“শিক্ষা কোন পণ্য নয়,
শিক্ষা আমার অধিকার।।"
বাংলাদেশে বিক্রয়যোগ্য জিনিস বোধহয় কমে গেছে। না হলে জনগণের বহুল আকাঙ্ক্ষিত সরকারগুলো কেনই বা জনগণের শিক্ষা বিক্রি করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত? শিক্ষাব্যবস্থা যে সমস্যার কাটাতারে জর্জরিত তা সমাধানের ধৃষ্টতা আমার নেই। কিন্তু যারা সমাধান দিতে পারে, তাদের সমাধান না দেয়ার অহেতুক অযুক্তির প্রতিবাদে কিছু কথা বলা তো রামায়ণকে মহাভারত বানাবে না।
ভারতে উচ্চশিক্ষার বাজেট ২০%, মালয়েশিয়ায় ৩৩%, থাইল্যান্ডে ১৯% আর আমাদের দেশে ৮%। জাতীয় আয়ের ১.২ শতাংশ শিক্ষাক্ষেত্রে নির্ধারিত! তুলনা করতে গেলেও সমস্যা আছে! বাংলাদেশ তো মালয়েশিয়া না! শিক্ষার কথা বললেই আমাদের টাকা নাই। গরীব দেশ আমরা। আমরা এতটাই গরীব, ৮০০ কোটি টাকা ব্যয়ে অচল মিগ কিনতে আমাদের হাত কাঁপে না। তখন চিন্তাতেই থাকে না, আমরা গরীব। ২১ কোটি টাকা ব্যয়ে যখন ভাড়া নিই ডিসি-১০ বিমান; যার ক্রয়মূল্য কিনা ১৫ কোটি টাকা; তখন আমরা গরীব থাকি না, অতিরিক্ত ৬ কোটি টাকার ক্ষতিতে আমরা দরিদ্র হই না। অথচ, একটা উন্নয়নশীল দেশের উন্নতির প্রধান হাতিয়ার হওয়া উচিত শিক্ষা, সেখানে মন্ত্রী-মিনিস্টাররা প্রাডো ছাড়া চাইনিজ হজম করতে পারে না। এই টাকা দিয়ে কি পারা যেত না নতুন স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা করতে? ৩১টি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাখাত উন্নয়ন করতে? ৮০০ কোটি টাকা দিয়ে ১৩ হাজার প্রাইমারী স্কুলে ২০ বছর শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন দেয়া যেত না? কি জানি! গরীব বলেই হয়তো না...
শরৎচন্দ্র বলেছিলেন, “মানুষকে পশুর স্তরে না নামালে মানুষকে দিয়ে পশুর কাজ করানো যায় না।" এরাও হয়তো নিরক্ষর বাংলাদেশ দেখতে চায়। চায় নীতিহীন ছাত্রসমাজ। যে ছাত্রসমাজের উপর আগে দেশের মানুষ ভরসা করতো, তারা এখন যমদূত। দেশে প্রায় ৫৬ লাখ মানুষ মাদকাসক্ত যার ৯১ ভাগই তরুন-তরুণী। একজন ছাত্র যদি নেশার পিছনে দিনে ১০০/= টাকা ব্যয় করে, তাহলে ৫৬ লাখ মানুষ ৫৬ কোটি টাকা। বছরে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা। যে গরীব দেশে শিক্ষার বাজেট ১৪ হাজার কোটি টাকা, সেখানে নেশার বাজেট ১৯ হাজার কোটি টাকা! নেশা কমানোর উদ্যোগ হাসিনা-খালেদা এমনকি ধর্মপ্রাণ নিজামীর নাই। কালো টাকা সাদা করবার সময় এরা সবাই একমত। লাইসেন্স দিয়ে মদ খাওয়ার বিপরীতে সংসদে কেউ কথা বলে না। এরা শুধু একজন আর একজনের চেয়ে বেশী টাকা কামাই করার সুযোগ খুঁজে। জনগণকে দেয়ার লক্ষ্য তাদের সীমীত।
লর্ড বেরিংটন বলেছিলেন, “শিক্ষা সবার জন্য নয়। শিক্ষা পাবে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ।" দেশ স্বাধীন হলেও শাসকশ্রেণীর চরিত্রের পরিবর্তন হয় নাই। জনগণের জন্য রচিত হয়নি কোনো শিক্ষানীতি। তাই ডিজিটাল সরকার শিক্ষানীতিতে বিদ্যমান 'ধর্মনিরপেক্ষতা' বাদ দিয়ে 'অসাম্প্রদায়িক চেতনা' যোগ করার খসড়া করে! এরা সেই ধরনের সরকার যারা শিক্ষানীতি প্রবর্তনের জন্য ছাত্রদের অভিমত নেয় না, কোনো ছাত্রসমাজ শিক্ষা সম্মেলন করে রিপোর্ট পেশ করতে চাইলে তাও নেয় না। এরা গণতন্ত্রী হলে স্বৈরাচারী কারা? ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, ছাত্রশিবির কি শুধু এদের ভাড়াটে বাহিনী? এদেরকে শিক্ষামূলক কাজে উদ্বুদ্ধ না করে কেন লেলিয়ে দেয়া হচ্ছে অস্ত্র হাতে ক্ষমতার পিছনে? জানি না... হয়তো জানা যাবেও না...
সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (UGC) “বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার কৌশলপত্র – ২০০৬-২০২৬" নামে একটা সংস্কার প্রস্তাব তুলে ধরে।
সেখানের কিছু অংশ-
১. ডীন মনোনয়নের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের মতামত দেয়ার সুযোগ থাকবে না।
২. সিনেট, সিন্ডিকেট, সিলেকশন-বোর্ডসহ সিদ্ধান্তগ্রহণের ক্ষেত্রসমূহে সরকারের মনোনীত ব্যক্তিদের প্রাধান্য থাকবে।
৩. বিশ্ববিদ্যালয়ের আয় পর্যায়ক্রমে বাড়ানোর মাধ্যমে সরকারী বরাদ্দ কমাতে হবে।
কি সুন্দর ও মহান সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনা। কোনো দলেরই ক্ষতি নাই এই সিদ্ধান্তগুলোতে। তাই এইক্ষেত্রে সকলে সমান, কেউ কারো বিরোধী না। বাঁশ শুধু ছাত্রদের, এদেশের মানুষের।
সুন্দর একটা উদাহরণ হলো, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে বিভাগ ৪টি, ছাত্রসংখ্যা ১৫০; ভর্তি ফি ২০,২০০টাকা; ডাইনিং ফি ১,৮০০টাকা; বিদ্যুৎ বিল ও সেমিস্টার ফি ৫,০০০টাকা। এটাকে সরকার পরিচালিত প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় বললে ভুল হবে না।
সরকারী বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের আরেক নমুনা 'জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়'। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আইনের কিছু কথা -
১. বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক পরিচালনা ব্যয়ের নিরিখে (মূলধন ব্যতিরেকে) প্রতি বছর শিক্ষার্থীদের নিকট হতে আদায়যোগ্য বেতন-ফিস নির্ধারিত হবে।
২. পঞ্চম বছর হতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শতকরা ১০০ ভাগ ব্যয় তার নিজস্ব আয় দ্বারা পরিচালিত হবে।
খোদ UGC চেয়ারম্যান 'সাপ্তাহিক-২০০০' এ দেয়া সাক্ষাৎকারে ২৮ এপ্রিল, ২০০৬ -এ বলেছিলেন, “এটা আসলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়।"
অভ্যন্তরীণ আয় বৃদ্ধির জন্য আবাসিক হল সংকোচনের কৌশলও ইউজিসি-র। এর কারণ সম্পর্কে তাদের বক্তব্য, “আবাসিক হল ছাত্রদের মধ্যে সংঘাতময় রাজনীতির সম্প্রসারণ করে।" হাস্যকর অযুক্তি! কারণ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো আবাসিক হল নেই। তারপরও ছাত্রলীগ-ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরের সশস্ত্র সংঘাত সেখানে বিদ্যমান। এমনই প্রশাসন, যারা ছাত্রদের থাকবার ব্যবস্থা করতে চায় না।
একটা কৌতুক শুনলাম সেদিন। ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চা তারস্বরে বলছে আর লাফাচ্ছে, “মায়ের দুধ আমার সুযোগ নয়, অধিকার।" আমাদের দশাও তাই। তাহলে আমরা কি? মনে হয়, অধিকার সচেতন(!) ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চা ...
তথ্যসূত্র ---> ভ্যানগার্ড ; আখর ।
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই অক্টোবর, ২০১০ রাত ১:০৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


