের সঙ্গে। ওঠার সময় মহিলাদের বললেন, ‘কি রে মা, তোরা সব আমার সঙ্গে আছিস্ তো?’
যদিও এই প্রশ্নের আদৌ প্রয়োজন ছিল বলে মনে হলো না। কারণ তিনি আছেন সুন্দরবনের মানুষের প্রাণের সঙ্গে, ঠাঁই পেয়েছেন অন্তরের অন্তঃস্থলে, লাল ঝান্ডার প্রতিনিধি হয়ে। তার নজির গোটা রাজ্যের মানুষ পেয়েছেন ‘আয়লা’-র পরে। উৎকন্ঠা, আশঙ্কা, সংশয় নিয়ে মানুষ দেখেছিলেন কিভাবে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত ডোমেদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে লাশ কুড়োচ্ছেন, আবার গ্রামের মানুষকে উৎসাহ দিয়ে মাথায় মাটির বোঝা নিয়ে নদীর বাঁধ মেরামতিতেও হাত লাগিয়েছেন। সুন্দরবনের মানুষ অবশ্য এতে অবাক হননি। কারণ এই ঘটনা তাঁদের কাছে নতুন নয়। বিপদে-আপদে, ঝড়ে-দুর্যোগে, বাঁধ ভেঙে গেলে রাতদুপুরেও এসে হাজির হন যিনি, তিনি যে এই ভয়ঙ্কর বিপর্যয়ে পাশে পাহাড়ের মতো দাঁড়াবেন, তাতে আর আশ্চর্যের কী! বরং অবাক হয়েছিলেন তাদের দেখে, যারা ২০০৯ সালের ২৫শে মে ‘আয়লা’-র মাত্র দিন দশেক আগে লোকসভা নির্বাচনে বিপুল জয় পাওয়ার পরেও সেই বিপন্ন সময়ে এক ইঞ্চি সাহায্যের হাত বাড়াতে এগিয়ে আসেনি। উল্টে তৃণমূলের সাংসদ ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর রাজ্যকে টাকা না দেওয়ার জন্য যোজনা কমিশনকে চিঠি দেওয়াও দেখেছেন তাঁরা।
সি পি আই (এম) তথা বামফ্রন্ট এবং তৃণমূলের ফারাক কী নিজের অভিজ্ঞতাতেই চিনতে শিখেছেন সুন্দরবনের মানুষ। শুধু গত এক দশকেই সুন্দরবন এলাকার উন্নয়নে, সুন্দরবনবাসীর জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে তৈরি হয়েছে অসংখ্য রাস্তা, সেতু, জেটি, গ্রামে গ্রামে বিদ্যুত, পানীয় জলের ব্যবস্থা হচ্ছে। কৃষির উন্নয়নে বৃষ্টির জল সংরক্ষণ, শিক্ষার প্রসারে অসংখ্য বিদ্যালয়, মাদ্রাসা, মহাবিদ্যালয়ের পরিকাঠামো উন্নয়নসহ নানাবিধ কাজ চলছে। দ্বীপের সঙ্গে জুড়ে গেছে দ্বীপ, গ্রামের সঙ্গে গ্রাম, একটা গঞ্জের নাগালে চলে এসেছে আরেকটা। রায়দিঘির সঙ্গে জুড়ে গেছে কঙ্কণদিঘি, সোজা অটো করেই চলে যাওয়া যাচ্ছে মইপীঠ। মণি নদীর ওপরেই তৈরি হয়েছে জয়নালের খেয়া সেতু। মৃদঙ্গভাঙা নদীর ওপর সেতু, নগেন্দ্রপুর দড়ির খেয়া সেতু। সেতুর পর সেতুর মালায় জুড়েছে সুন্দরবন, বড় বড় পিচের রাস্তায় বেঁধে ফেলা হয়েছে সুন্দরবনের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত। একাজের রূপায়ণে রয়েছে সুন্দরবন উন্নয়ন বিষয়ক দপ্তর, যার মন্ত্রীও তিনি কান্তি গাঙ্গুলি।
ক্রীড়ামন্ত্রীরও অল্পদিন দায়িত্ব পেয়েছেন তিনি। উন্নয়নমূলক কাজের পাশাপাশি সুন্দরবন এলাকার ছেলেমেয়েদের খেলাধুলার চর্চা ও বিকাশের জন্য সমন্বিত ক্রীড়া কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনার বাস্তব রূপায়ণ হচ্ছে। সুন্দরবনের প্রথম সমন্বিত ক্রীড়াকেন্দ্র কাকদ্বীপে তৈরি হয়েছে। ৭ হেক্টর জমির ওপর প্রায় ৩ কোটি ৩১ লক্ষ টাকা ব্যয়ে গড়ে তোলা হয়েছে পূর্ণাঙ্গ ফুটবল মাঠ, ২০০ মিটার রানিং ট্র্যাক, ভলিবল ও ব্যাডমিন্টন কোর্ট, ক্লাব হাউস এবং ভবিষ্যতে সম্প্রসারণের সুবিধাসহ আংশিক গ্যালারি নিয়ে এই কাকদ্বীপ স্পোর্টস কমপ্লেক্স। শুধু সুন্দরবনেই গড়ে উঠছে তিনটি সমন্বিত ক্রীড়াকেন্দ্র। কাকদ্বীপ স্পোর্টস কমপ্লেক্সের পর রায়দিঘিতে কাজও সমাপ্তির পথে। ক্যানিং-এ মাতলা স্পোর্টস কমপ্লেক্সের কাজও শুরু হয়েছে। কেবল সমন্বিত ক্রীড়া কেন্দ্র শুধু নয়, গড়ে উঠছে স্পোর্টস একাডেমিও।
এসব তথ্য, পরিসংখ্যান, নেহাতই কেজো কথা। আসল কথা সুন্দরবনের মানুষের মনকে জোড়া। লাল ঝান্ডার সেকাজেও নেতৃত্বে তিনি। গণউদ্যোগে সামিল হচ্ছেন সুন্দরবনের মানুষ। আয়লার ধাক্কায় সুন্দরবনের ৩৬০০ কিলোমিটার নদীবাঁধ ধসে গিয়েছিল। রাজ্য সরকারের পাশাপাশি সেই ক্ষতিগ্রস্ত নদীবাঁধ মেরামতির কাজে তাই দুর্গত মানুষেরা নিজেরাই হাত লাগানোর শপথ নেন। কোপেনহেগেনের কথা প্রবাহিত হয় সুন্দরবনেও। সুন্দরবনবাসী তাঁর স্লোগানে গলা মেলান, “আমাদের নদীবাঁধ আমরাই গড়ব। আমাদের বাদাবন (ম্যানগ্রোভ) আমরাই গড়ব।”
সুন্দরবনের মানুষের এই বদলে যাওয়া জীবনে হিসেব ঈষৎ গরমিল হয়ে যাচ্ছে সাম্প্রতিক কিছু পরিবর্তনে। ডি-লিমিটেশনের পর মথুরাপুর ২ পঞ্চায়েত সমিতি এবং মথুরাপুর ১ পঞ্চায়েত সমিতির আবাদ ভগবানপুর, কৃষ্ণচন্দ্রপুর, লালপুর, শঙ্করপুর এবং নলুয়া গ্রাম পঞ্চায়েত নিয়ে তৈরি হয়েছে রায়দিঘি বিধানসভা কেন্দ্র।
রায়দিঘির অন্তর্ভুক্ত যে দুটি পঞ্চায়েত সমিতি, সেই দুটিতেই গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে তৃণমূল জয়ী হয়েছে। ফল মিলেছে হাতেনাতে। গত দু’বছরে ঐ মথুরাপুর-১ এবং মথুরাপুর-২ পঞ্চায়েত সমিতি এলাকাতে উন্নয়নের টাকা নয়ছয়, মানুষকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি না রাখার ঘটনা দেখছেন মানুষ। রোশন আলি পেয়াদা বললেন, ‘তিনোমুল বাবুরা মিথ্যা কথা বলে আমাদের প্রবঞ্চনা দিয়ে জিতেছিল পঞ্চায়েতে। এখন তাদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।’ দু’বছর আগে চৈত্র মাসের ১১ তারিখ স্বামীর মৃত্যুর পরেও রহিমা বেওয়ার মেলেনি বিধবা ভাতা। এরকম অজস্র উদাহরণ। এই অবস্থায় রায়দিঘিতে এবারে তৃণমূলের প্রার্থী হয়েছেন অভিনেত্রী দেবশ্রী রায়। রুপোলী পর্দার ঝলক যে ভোটের পরেই মিলিয়ে যাবে এটা নতুন করে বুঝতে অসুবিধা নেই রায়দিঘির মানুষের। এমনকি, এই এলাকার তৃণমূল কর্মীরাও সেটা ভালো করেই জানেন। সেজন্যেই হয়তো রায়দিঘিতে তৃণমূলের কেন্দ্রীয় নির্বাচনী কার্যালয় তালা বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। টাকা বিলি হচ্ছে অজস্র, প্রতিশ্রুতির বন্যাব ততোধিক। সুন্দরবনের মানুষ ঠেকে শিখেছেন। জীবনের সঙ্গীকে তাঁরা কাছছাড়া করতে চান না।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই মে, ২০১১ বিকাল ৩:৪৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



