১
বহুকোষী প্রাণী হইয়া জন্মগ্রহণ করিবার ফলস্বরূপ বহুবিধ জটিলতার ভিতরে একটি অন্যতম সমস্যা বা ত্রুটি হইতেছে এককোষী অণুজীবদের চিন্তা-ভাবনা সম্পর্কে অস্পষ্টতায় বিরাজন কিংবা তাহাদের এই বলিয়া তাচ্ছিল্যজ্ঞান করা যে ‘আরে উহারা সাহিত্যচর্চা করিলেও তো কখনই রসময়গুপ্ত হইতে পারিবে না’। তবে যাহাই হউক, ইহা তো নিতান্তই সত্য, নতুবা বাস্তবকথন, যে আমাদিগের (এই ক্ষেত্রে ‘আমার’ বলাই উত্তম) উচ্চাকাঙ্খা, উন্নত জীবনের হাতছানি, প্রেম-ভালোবাসার আয়নপ্রবাহ, টেষ্টোষ্টেরন, ফ্রাইড চিকেন, ব্রেষ্ট-ফিডিং, ঈশ্বর বিতর্ক, নবজাতক-ধর্ষণ, রাষ্ট্রযন্ত্রের কূটনীতি, নাগরিক লাঞ্ছনা, পুঁজিবাদের চোরাস্রোতে সেলাইমেশিন-গবাদিপশু, মূল সমস্যা হইতে যোজন-যোজন দূরবর্তী অঞ্চলে বিচরণপূর্বক ওয়াশিংমেশিনে ধৌতকৃত মস্তিষ্কধারীদের কাষ্ঠদণ্ডের ছড়িসমেত লম্ফঝম্প, প্রশ্নাতীত (!) অবধারণসম্পন্ন এবং প্রভূত বিশ্লেষণী ক্ষমতাসম্পন্ন কুশীলবদের অর্থহীন ল্যারিক্স কাঁপানো, কতিপয় শুভ্রশ্মুশ্রু এবং সাদাজোব্বাধারীদের ‘হক মাওলা’ এবং ললাটে দুর্নীতি-অপকর্মের কৃষ্ণকায় ক্ষতচিহ্ন, পারসোনা’র পারসোনিফিকেশন, এইজ-রিম্যুভাল মাখন, তৈলাক্ত জুতার পালিশ, শরীরচর্চাকেন্দ্রের দৌরাত্ম্য, পুঁজিতান্ত্রিক গ্ল্যামার প্রতিযোগিতা এবং উঁচুনিচু-মেলানিন-কমবেশী বর্ণভেদের ফাঁক গলিয়া ‘সুপারহিউম্যান’ মানবসম্প্রদায়ের সময়ই বা কোথায় ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র এককোষী প্রাণীদের বোধ নিয়া ভাবনার অবকাশের।
২
মানুষ জন্মানোর পরের মুহূর্ত থেকেই যে এককোষী অণুজীবগুলো মানবদেহকে আষ্টেপৃষ্ঠে জাপ্টে ধরে; পরিপাকতন্ত্র, শ্বসনতন্ত্র, দন্ত ও চর্মে তাদের আধিপত্য ঘোষণা করে, অতঃপর ধীরে ধীরে এক জটিল সম্প্রদায় গঠন করে এবং মৃত্যু পর্যন্ত সঙ্গ দেয় মানবদেহকে, এগুলোই সেই মহানুভব ব্যাকটিরিয়া (একবচনে ব্যাকটিরিয়াম)। মানবদেহের কোষের তুলনায় প্রায় দশগুন সংখ্যার অধিকারি হলেও এরা নিতান্তই ছোট মানবকোষাকৃতির কাছে। আমাদের চর্মচক্ষুর কাছে ওরা তাই অদৃশ্য। অলক্ষ্য।
ব্যাকটিরিয়া এককোষী, প্রোক্যারিয়ট (prokaryote) অণুজীব (microorganism)। প্রোক্যারিয়ট বলা হচ্ছে কারণ এদের কোন সেল-নিউক্লিয়াস নেই, অথবা নেই কোন ঝিল্লী-আবদ্ধ (membrane-bound) অর্গানেল (organelle) - যদিও এর কিছু কিছু ব্যতিক্রম প্রত্যক্ষ করা যায়। এককোষী হলেও, মানব ইতিহাসের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে এই অণুজীব। ভুলে গেলে চলবে না জীবনের উৎপত্তি এই এককোষী অণুজীবদের মাধ্যমেই হয়েছিলো। এককোষী প্রাণের উৎপত্তি বিবর্তনের আওতাভুক্ত না হলেও বিবর্তন ব্যাখ্যা করতে চায় তার পরের ধাপগুলো – এককোষী প্রাণের ক্রমিক মেটামরফোসিস। তাই আজ যখন বহুকোষী জটিল দেহযন্ত্রের বিকাশ সাধন হয়েছে, তখন অণুজীবগুলোর প্রাগৈতিহাসিক ভূমিকা উচ্চবোধশক্তিসম্পন্ন মানুষের কাছে ধরা নাও দিতে পারে। কিন্তু এখন বোধকরি সময় এসেছে ওদের ভিন্নভাবে পর্যবেক্ষণের।
১৬৮৩ সালে লিউয়েন হুক নামক এক ওলন্দাজ বিজ্ঞানী যখন অণুবীক্ষণ যন্ত্রের জানালা দিয়ে উঁকি মেরে মানবকোষের ফাঁকে ফাঁকে দেখলেন এক সমৃদ্ধ অণুজীব সম্প্রদায় (microbial community), তখন রয়্যাল সোসাইটিকে তিনি এই জানিয়ে লিখলেন, “many very little living animalcules, very prettily a-moving”। মানবদেহে অবস্থানরত এই জীবগুলোর জীবন-ব্যবস্থা বুঝতে তাই পরবর্তী সময়ে বিজ্ঞানীরা অণুজীবগুলোকে তাদের নিজস্ব সহজাত বাসভুমি থেকে আলাদা কোরে গবেষণাগারের কালচারডিশে নিয়ে এলেন, যার ফলে যেটা হোলো, তথ্যের ঘাটতি। যাই হোক, নতুন নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা অবশেষে এটাই উপলব্ধি করতে সক্ষম হন যে ক্ষুদ্র হলেও, এই অণুজীব সম্প্রদায় এক শক্তিশালী রাসায়নিক কারখানা যেটা মৌলিকভাবে মানবদেহের কর্মবৃত্তিকে প্রভাবিত করে। এই সম্প্রদায় এলোমেলো এলোপাতাড়ি নয়, বরং সুসংগঠিত সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী যারা বংশপরম্পরায় আমাদের ভেতর বিরাজ করছে। আমরা সাধারণতঃ জননী এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের কাছ হতেই জীবনের প্রথম অণুজীবগুলো পেয়ে থাকি এবং কিছু নির্ধারিত হয় আমাদের জীবনশৈলীর উপর। এগুলোর উপরই নির্ধারিত হয় স্বতন্ত্র মানবদেহের অভ্যন্তরীণ অণুজীব-সম্প্রদায়ের প্যাটার্ন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, পরিপাকতন্ত্র এবং অন্যান্য নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকলেও, এইসব অণুজীবগুলো দেহের কোষগুলোকে রাসায়নিক সঙ্কেতের মাধ্যমে উত্তেজিত/আলোড়িত করতে পারে। আবার অনেক ব্যাকটিরিয়্যাল প্রোডাক্ট যেগুলোকে আমরা বিষাক্ত বলে চিহ্নিত করি, সেগুলো নাকি আদৌ তা নয়। এগুলো নাকি শুধুই অণুজীব (microbe) আর গৃহকর্তার (host) মধ্যে আলাপচারিতা। We are in constant communication with our microbes, and the messages are broadcasted throughout the human body। লণ্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের এক উৎসাহী রসায়নবিদ তো এই কথা বলেই ফেললেন যে পেটের নাড়ীভুঁড়ির ভেতরে বসবাসরত এই শক্তিশালী সম্প্রদায় যে শুধু আমাদের খাদ্যদ্রব্য হজম করার ক্ষেত্রেই সাহায্য করে তা নয়, এদের দৌড় নাকি আমাদের মস্তিষ্ক পর্যন্তও – influences subtle workings of our brain chemistry as well! শুধু কি তাই! আমরা কথায় কথায় যে জেনেটিক ডিটারমিনেজম ছুড়ে দিই, সেটাও কিঞ্চিত লঘু হয়ে যাচ্ছে যখন দেখা যাচ্ছে অতিশয় স্থুলতা’র (obesity) কারণ শুধু জিনেটিক নয়, অণুজীবও বটে! কিভাবে? ওয়াশিংটন স্কুল অফ মেডিসিনের বিজ্ঞানীরা মোটা ইদুরের পরিপাকতন্ত্র থেকে কিছু ব্যাকটিরিয়া যখন স্থানান্তরিত করলেন এক শুঁটকো ইদুরের মধ্যে, দিব্যি ফুলে গেলেন লরেল! হার্ডি তো অবাক! যাই হোক, একই ভাবে, বিজ্ঞানীরা এটাও খেয়াল করলেন দুজন মোটা-চিকন যমজ মানবশিশুর ভেতর অণুজীব সম্প্রদায়ের উল্লেখযোগ্য পার্থক্য বিদ্যমান।
ব্যস!! হয়ে গেলো! আমেরিক্যান সোসাইটি অফ মাইক্রোবায়োলজী’র ১০৮তম সম্মেলনে Margaret McFall-Ngai নামক এক অণুজীববিজ্ঞানী বলে উঠলেন, “Human beings are not really individuals; they’re communities of organisms”! আমরা ওইসব অণুজীবদের আবাসভূমি নই শুধু, ওরা শুধুই আমাদের খাদ্যদ্রব্য পরিপাক করায় না বা রোগসংক্রমণ হতে বাঁচায় না, ওরা-আমরা মিলিয়েই এক যৌথ প্রাণ, আমাদের দেহ ওদের সাথে অভিযোজিত হয়! সুপার-অর্গানিজম! হুম! অনেকটা গায়ার মতন। সবকিছুই এক জটিল সিস্টেমের অংশ। প্রাণ-চাঞ্চল্যে সমৃদ্ধ প্রত্যেকটি সত্তা/অস্তিত্ব এই সিষ্টেমের অন্তর্ভুক্ত। এবং সবকিছুই সম্পর্কযুক্ত এক পুনঃপ্রত্যাবর্তী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে!
“আমরা কে?”- এই প্রশ্নের জৈবিক-উত্তর খোঁজার জন্য হিউম্যান জিনোমের দিকে তাকাই এবার। এই প্রজেক্ট যখন ডিএনএ’র তিন বিলিয়ন-বেইস-পেয়ার সিকুয়েন্স বের করে ফেলল, আমরা হয়তো ভাবছিলাম যে এটাই হয়তো মানব-জীবনের নীলনকশা! বেশ কিছুদিন পর অবশ্য এটাই বোঝা গেলো যে এই জিনোম আসলে আমাদের পূর্ণাঙ্গ সত্তার কিয়দংশ মাত্র। এখন নাকি এই কথাও হচ্ছে, যে স্বতন্ত্র মানব-নীলনকশা পূর্নাঙ্গরূপে বুঝতে হলে আমাদের ভেতর বসবাসরত স্বতন্ত্র-অণুজীবগুলোর জিনোমও বিবেচনায় আনতে হবে, অন্যথায় মানবচরিত অধরাই থাকবে।
তাই অণুজীবদের নিয়ে এই নতুন ধারণা গুরুত্বপূর্ণ বটে।
The discovery underscored the fact that life as we know it is built upon microbes, whether we look in the deepest oceans or our own intestines .....
তাই এই প্রশ্ন এখন উঠতেই পারে যে, Are we organisms or living ecosystems?
৩
অণুজীবদের লইয়া কিঞ্চিত জ্ঞান আহরণের পর এই মুহূর্তে শুধু ইহাই জানিতে ইচ্ছা করিতেছে, কোন এক কবি-হত্যাপরিকল্পনার সময় কোন এক পাপাচারীর ব্যাকটিরিয়া কলোনি কি নির্লিপ্ত ছিলো? কোন এক কালে স্বজাতি ধর্ষণের সময় তাহাদের মাইটোকণ্ড্রিয়াল ডিএনএ কি কাঁপিয়া উঠে নাই? অতঃপর দলমতনির্বিশেষে সকল ভাবাদর্শ ভূলুণ্ঠিত করিয়া জগতের সব দলীয়-আদর্শ যখন একীভূত হইয়া যায়, গণতান্ত্রিক ও (অ)গণতান্ত্রিক দলপতিগণ পর্দার আড়ালে পারিবারিক সম্পর্ক স্থাপন করেন সম্প্রীতি আর ঐক্যের সার্কাসে, নৈতিকতার লেজুড় খুঁজিয়া না পাওয়া সন্তানদিগদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করিতে চান আধিপত্যপরম্পরা, তখন আমজনতার ত্রাহি আর্তনাদ করা ছাড়া আর উপায়ান্তর আছে কি? স্বজাতির মুক্তচিন্তা, মানবিক মূল্যবোধ, সাংস্কৃতিক কৃষ্টি (ওহ্ চিত্তাকর্ষক শব্দমালা) তো থামাইতেই হইবে! প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়ন আবার কি? উহাদের চিন্তা করিতে দেওয়া যাইবে না! উহারা শুধুই ছুটিবে। উহারা শুধুই দৌড়াইবে। দৌড়াইতে দৌড়াইতেই পরম সুখের উদ্যানে নিক্ষিপ্ত হইবে। থলির বিড়াল বাহির হইয়া আসিতে থাকিলেও এই ঘুণধরা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিরাজমান কুটিল অক্টোপাসের শুড়গুলি গুটাইয়া নিতে বাধ্য করিবে কে?
প্রায় সাড়ে পনের ইঞ্চি পর্দার সামনে মুখগুজিয়া বসিয়া সাতাশিখান বোতামের সহায়তায় ফুঁসিয়া উঠা রক্তকণিকা নির্লিপ্ত করা যাইতে পারে বড়জোর, বহির্জগতের কলুষিত এবং পচিয়া যাওয়া দেহে প্রাণ সঞ্চার করিতে পারেনা কখনই। তাহার পরও নাকি বরষা আসে, নদী ফুলিয়া উঠে, শালিকের চোখের বিষণ্ণতা দেখিয়া পঙ্গু-মানস সাহিত্য করিতে চায়।
এককোষী বহুকোষী মিলিয়া ইহা একটি গুরুচণ্ডালী জগাখিচুড়ী হইয়া গিয়াছে। উপাদেয় না হইলে উদ্গিরণ করুন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


