মার্ক জুবায়ের এর আত্মজৈবনিক পোস্ট “যেভাবে বেঁচে থাকতে হয়ঃ বেঁচে থাকার সহজ প্রনালী...”
পড়ে ভিতরের শান্ত পুকুরটা কিসের ছোঁয়ায় যেন অশান্ত হয়ে উঠলো। একটি ঢিল এসে পড়ল পানিতে। ঢেউগুলো ছোট থেকে ধীরে ধীরে বড় হতে লাগল। সারাটাদিন কিসের এক আস্থীরতা, অব্যাক্ত যন্ত্রনা।
কোথায় যেন ঝড়বৃষ্টি হচ্ছে তারই ঝাপ্টায় দেবদারু গাছগুলি হেলে হেলে পড়ছে আর ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর জলকনা মাঝে মাঝে গায়ে এসে পরছে, দৃষ্টি মেলতেই দেবদারু গাছের ফাঁক দিয়ে, সেই ডাঃ রুমা ঘোষের বাসার সামনে মেরুন রঙের জামা পরা কাকলী নামের মেয়েটা যার হাতে একটা গিটার ওর সাথে আছে যূথী আর শিশির।
হ্যাঁ শিশিরই তো । ঐযে বলছে “এই তারাতারি চল্। আমি ফুটবল খেলতে যাব।“
আমি যখন ক্লাশ এইটে তখন শিশির এস এস সি পরীক্ষা দিল। রাস্তায় শিশিরকে দেখে যূথীদের দোতলার ছাদ থেকে আমি যখন ডাকলাম -“এই শিশির শোন” -- তখন শিশির উপরে উঠে এসে নির্জন চিলেকোঠায় দাঁড়িয়ে বলেছিল-“ আমাকে তুমি আর কখনও তুই করে বলবে না।“ আমি হেসে কুটি কুটি হয়ে বলেছিলাম-“ কেন তুই কলেজের ছাত্র হয়েছিস তাই। যা আর তুই বলব না।“ ও কি খুব আহত হয়েছিল আমার কথায়। যূথী আসার সাথে সাথে ওকে বলে দিয়েছিলাম শিশিরকে এখন শিশির ভাই বলতে হবে, আর তুমি করে বলতে হবে । ইউনিভার্সিটিতে গেলে আপনি বলতে হবে।
ওপাড়ার রাসেল আমাকে পছন্দ করে কথাটা জানার পর শিশির বলে ছিল খালি এ পাড়ায় আসুক টেংরী ভেঙ্গে হাতে ধরায় দেব । ওর রাগ দেখে বলেছিলাম “রাসেল খারাপ কোথায় কি সুন্দর দেখতে মেডিকেলে ভর্তি হয়েছে?” শিশির এত ক্ষেপে গিয়েছিল যে দুই হাত দিয়ে স্বরলিপির খাতাটা ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে আমাদের রেখে চলে গিয়েছে। আমি আর যূথী একে অন্যের দিকে তাকিয়ে শিশিরর কে ডাকতে ডাকতে ওর পিছু পিছু চললাম বাসার উদ্দ্যেশে।
আমি যখন ইন্টারমেডিয়েট এর পরিক্ষার্থী তখন আমার জন্মদিনে শিশির আমাকে একটা ক্যাসেট উপহার দেয়। যার প্রথম গানটা ছিল ---তুমি নির্জন উপকূলে নায়িকার মত ----- আর শেষ গানটা ছিল ----তোমাকে দেখেছি শ্রাবণে---।
ইউনিভার্সিটিতে ক্লাশ শেষ করে বের হয়ে মাঝে মাঝে দেখেছি শিশির এসে দাঁড়িয়ে আছে করিডোরে।
বলত- “আমারও ছুটি তাই তোকে নিতে আসলাম। চল একসাথে বাসায় যাই।“
একদিন দুইদিন বোধ হয় বলেছে- “চল কোথাও বসি, আড্ডা দিয়ে তারপর বাসায় যাই।“
আমি ওর সেই প্রস্তাব ফু দিয়ে উড়িয়ে দিয়ে বলতাম-“ তোর সাথে তো জন্মের পর থেকে আড্ডা দিচ্ছি এখানে আর কি আড্ডা দেব? তার চেয়ে বাসায় চল রেস্ট নেব।“ আমরা পাড়ার ছেলে মেয়েরা একই স্কুলে এক সাথেই বড় হয়েছি। সবাই ছিলাম সবার খুব আপন খুব কাছের। তাই শিশির আলাদা করে কিছু ছিল না আমার কাছে।
আমার যেদিন এঙ্গেঞ্জমেন্ট সেদিন ও বার বার এসেছে আমার কাছে পাশে বসেছে হেসেছে কত মজার মজার কথা বলেছে। রাত ১১টার দিকে আড্ডার মাঝে ও হঠাৎ করে আমার মাথায় হাত রেখে বলে উঠেছিল “খুব সুখী হবে জীবনে----“ আমি হেসে বলেছিলাম কথোপকথন-- পূর্ণেন্দু পত্রী।
বিয়ের রাতে মার কাছে গিয়ে শিশির বলেছিল “চাচী কাকলীকে না খুবই সুন্দর লাগছে।“
ঠিক দেড়মাস পর ওর নতুন কর্মক্ষেত্র নেত্রকোনায় যোগদান করতে যেয়ে মুখোমুখি বাস সঙ্ঘর্ষে শিশির সহ মোট ৩৫জন মারা যায়। মারা যাবার তিনদিন পর শিশিরের বড় বোন নিশা আপু আমাকে টেলিফোনে ওদের বাসায় ডাকে। আমি গেলাম। নিশা আপু একটা ডাইরী আমার হাতে দিয়ে বলল-- "এটা তোমার জিনিস তোমার কাছেই রাখো।"
আমি খুব অবাক হয়ে কিছু বলতে চাইলে নিশা আপু কিছু বলতে বাধা দিয়ে চলে গেল। ডাইরীটা নিয়ে বাসায় এসে খুললাম, পড়তে শুরু করলাম। পড়তে পড়তে কখন যে থেমে গেছি ভেবেই পাইনি,--- নিশা আপু ডাইরীটা কি তুমি আমাকে না দিলে পারতে না? যে কথা শিশির কোনদিনও বলতে পারেনি, তা কেন তুমি আমাকে জানতে দিলে? কেন জানালে?
ডাইরীটা আমি শেষ করতে পারিনি। বহুদিন পর আজ আবার খুলে নিয়ে বসলাম। আবারও থেমে যেতে হল। অকারনেই চোখের পাতা ঝাপসা হয়ে আসে। আবার ডুবে যাই সে সুদূর অতীতে।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই আগস্ট, ২০০৯ রাত ১০:১২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




