প্রথম পর্ব এর পর থেকে
“সরি, আপনাকে পুরা ভিজিয়ে দিলাম।”
একটা মেয়ের কন্ঠে আমি বাস্তবে ফিরি, দেখি আমার পাশের সিটে আপাদমস্তক ভেজা একটা সুন্দরী মেয়ে বসেছে, বাসের সিটটা বেশ চিপা হওয়াতে আমার একপাশও সে ভালোমতোই ভিজিয়ে দিয়েছে, তার কোলের কলেজ ব্যাগটাও ভিজা। সে আমার দিকে কৌতুক মাখা চোখে তাকিয়ে আছে। আমি কিছু না বলে একটু হাসলাম। আসলে আমার অনেকটা ঘোরলাগা অবস্থা হয়েছে, কোন সুন্দরী মেয়ে দেখলে বরাবরই যেটা আমার হয়। :!>
মেয়েটির চুলগুলো ভেজা, কপাল ভেজা, চোখের পাতা, তারপর .......... সবখানে শুধু ফোঁটা ফোঁটা জল, যেন সবুজ পাতায় শিশির কনা। বাস আবার চলতে শুরু করেছে, বৃষ্টি মনে হয় আরো বেড়েছে, সেই সাথে আমার ঘোর লাগা ভাবটাও বেড়ে চলেছে।
হঠাৎ মেয়েটা খুব উল্লাস নিয়ে বলল,
“আজকে খুব দারুন বৃষ্টি নামছে, তাই না?”
আমি কি বলব? আবার সেই আধখানা হাসি দিলাম।
“আপনার হাসিটা কিন্তু খুব সুন্দর ! প্লিজ, ডোন্ট মাইন্ড”।
আমি শকের মতো খেলাম।
বলে কি মেয়েটা? আমার এক অতি বিজ্ঞ কাজিন ইদানীং বলে, “অর্ক, তোমার হাসিটা ইম্প্রুভ করতেছে। চেষ্টা করো, মেয়েরা এরকম হাসি পছন্দ করে।” মোবাইলেও একটা অচেনা মেয়ে আমার হাসি শুনে বলে, “আপনার হাসি খুব সুন্দর, যারা প্রানখুলে হাসতে পারে তাদের মনটা অনেক বড় হয়।"
আমাকে কিছু বলতে না দেখে মেয়েটি বলে, “আপনি কি আমার উপর রাগ করছেন?” এবারে তো কথা বলতে হয়, নাহলে আবার গাঁধা ভাবতে পারে।
“কি নাম তোমার!” (জুনিয়র ছেলেমেয়েদের দেখলেই আমি নিজের স্টুডেন্ট ভাবতে শুরু করি।)
“শ্রাবণ”
আমি তো আবার ভাবের জগতে চলে গেলাম। :#>
নাহ, আজকের বৃষ্টি বোধ হয় আমাকে ভাসিয়েই নিয়ে যাবে।
“কি নাম শুনেই চুপ? আসলে আমার নাম শ্রাবনী, সবাই শ্রাবণ বলে ডাকে।”
“আমি অর্ক। তুমি কিসে পড়ো?”
“ইকোনোমিক্স -ফার্স্ট ইয়ার। আপনি কি স্টুডেন্ট?”
আমি আবার হেসে নিজের জীবনের একমাত্র পরিচয়খানা দেই।
“ও, মাই গড!”
“কেন কী হৈসে?”
শ্রাবণী খানিকটা লজ্জা পায়, হাসিটা এড়াতে মুখ অন্যদিকে সরিয়ে নেয়।
আমি ভাবি, “শুধু তোমার জন্য” টাইপ গান মনে হয় এদের নিয়েই লেখা হয়।
“বৃষ্টিতে ভিজতে তোমার কি খুব ভালো লাগে?”
যেন হৃদয়ের কোন কথা বলা হয়েছে এরকম ভাব নিয়ে শ্রাবনী বলল, ”ভীষণ ভাল লাগে, বৃষ্টি হলেই ভিজতে নেমে যেতে ইচ্ছে করে। আপনার ভালো লাগে না?”
“খু-উ-উ-ব, বৃষ্টিতে ভিজলে মন ভালো হয়ে যায়।” (পুরো মিথ্যা কথা, নিজে নিরাপদ অবস্থায় থাকলে বৃষ্টি এবং বৃষ্টিভেজা কাউকে দেখতে ভালো লাগে, কিন্তু নিজে ভুলেও ভিজতে চাইনা, জ্বর-জারি হবার ভয়ে বর্ষার দিনে ব্যাগ সাথে থাকলেই ছাতা রাখি।)
কিন্তু আমার বানানো কথায় শ্রাবণী খুব খুশী হলো, যেন মনের মানুষের দেখা পেয়েছে এমন ভাব সাব।
“আপনার কি রিকশায় করে ঘুরতে ভালো লাগে?
“হ্যাঁ, খুব। বাসে চড়ি বাধ্য হয়ে। কাজ না থাকলে প্রায়ই বিকেলবেলা একা একা রিকশায় করে ঘুরতে বের হই।” (৫০% মিথ্যা। আসলে বাসে চড়তেই বেশী ভালো লাগে, দু একজন সুন্দরী ললনার দেখা পাওয়া যায়, আর রিকশায় তো একা একা বোরিং লাগে।)
“আপনার দেখি আমার সাথে খুব মিল। কিন্তু একটা ব্যাপারে খুব অমিল। আপনার পড়তে খুব ভালো লাগে, আর আমার পড়তে একদম ইচ্ছে করে না।”
হায়রে মেয়ে, আমার যে পড়তে কেমন লাগে, তা যদি তোমাকে বোঝাতে পারতাম! বুক চিড়ে দেখালে বুঝতে পারতা নিরস পড়াশুনায় ঝাঝড়া হয়ে গেছে অন্তরটা।
তবু বলি, “কেন ইচ্ছে করে না, কেন?”
শ্রাবণী মন খারাপ করে বলে, “পড়ে কি হবে?”
সত্যিই তো, পড়ে কি হবে? আহারে, এ্যাতো সুন্দর একটা মেয়ে, ওর জীবনটা অন্যরকম হওয়া উচিত- আনন্দময়, ভালোবাসাময়।
আমাকে চুপ থাকতে দেখে শ্রাবণী বলে, “কী ভাবছেন?”
কথা ঘুরানোর জন্য বলি, “তোমার কি ক্লাশ আছে নাকি এখন?”
“হ্যাঁ, কিন্তু ক্লাশ করবো না।”
“কেন?”
“এমনি ইচ্ছে করতেছে না একদম। কিছুক্ষন বৃষ্টিতে ভিজে ঘোরাঘুরি করে বাসায় চলে যাব।”
বাইরে তাকিয়ে দেখি বৃষ্টি অনেকটা কমে আসছে। তাই দেখে শ্রাবণীর মনটা আরো খারাপ হয়ে গেল। সে একদম চুপ। ওকে চুপচাপ দেখে আমার মনটাও খারাপ হয়ে গেল। বাস নীলক্ষেতের কাছে চলে আসছে। এখনি আমরা আলাদা হয়ে যাব, আর কোনদিন দেখা হবে না। এর আগে ও এমন হয়েছে। আমি কখনো কোন মেয়ের মোবাইল নাম্বার চাইতে পারিনা, কেমন যেন নিজের কাছে ছোট ছোট লাগে। আমি জানি শ্রাবণীকে যতই ভালো লাগুক, আমি ওর নাম্বার চাইতে পারব না।
বাস থামল। আমরা দুজনেই নেমে এক জায়গায় দাঁড়ালাম। বাইরে মেঘলা পরিবেশে সবুজ ড্রেস পরা মেয়েটিকে সত্যিই ভীষন ভালো লেগে গেল। দুজন চুপচাপ দাঁড়িয়ে, কেউ কোন কথা বলি না। দু তিন মিনিট চলে যায়। ওর মুখে মেঘলা আকাশের মত অন্ধকার, ওকে ছেড়ে যেতে আমার নিজের ও কষ্ট হচ্ছে, না হলে কোন একটা কিছু বলে হাসিয়ে দিতাম।
আমি একটু সরে আস্তে করে ডাকি, “এ্যাই খালি, পলাশী যাবা?”
রিকশাটা দাঁড়িয়ে পরে। সোজা উঠে বসি। তারপর ফিরতে থাকি হৃদয়হীন সেই চেনা রাজ্যের দিকে।
যদি মন কাঁদে
তুমি চলে এসো
এক বরষায় !
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই আগস্ট, ২০০৯ রাত ১০:৪৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



