আমি আমার কর্মজীবনে বিভিন্ন ঘটনার সম্মুখীন হয়েছি, আর এখন ও হচ্ছি। প্রতিটি ঘটনাই আমার কাছে এসেছে আমাকে অবাক করবার জন্য। ঘটনা গুলো যাদের জীবনের তাদের কাছে এই ঘটনা খুবই তুচ্ছ । বলবার মত নয় কিন্তু আমাদের আজ্ঞতা , আগ্রহ দেখে ওরা বলে যায় ওদের জীবন কাহিনী।
এই সব তুচ্ছ ঘটনা একত্রিত হয়ে যখন আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায় তখন আমরা দেখতে পাই এক ভয়াবহ চিত্র। এ ঘটনাগুলো হয়ত অনেকের কাছে খুবই আবাস্তব মনে হবে যেমন আমার কাছেই মাঝে মাঝে মনে হয়।
কিন্তু এই চিত্র খুবই বাস্তব আর স্বাভাবিক আমাদের এই সমাজে। কারও কারও জীবনে দৈনন্দিন ভাত খাবার মত ব্যাপার। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে এভাবেও বেঁচে থাকা যায়।
আমি কিছু কিছু ঘটনা ধারাবাহিক ভাবে লিখব বলে ভাবছি।
সুখ
জরির স্বামীর নাম সাহেব আলী। দিন মজুরী তার পেশা। যেদিন কাজ পায় সেদিন তো যার বাড়ীতে কাজ তার বাড়ীতেই খাওয়া । সন্ধ্যার সময় দুই সের চাল আর পঞ্চাশটা টাকা। উহ সেদিন তার ফুর্তি তে গলা দিয়ে গান বের হয়। বাসায় বউটা আর বাড়ীর সবাই কি খেল না খেল তা দেখার কি আছে! চালের সঙ্গে এক সের কাঁচামরিচ তো আনছে।
সস্তা দামের বিড়ি টানতে টানতে বাড়ী ফিরে বউটার উপর তার পৌরুষত্ব দেখিয়ে আরামে ঘুম । এই ঘুম ফজরের আজানের আগে আর ভাঙ্গে না।
বউটা নিজের ক্লান্ত শরীরটা নিয়ে চাটাইএ পড়ে থাকে। পেটে অনন্ত ক্ষুধা, সারা শরীরে ব্যাথা দাঁড়াতে পারে না, পা দুটা কাঁপে, মাথা ঘুরে । শরীরের ক্ষুধা হয়তো কোন একদিন ছিল ,কিন্তু কোন দিন বুঝতেই পারে নাই এই ক্ষুধা কিভাবে মেটে। বিয়ের পর পর শুধু ক্ষুধার সাথে যন্ত্রনা বাড়ত। আর এখন শুধুই নিপীরন মনে হয়। প্রতিটি দিনের আসহনিয় নিপীরন, কাউকে না বলতে পারা নির্যাতন।
ঠোঁটের কোনে ঘা হয়েছে। হাতে পায়ে পানি আসছে মনে হয়। বুক ধরফর করে। একটু ঔষধ যদি পাইত তবে একটু আরাম হইত। নিজের মনেই হেসে উঠে জরি , ভাত নাই তার আবার ঔষধ। আর আমার শ্বশুর বাড়ীর চৌদ্দগুষ্টির কেউ কোন দিন বাচ্চা হবার জন্য ডাক্তার দেখাইছে নাকি। বাচ্চা হওয়া তো লজ্জার কথা । সেটা নিয়া আবার ডাক্তারের কাছে যাও লাজ শরম কিছু নাই। বেহায়া কোথাকার? গ্রামে আর থাকা লাগবেনা। মন্ডলের বাড়ীর বউরা পর্যন্ত ডাক্তার দেখায়না তার আবার আমি।
জরির পেটে এখন তার চার নাম্বার সন্তান। একদিন খুব সাহস করে সাহেব আলীকে বলেছে-- --------"আমি আর পারব না বাচ্চা নিতে। আমার শরীর আর চলে না। কত কিছু ব্যাবস্থা হইছে, ক্লিনিকগুলিতে গেলে তারা ব্যাবস্থা করে দেবে।"
সাহেব আলী খুব ক্ষেপে গিয়ে বলেছে ------------তুই পারবিনা কেন রে ? আমার একটাও ব্যাটা নাই। তুই মেয়ে মানুষ হয়ে জন্ম নিয়া বলছিস বাচ্চা পেটে নিবি না!!! কেন তুই কি বেশ্যাগিরি করবি? মেয়ে মানুষের কাজই হল একটা, সেটা হল বাচ্চা পেটে ধরা। হারামজাদী আমাকে ব্যাটা দে তার পর তোর কথা চিন্তা করা যাবে। তুই মরলে তো আমার হার জুড়ায়। আমি দশ হাজার টাকা ডিমান্ড নিয়া আর একটা বিয়া করতে পাড়ি।"
বিড়ি টানতে টানতে সাহেব আলীর ঠোঁট দুটো গায়ের চামরার মত কালো রঙ ধারন করেছে। সে বড় করে বিড়ির মুখে একটা টান দেয় তারপর জরির পেটের দিকে তাকিয়ে বলে, "এবার ও যদি তোর বেটি হয় , তা হইলে আমাকে অন্য চিন্তা করতে হবে।"
স্বামীর কথা শুনে জরির সারা গা যেন দপ করে জ্বলে উঠে। মানুষটার মুখে এমন কথা জরির বড় অসহ্য। ইচ্ছে করে বুড়া ঝাঁটাটা বান্দরটার কালা মুখের উপর ভাঙ্গে। জরি কিছুক্ষন চুপ করে থেকে রাগটা সামলিয়ে নিয়ে বলে "তোমার যদি এতই ব্যাটার সখ তো আল্লাকে বলতে পার না । ব্যাটা বানানোর কাজ কি খালি আমার?"
বউ এর প্রশ্নের কোন সদুত্তর খুঁজে পায় না সাহেব আলী। সে অকারনে পিঠটা চুলকায় হাত দিয়ে। তারপর বিড়ি টানতে টানতে ঘর থেকে বের হয়ে যায়।
দিন যতই যাচ্ছে সন্তান ভারে ক্লান্ত জরির দেহমন ততই দূর্বল হয়ে পড়ছে। খালি ভয় হয় এবার ও যদি মেয়ে হয়, তাহোলে? এর উত্তর যানে না সে। মেয়ের জন্যই যদি তার ঘর ভাঙ্গে তবে পুরুষ গুলো এত বউ বউ করে কেন? মেয়ে জন্ম না হলে বউ আসবে কত্থেকে? পৌরুষগিরি দেখাবে কাকে।
সেদিন আষাড় মাসের সন্ধ্যা । ঝম ঝম করে বৃষ্টি পরছে। সারাদিন বৃষ্টি। বাড়িতে জরি একা। ওর শ্বাশুড়ী জরির বড় মেয়ে দুইটাকে নিয়ে বেড়াতে গেছে তার মেয়ের বাড়ীতে । রাতে থাকতেও পারে। ছোটটা এখন ও মায়ের শুকনা দুধ চুষে চুষে ঘুমায়। তাই আছে জরির কাছে।
এখন চুলায় চাল চড়ানোর সময়। জরি পিছনের মন্ডলের বাড়ীর বাইরের নলকূপে যায় পানি আনতে। মাটির রাস্তা বৃষ্টিতে খুব পিছলা হয়েছে। পা টিপে টিপে হাঁটছে জরি। ভিখারী বুড়ি কালার মা জরির পিছ ধরে । একমুঠ খুদ ও যদি পায়। তার উপর আজ যে বৃষ্টি রাতটা জরির বাড়ীর চালাতে কাটাতে পাড়লে আর বাড়ী যাবে না। জরি রাগত্ব স্বরে বলল ----------"দেখ বুড়ী অন্য কোথাও যাও আমাকে জ্বালাইওনা।"
জরি তার ছোট্ট উঠান মাড়িয়ে ঢুকল তার এক চালা রান্নাঘরে। হঠাৎ উঠল প্রোসব ব্যথা। সে অনেক কষ্টে কলসটা রাখল মেঝেতে। ঘরটা প্রায় অন্ধকার , তখন সাঁঝের আলোটা পর্যন্ত জ্বালান হয় নি। ঘরের মেঝেতে বসে পড়ল জরি। সে প্রানান্ত চেষ্টা করছে সন্তান প্রসবের।
ভুমিষ্ট হোল শিশু। জরি চোখ বুজে সন্তান প্রসবের পরবর্তি স্বস্থিটুকু ভোগ করছিল। সন্তান প্রসবের পর সন্তান ধারনের যে আনন্দ তা কেবল মায়েরাই জানে। তা কেবল প্রসূতিরাই ভোগ করে।
এই সময় কালার মা এসে দরজায় দাড়াঁয়। জরিকে ডাকে রাতটা যেন থাকতে দেয়। কালার মাকে জরি ভিতরে ডাকে, বাচ্চাটার নাড়ী কাটার জন্য। অন্ধোকারে শিশুটিকে হাতরিয়ে কালার মা বলে উঠল, "এটাতো মেয়েরে।"
বুড়ীর কথা শুনে জরির প্রসবের সব আনন্দ যেন নিমেষেই বন্যায় ভেসে নিয়ে গেল। এবার আর তার রক্ষা নেই, নিশ্চিত তার ঘর ভাঙ্গবে। এই মেয়ে তার ঘর ভাঙ্গবার জন্য এসেছে। তার বড় রাগ হল শিশুটির ওপর। পা দিয়ে সে শিশুটিকে সরিয়ে দিল। তার মন বলছে, এ মেয়েটা মরলে তার আর ঘর ভাঙ্গবে না। তার ক্লান্ত পা দুটো দিয়ে শিশুটির গলা চেপে ধরতে চাইছে।
হঠাৎ এক টুকরো আলো দরজার ফাঁক দিয়ে ঠিকরে পড়ল শিশুটির মুখের ওপর। মুখের দিকে তাকাল জরি। সন্তান বাৎসল্যে গলে গেল মাতৃহৃদয় । দুটো হাত দিয়ে শিশুটিকে ছোঁ মেরে তুলে নিল বুকে। গালে, কপালে চুম্বন ও দিল কয়েকটা। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল তার ঘরের দরকার নাই , তার সন্তান আছে।
এবার জরির চোখ পড়ল শিশুটির নাভির নিচে। একি দেখছে সে, এ যে তার ছেলে। সে চীৎকার করে বলল, "ওমা ! তুই এত মিথ্যাবাদী, এটা যে আমার ছেলে রে।'"
এই বলে সে কাঁদতে লাগল। তার আনন্দ আশ্রুতে শিশুর ভেজা ও পিচ্ছিল বুক আরও ভিজে গেল। পৃথিবীর সব আনন্দ যেন আজ জরির ছোট্ট চালা ঘরে এসে জমে হয়েছে। এ সুখ শুধু পুত্র সন্তান প্রসবের নয়, তার ঘর না ভাঙ্গার ।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে জানুয়ারি, ২০১০ দুপুর ১২:৪২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



