somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমার মৃত্যু

০২ রা মে, ২০১০ সন্ধ্যা ৭:০১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমার লাশটাকে ঘিরে ছোটখাট একটা জটলা। আশপাশের মানুষগুলো আমার কত জনমের চেনা। ওদের সুন্দর মুখগুলো কেমন যেন শুকনো আর মলিন।

আমার মাকে কেউ সামলাতে পারছে না। মা খুব চিৎকার করে কাঁদছে আর বারবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলছে। মার যে প্রচন্ড শ্বাসকষ্ট। এমনভাবে কাঁদলে তো মাকে বাঁচানো যাবে না। মাকে থামানো দরকার। কিন্তু কার সে সাধ্য আছে?

আমি যখন মায়ের কোলজুড়ে আসি তখন কত বয়স হবে তার? বড়জোড় সতের-আঠের। সেই অল্পবয়সী সংসার না জানা মা একহাতে আমাকে সামলেছেন, অন্যহাতে সংসার। দুবছর বয়সে বাবা বিদেশে চলে গেলে মা যে আমাকে কত কষ্ট করে একা একা বড় করেছেন তা কি আর আমি জানি না। অথচ মাকে একটা দিনের জন্য শান্তি দিয়ে যেতে পারলাম না।

দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে বাবা আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। বাবার চোখদুটো টকটকে লাল। বিদেশে খুব ভাল চাকরী ছেড়ে চলে এসেছিলেন শুধুমাত্র আমার জন্য। আমি যেন ভালভাবে পড়াশুনা করি, বিপথে না যাই। যখন যা আবদার করতাম তাই পেতাম। ধারদেনা করে হলেও বাবা সেটা পূরন করতেন।

বাবার স্বপ্নপূরনের পথে অনেকদূর এগিয়েছিলাম। আর মাত্র ছয়মাস পরে আমার পাশ করে বের হবার কথা। তারপর বড় চাকরী করব, বাবাকে আর কষ্ট করতে দেব না। বলবো, “তোমার এবার অবসর।” সেকথা বলা হল না।

আমার ছোট্ট ভাইটার মুখের দিকে তাকানো যায় না। ভীষন আঘাত পেয়েছে। ও যে বড্ড ভীতু। ও এখন কার সাথে ঘুমোবে? কে ওকে অংক করাবে? কত স্বপ্ন ছিল ছোট ভাইটাকে ডাক্তার বানাব। ও বলত, “ভাইয়া বিদেশী ডিগ্রী না থাকলে তো রোগী আসবে না।” আমি বলতাম, “যেমন করে হোক তোকে বিদেশে পড়তে পাঠাব। আমি খরচ যোগাড় করব।” সেইসব সুখের দিন দেখা হল না।

আমার নানী মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন নিঃশব্দে। ইনি আমার মায়ের খালা। নিজের নানীকে দেখিনি, তবে তার অভাব কোনদিন বুঝতে পারিনি। মনে পড়ে, ছোটবেলায় যখন আমি টাইফয়েডে পড়ে সাতদিন হাসপাতালে ছিলাম আমার অসহায় মাকে সঙ্গ দিয়েছিলেন তিনি।

নানীর দেড়তলা বিল্ডিংটা জুড়ে আমার কত শৈশব স্মৃতি। আশপাশের ছোটছোট ঘর এমনকি ফাঁকা জায়গাটাতেও চারতলা-ছয়তলা ফ্লাটবাড়ি উঠেছে। নানীকে যদি বলি বিল্ডিং ভেঙ্গে নতুন করে করতে তিনি বলেন, “তুই আমার নতুন বিল্ডিং এর ডিজাইন করে দিবি।” গণকযন্ত্রে পড়াশুনা করা এই আমি তাকে বোঝাতে পারিনা যে, দালানকোঠার ডিজাইন করা ইঞ্জিনিয়ার আমি না। বলি, “ঠিক আছে করে দেব।” কিন্তু করা হল না।

আমার দাদী গ্রামে আছেন। তাকে সম্ভবত আমার মৃত্যুর সংবাদ দেয়া হয়নি। অসুস্থ মানুষ তার অতি আদরের নাতিকে হারানোর ধাক্কা কিভাবে সামলাবেন? মাছের কাঁটা বেছে খেতে পারতাম না বলে দাদী কাঁটা বেছে কিমা ভেজ়ে দিতেন। মা রাগ করতেন, “এভাবে আহ্লাদ করলে ও তো কোনদিন কাঁটা বেছে খেতে পারবে না।”

দাদীর একটাই আফসোস, তাঁর ছয়ছেলে কেউ গ্রামে দালান করে দেয়নি। ঝড়ের সময় খুব ভয়ে থাকেন। আমি আশ্বাস দিতাম, “আমি আপনাকে পাকা দালান করে দিব আর সেই বাড়ি থাকবে আপনার সব সন্তানের নামে।” সেই স্বপ্নটাও বাকী থেকে গেল।

সাদা কাফনে মোড়ানো এই আমাকে এখন মাটির নিচে শুইয়ে দেয়া হবে। প্রিয় মুখগুলোকে ছেড়ে যেতে খুব খুব কষ্ট হচ্ছে। তবু চলেছি অজানার পথে।


--------------------------------------------------------------------
কারো জন্য কোনকিছু থেমে থাকে না, সব চলতে থাকে তার আপন গতিতে। তবু মাঝে মাঝে ভাবি, কাছের মানুষগুলোর এত এত ভালোবাসা, আদর। দিনে দিনে জমছে ঋণের পাহাড়। কি করে শোধ দেব আমি? এই ছোট্ট জীবনে সবকিছু করে যেতে পারব তো?


১০-০১-০৯
২৬টি মন্তব্য ২৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রাসূলের (সা.) অনুসারি হবেন শুধুমাত্র সাহাবা (রা.), অন্যরা এবং ওলামা ওলামার অনুসারি হবেন

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:৪০




সূরাঃ ৩৫ ফাতির, ২৮ নং আয়াতের অনুবাদ-
২৮। এভাবে রং বেরং- এর মানুষ, জন্তু ও আন’আম রয়েছে। নিশ্চয়ই আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে (ওলামা) আলেমরাই তাঁকে ভয় করে।নিশ্চয়্ই আল্লাহ পরাক্রমশালী ক্ষমাশীল।

সূরা:... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:২৩


Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে নবীজির শেখানো এক অনন্য আমল

লিখেছেন নতুন নকিব, ১১ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৯:০৩

দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে নবীজির শেখানো এক অনন্য আমল

ছবি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

মানুষের জীবন মূলত অসংখ্য ছোট-বড় সিদ্ধান্তের সমষ্টি। প্রতিটি বাঁকে, প্রতিটি মোড়ে আমাদের কোনো না কোনো... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১১ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪

আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×