somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নারী ---- মা নাকি মানুষ!!!!!!!!!!!!!!!! নাকি শুধুই মেয়ে মানুষ ?

০৭ ই মে, ২০০৯ দুপুর ১২:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমি আমার কর্মজীবনে বিভিন্ন ঘটনার সম্মুখীন হয়েছি, আর এখন ও হচ্ছি। প্রতিটি ঘটনাই আমার কাছে এসেছে আমাকে অবাক করবার জন্য। ঘটনা গুলো যাদের জীবনের তাদের কাছে এই ঘটনা খুবই তুচ্ছ । বলবার মত নয় কিন্তু আমাদের আজ্ঞতা , আগ্রহ দেখে ওরা বলে যায় ওদের জীবন কাহিনী।

এই সব তুচ্ছ ঘটনা একত্রিত হয়ে যখন আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায় তখন আমরা দেখতে পাই এক ভয়াবহ চিত্র। এ ঘটনাগুলো হয়ত অনেকের কাছে খুবই আবাস্তব মনে হবে যেমন আমার কাছেই মাঝে মাঝে মনে হয়।

কিন্তু এই চিত্র খুবই বাস্তব আর স্বাভাবিক আমাদের এই সমাজে। কারও কারও জীবনে দৈনন্দিন ভাত খাবার মত ব্যাপার। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে এভাবেও বেঁচে থাকা যায়।
আমি কিছু কিছু ঘটনা ধারাবাহিক ভাবে লিখব বলে ভাবছি।

সুখ

জরির স্বামীর নাম সাহেব আলী। দিন মজুরী তার পেশা। যেদিন কাজ পায় সেদিন তো যার বাড়ীতে কাজ তার বাড়ীতেই খাওয়া । সন্ধ্যার সময় দুই সের চাল আর পঞ্চাশটা টাকা। উহ সেদিন তার ফুর্তি তে গলা দিয়ে গান বের হয়। বাসায় বউটা আর বাড়ীর সবাই কি খেল না খেল তা দেখার কি আছে! চালের সঙ্গে এক সের কাঁচামরিচ তো আনছে।

সস্তা দামের বিড়ি টানতে টানতে বাড়ী ফিরে বউটার উপর তার পৌরুষত্ব দেখিয়ে আরামে ঘুম । এই ঘুম ফজরের আজানের আগে আর ভাঙ্গে না।

বউটা নিজের ক্লান্ত শরীরটা নিয়ে চাটাইএ পড়ে থাকে। পেটে অনন্ত ক্ষুধা, সারা শরীরে ব্যাথা দাঁড়াতে পারে না, পা দুটা কাঁপে, মাথা ঘুরে । শরীরের ক্ষুধা হয়তো কোন একদিন ছিল ,কিন্তু কোন দিন বুঝতেই পারে নাই এই ক্ষুধা কিভাবে মেটে। বিয়ের পর পর শুধু ক্ষুধার সাথে যন্ত্রনা বাড়ত। আর এখন শুধুই নিপীরন মনে হয়। প্রতিটি দিনের আসহনিয় নিপীরন, কাউকে না বলতে পারা নির্যাতন।

ঠোঁটের কোনে ঘা হয়েছে। হাতে পায়ে পানি আসছে মনে হয়। বুক ধরফর করে। একটু ঔষধ যদি পাইত তবে একটু আরাম হইত। নিজের মনেই হেসে উঠে জরি , ভাত নাই তার আবার ঔষধ। আর আমার শ্বশুর বাড়ীর চৌদ্দগুষ্টির কেউ কোন দিন বাচ্চা হবার জন্য ডাক্তার দেখাইছে নাকি। বাচ্চা হওয়া তো লজ্জার কথা । সেটা নিয়া আবার ডাক্তারের কাছে যাও লাজ শরম কিছু নাই। বেহায়া কোথাকার? গ্রামে আর থাকা লাগবেনা। মন্ডলের বাড়ীর বউরা পর্যন্ত ডাক্তার দেখায়না তার আবার আমি।

জরির পেটে এখন তার চার নাম্বার সন্তান। একদিন খুব সাহস করে সাহেব আলীকে বলেছে-- --------"আমি আর পারব না বাচ্চা নিতে। আমার শরীর আর চলে না। কত কিছু ব্যাবস্থা হইছে, ক্লিনিকগুলিতে গেলে তারা ব্যাবস্থা করে দেবে।"
সাহেব আলী খুব ক্ষেপে গিয়ে বলেছে ------------তুই পারবিনা কেন রে ? আমার একটাও ব্যাটা নাই। তুই মেয়ে মানুষ হয়ে জন্ম নিয়া বলছিস বাচ্চা পেটে নিবি না!!! কেন তুই কি বেশ্যাগিরি করবি? মেয়ে মানুষের কাজই হল একটা, সেটা হল বাচ্চা পেটে ধরা। হারামজাদী আমাকে ব্যাটা দে তার পর তোর কথা চিন্তা করা যাবে। তুই মরলে তো আমার হার জুড়ায়। আমি দশ হাজার টাকা ডিমান্ড নিয়া আর একটা বিয়া করতে পাড়ি।"

বিড়ি টানতে টানতে সাহেব আলীর ঠোঁট দুটো গায়ের চামরার মত কালো রঙ ধারন করেছে। সে বড় করে বিড়ির মুখে একটা টান দেয় তারপর জরির পেটের দিকে তাকিয়ে বলে, "এবার ও যদি তোর বেটি হয় , তা হইলে আমাকে অন্য চিন্তা করতে হবে।"

স্বামীর কথা শুনে জরির সারা গা যেন দপ করে জ্বলে উঠে। মানুষটার মুখে এমন কথা জরির বড় অসহ্য। ইচ্ছে করে বুড়া ঝাঁটাটা বান্দরটার কালা মুখের উপর ভাঙ্গে। জরি কিছুক্ষন চুপ করে থেকে রাগটা সামলিয়ে নিয়ে বলে "তোমার যদি এতই ব্যাটার সখ তো আল্লাকে বলতে পার না । ব্যাটা বানানোর কাজ কি খালি আমার?"
বউ এর প্রশ্নের কোন সদুত্তর খুঁজে পায় না সাহেব আলী। সে অকারনে পিঠটা চুলকায় হাত দিয়ে। তারপর বিড়ি টানতে টানতে ঘর থেকে বের হয়ে যায়।

দিন যতই যাচ্ছে সন্তান ভারে ক্লান্ত জরির দেহমন ততই দূর্বল হয়ে পড়ছে। খালি ভয় হয় এবার ও যদি মেয়ে হয়, তাহোলে? এর উত্তর যানে না সে। মেয়ের জন্যই যদি তার ঘর ভাঙ্গে তবে পুরুষ গুলো এত বউ বউ করে কেন? মেয়ে জন্ম না হলে বউ আসবে কত্থেকে? পৌরুষগিরি দেখাবে কাকে।

সেদিন আষাড় মাসের সন্ধ্যা । ঝম ঝম করে বৃষ্টি পরছে। সারাদিন বৃষ্টি। বাড়িতে জরি একা। ওর শ্বাশুড়ী জরির বড় মেয়ে দুইটাকে নিয়ে বেড়াতে গেছে তার মেয়ের বাড়ীতে । রাতে থাকতেও পারে। ছোটটা এখন ও মায়ের শুকনা দুধ চুষে চুষে ঘুমায়। তাই আছে জরির কাছে।

এখন চুলায় চাল চড়ানোর সময়। জরি পিছনের মন্ডলের বাড়ীর বাইরের নলকূপে যায় পানি আনতে। মাটির রাস্তা বৃষ্টিতে খুব পিছলা হয়েছে। পা টিপে টিপে হাঁটছে জরি। ভিখারী বুড়ি কালার মা জরির পিছ ধরে । একমুঠ খুদ ও যদি পায়। তার উপর আজ যে বৃষ্টি রাতটা জরির বাড়ীর চালাতে কাটাতে পাড়লে আর বাড়ী যাবে না। জরি রাগত্ব স্বরে বলল ----------"দেখ বুড়ী অন্য কোথাও যাও আমাকে জ্বালাইওনা।"

জরি তার ছোট্ট উঠান মাড়িয়ে ঢুকল তার এক চালা রান্নাঘরে। হঠাৎ উঠল প্রোসব ব্যথা। সে অনেক কষ্টে কলসটা রাখল মেঝেতে। ঘরটা প্রায় অন্ধকার , তখন সাঁঝের আলোটা পর্যন্ত জ্বালান হয় নি। ঘরের মেঝেতে বসে পড়ল জরি। সে প্রানান্ত চেষ্টা করছে সন্তান প্রসবের।

ভুমিষ্ট হোল শিশু। জরি চোখ বুজে সন্তান প্রসবের পরবর্তি স্বস্থিটুকু ভোগ করছিল। সন্তান প্রসবের পর সন্তান ধারনের যে আনন্দ তা কেবল মায়েরাই জানে। তা কেবল প্রসূতিরাই ভোগ করে।
এই সময় কালার মা এসে দরজায় দাড়াঁয়। জরিকে ডাকে রাতটা যেন থাকতে দেয়। কালার মাকে জরি ভিতরে ডাকে, বাচ্চাটার নাড়ী কাটার জন্য। অন্ধোকারে শিশুটিকে হাতরিয়ে কালার মা বলে উঠল, "এটাতো মেয়েরে।"

বুড়ীর কথা শুনে জরির প্রসবের সব আনন্দ যেন নিমেষেই বন্যায় ভেসে নিয়ে গেল। এবার আর তার রক্ষা নেই, নিশ্চিত তার ঘর ভাঙ্গবে। এই মেয়ে তার ঘর ভাঙ্গবার জন্য এসেছে। তার বড় রাগ হল শিশুটির ওপর। পা দিয়ে সে শিশুটিকে সরিয়ে দিল। তার মন বলছে, এ মেয়েটা মরলে তার আর ঘর ভাঙ্গবে না। তার ক্লান্ত পা দুটো দিয়ে শিশুটির গলা চেপে ধরতে চাইছে।

হঠাৎ এক টুকরো আলো দরজার ফাঁক দিয়ে ঠিকরে পড়ল শিশুটির মুখের ওপর। মুখের দিকে তাকাল জরি। সন্তান বাৎসল্যে গলে গেল মাতৃহৃদয় । দুটো হাত দিয়ে শিশুটিকে ছোঁ মেরে তুলে নিল বুকে। গালে, কপালে চুম্বন ও দিল কয়েকটা। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল তার ঘরের দরকার নাই , তার সন্তান আছে।

এবার জরির চোখ পড়ল শিশুটির নাভির নিচে। একি দেখছে সে, এ যে তার ছেলে। সে চীৎকার করে বলল, "ওমা ! তুই এত মিথ্যাবাদী, এটা যে আমার ছেলে রে।'"

এই বলে সে কাঁদতে লাগল। তার আনন্দ আশ্রুতে শিশুর ভেজা ও পিচ্ছিল বুক আরও ভিজে গেল। পৃথিবীর সব আনন্দ যেন আজ জরির ছোট্ট চালা ঘরে এসে জমে হয়েছে। এ সুখ শুধু পুত্র সন্তান প্রসবের নয়, তার ঘর না ভাঙ্গার ।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে জানুয়ারি, ২০১০ দুপুর ১২:৪২
২২টি মন্তব্য ২০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিলিয়নিয়ার রবিন খুদা ও আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকার

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ০৯ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:৩০

বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় কী?

কর্মসংস্থান? না।

বিনিয়োগ? না।

ডলার সংকট? না।

গার্মেন্টস খাতে ছাঁটাই? না।

ব্যাংকিং খাতের আস্থা সংকট? না।

সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো— কোনো অনুষ্ঠানে জুলাই চেতনা কত মিলিলিটার ঢুকেছে, কে কতবার উচ্চারণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×