somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোকা-মানব

২৪ শে জুলাই, ২০০৯ সন্ধ্যা ৭:১৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



এইতো তিন-চারদিন আগের কথা। চিটাগাং ওয়ার-সেমেটেরীতে বৃষ্টিস্নাত এক পড়ন্ত বিকেলে বাহারি ফুলের ছবি তোলায় ব্যস্ত ছিলাম, আর মনে মনে তারিফ করছিলাম পরিচর্যার দায়িত্বে থাকা মানুষদের। হঠাৎ মেরিন’আপুর উত্তেজনাময় মৃদু-চিৎকার, ‘আকাশ, এইদিকে! এইদিকে! তাড়াতাড়ি!’।

সেমেটারীর পাশেই, এক ঝোপের ভেতর একটা মানুষমুখ যেন উঁকি দিচ্ছে। শাটার দেরি করতে চাইলো না এক মুহূর্তও।





প্রথম প্রথম অবাক্‌ হওয়াটা স্বাভাবিক। এবং তার সাথে অবধারিতভাবে প্রশ্ন আসবে, কেন? কেন এই নির্জন পড়ন্ত বৃষ্টিস্নাত বিকেলে একটা পোকা তার পিঠে মানুষ-মুখ নিয়ে ঘুরে বেড়াবে?

জানতে পারলাম, মানুষের দু’মুখের অবয়বধারী এই পোকার নাম নাকি সামুরাই বিটল্‌ (Samurai Beetle)। (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক সেমেটারী/মেমোরিয়ালে এক জাপানী পোকা!)। সামুরাই বলা হচ্ছে, কারণ একদিক থেকে ঐ চুল-সহ মুখাকৃতিটা নাকি সামুরাইদের মত। যাই হোক। এরা অবশ্য stink bug, face bug ইত্যাদি নামেও পরিচিত। ঐ মুখ দেখিয়ে তারা কি বলতে চাচ্ছে, ‘তুমি আমাকে নিয়ে যা করতে চাচ্ছো, তা কিন্তু ভুলেও চিন্তা কোরো না!’ কিন্তু, কি করতে চাইবে মানুষ ওদের নিয়ে? খেয়ে ফেলতে পারে, এটাই এক বড় সমস্যা! কারণ নতুন এক গবেষণায় এটাই নাকি পাওয়া গেছে, যে এই প্রজাতির stink bug খুব পুষ্টিসম্পন্ন! ওদের ভেতর পাওয়া যাবে সমৃদ্ধ প্রোটিন, ফ্যাট, এ্যামিনো-এসিড, ভিটামিন আর খনিজ-লবণ। তাই সর্বভুক্‌ মানব-প্রজাতির হাত থেকে বাঁচতে ওদের এই কপটবেশ (camouflage)। হতে পারে ওদের এই প্রচেষ্টা বেশ সফল, কারণ আমি তো ওদের দিকে শুধুই শাটার টিপে ক্ষান্ত দিলাম, ছুঁয়েও দেখতে চাইলাম না, দূর হতেই অভিবাদন জানালাম। অন্য পোকাদের যেরকম তাচ্ছিল্য-জ্ঞান করা হয়, সেই মনোভাবের ঘাটতি ছিলো এখানে। হ্যাঁ, তাইতো! বেশ ভালো পন্থা বের করেছে ওরা, টিকে থাকার জন্য!

কথা কিন্তু এখানেই শেষ নয়।

একটা প্রশ্ন হচ্ছে, ওরা কি সচেতনভাবেই টিকে থাকার জন্য বিবর্তনের ধাপে ধাপে মনুষ্য-শ্রদ্ধা পাওয়ার আশায় মনুষ্য-মুখাকৃতির উৎপত্তি ঘটিয়েছে? এই প্রসঙ্গে হিইক ক্র্যাব (Heike crab) এর কথা না বলে পারছি না।

১১৮০-১১৮৫ খ্রীষ্টাব্দ। জাপানের দুটি গোত্র – Heike (Taira) আর Genji (Minamoto) এর মধ্যে সংঘটিত হচ্ছিলো Genpei War। ইম্পেরিয়াল কোর্টের কর্তৃত্ব তথা পুরো জাপানের দখল নিতে গোত্রদুটোর মধ্যে বেশ কয়েক দশক ধরেই ছোটখাট সংঘর্ষ হয়েই আসছিলো, যার ফলশ্রুতিতে ঐ পাঁচ-বছরের Genpei War। তো এই যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত Heike (Taira) গোত্রের পতন হয় এবং ১১৯২ খ্রীষ্টাব্দে Minamoto no Yoritomo এর কর্তৃত্বে Kamakura shogunate নামক এক সামন্ততান্ত্রিক সেনা-শাসন যুগের সূচনা হয়।

২৫শে এপ্রিল, ১১৮৫। এই Genpei War চলাকালীন সময়েই জাপানের Yamaguchi Prefecture এ অবস্থিত বর্তমান Shimonoseki শহরের কাছাকাছি এক গুরুত্বপূর্ণ জলযুদ্ধ - Battle of Dan-no-ura - সংঘটিত হয় যেখানে প্রচুর হিইক (Heike) সামুরাইদের মৃত্যু হয়েছিলো। অর্ধ-দিনব্যাপী ঐ যুদ্ধে সংখ্যালঘু অসহায় হিইক সামুরাইদের শেষ আশ্রয় হয়েছিলো সমুদ্রের তলদেশ।

এর অনেক পরের কথা হতে পারে। সময় সব ঘটনার উপর প্রলেপ ফেলে দিলেও জাপানের ইনল্যান্ড-সী’র জেলেরা কিন্তু ভোলেনি হিইক সামুরাইদের বীরত্বের কথা। পরম শ্রদ্ধা ভরে নিশ্চয়ই স্মরণ করতো তারা ঐ বীরদের আর জাল টানতো।

তোমাদের ভুলি নাই,
তোমাদের ভোলা যায় না।

ঠিক এই সময় ওদেরই এক জেলের জালে অন্য অনেক সাধারণ কাঁকড়ার সাথে উঠে এলো এক অদ্ভুত-দর্শন কাঁকড়া। চম্‌কে উঠেছিলো নিশ্চয়ই সেই জেলে। আবেগে-আপ্লুত হয়েছিলো নিশ্চয়ই। তার ছন-কাঠের পরিপাটি ঘরের এক কোনে রাখা চিরচেনা সেই হিইক সামুরাই বীরের মুখ এই কাঁকড়ার গায়ে! তবে কি যুগ-যুগ আগের সেই যুদ্ধে তলিয়ে যাওয়া সব বীররা নতুন আবাস গেড়েছে এই গহীন জলের তলে, ধরেছে এই কাঁকড়া-রূপ! ওদেরকে কি আর খাওয়া যায়? ওদেরকে কি আর জালের বাঁধনে বাধা যায়? এতো বড় অসম্মান তো ওদের প্রাপ্য নয়! পরম যত্নে ছেড়ে দিয়েছিলো কাঁকড়াটিকে তাই সেই জেলেটি। হ্যাঁ, ছড়িয়ে গিয়েছিলো এই খবর। তারপর কোন জেলেরাই আর তাদের বীরের মুখোশধারী ঐ হিইক ক্র্যাব ধরেনি, তাদের বীরদের প্রতি এভাবেই সম্মান দেখিয়েছে তারা!



হিইক ক্র্যাব


প্রকৃতিতে ছদ্মবেশ-ধারণ (disguise) একটা জনপ্রিয় ও কার্যকরী টিকে থাকার পন্থা (survival strategy)। তাই কোন ফুলের আকৃতি কোন বিষাক্ত পোকার মত হতেই পারে, প্রজাপতির pupae কোন সাপের মাথার দাগযুক্ত বৈশিষ্টসম্পন্ন হতেই পারে। তবে কোন কোন ক্ষেত্রে এই ধোঁকাবাজি (bluff) খুব সহজ-সরল পর্যায়ে থাকে না। উপরে উল্লেখিত হিইক ক্র্যাবদের ব্যাপারটা এইরকম এক জটিলাবস্থা। তবে জীবজগতের এই camouflage phenomenon ব্যাখ্যা করা যায় ইভ্যুলিউশনারী সাইকোলজীর দ্বারা, আর জীনতত্ত্ব তো আছেই। এই সেল্‌ফ-ডিসেপ্‌শন মানুষদের মাঝেও আছে, যখন তারা নিজের অজান্তেই নিজেকে উল্লেখযোগ্য করে তুলতে চায়, গোত্র-সামাজিক ব্যবস্থায় নিজের chance of survival কে optimise করতে। সেটা নিয়ে না হয় আরেকদিন .....।

তবে ঐ হিইক ক্র্যাবদের ক্ষেত্রে যে ব্যাপারটা অল্পবিস্তর বোঝা যাচ্ছে সেটা হলো, যখন ঐ জেলেরা তাদের বীরের মুখোশধারী ঐ হিইক ক্র্যাবদের না ধরে ছেড়ে দিচ্ছিলো ক্রমাগত, তখন নিজেদের অজান্তেই জাপানের ইনল্যান্ড-সী’র জেলেরা এক informal selective breeding programme চালাচ্ছিলো গত প্রায় এক সহস্রাব্দ ধরে। আর এই ফাঁকে ঐ কাঁকড়াগুলোও ‘শিখে’ গিয়েছিলো তাদের বেঁচে থাকার মূল রহস্য! নিজেদের খোলসের (carapaces) কিছু এলোপাতাড়ি (random) দাগের জন্য দায়ী (যেটা কিনা ঐ জেলেদের কুসংস্কারাচ্ছন্ন মনের কাছে বীর-সম্মাননা প্রাপ্ত হিইক-সামুরাই মুখোশ!) সেই সেলফিশ জিনটাকে ঠিকই তারা বংশপরম্পরায় চালান করে দিচ্ছিলো!

খোলসের (carapaces) কিছু এলোপাতাড়ি (random) দাগ বললাম এই কারণে যে, ইভ্যুলিউশন শুধু ইচ্ছা করেই কিছু মানব-ছবি কিছু পোকা/কাঁকড়ার পিঠে একে দেয়নি, মানব-ছবি মোটেও গুরুত্বপূর্ণ নয় এখানে। camouflage phenomenon’তে জীবজগৎ বিভিন্ন জটিল ও সুনির্মিত নকশা/প্যাটার্নের আশ্রয় নেয়। যদি কোন জায়গায় দুটো কালো দাগ থাকে, আমাদের সদা-কল্পনাপ্রবণ মস্তিষ্ক বাকি কাজটুকু নির্দ্বিধায় করে ফেলে, আশেপাশের অন্য দাগগুলি থেকে একটা মানব-মুখের প্যাটার্ন খুঁজে বের করে। আর তারপর তার প্রতি সহানুভুতিশীল হয়!

তবুও ভাবতে ভালো লাগে, ঐ বীর হিইক সামুরাইরা জাপানের ইনল্যান্ড-সী’র অতলে কিছু কাঁকড়ার রূপ ধরে নতুন জীবন শুরু করেছে। ওরা না হয় ওভাবেই থাকুক !




সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ রাত ২:০০
৪০টি মন্তব্য ৪০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×